মাধ্যমিক ইতিহাস – প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ – বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ (তৃতীয় অধ্যায়) – সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

পশ্চিমবঙ্গ মাধ্যমিক ইতিহাস পরীক্ষার তৃতীয় অধ্যায়ের বিষয় হল প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ। এই অধ্যায়ে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত প্রতিরোধ ও বিদ্রোহের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এই অধ্যায়ের বিষয়বস্তু শিক্ষার্থীদের ভারতীয় ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্পর্কে জানতে সাহায্য করে।

Table of Contents

মাধ্যমিক ইতিহাস – প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ – বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের বিরুদ্ধে ভারতে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল কেন?

ভারতে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ও ইংরেজ কর্মচারীদের সীমাহীন শাসন ও শোষণে বহু জমিদার তাঁদের জমিদারি হারায়, চাষি হারায় জমির স্বত্ব, অরণ্যচারীরা হারায় তাদের অরণ্যের অধিকার। অসংখ্য শ্রমিক, শিল্পী, পরিবার বেকার হয়ে পড়ে অর্থাৎ সমাজের সর্বস্তরের মানুষের জীবনকেই দুর্বিষহ করে তুলেছিল। এরই পরিণতি স্বরূপ দেখা দেয় ভারতবাসীর তীব্র অসন্তোষ।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সিপাহি বিদ্রোহের পূর্বে ভারতে সংঘটিত কয়েকটি বিদ্রোহের নাম করো।

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের সিপাহি বিদ্রোহের পূর্বে ভারতবর্ষের উল্লেখযোগ্য বিদ্রোহগুলি ছিল – (ক) সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ (১৭৬৩ খ্রি.), কোল বিদ্রোহ (১৮৩১-৩২ খ্রি.), চুয়াড় বিদ্রোহ (১৭৯৮ খ্রি.), তিতুমিরের বারাসত বিদ্রোহ (১৮৩০-৩১ খ্রি.) সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৫-৫৬ খ্রি.), মুন্ডা বিদ্রোহ (১৮৯৯ খ্রি.), নীল বিদ্রোহ (১৮৫৯ খ্রি.) প্রভৃতি।

উনিশ শতকের প্রথমার্ধে মুসলিমদের ব্রিটিশ বিরোধী বিদ্রোহগুলি কী কী ছিল?

ব্রিটিশ বিরোধী প্রথম মুসলিম বিদ্রোহ ছিল ফরাজি আন্দোলন। পাশাপাশি অন্য আর একটি আন্দোলন ছিল ওয়াহাবি আন্দোলন ৷

কোথায়, কবে চুয়াড় বিদ্রোহ শুরু হয়?

১৭৬৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে একাধিকবার চুয়াড় বিদ্রোহ দেখা দেয়। মেদিনীপুর জেলার লালগড়, রামগড়, জামবনি, কর্ণগড়, বাকুঁড়ার দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে ঘাটশিলা ও ধলভূমে চুয়াড়রা বিদ্রোহ করে। ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে শুরু হয় দ্বিতীয় চুয়াড় বিদ্রোহ।

চুয়াড় বিদ্রোহের কারণ কি?

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেওয়ানি লাভ করার পর জঙ্গলমহলে (চুয়াড়রা যেখানে বাস করত) অত্যধিক রাজস্ব নির্ধারণ করলে স্থানীয় জমিদারের পক্ষে সেই কর প্রদান করা সাধ্যাতীত হয়ে দাড়ায়। তাই চুয়াড়রা তাদের রাজা জগন্নাথ ধলের নেতৃত্বে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। এ ছাড়াও পাইকদের জমি হারানো, নিষ্ঠুর ভাবে জমি কেড়ে নেওয়া, চুয়াড়দের চিরাচরিত সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন, দুর্ভিক্ষ কি ছিল এই বিদ্রোহের অন্যতম কারণ।

চুয়াড় কাদের বলা হয়? চুয়াড় বিদ্রোহের নেতৃত্ব কারা দিয়েছিলেন?

চুয়াড় বলতে মেদিনীপুর ও বাঁকুড়ার জঙ্গলমহল নামে পরিচিত বনাঞ্চলের আদিবাসীদের বোঝাত। এই বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ধলভূমের রাজা জগন্নাথ হল, কর্ণগড়ের রানি শিরোমণি, রায়পুরের জমিদার দুর্জন সিংহ, ধানকার শ্যামগঞ্জন প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ।

চুয়াড়রা কী ধরনের কাজকর্ম করত?

চুয়াড়রা মূলত চাষ-আবাদ ও পশুপাখি শিকার করত। জঙ্গলমহলে উৎপাদিত দ্রব্য-সামগ্রী বিক্রি করত। কেউ কেউ আবার জমিদারদের অধীন আধাসামরিক বাহিনী অর্থাৎ পাইক বরকন্দাজের কাজ করত।পাইকান জমি কাকে বলা হয়?

জমিদাররা তাদের অধীনে পাইকের কাজ করা চুয়াড়দের নগদ অর্থে বেতনের পরিবর্তে যে খাস জমি ভোগ করতে দিত তাকে বলা হয় পাইকান জমি। এই জমি ছিল নিষ্কর জমি। কিন্তু কোম্পানি এই নিস্কর জমির ওপর রাজস্ব ধার্য করলে এবং পাইকান জমি কেড়ে নিলে পাইকরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে।

চুয়াড় বিদ্রোহে জমিদারগণ কী ভূমিকা পালন করেছিল?

ব্রিটিশ শাসকদের আরোপিত মাত্রাতিরিক্ত রাজস্ব জমিদারদের বিদ্রোহী করে তুলেছিল। তাই তারা পাইক বরকন্দাজের সহযোগিতায় ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে চুয়াড় বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেয়। কৃষকরা জমিদারের বন্ধু না হলেও তারা দলবদ্ধভাবে, নিজেদের স্বার্থরক্ষার জন্য জমিদারের নেতৃত্বে ব্রিটিশ শাসকদের সর্বগ্রাসী ক্ষুধা ও চরম শোষণ-পীড়নের জন্য চুয়াড় বিদ্রোহে যোগ দেয়।

চুয়াড় বিদ্রোহের অবসান হয় কীভাবে?

বিদ্রোহ চরম আকার ধারণ করায় মেদিনীপুরের শাস্তি বিঘ্নিত ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে দুর্জন সিংহের নেতৃত্বে চুয়াড় হলে লর্ড ওয়েলেসলি দুটি সেনাদলের সাহায্যে সাড়াশি অভিযান চালিয়ে বিদ্রোহীদের চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেন। বহু চুয়াড় বিদ্রোহীকে গাছে ঝুলিয়ে ফাঁসি দেওয়া হয়। বিদ্রোহীদের গ্রেফতার করে তাদের ঘাঁটিগুলি জ্বালিয়ে ও আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করে এই বিদ্রোহ দমন করে। অন্যদিকে বিভাজন নীতির আশ্রয় নিয়ে চুয়াড় ও পাইকদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে কৌশলে চুয়াড় বিদ্রোহের অবসান ঘটায়।

চুয়াড় বিদ্রোহের গুরুত্ব কী?

চুয়াড় বিদ্রোহ ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে জমিদার ও তার অনুচরবর্গ, কৃষকদের বিদ্রোহ হলেও এই বিদ্রোহের প্রাণশক্তি ছিল নিপীড়িত কৃষক যাঁরা সমাজের নিম্নবর্গের মানুষ ছিলেন তাঁরা বুঝেছিলেন জমিদারদের নিপীড়িতদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া অপেক্ষা ব্রিটিশ শাসনের অবসান বেশি জরুরি তাই তাদের আত্মপ্রত্যয় ন্যায্য অধিকার রক্ষার সংগ্রামকে অনুপ্রেরণা দেয় যা পরবর্তীকালে অনেক আন্দোলনের দিশারি হয়ে দাঁড়ায়।

ব্রিটিশ শাসনের প্রথম দশকে দুটি উপজাতি বিদ্রোহের নাম করো।

ব্রিটিশ শাসনের প্রথম দশকে দুটি উপজাতি বিদ্রোহ হল কোল বিদ্রোহ ও সাঁওতাল বিদ্রোহ। ১৮৩১-৩২ খ্রিস্টাব্দে কোল বিদ্রোহ শুরু হয় এবং এই বিদ্রোহের নেতা ছিলেন বুদ্ধ ভগৎ, জোয়া ভগৎ, সুই মুন্ডা। অন্যদিকে ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে সিধু-কানহুর নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল সাঁওতাল বিদ্রোহ।

কবে, কোথায় প্রথম কোল বিদ্রোহের সূচনা হয়?

১৮৩১-৩২ খ্রিস্টাব্দে ছোটোনাগপুরের রাঁচিতে এই কোল বিদ্রোহ প্রথম শুরু হয়।

কোল বিদ্রোহ কোথায় কোথায় ছড়িয়ে পড়েছিল?

ছোটোনাগপুরের রাঁচিতে এই বিদ্রোহের সূচনা হলেও ক্রমশ এই বিদ্রোহ সিংভূম, মানভূম, হাজারিবাগ, পালামৌ জেলায় ছড়িয়ে পড়েছিল। যদিও বহু আগেই এই বিদ্রোহ প্রকাশ পেয়েছিল সিংভূম জেলার শোনপুর পরগনায়।

কোল বিদ্রোহের নেতা কারা ছিলেন?

অন্যান্য বিদ্রোহের মতো কোল বিদ্রোহের ক্ষেত্রেও স্থানীয় নেতৃত্বের সৃষ্টি হয়। এঁরা হলেন — সুই মুন্ডা, বুদ্ধ ভগৎ, জোয়া ভগৎ, খাদু পাতর, ঝিন্দরাই মানকি, সূর্য, সিংরাই প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ।

দর্পনাথ সাহি কে ছিলেন? তাঁর সঙ্গে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কী চুক্তি হয়েছিল?

দর্পনাথ সাহি ছিলেন পালামৌর রাজা। ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে দর্পনাথ সাহির সঙ্গে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চুক্তি হয় যে, বাৎসরিক ছয় হাজার টাকা রাজস্বসহ অতিরিক্ত ছয় হাজার টাকা তিনি কোম্পানিকে প্রদান করবেন।

কোল বিদ্রোহের উদ্দেশ্য কী ছিল?

চার্লস মেটকাফ-এর মতে, কোল বিদ্রোহীদের প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ইংরেজ শাসনের অবসান ঘটানো। এ ছাড়া জমিদার, মহাজন, শস্য ব্যবসায়ী, পুলিশ, কোম্পানির কর্মচারীদের প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়া ছিল অন্যতম উদ্দেশ্য। কারণ কোল বিদ্রোহীরা এদের ইংরেজ শাসনের অঙ্গ হিসেবেই দেখেছিল। তাই ইংরেজ আশ্রিত লোকজনরা কেউই বিদ্রোহীদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি।

কোল বিদ্রোহের কারণ কী ছিল?

