এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের তৃতীয় পাঠের অন্তর্গত ‘পথচলতি’-এর বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করব। এখানে লেখকের পরিচিতি, গল্পের উৎস, গল্পের পাঠপ্রসঙ্গ, গল্পের সারসংক্ষেপ, গল্পের নামকরণ এবং এর প্রধান বিষয়বস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। এই আর্টিকেলটি আপনাদের ‘পথচলতি’ গল্প সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা দেবে এবং গল্পটি ভালোভাবে বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। এ ছাড়া, অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষায় এই অধ্যায় থেকে লেখক ও গল্পের সারসংক্ষেপ সম্পর্কিত প্রশ্ন আসতে পারে, তাই এই তথ্যগুলো জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক পরিচিতি
সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। 1890 খ্রিস্টাব্দের 26 নভেম্বর হাওড়া জেলার শিবপুরে তাঁর জন্ম হয় এবং তাঁর মৃত্যু হয় 1977 খ্রিস্টাব্দের 29 মে। তিনি একজন বাঙালি ভাষাতাত্ত্বিক পণ্ডিত, বহুভাষাবিদ এবং সাহিত্যিক।
তাঁর পিতা হরিদাস চট্টোপাধ্যায় ছিলেন ইংরেজদের সদাগরি অফিসের কেরানি। তিনি 1907 খ্রিস্টাব্দে এনট্রান্স পরীক্ষায় ষষ্ঠ স্থান অধিকার করে 20 টাকা বৃত্তি লাভ করেন। এরপর তিনি বিএ-তে প্রথম স্থান অধিকার করেন। 1913 খ্রিস্টাব্দে ইংরেজিতে এমএ-তেও তিনি প্রথম স্থান অর্জন করেন।
1918 খ্রিস্টাব্দে তিনি সংস্কৃতের শেষ পরীক্ষায় পাস করেন এবং ‘প্রেমচাঁদ-রায়চাঁদ বৃত্তি’ ও জুবিলি গবেষণা পুরস্কার অর্জন করেন। তাঁর প্রাপ্ত উল্লেখযোগ্য পুরস্কারগুলি হলো— ‘সাহিত্য বাচস্পতি’ ও ‘পদ্মবিভূষণ’।
তিনি প্রথমে বিদ্যাসাগর কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক, পরে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক নিযুক্ত হন। 1927 খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চারজন ভ্রমণসঙ্গীর একজন হয়ে তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া সফরে যান। তিনি ‘The Origin and Development of the Bengali Language’ গ্রন্থ রচনার জন্য আজও স্মরণীয় হয়ে আছেন। বাংলায় রচিত তাঁর গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে— ‘ভারত সংস্কৃতি’, ‘বাংলা ভাষাতত্ত্বের ভূমিকা’, ‘পশ্চিমের যাত্রী’, ‘ইউরোপ ভ্রমণ’, ‘দ্বীপময় ভারত ও শ্যামদেশ’, ‘রবীন্দ্র সঙ্গমে’, ‘কিরাত জনকৃতি’, ‘বেঙ্গলি ফোনেটিক রিডার’ ইত্যাদি। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের নাম ভাষাচর্চার জগতে আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়।
বিষয়সংক্ষেপ
‘পথচলতি’ গল্পটির কথক সম্ভবত 1928 খ্রিস্টাব্দের শীতকালে গয়া থেকে কলকাতা যাওয়ার পথে দেহরাদুন এক্সপ্রেস ধরার জন্য ফিরছিলেন। গাড়িতে অসম্ভব ভিড়ের জন্য এ-কামরা, সে-কামরা করে শেষে হন্যে হয়ে একটি তৃতীয় শ্রেণির ফাঁকা বগির কাছে এসে থমকে দাঁড়ালেন। বগিটির দরজার কাছে তখন দরজা আটকে থাকা বেশ কয়েকজন দোহারা চেহারার কাবুলিওয়ালার হুংকারে আশপাশের সকলেই তটস্থ, এমনকি পুলিশও বেপাত্তা।
এই মারমুখী আফগানদের কী করে পথে আনতে হবে, সেটা কথক প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করে নিলেন। ওরা খুব সাধারণ ‘পশতু’ ভাষায় কথা বলছিল। তাই ওরা যে ভাষাকে সমীহ করে, সেই শিক্ষিতজনের ভাষা ফারসির দু-চার কলি জানার সুবাদে ওদের ঘায়েল করতে কথক সাহস করে ওই কামরায় ঢুকতে উদ্যত হলেন। ওদের হুংকারে একটুও বিচলিত না হয়ে, তিনি তখন ফারসি ভাষায় অনুরোধ করলেন একজনের জন্য একটু জায়গা করে দিতে। ওরা বাঙালিবাবুর মুখে এমন অভিজাত ভাষায় কথা শুনে হতভম্ব হয়ে গেলেও আমতা আমতা করতে লাগল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই ফারসি ভাষার আনুকূল্যেই বেশ সম্মানের সঙ্গেই লেখক জায়গা পেলেন ওই পাঠানদের কামরায়।
ওদের পশতু ভাষায় লেখকের খুব বেশি অসুবিধা হলো না। পশতু-বাংলার সঙ্গে মনের ভাষার মিশেল করে সকলে আনন্দের সঙ্গে চলতে লাগলেন।
