অষ্টম শ্রেণি বাংলা – শিকল-পরার গান – বিষয়সংক্ষেপ

Souvick

এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের সপ্তম পাঠের অন্তর্গত ‘শিকল-পরার গান’-এর বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করব। এখানে কবির পরিচিতি, কবিতার উৎস, কবিতার পাঠপ্রসঙ্গ, কবিতার সারসংক্ষেপ, কবিতার নামকরণ এবং এর প্রধান বিষয়বস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। এই আর্টিকেলটি আপনাদের ‘শিকল-পরার গান’ কবিতা সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা দেবে এবং কবিতাটি ভালোভাবে বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। এছাড়া, অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষায় এই অধ্যায় থেকে কবি ও কবিতার সারসংক্ষেপ সম্পর্কিত প্রশ্ন আসতে পারে, তাই এই তথ্যগুলো জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শিকল-পরার গান - অষ্টম শ্রেণী - বাংলা - কবি পরিচিতি

কবি পরিচিতি

বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার অন্তর্গত চুরুলিয়া গ্রামে 1899 খ্রিষ্টাব্দের 24 মে নজরুল ইসলামের জন্ম হয়। তাঁর পিতা হলেন কাজী ফকির আহমেদ এবং মাতা জাহেদা খাতুন। নজরুলের শৈশব অতিবাহিত হয়েছে অত্যধিক দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করে। মাত্র 9 বছর বয়সেই তাঁর পিতৃবিয়োগ হওয়ায় সংসারে অর্থকষ্ট নেমে আসে। ফলে শৈশবেই অর্থোপার্জনের চেষ্টায় লিপ্ত হতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। তাঁর বাল্যশিক্ষা শুরু হয়েছিল মক্তবে। রানিগঞ্জের শিয়ারশোল রাজ হাই স্কুলে দশম শ্রেণিতে পাঠরত অবস্থাতেই তিনি বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগদান করেন এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে প্রথমে লাহোর ও পরে করাচি সেনাশিবিরে যোগ দেন। 1917 থেকে 1919 খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত নজরুল সৈনিকের দায়িত্ব পালন করেন। এই সময় থেকেই শুরু হয় তাঁর সাহিত্যকীর্তি। 1919 খ্রিষ্টাব্দে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’-য় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কবিতা ‘মুক্তি’। 1920 খ্রিষ্টাব্দে তিনি কলকাতায় চলে আসেন এবং অল্প দিনের মধ্যেই তিনি কবি এবং গায়ক হিসেবে সমাদর লাভ করতে থাকেন। 1922 খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয় নজরুলের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’। তবে 1921 খ্রিষ্টাব্দেই ‘বিজলী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি। এই কবিতাটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই বাংলা সাহিত্যজগতে তাঁর আসনটি চিরস্থায়িত্ব লাভ করে। বিদেশি ইংরেজ সরকারের শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে হাতিয়াররূপে তিনি ব্যবহার করতে চেয়েছেন তাঁর সাহিত্যকে। যেখানে অন্যায়, অবিচার, শোষণ, ধর্মের নামে ভণ্ডামি, জাতের নামে বজ্জাতি, সেখানেই প্রতিবাদে মুখর হয়েছে নজরুলের সাহিত্য। তাঁর সাহিত্যে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির বাণী ধ্বনিত হয়েছে। বিদ্রোহের সুর ধ্বনিত হওয়ায় ‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশি’ প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থ ব্রিটিশ সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল, কিন্তু তাতে একেবারেই ভীত হননি নজরুল ইসলাম। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলি হল—’অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশি’, ‘সাম্যবাদী’, ‘সর্বহারা’, ‘ফণিমনসা’, ‘প্রলয়শিখা’ ইত্যাদি। বেশ কিছু গল্প ও কয়েকটি উপন্যাসও তিনি রচনা করেছেন। তবে নজরুল সবথেকে বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করেছেন তাঁর সংগীতের মাধ্যমে। গজল, শ্যামাসংগীত, আধুনিক নানা ধরনের গান তিনি যেমন রচনা করেছেন, তেমনই গেয়েছেনও। নজরুলের গান বিপ্লবীদের শক্তি জোগাত, অনুপ্রাণিত করত। 1976 খ্রিষ্টাব্দের 29 আগস্ট কবি নজরুল পরলোকগমন করেন। তাঁর স্মরণীয় সাহিত্যকীর্তির জন্যই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি আজও অমর হয়ে আছেন।

উৎস

‘শিকল-পরার গান’ কবিতাটি কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিষের বাঁশি’ কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।