ছোটোনাগপুর অঞ্চলে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক উচ্চহারে রাজস্ব বৃদ্ধি, জমিদার-মহাজন- ব্যবসায়ীদের শোষণ ছিল কোল বিদ্রোহের মূল কারণ। অন্যান্য কারণগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – দেশি মদের ওপর কর স্থাপন, কোলদের ঐতিহ্য বিরোধী আফিম চাষ করতে বাধ্য করা, বেগার খাটানো, নারীদের সম্মান হানি হওয়া। এ ছাড়া বনজ সম্পদের ওপর কোলদের আজন্ম অধিকার ব্রিটিশরা ছিনিয়ে নিলে কোলরা বিদ্রোহী হয়ে উঠে।

কোল বিদ্রোহের প্রকৃতি আলোচনা করো।

কোল বিদ্রোহে কোলরা ছাড়াও ওঁরাও, হো, মুভা উপজাতির মানুষেরা যোগ দিয়েছিল। বিদ্রোহীরা দিকু, অর্থাৎ বহিরাগতদের এলাকা ছেড়ে যেতে নির্দেশ প্রদান করেন। নির্দেশ অমান্যকারীদের গৃহে অগ্নিসংযোগ করা হয়। বহু হিন্দু তাদের হাতে পড়ে আদিবাসী দেবতার সামনে বলি প্রদত্ত হয়। কোলদের আক্রমণে সূত্রধর ও কর্মকার ছাড়া কেউই রক্ষা পায়নি। নিম্নবর্গের বহু মানুষ এই বিদ্রোহকে সমর্থন করে।

কোলবিদ্রোহ কীভাবে দমন করা হয়?

ক্যাপ্টেন উইলকিনসনের নেতৃত্বে ৫০ নং বেঙ্গল ইনফ্যান্টি এনে প্রায় দুমাস ধরে অমানুষিক অত্যাচার চালিয়ে, অসংখ্য কোল উপজাতির নরনারীকে নির্মমভাবে হত্যা করে। ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে এই বিদ্রোহ দমন করা হয়।

অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত বিরাট ইংরেজ বাহিনীর তির, ধনুক, বল্লম সজ্জিত বিদ্রোহীরা শেষ পর্যন্ত পরাজয় স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়। এ ছাড়াও আঞ্চলিক সীমাবদ্ধতা, কোলদের মধ্যে ঐক্যের অভাবেও এই বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়।

কোলবিদ্রোহের ফলাফল কী হয়েছিল।

কোল বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও এর ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। এই বিদ্রোহের ফলে

  • ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ – পশ্চিম সীমান্ত এজেন্সি গঠন করা হয় ওই অঞ্চলের উপজাতিদের বসবাসের জন্য।
  • সরকার সেখানে কোম্পানির নিয়মবিধি কার্যকর না করে উপজাতিদের স্বশাসন, তাদের ঐতিহ্য রীতিনীতি মেনে নেয়।
  • জমি হস্তান্তরে বিধি-নিষেধ আরোপিত হয়।
  • উপজাতীয় গ্রাম- প্রধানদের জমি ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

মাধব সিং কে ছিলেন? কোলরা তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিলেন কেন?

মাধব সিং ছিলেন কোম্পানির দেওয়ান। মাধব সিং অত্যন্ত নির্ণয় ও নিষ্ঠুরভাবে কোলদের কাছ থেকে উচ্চহারে রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করলে হতদরিদ্র ও অসহায় কোলরা সর্বস্বান্ত হয়ে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন।

কোলদের বাধ্য করা হয়েছিল ফসলের বদলে নগদ অর্থে খাজনা প্রদান করতে। উৎপাদিত ফসল বিক্রি করতে গেলে তারা মহাজন ও জমিদারদের দ্বারা প্রতারিত হয়ে বিদ্রোহের পথ বেছে নেয়।

সাঁওতাল বিদ্রোহ কত খ্রিস্টাব্দে শুরু হয়? এই বিদ্রোহ কী নামে পরিচিত? সাঁওতাল পরগণা কী নামে পরিচিত?

সাঁওতাল বিদ্রোহ শুরু হয় ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে। এই বিদ্রোহ খেরওয়ারী হুল নামে পরিচিত। সাঁওতাল পরগনা দামিন-ই-কোহ বা মুক্তাঞ্চল নামে পরিচিত।

সাঁওতাল বিদ্রোহ কোথায় কোথায় ছড়িয়ে পড়েছিল?

১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে ভাগনাডিহি নামক স্থানে সাঁওতাল বিদ্রোহের সূচনা হয়। ক্রমে তা রাঁচি, হাজারিবাগ, ছোটোনাগপুর, পুরুলিয়া, মেদিনীপুর, বীরভূম, ভাগলপুর, মুরশিদাবাদ প্রভৃতি স্থানে বিস্তার লাভ করে।

সাঁওতাল বিদ্রোহ কাদের নেতৃত্বে সম্পন্ন হয়?

সাঁওতাল বিদ্রোহের নেতারা ছিলেন — সিধু, কানহু, চাঁদ, ভৈরব, ডোমনমাঝি, কালো প্রামাণিক, বীরসিংহ মাঝি প্রমুখ নেতৃবর্গ।

সাঁওতাল বিদ্রোহের কারণগুলি কী কী ছিল?

সাঁওতাল বিদ্রোহের উল্লেখযোগ্য কারণগুলি হল — নতুন ভূমিরাজস্ব নীতি, দামিন-ই-কোহের জাল কেটে সাফ করে দেওয়া, বহিরাগত (দিকু)দের আগমন ও শোষণ, চড়া খাজনা, বেগার শ্রম, মহাজন ও ব্যবসায়ীদের শোষণ, বেচারাম কেনারাম ও কামিয়াতি নামক ঋণচুক্তির প্রচলন, অরণ্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ, খ্রিস্টান মিশনারিদের করবার চেষ্টা, পুলিশ প্রশাসনের নিপীড়িন অনাবৃষ্টি অজন্মা প্রভৃতি।

সাঁওতাল বিদ্রোহের লক্ষ্য কী ছিল।

সাঁওতাল বিদ্রোহের লক্ষ্যগুলি ছিল –

  • দের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করা।
  • জমিদার, মহাজন, হংসায়ীদের শোষণ থেকে মুক্তি পাওয়া।
  • সাঁওতালরা, তাদের এই দুরবস্থার জন্য ব্রিটিশদের দায়ী করে ব্রিটিশ শাসনের উচ্ছেদ করতে চেয়েছিল।
  • অরণ্যের অধিকার ফিরে পাওয়াও ছিল সাঁওতাল বিদ্রোহের লক্ষ্য।

কামিয়াতি প্রথা কী?

কামিয়াতি ছিল এক ধরনের বন্ড। সাঁওতালরা মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে এই ব্যবস্থায় যতদিন ক্ষণ পরিশোধ করতে পারতো না ততদিন তাদেরকে মহাজনদের জমিতে বেগার খাটতে হত। কামিয়াতি প্রথায় মহাজনরা চড়া ও চক্রবৃদ্ধি হারে শোষ নেওয়ায় সেই ঋণ সাঁওতালরা কোনোদিন শেষ দিতে পারতো না। ফলে তারা চিরবন্দি হতে পড়ত।

হারওয়ারি ব্যবস্থা বলতে কী বোঝো?

দাদন নেওয়া সাঁওতালরা দাদন পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে, তাদের মহাজনদের জমিতে বেগার শ্রমদানের পাশাপাশি অন্যান্য কাজকর্ম করে দেওয়ার ব্যবস্থা হারওয়াহি ব্যবস্থা নামে পরিচিত।

বেচারাম কাকে বলা হয়?

বেচারামকে বলা হয় ছোটো বাউ। বেচারাম আসলে নির্দিষ্ট ওজন অপেক্ষা কম ওজনের এক ধরনের বাটখারা। এর দ্বারা সাঁওতালদের ক্রয় করতে আসা জিনিসপত্র কম ওজনের বাটখারায় মেপে পরিমাণে কম দিয়ে প্রতারিত করা হত।

কেনারাম কাকে বলে?

কেনারাম হল বড় বাউ। কেনারাম আসলে নির্দিষ্ট ওজন অপেক্ষা বেশি ওজনের একধরনের বাটখারা। এর দ্বারা ব্যবসায়ীরা সাঁওতালদের বিক্রি করতে আসা জিনিসপত্র বেশি ওজনের বাটখারার সাহায্যে মেপে ওজনে কম দেখিয়ে সাঁওতালদের ঠকানো হত। এটা প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই না।

সাঁওতাল বিদ্রোহ কী নিছক একটি উপজাতি বিদ্রোহ ছিল?

বিদ্রোহ ছিল না। এই বিদ্রোহে সাঁওতালরা ছাড়াও নিম্নবর্গের সাঁওতাল বিদ্রোহ শুধুমাত্র একটি উপজাতি সাধারণ মানুষ অর্থাৎ, কামার, কুমোর, দুধের গোয়ালা, তাঁতি (জোলা), তেলি প্রভৃতি নানা পেশার হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায় সাহায্য ও সমর্থন করেছিল। বস্তুত এটাকে নিছকই একটি উপজাতি বিদ্রোহ না বলে বরং সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে, মহাজন, জমিদার, ব্যবসায়ীদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের ঐক্যবদ্ধ সশস্ত্র সংগ্রাম বলাই শ্রেয়।

সাঁওতাল বিদ্রোহের প্রকৃতি নিয়ে ঐতিহাসিকরা কী মত পোষণ করেন?

আধুনিক গবেষক ও ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহকে শুধুমাত্র একটি উপজাতি বিদ্রোহ মনে করেন না। রমেশচন্দ্র মজুনদারের মতে, ১৮৫৫-৫৬ খ্রিস্টাব্দের সাঁওতাল বিদ্রোহ ব্রিটিশ অপশাসনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহ রূপে চিহ্নিত। সুপ্রকাশ রায় সাঁওতাল বিদ্রোহকে মহাবিদ্রোহের অগ্রদূতা স্বরূপ আখ্যা দিয়েছেন। কালীকিঙ্কর দত্তের মতে, এই বিদ্রোহ ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক বিদ্রোহ।

গিরা কি? সাঁওতালরা গ্রাম লুঠ করে সেখানে কি রেখে আসতেন?

গিরা হচ্ছে শালগাছের ডাল। সাঁওতালরা গ্রাম লুণ্ঠন করে বা ইংরেজদের বাংলোগুলি লুণ্ঠন করে সেখানে চামড়া বাধা বাঁশ পুঁতে রেখে আসত। এটি ছিল সাঁওতালদের অধিকার ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিতবাহী।

কীভাবে সাঁওতাল বিদ্রোহের সূচনা হয়?

