এই আর্টিকেলে আমরা সপ্তম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের অন্তর্গত প্রাবন্ধিক শিবতোষ মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘কার দৌড় কদ্দূর’ গদ্যাংশের কিছু গুরুত্বপূর্ণ রচনাধর্মী বা বড়ো প্রশ্ন ও উত্তর (Long Answer Questions) নিয়ে আলোচনা করব। এই বিস্তারিত প্রশ্নোত্তরগুলো সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত সহায়ক, কারণ স্কুলের বাংলা পরীক্ষায় এই অধ্যায় থেকে ব্যাখ্যামূলক বা বড়ো প্রশ্ন নিয়মিত আসে।

প্রবন্ধকার শিবতোষ মুখোপাধ্যায় কোন্ চলাকে পৃথিবীতে ‘সত্যিকারের চলা’ বলে অভিমত পোষণ করেছেন এবং কেন?
প্রবন্ধকার, প্রাণীবিজ্ঞানী অধ্যাপক শিবতোষ মুখোপাধ্যায় তাঁর বিজ্ঞানভিত্তিক প্রবন্ধ ‘কার দৌড় কদ্দূর’-এ পৃথিবীতে ‘সত্যিকারের চলা’ বলতে মানুষের নিজ মনোভূমিতে চলাকে বুঝিয়েছেন।
জ্ঞান-বিজ্ঞানে, সাহিত্যে-শিল্পে, রহস্য-উন্মোচনে, সৌন্দর্য-আস্বাদনের মধ্য দিয়েই মানুষের মনোভূমিতে বিচরণ চলেছে। মানুষ তার মনন চলা দিয়েই জল-স্থল-আকাশ জয় করেছে। সে শুধু নিজে চলে না, সে সব কিছুকে চালনা করে। জাহাজ, রেল, প্লেন, জেট সমস্ত কিছুকেই মানুষ নিয়ন্ত্রণ করছে। মনের চলনের দ্বারাই মানুষ এই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ স্থানটি অধিকার করতে সক্ষম হয়েছে। এই চলাই সত্যিকারের চলা বলে লেখক অভিমত পোষণ করেছেন।
টীকা লেখো – হিউয়েন সাঙ, শ্রীজ্ঞান দীপঙ্কর, ভাস্কো-ডা-গামা, শঙ্করাচার্য।
হিউয়েন সাঙ – হিউয়েন সাঙ একজন চিনা পর্যটক। তিনি বৌদ্ধধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে হর্ষবর্ধনের রাজত্বকালে ভারতে আসেন। দীর্ঘ সময় ভারতে থেকে স্বদেশে ফিরে গিয়ে ভারতভ্রমণ-বিষয়ক গ্রন্থ লেখেন। এই গ্রন্থ থেকে তৎকালীন ভারতবর্ষের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবন সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায়।
শ্রীজ্ঞান দীপঙ্কর – পণ্ডিতদের মতে, 980 খ্রিস্টাব্দে বর্তমান বাংলাদেশের বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামে শ্রীজ্ঞান দীপঙ্করের জন্ম। তিব্বতি পরম্পরা অনুসারে ইনি বিক্রমমনিপুর রাজ কল্যাণশ্রীর পুত্র। আদিনাম ছিল- আদিনাথ চন্দ্রগর্ভ। নিতান্ত অল্পবয়সেই তিনি বৌদ্ধধর্মের নানা শাস্ত্র পাঠ করে প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করেন- মাত্র 19 বছর বয়সে ‘ওদন্তপুরী’ বিহারের মহাসংঘিকাচার্য শীলরক্ষিতের কাছে দীক্ষা নিয়ে ইনি ‘শ্রীজ্ঞান’ উপাধি লাভ করেন- তাঁর আর-এক উপাধি অতীশ। প্রাথমিক পর্যায়ে বাড়িতে মায়ের কাছে এবং পরে অবধূত জেতারির কাছে শাস্ত্রশিক্ষা লাভ করেন। পালরাজা মহীপালের তত্ত্বাবধানে ইনি বিক্রমশীলা মহাবিহারের অধ্যক্ষপদে নিযুক্ত হন। তিব্বতের রাজা ও তিব্বতি বৌদ্ধদের আমন্ত্রণে তিনি তিব্বতে গিয়ে বহু ‘সংস্কৃত’ ও ‘পালি’ ভাষায় লেখা বৌদ্ধগ্রন্থ সেখানকার ‘ভোট’ ভাষায় অনুবাদ করেন। শেষপর্যন্ত তিব্বতেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