পাঠপ্রসঙ্গ

ব্রিটিশ সরকার ভারতের বুকে প্রায় দুই শত বছর শাসন-শোষণ চালিয়েছে। সেই ত্রাসের শাসনে ভারতবাসী ছিল শৃঙ্খলিত। এমন পরাধীন বন্দিদশা থেকে মুক্তির জন্য ভারতের সন্তানগণ বিপ্লবের কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। তাঁরা নির্ভীকচিত্তে মুক্তি-সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, ফাঁসির মঞ্চে জীবনকে করেছিলেন বলিদান। বিদেশি সরকার ভয় দেখিয়ে, পীড়ন চালিয়ে বিপ্লবকে স্তব্ধ করতে চেয়েছিল, তাই লৌহকারাগারে বন্দি করে অত্যাচার চালানো হত দেশসেবকদের উপরে। এরই প্রতিবাদে মুখর হয়েছিলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি দেশবাসীকে নির্ভীক হৃদয়ে দেশমাতৃকার সেবায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি মনে করেছেন ইংরেজের লৌহশিকলে দীর্ঘদিন বেঁধে রাখা যাবে না ভারতীয়দের। সেই প্রসঙ্গই ‘শিকল-পরার গান’ কবিতায় বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম তুলে ধরতে চেয়েছেন।

বিষয়সংক্ষেপ

অগ্নিযুগের কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কাব্যের মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কথা প্রচার করেছেন। ইংরেজের শোষণের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার কথা ঘোষণা করেছেন কবি তাঁর নানা কবিতায় ও গানে। কবি নজরুল উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছেন যুবশক্তিকে, এমনই একটি কবিতা হল ‘শিকল-পরার গান’। কবি দেখেছেন ব্রিটিশ রাজশক্তি ভারতীয়দের শাসনের নামে শোষণ করে চলেছে, পদে পদে লাঞ্ছিত হচ্ছে ভারতীয়দের স্বাধীনতা। যাঁরাই বিপ্লবের কথা বলেন বা সরকারবিরোধী আন্দোলন করেন, তাঁদেরই শৃঙ্খলিত জীবন কাটাতে বাধ্য করা হচ্ছে। লৌহকারাগার পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে বিপ্লবীদের সমাবেশে, কিন্তু কবি বলতে চাইছেন—এই শিকল পরার মাধ্যমেই শিকল ভাঙার কাজ ত্বরান্বিত হবে। আজ যাঁদের হাতে-পায়ে শিকল পরানো হচ্ছে, আন্দোলনকে স্তব্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে—তাঁদেরই দেখানো পথ ধরে আরও অনেক অনেক বিপ্লবী ঝাঁপ দেবেন বিপ্লবে, তখন তাঁদের আর শিকল পরিয়ে কারাগারে আটকে রাখা যাবে না; বরং তাঁরাই দলবদ্ধভাবে ভেঙে ফেলবেন ব্রিটিশ কারাগারের লৌহকপাট। তাই এই শিকল পরা ছলনামাত্র। বন্দিশালা তাঁদের ধরে রাখতে ব্যর্থ হবে, কেবল মনের সকল ভয়কে জয় করতেই যেন সাধ করে বিপ্লবীগণ বন্দি হতে এসেছেন। যখন এই ভয় দূর হয়ে যাবে তখন কোনো বাঁধনেই বিপ্লবীদের আর বেঁধে রাখা যাবে না। তখনই বিদেশি সরকার বুঝবে যে শৃঙ্খলিত পায়ে ভারতীয়দের আর আবদ্ধ রাখা যাবে্বা না, আত্মশক্তিতে জেগে উঠে ভারতীয়রা সকল শিকলকে ভেঙে ফেলবে। বিদেশি সরকার ভেবেছে ভয় দেখিয়েই বিশ্বকে গ্রাস করবে, কিন্তু তা সম্ভব হবে না বলে কবি মনে করেন। কারণ বিধাতার সৃষ্ট এই জগতে ত্রাসের শাসন দীর্ঘস্থায়ী হয় না। যেদিন ভয় দেখানো ভূতকে সকলে পরাজিত করতে শিখবে, সেদিন কোনো বাঁধনেই কাউকে বেঁধে রাখা যাবে না, সেদিন বলহীনও আত্মশক্তিতে মাভৈঃ মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে বলবীর্য লাভ করে জয়ের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বে। ভারতীয়রা তখন ভয়ের টুটি টিপে ধরবে এবং ভয়ের শাসনের অবসান ঘটবে। ফলে বিপ্লবের পথে চলতে গিয়ে ফাঁসির মঞ্চেও হাসিমুখে তারা জীবনের জয়গান রচনা করবে। কবি তাই দেশের মুক্তিকামী মানুষদের বলতে চেয়েছেন যে—আর কান্না নয়, আর বন্ধন নয়; মুক্তিপথের অগ্রদূতের চরণে নিজেদের সমর্পণ করতে হবে। শত লাঞ্ছনার জবাব দিতে হবে লাঞ্ছিতদেরই। তাঁদের দেহের অস্থি দিয়েই তৈরি হবে বজ্র, আবার জ্বলবে বজ্রানল—সেই আগুনেই ধ্বংস হবে বন্ধন, শৃঙ্খল এভাবেই ‘শিকল-পরার গান’ কবিতায় দেশের সন্তানদের কবি জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছেন।