স্বাধীন সাঁওতাল রাজ্য প্রতিষ্ঠার সংকল্প নিয়ে সিধু ও কানহু-র নেতৃত্বে ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দের ৩০ জুন ভাগনাডিহির মাঠে ১০ হাজার সাঁওতাল এই বিদ্রোহের সূচনা করে। প্রথমে তাঁরা দলবদ্ধভাবে পাঁচ কাঠিয়া গ্রাম আক্রমণ করে। দিঘি থানার দারোগা মহেশলাল দত্তকে হত্যা করে, কেনারাম ভগত সহ পাঁচজন কুখ্যাত মহাজনকে তারা হত্যা করে। এ ছাড়াও তারা সরকারের দপ্তরখানা, জমিদারদের কাছাড়ি এবং মহাজনদের আড়তগুলি আক্রমণ করলে সাঁওতালদের মধ্যে প্রবল প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এরপর ক্রমশ মহেশপুর, পাদুর, মুরশিদাবাদ ও বীরভূমের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এই বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে।

কারা সাঁওতালদের ওপর শোষণ করত?

সাঁওতালরা অনেকের দ্বারা শোষিত হয়েছিল। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল –

  • জমিদার ও তাদের নিযুক্ত খাজনা আদায়কারী
  • মহাজন
  • ব্যবসায়ী
  • রেলপথ নির্মাণের ঠিকাদার
  • ইউরোপীয় কর্মচারী
  • বহিরাগত দিকুও শস্য ব্যবসায়ী
  • নীলকর সাহেব। এরা সকলেই সাঁওতালদের ওপর শোষণ ও অত্যাচার করেছিল।

সাঁওতালদের লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন কারা?

সাঁওতাল বিদ্রোহকালে সাঁওতালদের আক্রমণের লক্ষ্য হয়েছিল দিঘি থানার দারোগা মহেশলাল দত্ত, কেনারাম ভগত সহ বহু কুখ্যাত মহাজন, পাকুরের রাজবাড়ী, অম্বর পরগনার জমিদার এবং বহু নীলকর সাহেব। রেলপথের ইউরোপিয় কর্মচারী, পদস্থ পুলিশকর্তা, ব্যবসায়ীদের অনেকে সাঁওতালদের দ্বারা নিহত হয়। সাধারণত বিদ্রোহীদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হত ইংরেজদের বাংলো এবং জমিদারদের গুদাম ও ধানের গোলা।

কীভাবে সাঁওতাল বিদ্রোহের অবসান হয়?

তির, ধনুক ও বল্লম সম্বল করে সাঁওতালরা কলকাতা দখলের উদ্দেশ্যে দল বেঁধে বেরিয়ে পড়লে ইংরেজ সেনাপতি মেজর বুরাফ ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে ১৬ জুলাই পিরপেত্তির কাছে সাঁওতাল বিদ্রোহীদের হাতে পরাজিত হন। নভেম্বর মাসে সাঁওতাল বিদ্রোহীদের অধীনস্থ সমগ্র এলাকায় সামরিক শাসন জারি করে মেজর জেনারেল লয়েডের নেতৃত্বে ৫৫ নং পার্বত্য বাহিনী সাঁওতালদের আক্রমণ করে। ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত উভয়পক্ষের সংঘর্ষ চলে। অবশেষে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতন চালিয়ে ব্রিটিশ সরকার এই বিদ্রোহ দমন করে।

সাঁওতালদের পরাজয়ের কারণ কী?

সাঁওতালদের পরাজয়ের কারণগুলি হল —

  • আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের অভাব
  • সিধু ও কানুর মৃত্যু
  • প্রায় ২০ হাজার সাঁওতালকে নির্মমভাবে হত্যা করা
  • ব্রিটিশ বাহিনী কর্তৃক গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংস করা প্রভৃতি ছিল সাঁওতালদের পরাজয়ের কারণ।

সিধু, কানুহু ও অন্যান্য সাঁওতালদের কী শাস্তি হয়?

সিধুকে গ্রেফতার করার সাথে সাথে তৎক্ষণাৎ গুলি করে তাঁকে হত্যা করা হয়। কান্তু উপেনবান্দায় গ্রেপ্তার হলে কয়েকদিনের মধ্যে তাঁর ফাঁসি হয়। বহু নরনারীকে নিধন করা হয়। প্রায় ২০ হাজার সাঁওতালকে হত্যা করা হয়েছিল সাঁওতাল বিদ্রোহে।

সাঁওতাল বিদ্রোহের ফলাফল কী হয়?

সাঁওতাল বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও এই বিদ্রোহের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী —

  • এই বিদ্রোহের ফলে সরকার সাঁওতাল পরগনা নামে একটি স্বতন্ত্র সংরক্ষিত এলাকা সৃষ্টি করে।
  • সাঁওতালদের উপজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
  • বাজেয়াপ্ত গবাদি পশু সাঁওতালদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
  • মাঝি, পরগনাইন প্রভৃতি সাঁওতাল গোষ্ঠীপতিদের মাধ্যমে সাঁওতালদের বিচার ব্যবস্থা চালু হয়।
  • তিন বছরের জন্য বহিরাগতদের সাঁওতাল পরগনায় মহাজনদের প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়।

সাঁওতাল বিদ্রোহের গুরুত্ব কী?

সাঁওতাল বিদ্রোহের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। কারণ শোষণ, নিপীড়ন, অত্যাচার-অনাচারের বিরুদ্ধে ে ওঠা এই বিদ্রোহ প্রমাণ করে যে, শাসক ও শোষক শ্রেণি যন্ত্র ক্ষমতাবান হোক না কেন মনের অদম্য আকাঙ্ক্ষা ও প্রক ইচ্ছাশক্তির দ্বারা তাঁর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো যায়। সামান তির, ধনুক, টাঙ্গি নিয়ে তারা সুসজ্জিত ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে যেভাবে লড়েছিল তা অনুসরণযোগ্য যা ভবিষ্যতে আরও বড়ো বিদ্রোহের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। সুপ্রকাশ রায় তাই সাঁওতাল বিদ্রোহকে মহাবিদ্রোহের অগ্রদূত বলেছেন।

খেরওয়ার আন্দোলন বলতে কী বোঝো?

খেরওয়ার ছিল সাঁওতালদের একটি ধর্মী আন্দোলন। ভগীরথ মাঝির নেতৃত্বে ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে নিজেদের পুরাতন রীতিনীতি, আচার ব্যবহার ছেড়ে হিন্দুদের বৈয়ব ধর্মকে সামনে রেখে এই আন্দোলনের সূচনা হয়। এই আন্দোলনের প্রত্যক্ষ লক্ষ্য ছিল শুদ্ধ জীবনচর্চা, নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করা, নিজেদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করা। অন্যদিকে ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে সশস্ত্র সাঁওতাল বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার পর খেরওয়ার ছিল স্বাধীন সাঁওতাল রাজ্য প্রতিষ্ঠার বিকল্প একটি পথ।

মুন্ডা বিদ্রোহ করে এবং কার নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল?

মুন্ডা বিদ্রোহ শুরু হয় ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে এবং শেষ হয় ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে। এই বিদ্রোহ বিরসা মুণ্ডার নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল।

মুন্ডা বিদ্রোহের প্রধান কারণগুলি কী কী?

মুন্ডা বিদ্রোহের প্রধান কারণগুলি হল –

  • ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক মুন্ডাদের চিরাচরিত প্রথা খুঁৎকাটি প্রথার অবসান ঘটানো
  • মুন্ডাদের মুন্ডারি আইনি বিচার ও সামাজিক আইন বাতিল করে দেওয়া
  • মহাজন, চা ব্যবসায়ী, জমিদারদের নির্লজ্জ শোষণ
  • বেট বেগার বেগারি প্রথা
  • খ্রিস্টধর্মে মুণ্ডাদের দীক্ষিত করার চেষ্টা করা
  • মুন্ডাদের জমিগুলিকে কৌশলে জমিদার কর্তৃক খাস জমিতে পরিণত করা
  • ব্রিটিশ রাজের অবসান ঘটানো
  • অজন্মা ও দুর্ভিক্ষে সরকারের উদাসীনতা প্রভৃতি কারণে গড়ে ওঠা মুন্ডা উপজাতির পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও অসন্তোষের স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ হল মুক্তাবিদ্রোহ।

খুঁৎকাঠি প্রথা কী?

খুঁৎকাঠি প্রথা মানে জমির যৌথ মালিকানা। এটি ছিল মুন্ডাদের একটি চিরাচরিত প্রথা। এর অন্য নাম খুস্তকাঠি। ব্রিটিশ শাসনে ফুঁৎকাঠি প্রথা উঠিয়ে দিয়ে জমিতে ব্যক্তিগত মালিকানার প্রতিষ্ঠা করা হয়। ঐতিহ্যবাহী এই প্রথাটি উঠিয়ে | দেওয়াই ছিল মুন্ডা বিদ্রোহের অন্যতম কারণ।

বিরসা মুন্ডা কে ছিলেন?

বিরসা মুন্ডা ছিলেন মুন্ডা বিদ্রোহের প্রধান নেতা। তাঁর ব্যক্তিত্ব, প্রচেষ্টা ও সাংগঠনিক প্রতিভার ফলেই মুন্ডা বিদ্রোহ তীব্রতর হয়ে উঠেছিল এবং বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রসারিত হয়েছিল। তিনি মুন্ডাদের দীর্ঘদিনের অরণ্য সম্পদের অধিকারের ওপর সরকারি বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তিনি ব্রিটিশরাজের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীন মুন্ডারাজ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। এজন্য ব্রিটিশ ছাড়াও জমিদার, মহাজন, মিশনারি ও পুলিশের বিরুদ্ধে তিনি সশস্ত্র আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন। মুন্ডাদের কাছে ভগবান রূপে পূজিত এই মহান নেতা ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।

মুন্ডারা কেন জমিদার মহাজনদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন?

মুন্ডারা ছিল নিরীহ, সহজ, সরল, কৃষিজীবী মানুষ। জমিদারি প্রথার প্রসার ঘটলে জমিদাররা কৌশলে মুন্ডাদের জমিগুলি খাস জমিতে পরিণত করে নেয় এবং ক্রমাগত খাজনার হারের বৃদ্ধি ঘটাতে থাকে। এ ছাড়া মুন্ডাদের জমিদার, মহাজনদের নানারকম বেগার শ্রম দিতে হত। মহাজনরা মুন্ডাদের কাছ থেকে বিশাল সুদও আদায় করতো। এইসব কারণে মুন্ডাদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। সরকারি প্রশাসন ছিল জমিদার ও মহাজনদের স্বার্থরক্ষায় নিয়োজিত; ফলে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল জমিদার ও মহাজনদের ওপর।

মুন্ডা বিদ্রোহ কোথায় কোথায় প্রসার ঘটে?