ভাস্কো-ডা-গামা – ভাস্কো-ডা-গামা একজন পর্তুগিজ পর্যটক। ইনি সমুদ্রপথে সুদূর ইউরোপ থেকে ভারত তথা প্রাচ্য দেশের পথ আবিষ্কার করে 1498 খ্রিস্টাব্দে ভারতের কালিকট বন্দরে পৌঁছোন। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সাহিত্য-সংস্কৃতি ও শিল্পের সমন্বয়সাধনে ভাস্কো-ডা-গামার এই ভারত-আগমন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।
শঙ্করাচার্য – কেরল রাজ্যের কালাদি গ্রামে 788 খ্রিস্টাব্দে শঙ্করাচার্যের জন্ম হয়। আদি শঙ্করাচার্য বৌদ্ধধর্মের প্রবল উচ্ছ্বাস থেকে হিন্দুধর্মকে রক্ষা করেন। পুরীর জগন্নাথ মন্দির রক্ষার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা প্রশংসনীয়। তিনি অদ্বৈত বেদান্তের চর্চা করেছিলেন এবং অদ্বৈত বেদান্তকে তিনি সুদৃঢ় ভিত্তির উপর স্থাপন করেন। মূল উপনিষদের ভাষ্য-সহ বহু স্তোত্র তিনি রচনা করেছিলেন। পদব্রজে শঙ্করাচার্য সমগ্র ভারতবর্ষের উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম পরিভ্রমণ করেন ও চার প্রান্তে চারটি মঠ স্থাপন করেন। 820 খ্রিস্টাব্দে এই মহান বেদান্ত ভাষ্যকার দেহত্যাগ করেন।
‘প্রাণী মাত্রকেই খাবার সংগ্রহ করতে হয়’ – গাছ কীভাবে না দৌড়ে তার খাবার সংগ্রহ করতে পারে?
কয়েকটি পরভোজী গাছ ছাড়া সমস্ত উন্নত শ্রেণির ক্লোরোফিলযুক্ত সবুজ গাছ নিজের দেহে নিজে সালোকসংশ্লেষ পদ্ধতিতে শর্করা জাতীয় খাদ্য তৈরি করে। শিকড় বা মূলের সাহায্যে গাছ মাটির নীচ থেকে খনিজ লবণমিশ্রিত জল সংগ্রহ করে কাণ্ডের মধ্যে অবস্থিত জাইলেমের সাহায্যে গাছের রান্নাঘর সবুজ পাতায় পাঠিয়ে দেয়। পরিবেশ থেকে সংগৃহীত কার্বন ডাইঅক্সাইড, পাতার সবুজ ক্লোরোফিল ও সূর্যের আলোর ফোটন কণার উপস্থিতিতে জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় অর্থাৎ সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় শর্করা জাতীয় খাদ্য প্রস্তুত হয়। খাদ্য তৈরির পর এই খাদ্য ফ্লোয়েম নামক সংবহন কলার মাধ্যমে সারা শরীরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তাই খাদ্য সংগ্রহের জন্য উদ্ভিদকে স্থানপরিবর্তন অর্থাৎ গমন করতে হয় না।
প্রবন্ধে লেখক জানিয়েছেন যে খাবার সংগ্রহের কারণেই ‘প্রাণীরা এক জায়গায় স্থাণু না হয়ে দিকে দিকে পরিভ্রমণ করে।’ – তুমি কি এই মতটিকে সমর্থন করো? তোমার উত্তরের সপক্ষে যুক্তি দাও।