উপরের বাঙ্কে শায়িত বাংলাদেশের বৃদ্ধ পাঠান আগা সাহেব (যিনি পটুয়াখালিতে শীতবস্ত্র আর হিং বিক্রি করেন), কথকের সঙ্গে জমিয়ে গল্প শুরু করলেন। এরপর এক পাঠান, কথকের অনুরোধে খুশহাল খাঁ খট্টকের পশতু গজল শোনালেন। আসর উঠল জমে। এরপর পাঠানদের অন্য একজন, আদম খান আর দুরখানির মহব্বতের কিস্সা কিছুটা গান করে, কিছুটা পাঠ করে কথককে শোনালেন। সব ভেদাভেদ ভুলে বাঙালিবাবু আর আফগানরা সকলেই যেন এক সাহিত্য সভায় মশগুল হয়ে গেলেন।
কথকের সম্পর্কে ওরা নিজেদের মধ্যে যে খুব উচ্চমার্গের প্রশংসাসূচক কথা বলছিল, পশতু ভালো না জানলেও কিছুটা আরবি-ফারসি জানার জন্য লেখকের তা বুঝতে অসুবিধা হলো না।
রাত্রে সুখনিদ্রা দিয়ে সকালে উঠেই কথক দেখেন আরেক চিত্র। ওদের মধ্যে তখন কেউ নামাজ পড়ছে, আবার কেউবা অত ভোরেই ‘রোটা’ আর ‘কাবাব’ পেট ভরতি করে খেয়ে নিচ্ছে; কারণ, সারাদিন রোজার উপোস। অন্য দিকে, আগা সাহেব মালা জপতে জপতে লেখকের রাতের ঘুমের খবর নিতে ভুললেন না।
ইতোমধ্যে গাড়ি আসানসোল এসে গেল। কথকও সেখান থেকে কলকাতা চলে গেলেন। কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন জাতির সঙ্গে এমন একটি সুন্দর ও অভাবনীয় রেলভ্রমণে রাত্রিযাপন তাঁর চিরকাল স্মরণে রইল।
নামকরণ
সকলেরই নাম থাকে— তা বস্তুজগৎ, উদ্ভিদজগৎ, প্রাণীজগৎ কিংবা গল্প-কাব্যের জগৎ যাই হোক না কেন। গল্পজগতের একটি গল্প হিসেবে ‘পথচলতি’ নামটি কতটা সমর্থনযোগ্য, সেটাই আমাদের আলোচ্য।
পুরো গল্পটাই মূলত পথ চলারই কাহিনি। এ পথচলা অবশ্য পথে নেমে হাঁটা নয়; একটি রাতে ট্রেনে করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার কাহিনি। লেখক দেহরাদুন এক্সপ্রেসে আফগানদের সঙ্গে এক কামরায় উঠলেন এবং কাবুলিওয়ালাদের সঙ্গে একেবারে মিশে গেলেন। প্রায় ষোলোজন পাঠান মর্দের সাথে ঘাম এবং হিংয়ের উগ্র গন্ধকে উপেক্ষা করে রাতের আসর জমিয়ে দিলেন।
আফগান আগা সাহেবের সঙ্গে ভাববিনিময়, সাহিত্য সভার একটা জব্বর পরিবেশ সৃষ্টি করা, রাতে সুখনিদ্রায় যাওয়া, ভোরে পাঠানদের রোটা-কাবাব খাওয়ার দৃশ্য অবলোকন করা এবং আগা সাহেবের সৌজন্য ও শিষ্টাচারে অভিভূত হয়ে লেখক শেষ পর্যন্ত চলে এলেন গন্তব্যে।
সারাটা পথ ওই কাবুলিওয়ালাদের সঙ্গে ভাষার ব্যবধান ঘুচিয়ে, ওদের শরীর থেকে আসা উৎকট গন্ধকে অতিক্রম করে, ওদের অহিন্দুস্থানি খাবারের প্রতি একটুও শুচিবায়ুগ্রস্ততা না দেখিয়ে লেখক যেন কতকগুলো দুরন্ত এবং দামাল ভিনদেশিদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে সারাটা পথ এক অপূর্ব আবেশে চলতে চলতে এলেন। সে চলায় আবেগের আতিশয্য ছিল, কিন্তু বিরোধ ছিল না; আলোচনা ছিল, কিন্তু সমালোচনা ছিল না; বর্তমান ছিল, কিন্তু ভবিষ্যৎ ছিল না।
ভাষা, সাহিত্য এবং সংস্কৃতির যথেষ্ট পার্থক্য সত্ত্বেও একটি রেলকামরার ছোট্ট গণ্ডির ভিতর কয়েকজন ভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে লেখকের যে ভাববিনিময়— তার মধ্যে থাকা এক উন্নত এবং উদার মানসিকতা— তাদের সকলকে ভুলিয়ে দিয়েছে তাদের পরিচয়, গঠন করেছে বন্ধুত্বের অঙ্গীকার। এ পথচলায় শুধুই এক অনাবিল আনন্দের রেশ নিয়ে লেখক ফিরলেন। পথ চলতে চলতেই যেহেতু লেখকের একটি রাতের কাহিনি এখানে বর্ণিত হয়েছে, তাই গল্পটির ‘পথচলতি’ নামটি সংগত কারণেই সার্থক।
এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের তৃতীয় পাঠের অন্তর্গত ‘পথচলতি’-এর বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করেছি। আশা করি, আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে আসবে। যদি কোনো প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থাকে, তবে আমাদের টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন; আমরা উত্তর দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করব। এ ছাড়া, লেখাটি প্রয়োজনীয় মনে হলে আপনার বন্ধু বা সহপাঠীদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ।





Leave a Comment