১৮৯৯-১৯০০ খ্রিস্টাব্দের মুন্ডা বিদ্রোহ রাঁচি, হাজারিবাগ, ছোটোনাগপুর, সিংভূমের পার্বত্য অঞ্চল প্রভৃতি জায়গায় প্রসার লাভ করে।

মুন্ডা বিদ্রোহের জন্য সামাজিক ব্যবস্থা কীভাবে দায়ী?

মালিক; তাই তাদের সমাজে প্রচলন ছিল খুঁৎকাঠি প্রথা। কিন্তু -মুন্ডারা বিশ্বাস করত তাঁরাই হল জমির সত্যিকারের ব্রিটিশ শাসনের প্রবর্তন হলে তাদের সেই চিরাচরিত প্রথাকে ভেঙে ফেলে জমিতে ব্যক্তিগত মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়। এ ছাড়াও সরকার মুন্ডাদের চিরাচরিত মুন্ডারি আইন, বিচার ও সামাজিক ব্যবস্থাসমূহ বাতিল করে তাদের জন্য নতুন আইন প্রচলন করলে মুন্ডারা অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হয়ে বিদ্রোহের পথ বেছে নেয়। এভাবে মুন্ডাদের প্রচলিত সামাজিক ব্যবস্থার ভাঙন ছিল মুন্ডা বিদ্রোহের অন্যতম কারণ।

মুন্ডা বিদ্রোহীরা কেন খ্রিস্টান মিশনারিদের ওপর ক্ষুদ্ধ হয়েছিল?

মুন্ডারা ছিলেন অত্যন্ত ধর্মভীরু মানুষ। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে খ্রিস্টান মিশনারিরা মুন্ডাদের ধর্ম অর্থাৎ মুন্ডারি ধর্ম ও ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রচার চালায়। খ্রিস্টান মিশনারিরা নানা প্রলোভন দেখিয়ে, ভয় দেখিয়ে, লোভ দেখিয়ে মুন্ডাদের খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত করে ধর্মান্তরিত করতে থাকলে মুন্ডারি ধর্মের ধারক ও বাহক মুন্ডারা তাদের ওপর অসম্ভব ক্ষুব্ধ হয়। এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হল মুন্ডা বিদ্রোহ। মিশনারিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল লুথারান ও অ্যাংলিকান গোষ্ঠী। স্বাভাবিক কারণেই মুন্ডাদের আক্রমণের অন্যতম লক্ষ্য ছিল খ্রিস্টান মিশনারিরা।

মাঝিহাম মানে কী? ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে শেষ উল্লেখযোগ্য উপজাতি বিদ্রোহ কোনটি?

মাঝিহাম মানে খাসজমি। মুন্ডাদের এলাকায় বহিরাগত ঠিকাদার, মহাজন ও জমিদার শ্রেণি ওই অঞ্চলের জমি (ভূঁইহারি জমি) থেকে মুন্ডাদের বিতাড়িত করে সেগুলি নিজেদের খাসজমিতে পরিণত করে। এইরূপ জমিই মাঝিহাম নামে পরিচিত। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে শেষ উপজাতি বিদ্রোহ হল মুণ্ডা বিদ্রোহ (১৮৯৯-১৯০০ খ্রিস্টাব্দ)।

ছোটোনাগপুর প্রজাস্বত্ব আইন কবে, কেন পাস হয়?

ব্রিটিশ সরকার ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে মুণ্ডাদের অভাব অভিযোগ শুনে সেগুলির সুষ্ঠু সমাধানকল্পে ছোটোনাগপুর প্রজাস্বত্ব আইন পাস করে।

মুণ্ডা বিদ্রোহের ফলাফল কী হয়েছিল?

মুন্ডা বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও এর ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। উল্লেখযোগ্য ফলাফলগুলি হল —

  • এর ফলে মুন্ডাদের জমিতে খুঁৎকাঠি স্বত্ব পুনঃপ্রবর্তিত হয়।
  • ব্রিটিশ সরকার ছোটোনাগপুর অঞ্চলের জন্য ছোটোনাগপুর প্রজাস্বত্ব আইন পাস করে।
  • এই অঞ্চলের জন্য আলাদা প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
  • বেট বেগার বেগাড়ি নিষিদ্ধ হয়।
  • বিরসা সম্প্রদায়ের আত্মপ্রকাশ ঘটে।

ওয়াহাবি কথাটির অর্থ কী? ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রবর্তক কে?

ওয়াহাব শব্দের অর্থ নবজাগরণ। ওয়াহাবি আন্দোলনের নামকরণ হয় আব্দুল ওয়াহাবের নামানুসারে। ওয়াহাবি আন্দোলনের আসল নাম ‘তারিখ-ই-মহম্মদিয়া’ (মহম্মদ নির্দেশিত পথ)। ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রবর্তক ছিলেন আরব দেশের মহম্মদ-বিন-আব্দুল ওয়াহাব নামক একজন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি। ভারতে এই আন্দোলনের প্রবর্তন করেন দিল্লির সুবিখ্যাত মুসলিম সম্ভ শাহ ওয়ালিউল্লাহ ও তাঁর পুত্র আজিজ।

ওয়াহাবি ও ওয়াহাবিবাদ কাকে বলা হয়?

আব্দুল ওয়াহাবের অনুগামীদের বলা হয় ওয়াহাবি; যারা ইসলাম ধর্মের সংস্কার সাধন এবং পুনরুজ্জীবনের জন্য ওয়াহাবি আন্দোলনের সূত্রপাত করেন। ওয়াহাবি আন্দোলনকারীদের প্রচারিত ধর্মমত ওয়াহাবিবাদ নামে পরিচিত।

ওয়াহাবি আন্দোলনের উদ্দেশ্য কী ছিল?

ইসলামের শুদ্ধিকরণ ও ইসলাম ধর্মের কুসংস্কার দূর করে তারিখ-ই-মহম্মদিয়া প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্য নিয়ে এই আন্দোলনের সূচনা হলেও ক্রমেই তা ব্রিটিশ বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করে। এ ছাড়াও এই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল অত্যাচারী শাসক ও জমিদারদের শোষণ থেকে কৃষকদের মুক্ত করা, নিম্নবর্গের মানুষদের আর্থিক সংকট থেকে মুক্ত করা এবং ইংরেজি শিক্ষার প্রবর্তন ও সরকারি উচ্চ পদ গুলিতে ইংরেজদের একচেটিয়া আধিপত্যের বিরোধিতা করা।

ওয়াহাবি আন্দোলন ভারতের কোন্ কোন্ অঞ্চলে বিস্তার লাভ করেছিল?

ওয়াহাবি আন্দোলন ভারতের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। উত্তর-পশ্চিম সীমান্তপ্রদেশ, পাঞ্জাব, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, হায়দারাবাদ, বাংলা, বিহার প্রভৃতি অঞ্চলে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল।

দার-উল-হারব ও দার-উল-ইসলাম বলতে কী বোঝায়?

দার-উল-হারব বলতে বোঝায় বিধর্মীদের দেশ বা শত্রুর দেশ ভারতের ওয়াহাবি আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা সৈয়দ আহম্মদ ব্রিটিশ শাসিত ভারতকে দার-উল-হারব’ বলে চিহ্নিত করেন। দার-উল-ইসলাম’ কথার অর্থ হচ্ছে ধর্মরাজ্য বা ইসলামের দেশ অর্থাৎ বিধর্মী ইংরেজ শাসনের উচ্ছেদ ঘটিয়ে ‘দার-উল-ইসলাম’ প্রতিষ্ঠা করাই ছিল ওয়াহাবিদের অন্যতম লক্ষ্য।

সৈয়দ আহম্মদ কে ছিলেন?

সৈয়দ আহম্মদ (১৭৮৬-১৮৩১ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন ভারতের ওয়াহাবি আন্দোলনের পুরোধা। তিনি ছিলেন উত্তরপ্রদেশের রায়বেরিলির বাসিন্দা। তিনি মক্কায় গিয়ে ওয়াহাবি আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশে ফিরে এসে এই ধর্মীয়-রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগদান করেন এবং তাঁর অনুগামীদের নিয়ে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। তিনি ঘোষণা করেন ধর্মযুদ্ধ দ্বারা ব্রিটিশ শাসনের উচ্ছেদের প্রয়োজন।

বালাকোট যুদ্ধে কে, কেন শহিদ হন?

১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে বালাকোটের যুদ্ধে ভারতে ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রাণপুরুষ সৈয়দ আহম্মদ পরাজিত ও নিহত হন। শিখদের নির্যাতনের হাত থেকে পাঞ্জাবের মুসলমানদের রক্ষা করার জন্য সৈয়দ আহম্মদ জেহাদের ঘোষণা করেন এবং বালাকোটের যুদ্ধে তিনি শহিদ হন।

বাংলায় ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রবর্তন কে করেন? কোথায় এই আন্দোলনের প্রধান ঘাঁটি ছিল?

বাংলার ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রবর্তক তথা নেতা ছিলেন মীর নিসার আলি বা তিতুমির (১৭৮২-১৮৩১ খ্রিস্টাব্দ)। এই আন্দোলনের প্রধান ঘাঁটি ছিল উত্তর ২৪ পরগনা জেলার নারকেলবেড়িয়া গ্রাম নামক স্থান।

তিতুমির কে ছিলেন? তিনি কাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন?

তিতুমির ছিলেন বাংলার ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রধান নেতা। তিনি জমিদার শ্রেণি, নীলকর ও ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হন।

তিতুমির কে এবং কেন মনে রাখা হয়?

ওয়াহাবি আন্দোলনের বাংলার প্রধান নেতা ছিলেন তিতুমির। তাঁর নেতৃত্বে বারাসত বিদ্রোহ ছিল ধর্মীয় আন্দোলনের মোড়কে অত্যাচারী জমিদার, নীলকর ও ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে এক গ্রামীণ প্রতিবাদী আন্দোলন। তিনি ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে বাঁশের কেল্লার মধ্যেই বীরের মতো প্রাণ বিসর্জন দেন। বারাসত বিদ্রোহের নায়ক। হিসেবেই তাঁকে মনে রাখা হয়।

তিতুমির কাদের নিয়ে বাংলাদেশের কোথায় কোথায় ওয়াহাবি আন্দোলন গড়ে তোলেন?

বাংলাদেশের ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রাণপুরুষ তিতুমির জমিদার ও ব্রিটিশ শাসনের অত্যাচারের বিরুদ্ধে চাষি ও বেকার জোলাদের সংঘবদ্ধ করে নদিয়া, যশোহর ও চব্বিশ পরগনা জেলায় গণআন্দোলন গড়ে তোলেন-যা বারাসত বিদ্রোহ নামে পরিচিত।

বাঁশের কেল্লা কে, কোথায় স্থাপন করেন?