প্রাবন্ধিক শিবতোষ মুখোপাধ্যায়ের ‘কার দৌড় কদ্দূর’ প্রবন্ধ থেকে নেওয়া উদ্ধৃত মতটিকে আমি সম্পূর্ণরূপে সমর্থন করি। খাবার সংগ্রহের কারণে প্রাণীরা এক জায়গায় স্থাণু না হয়ে দিকে-দিকে পরিভ্রমণ করে সে-বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু শুধুমাত্র খাদ্যসংগ্রহের জন্য প্রাণীদের দিকে দিকে পরিভ্রমণ করতে হয়- তা ঠিক নয়। আরও কয়েকটি কারণে প্রাণীদের স্থানপরিবর্তন করতে হয়। বাসস্থান খোঁজার জন্য, আত্মরক্ষার জন্য, বংশবিস্তারের জন্য এককথায় অভিযোজনের জন্যও প্রাণীদের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ বা গমন করতে হয়। তবে যেহেতু অধিকাংশ প্রাণী নিজেদের দেহে খাদ্য তৈরি করতে পারে না, সেহেতু খাদ্যের সন্ধানেও প্রাণীদের অবশ্যই নানা স্থানে যেতে হয়। এই ব্যাপারে তাই আমি লেখকের সঙ্গে একমত।
‘গমনাগমনের প্রকৃত মাধুর্যটা আমাদের চোখে পড়ে সাধারণত উচ্চতর প্রাণীর মধ্যে।’ – পাঠ্যাংশে উচ্চতর প্রাণীদের গমনাগমনের মাধুর্য কীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে আলোচনা করো।
লেখকের মনে হয়েছে উচ্চতর প্রাণীদের গমনাগমন যথেষ্ট বৈচিত্র্যময়। কেননা তাদের চলার মধ্যে রয়েছে অনেক কৌশলগত দিক। তবু বলা যেতে পারে গমনশক্তি প্রাণীদেহের দৈহিক ওজনের উপর অনেকটাই নির্ভর করে। সাধারণত ভাবা হয় বেশি ওজনবিশিষ্ট প্রাণীদের গতি খুব কম হবে এবং দৈহিক ওজন কম হলে তাদের গতি বেশি হবে, কিন্তু তা নাও হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে দেখা যায় 30 পাউন্ড ওজন নিয়ে চিতা দৌড়োয় ঘণ্টায় 70 মাইল, অথচ নেকড়ে চিতার সমওজনের হয়েও ঘণ্টায় দৌড়োয় মাত্র 36 মাইল। হিপো দৈহিক 1800 পাউন্ড ওজন নিয়ে ঘণ্টায় 20-30 মাইল যেতে পারে। আবার গ্যাজেলি হরিণ 80 পাউন্ড ওজন নিয়েও ঘণ্টায় 60 মাইল বেগে দৌড়োয়।
এই সকল প্রাণীদের দ্রুততার সঙ্গে তাদের গমনভঙ্গিও বিচিত্র- কেউ পায়ের সাহায্যে, কেউ ডানা, কেউ পাখনা ব্যবহার করে মাইলের পর মাইল অতিক্রম করে। সমুদ্রের স্রোতের সঙ্গে কত সামুদ্রিক জীব গা ভাসিয়ে সাঁতার কেটে মাইলের পর মাইল চলে যায়। আবার বাঘ-সিংহ-হরিণ ছুটে যায় দ্রুতগতিতে, শামুকেরা চলে একখানি মাংসল পুরু পা দিয়ে। এসব প্রাণীদের গমনাগমনের কলাকৌশল, শারীরিক গঠন, গতিবেগ বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ।
এই আর্টিকেলে আমরা সপ্তম শ্রেণির বাংলা পাঠ্যক্রমের অন্তর্গত, শিবতোষ মুখোপাধ্যায় রচিত ‘কার দৌড় কদ্দূর’ প্রবন্ধের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের আসন্ন পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এই প্রশ্নোত্তরগুলি অত্যন্ত সহায়ক হবে, কারণ পরীক্ষায় এই ধরনের বর্ণনামূলক প্রশ্ন প্রায়শই এসে থাকে।
আশা করি, এই আলোচনাটি আপনাদের উপকারে এসেছে। পাঠ্যবিষয়ক কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকলে নির্দ্বিধায় আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে জানাতে পারেন। আপনাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে এবং পড়াশোনায় সাহায্য করতে আমরা সর্বদা প্রস্তুত। ধন্যবাদ!





মন্তব্য করুন