নামকরণ

সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হল নামকরণ। মূলত নামকরণের মাধ্যমেই রচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে আগাম ধারণা করা যায়। নামকরণ বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে, যেমন—চরিত্রধর্মী, বিষয়ধর্মী, ব্যঞ্জনাধর্মী প্রভৃতি। এবার আলোচনা করে দেখা যাক যে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘শিকল-পরার গান’ কবিতাটির নামকরণ সার্থক কি না। কবি নজরুল যখন আলোচ্য কবিতাটি লিখেছেন, তখন ভারতবাসী পরাধীন, ভারতীয়দের বুকের উপর দিয়ে চলছে ব্রিটিশ সরকারের অত্যাচারের স্টিমরোলার। শোষিত ভারতীয়রা ব্রিটিশের কারাগারে বন্দিজীবন কাটাচ্ছে, সরকার ভয় দেখিয়ে দেশবাসীর জাতীয় চেতনাকে স্তব্ধ করার চেষ্টা করে চলেছে অনবরত। তবে কবি নজরুল আশাবাদী, তিনি ইংরেজ সরকারকে বুঝিয়ে দিতে চান যে—ভয় দেখিয়ে জনসাধারণের মন জয় করা যায় না। বর্তমানে যতই ভারতীয়দের লৌহশিকলে বেঁধে রাখা হোক না কেন, এই শিকল অচিরেই ভেঙে পড়বে। ভারতীয়রা দলবদ্ধভাবে শিকল ভাঙার খেলায় মেতে উঠে লৌহকারাগারকে ভরিয়ে তুলবে আর তাদের আন্দোলনেই বন্দিশালার লৌহকপাট ভেঙে খান-খান হয়ে যাবে। ত্রাসের শাসন আর বেশিদিন চলবে না, ভয় দেখানো ভূতকে বিপ্লবীরা জয় করবেনই আর তখন ইংরেজ সরকারের তৈরি করা শিকল ভারতীয়দের বাঁধতে সক্ষম হবে না বলে কবি নজরুল মনে করেছেন। ফাঁসির মঞ্চে জীবনের জয়গান গাইবেন বিপ্লবীগণ, লাঞ্ছিত ভারতীয়রা আপন বুকের অস্থি দিয়েই বজ্রানল প্রজ্বলিত করবেন, সকল ভয়ভীতি-দৈন্য ভুলে শিকল ভাঙার গানে মেতে উঠবেন তাঁরা। ‘শিকল-পরার গান’—সমস্ত কবিতাটির মধ্যেই কবির পূর্বোক্ত আশাবাদ ধ্বনিত হয়েছে। সেদিক থেকে বিচার করে বলা যায় যে, কবিতাটির ব্যঞ্জনাধর্মী নামকরণ সার্থকভাবে প্রযুক্ত হয়েছে।


এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের সপ্তম পাঠের অন্তর্গত ‘শিকল-পরার গান’-এর বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করেছি। আশা করি, আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে আসবে। যদি কোনো প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থাকে, তবে আমাদের টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন; আমরা উত্তর দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করব। এছাড়া, লেখাটি প্রয়োজনীয় মনে হলে আপনার বন্ধু বা সহপাঠীদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ।

Please Share This Article

Related Posts

মহাভারতে তোমার প্রিয় চরিত্র কোনটি? কেন তাকে তোমার ভালো লাগে লেখো।

মহাভারতে তোমার প্রিয় চরিত্র কোনটি? কেন তাকে ভালো লাগে | অষ্টম শ্রেণী পথের পাঁচালী

বাবার সঙ্গে অপুর কুঠির মাঠ দেখতে যাবার অভিজ্ঞতাটি লেখো। ‘কুঠিবাড়ি’ বলতে তুমি কী বোঝো?

বাবার সঙ্গে অপুর কুঠির মাঠ দেখতে যাবার অভিজ্ঞতাটি লেখো। ‘কুঠিবাড়ি’ বলতে তুমি কী বোঝো?

অপুর খরগোশ দেখার মতো তোমার হঠাৎ অবাক হবার মতো কোনো ঘটনা লেখো।

ছবি দেখে চেনা কোনো কিছু হঠাৎ চোখের সামনে চলে এলে কেমন লাগে? অপুর খরগোশ দেখার মতো তোমার হঠাৎ অবাক হবার মতো কোনো ঘটনা লেখো।

About The Author

Souvick

Tags

Leave a Comment

SolutionWbbse

"SolutionWbbse" শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন অধ্যয়ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গাইডলাইন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সাহায্য প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষণীয় উপকরণ সহজেই সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

Editor Picks

মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান – বায়ুদূষণের নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ও ব্যবহৃত যন্ত্রসমূহ

বিভিন্ন বায়ুদূষকের ক্ষতিকর প্রভাব – মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান (Class 10 Life Science)

অ্যাসিড বৃষ্টির প্রভাব – মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান | Effects of Acid Rain in Bengali

গ্রিনহাউস গ্যাসগুলির ক্ষতিকর প্রভাব এবং কমানোর উপায় | মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান

SPM কী? SPM-এর প্রকৃতি, উৎস এবং ক্ষতিকর প্রভাব