তিতুমির ওরফে মির নিশার আলি বাঁশের কেল্লা স্থাপন করেন। বাঁশের কেল্লা স্থাপিত হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার নারকেলবেড়িয়া গ্রামে।

তিতুমির বাঁশের কেল্লা নির্মাণ করেছিলেন কেন?

বিদ্রোহী দরিদ্র মানুষের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে ইংরেজ সরকার ও জমিদারের আক্রমণ প্রতিহত করতে তিতুমির বাঁশের কেল্লা নির্মাণ করে ইংরেজদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন। বাঁশের কেল্লায় সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে তিনি একটি পতাকা উড়িয়ে দিয়েছিলেন।

তিতুমির কোথায় ধর্মযুদ্ধ ঘোষণা করেন? বাংলায় ওয়াহাবি আন্দোলনের কয়েকজন নেতার নাম লেখো।

তিতুমির চব্বিশ পরগনা জেলার নারকেলবেড়িয়া গ্রামে একটি বাঁশের কেল্লা নির্মাণ করে সেখানে প্রায় পাঁচশত অনুগামীদের সমবেত করে জেহাদ বা ধর্মযুদ্ধ ঘোষণা করেন। ওয়াহাবি আন্দোলনে বাংলার প্রধান নেতা ছিলেন তিতুমির। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ববৃন্দ হলেন এনায়েৎ আলি, মহম্মদ
মহম্মদ হোসেন, বিলায়েৎ আলি, মিসকিন শাহ, গোলাম মাসুম প্রমুখ।

তিতুমির কী উপাধি ধারণ করেন। তাঁর উচ্চপদস্থ কর্মচারী হিসেবে কারা নিযুক্ত হন?

তিতুমির বাদশাহ উপাধি ধারণ করেন। তিতুমিরের প্রধান উপদেষ্টা হন মকিন শাহ নামে এক ফকির, মন্ত্রীপদে নিযুক্ত হন মৈনুদ্দিন নামক একজন জোলা, সেনাপতি নিযুক্ত হন গোলাম মাসুম এবং মিস্কিন শাহ ছিলেন তিতুমিরের গোয়েন্দাবাহিনীর প্রধান। তিতুমিরের সমস্ত পদাধিকারীই ছিলেন দরিদ্র কৃষক পরিবারের অন্তর্গত।

তিতুমিরের প্রথম জীবন সম্পর্কে কী জানো?

তিতুমির ১৭৮২ খ্রিস্টাব্দে চব্বিশ পরগনা জেলার চাঁদপুর নামক গ্রামে এক গৃহস্থ চাষির ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্রথম জীবনে নদিয়ার জমিদারের অধীনে লেঠেলের কাজ করতেন। সে সময় তিনি দরিদ্র কৃষকদের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের সময় জমিদারের অত্যাচারের স্বরুপ তিনি।
দেখেছিলেন।

যৌবনে তিনি হজ করাতে মক্কায় যান এবং সেখানে তার সাথে সাক্ষাৎ হয় সৈয়দ আহম্মদের। সৈয়দ আহম্মদের আদর্শে উদ্‌বুদ্ধ হয়ে তিনি বাংলাদেশে ওয়াহাবি আদর্শ প্রচার করেন।

কে, কবে বারাসত বিদ্রোহের সূচনা করেন?

বাংলার ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রাণপুরুষ তিতুমির ওরফে মীর নিসার আলি বারাসত মহকুমায় যে বিদ্রোহের সূচনা করেন তা বারাসত বিদ্রোহ নামে পরিচিত। ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই বিদ্রোহ হয়।

বারাসত বিদ্রোহের কারণ কী?

বারাসত বিদ্রোহের কারণগুলি হল —

  • ইসলাম ধর্মের সংস্কার সাধন ও বিশুদ্ধতা প্রতিষ্ঠা।
  • জমিদার, নীলকর, পুলিশ, প্রশাসনিক ব্যক্তিবর্গের শোষণ ও শাসন থেকে দরিদ্র কৃষক, জোলা ও অন্যান্য পেশার মানুষদের মুক্তিদান করা।
  • জমিদার কৃয়দেব রায় ও কুরগাছি এবং নগরপুরের জমিদারদের অত্যাচারের বিহিত করা এবং ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটানোর জন্য বিদ্রোহের সূচনা করেন তিতুমির।

তিতুমির তথা ওয়াহাবিরা জমিদার কৃষ্ণদেব রায়ের ওপর ক্ষুদ্ধ হয়েছিলেন কেন?

বারাসত অঞ্চলে ওয়াহাবিদের প্রভাব বৃদ্ধি পেলে জমিদার কৃষ্ণদেব রায় তাদের কর্তৃত্ব খর্ব করার জন্য ওয়াহাবিদের দাড়ির ওপর আড়াই টাকা কর ধার্য করেন। মসজিদ নির্মাণ ও মুসলিম নামকরণের জন্যও কর ধার্য করেন। এমনকি মাঝে মাঝে ওয়াহাবিদের দাড়ি উপড়ে নিতেন। কৃষদের রায় পাইক বরকন্দাজ নিয়ে গ্রামের একটি মসজিদে অগ্নি সংযোগ করেন। এছাড়াও ওয়াহাবিদের নামে মিথ্যা অভিযোগ তৈরি করে কাছারিতে এনে ভীষণ নির্যাতন। চালালে কৃষ্ণদেব রায়ের ওপর ওয়াহাবিরা ক্ষুব্ধ হয় এবং প্রতিবাদ স্বরূপ তার গ্রামে আক্রমণ করে।

বাঁশের কেল্লা সম্পর্কে কী জানো?

বারাসতের কাছে নারকেলবেড়িয়া গ্রামে তিতুমির চাষি ও বেকারদের সংঘবদ্ধ করে একটি বাঁশের কেল্লা নির্মাণ করেন। তিনি এখানে অস্ত্রশস্ত্র জড়ো করে নিজেকে বাদশাহ বলে ঘোষণা করেন এবং জমিদারদের খাজনা দিতে নিষেধ করে নিজে খাজনা দাবি করেন। বাঁশের কেল্লা ছিল দরিদ্র মানুষের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। কলকাতা থেকে আগত ইংরেজ বাহিনীর গোলার আঘাতে বাঁশের কেল্লা পুড়ে যায় এবং বাঁশের কেল্লার মধ্যেই তিতুমিরের মৃত্যু হয় (১৮৩১ খ্রিস্টাব্দ)।

বারাসত বিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণগুলি কী কী?

বারাসত বিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণগুলি হল –

  • বিশাল সুসজ্জিত ইংরেজ বাহিনীর (গোলন্দাজ, অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী) একযোগে আক্রমণ
  • ইংরেজ বাহিনীর কামান ব্যবহার
  • কামানের আঘাতে বাঁশের কেল্লার ধ্বংস
  • তিতুমির ও তার সহযোদ্ধাদের মৃত্যুবরণ
  • বিদ্রোহীদের উন্নতমানের অস্ত্রশস্ত্র ও গঠনমূলক কর্মসূচির অভাব প্রভৃতি কারণে বারাসত বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়েছিল।

তিতুমির ও তার সাথিদের কী পরিণতি হয়েছিল?

তিতুমির যুদ্ধক্ষেত্রেই বীরের মতো মৃত্যুবরণ করেন। বহু বিদ্রোহী যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হন। তিতুমিরের প্রায় ৮০০ জন অনুগামীকে বন্দি করা হয়। তিতুমিরের প্রধান সেনাপতি গোলাম মাসুমের ফাঁসি হয়। অন্যান্য বিদ্রোহীদের অধিকাংশের দ্বীপান্তর হয়। অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে ইংরেজ বাহিনী বারাসত বিদ্রোহ দমন করেন।

ওয়াহাবি আন্দোলনের ব্যর্থতার দুটি কারণ উল্লেখ করো।

ওয়াহাবি আন্দোলনের ব্যর্থতার নানাবিধ কারণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুটি কারণ হল –

  • গঠনমূলক কর্মসূচি এবং উপযুক্ত সংগঠন ও সংগঠকের অভাব
  • এটি একটি ধর্মীয় আন্দোলন হিসেবে শুরু হওয়ায় ভারতবর্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা, বড়ো জমিদাররা এই আন্দোলনে শামিল হননি।

কবে বাংলাদেশে ওয়াহাবি আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে? বিদ্রোহীরা নানা জায়গায় অগ্নিসংযোগ করে কেন?

১৮৩১ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে ওয়াহাবি আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। জমিদারদের কাছারিবাড়ি, নীলকুঠিগুলি আক্রমণ ও ধ্বংস করে বিদ্রোহীরা অগ্নিসংযোগ করেন, কারণ যাতে তাদের ঋণসংক্রান্ত যাবতীয় প্রমাণ লোপাট করা যায়।

মালগুজারি ও মুওয়াহেদুন বলতে কী বোঝো?

মালগুজারি কথার অর্থ হল খাজনা। মুওয়াহ্হেদুন বলতে বোঝায় খাঁটি একেশ্বরবাদী। ওয়াহাবিরা নিজেদের মুওয়াহেদুন বলে পরিচয় দিতেন।

তিতুমির এবং তাঁর অনুগামীরা কিসের বিরোধী ছিলেন?

তিতুমিরের অনুগামীরা –

  • মূর্তিপূজা
  • পিরের পূজা
  • মহাজনি কারবার
  • কুসংস্কার
  • ব্রিটিশ শাসন প্রভৃতির বিরোধী ছিলেন।

তিতুমিরের বারাসত বিদ্রোহ ক্রমশ ইংরেজ বিরোধী বিদ্রোহের রূপ পরিগ্রহ করে কেন?

ধর্মীয় সংস্কার সাধনের লক্ষ্য নিয়ে বারাসত বিদ্রোহের সূচনা হলেও ক্রমশ তা ইংরেজ বিরোধী হয়ে উঠেছিল, কারণ –

  • ঔপনিবেশিক ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা।
  • অবশিল্পায়ন
  • নীলকর ও জমিদারদের শোষস্, (বিদ্রোহীরা জমিদারদেরও ইংরেজ শাসনের অংশ মনে করত) প্রভৃতি।

ওয়াহাবি আন্দোলনের ভারতের কয়েকজন উল্লেখযোগ্য নেতার নাম লেখো।

সৈয়দ আহম্মদ, বিলায়েৎ আলি ও এনায়েৎ আলি – (পাটনা), কেরামত আলি (জৌনপুর), জৈনুদ্দিন (হায়দ্রাবাদ), ইমাতা জিমামি (বেরিলী), তিতুমির (বাংলাদেশ) প্রমুখ নেতৃবৃন্দ ছিলেন ওয়াহাবি আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য নেতৃত্ব।

তিতুমিরের সংগ্রামের প্রকৃতি কী ছিল?

তিতুমিরের জীবনীকার বিহারীলাল সরকারের মতে, বহু হিন্দু তিতুমিরের নেতৃত্ব মেনে নিয়েছিলেন। আবার বহু মুসলিম ভূস্বামীরাও ওয়াহাবিদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন। সুতরাং তিতুমিরের সংগ্রাম ধর্মকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও ক্রমশ তা সংকীর্ণ ধর্মীয় সীমারেখা অতিক্রম করে দরিদ্র মানুষের জমিদার ও রাষ্ট্রবিরোধী প্রতিবাদী সংগ্রামের রূপ পরিগ্রহ করে।

ফরাজি কথার অর্থ কী? কে এই আন্দোলনের প্রবর্তন করেন?

ফরাজি কথাটি এসেছে আরবি শব্দ ফাইরাজ বা ফরাইজ থেকে। ফরাইজ-এর অর্থ আল্লাহের আদেশ অনুসরণ। ফরাজি কথার অর্থ হল – আল্লাহের আদেশ অনুসরণকারী বা আল্লাহ্র সেনাপতি বা ইসলাম নির্দিষ্ট বাধ্যতামূলক কর্তব্য। ফরাজি আন্দোলনের প্রবর্তন করেছিলেন হাজি শরিয়ৎ উল্লাহ (১৭৮১-১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দ)।

ফরাজি কী? মহম্মদ মহসীন আলাউদ্দিন আহমদ কী নামে জনপ্রিয়?

ফরাজি হল একটি মুসলিম ধর্মীয় গোষ্ঠীর নাম। মহম্মদ মহসীন আলাউদ্দিন আহমদ দুদু মিঞা নামে জনপ্রিয়।

ফরাজি আন্দোলন ভারতবর্ষের কোথায় কোথায় ছড়িয়ে পড়ে?

পূর্ববাংলার ফরিদপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ, বাখরগঞ্জ, পাবনা, নোয়াখালি ও ত্রিপুরায় ফরাজি আন্দোলনের ব্যাপক প্রসার ঘটে। এটি জমিদার, নীলকর, ঔপনিবেশিক শাসন বিরোধী রূপ পরিগ্রহ করে।

ফরাজি আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কারা?

ফরাজি আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন হাজি শরিয়ত উল্লাহ। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র দুদু মিঞা ফরাজি আন্দোলনকে সাংগঠনিকভাবে পরিপূর্ণ রূপ প্রদান করেন। দুপু মিঞার মৃত্যুর পর তার পুত্র নোয়া মিঞা ফরাজি আন্দোলনের নেতৃত্ব প্রদান করেন।

ফরাজি আন্দোলন কী কেবলমাত্র একটি ধর্মীয় আন্দোলন?

হাজি শরিয়ৎ উল্লাহ ইসলাম ধর্মের সংস্কারের জন্য ফরাজি আন্দোলন শুরু করলেও তার পুত্র দুদু মিঞা একে ধর্মীয় মোড়ক থেকে কিছুটা বের করে কৃষক আন্দোলনে উন্নীত করেছিলেন। দুদু মিঞা প্রচার করেন জমি আল্লাহর দান এবং সেখানে জমিদারের কর ধার্য করার অধিকার নেই। তাঁর এই বক্তব্যে বহু হিন্দু-মুসলিম কৃষকরা প্রভাবিত হয়েছিল। | তাই একে সম্পূর্ণ ধর্মীয় আন্দোলন বলা যাবে না বরং একে জমিদার, মহাজন ও ইংরেজ বিরোধী আন্দোলন বলা শ্রেয়।

ফরাজি আন্দোলনের উদ্দেশ্য কী ছিল?

ফরাজি আন্দোলন ছিল একটি ব্রিটিশ বিরোধী ধর্মভিত্তিক আন্দোলন। এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল ফরাইজ অর্থাৎ কোরানে নির্দিষ্ট পাঁচটি অবশ্য পালনীয় কর্তব্য যাতে সকল মুসলমান সমাজ মেনে চলে তার জন্য প্রচার কার্য চালানো। এই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইসলাম ধর্মের কুসংস্কার দূর করে বাংলাদেশকে ‘দার-উল-ইসলামে’ পরিণত করা।

দুদু মিঞা স্মরণীয় কেন?

প্রখর রাজনৈতিক চেতনাসম্পন্ন ব্যক্তি দু মিঞা ছিলেন বাংলার ফরাজি আন্দোলনের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। শরিয়ৎ উল্লাহর পুত্র, দক্ষ সংগঠক এবং ফরাজি আন্দোলনের অন্যতম নেতা দুদু মিঞার সুযোগ্য নেতৃত্বে ফরাজি আন্দোলন ধর্মীয়-সামাজিক আন্দোলন থেকে সামাজিক-অর্থনৈতিক- রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত হয়—এ জন্যই দুদ মিঞা স্মরণীয়।

ফরাজি খিলাফৎ বলতে কী বোঝ?

ফরাজিদের সুশৃঙ্খল প্রশাসনকে বলা হয় ফরাজি খিলাফৎ। দুদুমিঞা ছিলেন এই প্রশাসনের স্রষ্টা এবং সর্বোচ্চ পদাধিকারী। তাঁকে বলা হত ওস্তাদ। তাঁর সাহায্যকারীদের বলা হত খলিফা। পূর্ববঙ্গকে তিনি কটি হল্কায় (অঞ্চলে) বিভক্ত করে ফরাজিদের সংঘবদ্ধ করেন। বাহাদুরপুর ছিল দুদু মিঞার ফরাজি খিলাফৎ-এর প্রধান কার্যালয়।

ফরাজিদের বে-জুম্মাওয়ালা বলা হয় কেন?

ফরাজিরা জুম্মা বা ইদের প্রার্থনায় আপত্তি করতেন বলে এদের বলা হয় বে-জুম্মাওয়ালা। ফরাজিগণ জুম্মা ও ইদ উৎসবের তীব্র বিরোধী ছিলেন। তাঁদের মতে ইংরেজ অধ্যুষিত ভারতবর্ষ ছিল দার-উল-হারব বা বিধর্মীদের
দেশ। সুতরাং এই অবস্থায় ভারতে জুম্মা প্রার্থনা উচিত নয়। বলে তারা মনে করতেন।

ফরাজি আন্দোলন অন্য কী নামে পরিচিত? হাজি শরিয়ত উল্লাহ কোন আদর্শে বিশ্বাস করতেন?

ফরাজি আন্দোলনের অন্য নাম মিঞা আন্দোলন। হাজি শরিয়ৎ উল্লাহ আদি-ইসলামীয় সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসকরতেন।

দুদু মিঞা কি প্রচার করেছিলেন? তাঁর আদর্শ দ্বারা কারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন?

দুদু মিঞা প্রচার করেন জমি আল্লাহের দান সুতরাং সেখানে জমিদারের কর ধার্য করার অধিকার নেই। তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন বহু তাঁতি ও মুসলিম কৃষক সম্প্রদায়।

খলিফা কাদের বলা হত?

ফরাজি খিলাফৎ অনুসারে পূর্ববঙ্গকে কয়টি হল্কায় বিভক্ত করা হয়। হল্কার (অঞ্চল) দায়িত্বে যারা থাকতেন তাদের বলা হত খলিফা। খলিফারা ওস্তাদ (শীর্ষ প্রশাসক) কে সবসময় সাহায্য করত। খলিফারা নিজে এলাকার সংবাদ সবসময় ওস্তাদের কাছে পাঠাতেন।

দুদু মিঞা তথা ফরাজিরা কেন জমিদারদের দুর্গাপূজা কর প্রদানে বিরোধী ছিলেন?

দুদু মিঞা তথা ফরাজিরা পৌত্তলিকতার ঘোর বিরোধী ছিলেন। তাই তাঁরা দুর্গাপূজা কর প্রদানে অস্বীকার করেন। তা ছাড়া দুর্গাপূজা করকে তারা উৎপীড়নমূলক কর বলে মনে করতেন।

দুদু মিঞা কবে, কাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ঘোষণা করেন?

১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দে দুদু মিঞা জমিদার, রক্ষণশীল মুসলমান ও নীলকরদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ঘোষণা করেন।

ফরাজি আন্দোলনের দুটি বৈশিষ্ট্য লেখো।

ফরাজি আন্দোলনের দুটি বৈশিষ্ট্য হল —

  • ফরাজি আন্দোলন ছিল মূলত সাম্প্রদায়িক। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল মুসলিম ধর্মীয় গোষ্ঠী।
  • এই আন্দোলন বহিরাগত ধর্মীয় আন্দোলন থেকে উৎসারিত।

দুদু মিঞা কী কী কাজের মাধ্যমে ফরাজি আন্দোলনকে সুসংবদ্ধ করেন?

শরিয়ৎ উল্লাহের পুত্র দুদু মিঞা ১৮৩৭ থেকে ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ফরাজি আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। বাহাদুরপুরে প্রধান কার্যালয় স্থাপন, পঞ্চায়েৎ ব্যবস্থা প্রবর্তন, লাঠিয়াল ও গুপ্তচর বাহিনী গঠন, প্রভাবাধীন এলাকাকে কয়েকটি হচ্ছায় বিভক্ত করে প্রতি হস্তায় খলিফা নিয়োগ, অর্থ সংগ্রহ ও কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করা, জমিদার ও নীলকরদের আক্রমণ করা প্রভৃতি কাজ করে ফরাজি আন্দোলনকে সুসংবদ্ধ করেন।

হাজী শরিয়ত উল্লাহ স্মরণীয় কেন?

ইসলাম ধর্মতত্ত্বে সুপণ্ডিত ফরিদপুরের হাজী শরিয়ত উল্লাহ ছিলেন বাংলাদেশে ফরাজি আন্দোলনের প্রবর্তক। তাঁর নেতৃত্বে নির্যাতিত কৃষকদের স্বার্থে ইসলামীয় পুনরুজ্জীবনবাদী ফরাজি আন্দোলন ক্রমে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক চরিত্র লাভ করে নীলকর, জমিদার ও ব্রিটিশ বিরোধী হয়ে উঠে। বরিশালে ময়মনসিংহ, ঢাকা, ফরিদপুরে তাঁর আন্দোলন শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যু হয়। ফরাজি আন্দোলনে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি স্মরণীয়।

ফরাজি আন্দোলন কী হিন্দু বিরোধী ছিল?

ফরাজি আন্দোলন ইসলাম ধর্মের সংস্কার সাধনের উদ্দেশ্যে শুরু হলেও ক্রমশ তা জমিদার বিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়। অধিকাংশ জমিদাররাই ছিল হিন্দু। তবুও এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, ফরাজি আন্দোলন সম্পূর্ণভাবে হিন্দু বিরোধী সাম্প্রদায়িক আন্দোলন ছিল না, কারণ এই আন্দোলনে মুসলমান কৃষকদের পাশাপাশি বহু হিন্দু কৃষকও শামিল হয়েছিল। তাই এই আন্দোলনকে হিন্দু বিরোধী আন্দোলন না বলে নিপীড়িত কৃষকদের শোষণের হাত থেকে মুক্তির আন্দোলন বলাই শ্রেয়।

ফরাজি আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণ/সীমাবদ্ধতা কী ছিল?

ফরাজি আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণগুলি হল —

  • দুদু মিঞার পর ফরাজি আন্দোলনের নেতৃত্ব প্রদান করার মতো উপযুক্ত নেতার অভাব
  • ইংরেজ ও জমিদার বিরোধিতার বদলে ধর্মীয় ক্ষেত্রে গুরুত্বদান
  • ধর্মীয় সংকীর্ণতা
  • রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাব
  • সাধারণ লোকদের জোর করে দলভুক্ত করা
  • অর্থ আদায়
  • পূর্ববঙ্গের সংকীর্ণ স্থানে সীমাবদ্ধ
  • দুদু মিঞার কলঙ্কময় ব্যক্তি জীবন
  • সরকারি দমননীতি প্রভৃতি

দুদু মিঞার মৃত্যুর পর ফরাজি আন্দোলনের জনপ্রিয়তা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল কেন?

দুদু মিঞার মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র নোয়া মিঞা ফরাজি আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করে জমিদার ও ইংরেজদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক নীতি গ্রহণ না করে ধর্ম সংস্কারে মনোনিবেশ করেন। ফলে এই আন্দোলন রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ধর্মীয় আন্দোলনে পরিণত হলে ফরাজি আন্দোলনের জনপ্রিয়তা নষ্ট হয়ে যায়।

ফরাজি আন্দোলনের গুরুত্ব কী?

ফরাজি আন্দোলন ছিল ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে মুসলিম সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিক্রিয়া। ধর্মীয় আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও এই আন্দোলন পরে রাজনৈতিক আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করে। এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল কৃষিজীবী মুসলমান শ্রেণি। এইসব দিক থেকে এই আন্দোলন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ওয়াহাবি ও ফরাজি আন্দোলনের সাদৃশ্যগুলি কী কী?

ওয়াহাবি ও ফরাজি আন্দোলনের সাদৃশ্যগুলি হল —

  • আন্দোলন দুটির প্রেরণা এসেছিল ভারতের বাইরে থেকে
  • দুটি আন্দোলনই ছিল ইসলাম ধর্মের পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলন
  • দুটি আন্দোলনেই সাম্প্রদায়িক প্রভাব লক্ষ করা যায়
  • আর্থ-সামাজিক দিক থেকে দুটি আন্দোলনই → ছিল সামন্ততন্ত্র বিরোধী
  • অবতারবাদী ভাব লক্ষ করা যায়। দুটি আন্দোলনেই
  • দুটি আন্দোলনেই ব্রিটিশ বিরোধিতা দেখা যায়।

১০৬. নীল বিদ্রোহের কারণ কী?

নীল বিদ্রোহের কারণগুলি হল –

  • নীলকরদের অত্যাচার, শোষণ, দৌরাত্ম্য, ব্যভিচার ও লাম্পট্য
  • নীলকরদের লাঠিয়াল, পাইক বরকন্দাজ বাহিনীর অত্যাচার
  • নীলচাষ না করলে চাষিদের নীল কুঠিতে আটকে রাখা।
  • দাদন গ্রহণ করতে কৃষকদের বাধ্য করা
  • নীলের উপযুক্ত দাম না পাওয়া
  • নীলগাছের মূল্যবৃদ্ধি পেলেও নীলকরদের চুপ করে থাকা
  • নীল ন চাষিদের আইনের সাহায্য না পাওয়া প্রভৃতি নানা কারণে র নীলবিদ্রোহের সূচনা হয়।

নীল বিদ্রোহ অন্যান্য কৃষক বিদ্রোহ থেকে আলাদা কেন?

নীল বিদ্রোহ অন্যান্য কৃষক বিদ্রোহ থেকে আলাদা কারণ, অন্যান্য কৃষক বিদ্রোহের মতো নীল বিদ্রোহ জমিদার ও মহাজন বিরোধী কোন্ কৃষক আন্দোলন ছিল না। এটি ছিল নীলকরদের বিরুদ্ধে আন্দোলন। সেইদিক থেকে দেখতে গেলে নীলকররাই ছিল কৃষকদের প্রতিপক্ষ। তা ছাড়া প্রা বহু ছোটো জমিদার এমনকি কয়েকজন খ্রিস্টান মিশনারিরাও ও বিদ্রোহীদের পাশে দাঁড়িয়েছিল এই বিদ্রোহে যা অন্য কোনো বিদ্রোহে পরিলক্ষিত হয়নি।

নীলকররা ভারতে নীলচাষে কেন আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন?

ইংল্যান্ড ও ইউরোপে বস্ত্র শিল্পের বিকাশ, বন্ধ রহিত করার জন্য নীলের প্রয়োজনীয়তা (কেননা তখনও কৃত্রিম রঞ্জনদ্রব্যের আবিষ্কার হয়নি), নীল রপ্তানি করে করে প্রচুর মুনাফা অর্জন প্রভৃতি কারণে নীলকররা ভারতে নীলচাষে আগ্রহী হয়ে উঠে। নীলকরদের লক্ষ্য ছিল অল্পব্যয়ে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করা।

নীলবিদ্রোহ কোথায় কোথায় সংঘটিত হয়েছিল?

নীলবিদ্রোহ বঙ্গদেশে ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। বারাসত, যশোহর, পাবনা, খুলনা, রাজশাহী, মালদহ, ফরিদপুর, মুরশিদাবাদ, চব্বিশ পরগনা, নদিয়া প্রভৃতি অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি গ্রামের কৃষকরাই নীলবিদ্রোহে শামিল হয়েছিলেন।

নীলবিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কারা?

কৃষক সমাজের উপর সুদীর্ঘকালের অমানুষিক অত্যাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা নীলবিদ্রোহে যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তারা হলেন — বিচরণ বিশ্বাস, দিগম্বর বিশ্বাস, মহেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, রফিক মণ্ডল, কাদের মোল্লা, মেঘাই সর্দার ও বিশ্বনাথ সর্দার প্রমুখ। বঙ্গদেশে ষাট লক্ষাধিক কৃষক এই বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেছিল।

নীলবিদ্রোহ কীভাবে সশস্ত্র অভুত্থানের রূপ পরিগ্রহ করে?

প্রশাসনিক স্তরে দীর্ঘদিন আবেদন-নিবেদন করে কোনো সুফল না পাওয়ায় নীলচাষিরা নীলচাষ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর সাহায্যে নীলচাষ করতে বাধ্য করা হলে নীলবিদ্রোহ সশস্ত্র রূপ পরিগ্রহ করে। বিদ্রোহীরা নীলকুঠিগুলি আক্রমণ করে (নদিয়ার কুঠিয়াল স্যামুয়েল ফেডী থেকে খুলনার অত্যাচারী কুঠিয়াল রেনীকে আক্রমণ করা হয়)। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে চাষিদের এইভাবে নীলবিদ্রোহে অংশগ্রহণ করায় ইংরেজ শাসকরা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে।

বিশ্বনাথ সর্দার কে ছিলেন?

বিশ্বনাথ সর্দার ছিলেন বাংলাদেশের নীলবিদ্রোহের অন্যতম পুরোধা। নদিয়া জেলায় চৌগাছা গ্রামের বিশ্বনাথ সর্দার ‘বিশে ডাকাত’ নামে পরিচিত ছিলেন। নদিয়ার ভয়ানক কুঠিয়াল স্যামুয়েল ফেডীকে তিনি আক্রমণ করেন। গ্রেপ্তার হওয়ার পর বিশ্বনাথ সর্দারের ফাঁসি হয়। তিনি ছিলেন নীল বিদ্রোহের প্রথম শহিদ।

নীলবিদ্রোহ কাকে বলে? কোথায় এই বিদ্রোহ প্রথম শুরু হয়?

১৮৫৯-৬০ খ্রিস্টাব্দে শ্বেতাঙ্গ নীলকরদের বিরুদ্ধে বাংলার নীলচাষিদের সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ নীলবিদ্রোহ নামে পরিচিত। কৃয়নগরের চৌগাছা গ্রামে ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে প্রথম নীলবিদ্রোহ শুরু হয়।

কৃষকরা কেন নীল চাষ করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন?

নীলের বাজার দর ১০ টাকা থাকা সত্ত্বেও কৃষকরা নীলের দাম পেত গড়ে ২ টাকা আট আনা। এক বিঘে জমিতে নীলচাষ করতে রায়ত দের খরচ হত ১৩ টাকা ৬ আনা। আর ওই নীল বিক্রি করে তাঁরা পেত মাত্র ৪ টাকা অথচ ওই একই জমিতে তামাক উৎপাদন করলে তাদের ২৪ টাকা খরচ হত আর সেই তামাক বিক্রি হত ৩৫ টাকায়। কিংবা ধান উৎপাদন করলে তাদের সারা বছরের খোরাকি হয়ে যেত। এইসব কারণে কৃষকরা নীলচাষ করতে চাইতো না।

দাদন প্রথা নীলচাষিদের কীভাবে ক্ষতি করেছিল?

দাদন কথার অর্থ হল অগ্রিম। ছলে-বলে-কৌশলে কৃষকদের অগ্রিম প্রদান করে কৃষকদের উৎপাদিত নীল কুঠিতে জমা দিতে বাধ্য করত। দাদন নেওয়া চাষি কতটা জমিতে নীলচাষ করবে তা মেপে দিত নীলকররা। এতে প্রচণ্ড পরিমাণ কারচুপি ছিল। ১১ বিঘে জমিকে ৭ বিঘে ধরে নিয়ে তাদের উৎপাদিত নীলের দাম দিত অর্থাৎ ১১ বিঘা জমি আবাদ করে কৃষকরা ৭ বিঘের দাম পেত। এককথায় দাদন নিয়ে কৃষকরা নীলকরদের দাসে পরিণত হয়েছিল। সমাচার দর্পণের মতে, ‘যে চাষি দাদন নেয়, তার মরণ পর্যন্ত খালাস নেই।’

নীলকর সাহেবরা রায়তদের জমিতে নীলচাষ করতে বেশি পছন্দ করতেন কেন?

১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দের চার্টার আইন দ্বারা ইউরোপীয় তথা শ্বেতাঙ্গরা এদেশে জমি কেনার অধিকার পেলেও তারা তা না করে রায়তদের জমিতেই নীলচাষ করতে বেশি পছন্দ করত। কারণ রায়ত নিজের ব্যয়ে লাঙল, সার, বীজ ও নিজের পরিশ্রমে নীল উৎপাদন করত এবং দাদন নেওয়ার জন্য তারা নীলকরদের সেই নীল প্রদানে বাধ্য থাকতো। এতে নীলকরদের প্রচুর লাভ হত। কোনো রকম দুচিন্তা ছাড়াই তারা মাত্র ৪০০ টাকা খরচ করে লাভ করত ১৭৫০ টাকা। ফলে তারা নিজেরা জমি কিনে নীলচাষ করা অপেক্ষা রায়তের জমিতে নীলচাষ করতেই বেশি পছন্দ করতেন।

বিশ্বনাথ সর্দার ও শিবনাথ ঘোষ কোন্ কোন্ কুঠিয়ালকে আক্রমণ করেছিলেন?

বাংলার ‘রবিন হুড’ তথা নীল বিদ্রোহের পথিকৃৎ বিশ্বনাথ সর্দার তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে নিজের জীবন বিপন্ন করে অত্যাচারী কুঠিয়াল স্যামুয়েল ফেডীকে আক্রমণ করেছিলেন। শিবনাথ ঘোষ খুলনার অত্যাচারী কুঠিয়াল রেনীকে আক্রমণ করেছিলেন।

নীলচাষি তথা নীলবিদ্রোহীরা কাদের কাদের সাহায্য পেয়েছিলেন?

বাংলার বেশিরভাগ জমিদার, জোতদার, মহাজন এই বিদ্রোহকে কেবল সমর্থন বা সাহায্যই করেননি বরং তাঁরা নেতৃত্ব প্রদানও করেছেন। এ ছাড়াও কয়েকজন খ্রিস্টান মিশনারিও বিদ্রোহীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

বঙ্গদেশে নীলবিদ্রোহে কত কৃষক অংশগ্রহণ করেছিল? তাদের সংগ্রামী কৌশল কী ছিল?

নীলবিদ্রোহে বঙ্গদেশের প্রায় ৬০ লক্ষাধিক কৃষক অংশগ্রহণ করেছিল। নীলবিদ্রোহীরা নীলচাষ বন্ধ করে দিতে এক অভিনব সংগ্রামী কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। নীলকরের লোকজনরা গ্রামে আসার চেষ্টা করলে ঢাক ঢোল পিটিয়ে সবাইকে বার্তা দেওয়া হত। সঙ্গে সঙ্গে বর্শা, তারপর লাঠি ও বল্লমধারী শয়ে শয়ে কৃষক তাদের দিকে ধেয়ে আসতো। আর তারা কোনোক্রমে প্রাণ নিয়ে পালাত।

নীলচাষ করতে না চাইলে কৃষকদের ওপর কেমন অত্যাচার করা হত?

চাষিরা নীলচাষ করতে না চাইলে নীলকরদের লাঠিয়াল, পাইক, বরকন্দাজ বাহিনী তাদের ধরে এনে মারধোর করত। কুঠিতে আটকে রেখে গোপন স্থানে এনে তাদের আড়ং ধোলাই দেওয়া হত। চাষিদের ধান, তামাকের জমি নষ্ট করে দেওয়া হত। তাদের গোরু বাছুর হরণ করে নিয়ে কুঠিতে রেখে দেওয়া হত। নীলচাষ না করলে চাষিদের চাবুক পেটা করা হত।

শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির কারা কারা নীল বিদ্রোহের প্রতি সমর্থন জানায়?

বাংলার মধ্যবিত্ত বহু মানুষ নীল বিদ্রোহীদের প্রতি সমর্থন জানায়। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন অক্ষয়কুমার দত্ত শিশির কুমার ঘোষ, গিরিশ ঘোষ, মনমোহন ঘোষ, দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ কিশোরীচাদ মিত্র। এ ছাড়াও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দীনবন্ধু মিত্র, মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ একদিকে যেমন নীল চাষিদের মামলা মোকদ্দমার খরচ বহন করতেন অন্যদিকে তাদের সুলেখনীর মাধ্যমে নীলকরদের অত্যাচারের বাহিনী জনসাধারণের সামনে তুলে ধরতেন।

কোন্ কোন্ পত্র পত্রিকা ও লেখা থেকে নীলবিদ্রোহের কথা জানা যায়?

১৮২২ খ্রিস্টাব্দে ‘সমাচার চন্দ্রিকা’ ও ‘সমাচার দর্পণে’ প্রথম নীলকরদের অত্যাচারের কথা প্রকাশ হয়। পরবর্তীকালে তত্ত্ববোধিনী, হিন্দু পেট্রিয়ট পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে নীলকরদের অত্যাচারের কাহিনি বর্ণিত হয়। এ ছাড়াও দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ নাটক থেকেও নীলকরদের অত্যাচারের কাহিনি জানা যায়।

ওয়াট-টাইলর নামে কারা পরিচিত? তারা কেন স্মরণীয়?

বাংলাদেশের ওয়াট-টাইলর নামে পরিচিত ছিলেন দিগম্বর বিশ্বাস ও বিচরণ বিশ্বাস নামক ভ্রাতৃদ্বয়। চৌগাছা গ্রামের এই ভ্রাতৃদ্বয় প্রথম জীবনে ছিলেন নীলকুঠির কর্মচারী এবং পরবর্তীকালে তাঁরা ছিলেন নীলবিদ্রোহের মহান। নেতা। তাঁরা তাদের সর্বস্ব ব্যয় করে রায়তদের রক্ষা করার জন্য লাঠিয়াল নিয়োগ করেন এবং মামলা-মোকদ্দমার হাত থেকে রায়তদের রক্ষা করেন। তৎকালীন সময়ে প্রায় ১৭ হাজার টাকা তারা রায়তদের স্বার্থে ব্যয় করেছিলেন।

নীলবিদ্রোহের সঙ্গে হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় – এর সম্পর্ক কী?

হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ছিলেন নীলচাষিদের প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল। তিনি ছিলেন ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’ পত্রিকার সম্পাদক। সেই পত্রিকায় তিনি নিয়মিতভাবে নীলকরদের অত্যাচারের কাহিনি তুলে ধরে নীল বিদ্রোহের প্রতি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির দৃষ্টি আকর্ষণ করালেন। এ ছাড়া আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকা সত্ত্বেও তিনি নীলচাষিদের মামলা চালাবার জন্য যথাসাধ্য অর্থ ব্যয় করেন। শিবনাথ শাস্ত্রী লিখেছেন – নীলকর অত্যাচার নিবারণ হরিশের এক অক্ষয় কীর্তি। এই কার্যে তিনি, দেহ, মন, অর্থ, সামর্থ্য সমাধি নিয়োগ করিয়াছিলেন।

নীলদর্পণ নাটক সম্পর্কে কী জানো?

‘নীলদর্পণ’ নাটকটির লেখক দীনবন্ধু মিত্র। নীলকরদের অত্যাচারে একটি কৃষক পরিবারের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কাহিনি এতে তুলে ধরা হয়েছে। অত্যন্ত মর্মস্পর্শী এই নাটকের ইংরেজি অনুবাদ করেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত এবং এটি প্রকাশিত হয় পাদ্রী লং সাহেবের নামে। এই নাটক নীলচাষিদের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে ভীষণভাবে সাহায্য করেছিল।

নীল কমিশন কবে এবং কেন গঠিত হয়েছিল?

১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের ৩১ মার্চ নীল কমিশন গঠিত হয়। এই কমিশন গড়ে তোলার উদ্দেশ্য ছিল নীলচাষিদের অভিযোগ ও বিক্ষোভ সম্পর্কে তদন্ত করা। সরকারি সদস্যদের নিয়েই মূলত এই কমিশন গঠিত হলেও কমিশন নীলকরদের বিরুদ্ধে আনা অধিকাংশ অভিযোগ স্বীকার করে নিয়েছিলেন।

নীল কমিশন (Indigo Commission) কী কী সুপারিশ করেন?

নীল কমিশনের সুপারিশগুলি হল –

  • নীলকরদের ব্যবসা মূলত ভ্রান্ত কার্যত ক্ষতিকারক এবং | উদ্দেশ্যগত বিচারে পাপমূলক।
  • নীলকরদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলি সত্য। কমিশনের প্রতিবেদনে ধারাবাহিকভাবে নীলকরদের অত্যাচারের কাহিনি লিপিবদ্ধ হয়। নীল কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে সরকার ঘোষণা করেন যে, রায়তদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার নীল চাষ করা যাবে না।

নীলবিদ্রোহ কী সফল হয়েছিল?

নীলবিদ্রোহ শুরু হয়েছিল নীলচাষ বন্ধ করার দাবিতে। নীলবিদ্রোহের পরে নীলচাষের উচ্ছেদ ঘটেছিল অর্থাৎ বাংলার চাষিদের দুর্দমনীয় মনোভাবের কাছে নীলকর সাহেবরা নীলচাষ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল। সেদিক থেকে দেখলে নীলবিদ্রোহ সফল হয়েছিল।

নীলবিদ্রোহের গুরুত্ব কী ছিল?

নীল বিদ্রোহে কৃষক, জমিদার, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, হিন্দু-মুসলমান এমনকি খ্রিস্টান মিশনারিরাও অংশগ্রহণ করে এই বিদ্রোহকে সংঘবদ্ধ ধর্মনিরপেক্ষ গণআন্দোলনের রূপ প্রদান করে। ফলে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিদ্রোহ। সামন্তপ্রথা ও উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন ছিল একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলন, যা দেশের লোককে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করেছিল। এটি ছিল আসলে কৃষকদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের সংগ্রাম।

নীলবিদ্রোহের ফলাফল আলোচনা করো।

ফলাফল –

  • নীলবিদ্রোহের ফলে নীলচাষের উচ্ছেদ ঘটে
  • নীলচাষ থেকে মূলধন সরিয়ে নিয়ে গিয়ে নীলকর সেই অর্থ চা শিল্পে বিনিয়োগ করেন
  • নীলকরদের তাড়িয়ে দিয়ে এদেশের সম্পন্ন ব্যক্তিরা সুদের মহাজনি ব্যবসা শুরু করে
  • সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বৃদ্ধি পায়।
  • দেশের লোকদের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায়।

ভারতের ইতিহাসে প্রতিরোধ ও বিদ্রোহের একটি দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। এই প্রতিরোধ ও বিদ্রোহগুলি বিভিন্ন কারণে ঘটেছিল, যেমন ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, সামন্ততান্ত্রিক শাসন ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চারতা, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম ইত্যাদি।

Rate this post


Join WhatsApp Channel For Free Study Meterial Join Now
Join Telegram Channel Free Study Meterial Join Now

মন্তব্য করুন