এই আর্টিকলে আমরা নবম শ্রেণীর জীবন বিজ্ঞানের প্রথম অধ্যায় ‘জীবন ও তার বৈচিত্র্য’ -এর অন্তর্গত ‘জীবনের প্রধান/মূল বৈশিষ্ট্য’ অংশের গুরুত্বপূর্ণ রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করব। পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) -এর সিলেবাস অনুযায়ী আসন্ন ইউনিট টেস্ট বা স্কুল পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এই প্রশ্নগুলো অত্যন্ত জরুরি।

জীবন (Life) বলতে কী বোঝো? জীবনের প্রধান তিনটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করো।
জীবন – বৃদ্ধি, বিপাক, পরিব্যক্তি, বিবর্তন এবং জেনেটিক বস্তুর পুনরুৎপাদন প্রভৃতি বিভিন্ন প্রকার জৈবনিক কার্যকলাপ সম্পন্ন করার ক্ষমতাকেই জীবন বা প্রাণ বলা হয়। জীবন হল এক গতিময় (dynamic) এবং বহুবিধ ভৌত-রাসায়নিক ক্রিয়ার আধার।
জীবনের প্রধান তিনটি বৈশিষ্ট্য –
বৃদ্ধি (Growth) – প্রত্যেক জীবেরই বৃদ্ধি সম্পন্ন হয়। দেহে খাদ্য সংশ্লেষ বা খাদ্য গ্রহণ, পরিপাক ও আত্তীকরণের মাধ্যমে প্রোটোপ্লাজমের সংশ্লেষণ ঘটে। এর ফলে সামগ্রিকভাবে জীবদেহের আকার, আয়তন ও শুষ্ক ওজনের স্থায়ী ঊর্ধ্বমুখী বৃদ্ধি সম্পন্ন হয়। জীবের বৃদ্ধি সবসময়ই অভ্যন্তরীণ। যেমন – উদ্ভিদের বৃদ্ধি – বীজের অঙ্কুরোদগম → শিশুচারা → চারাগাছ → পরিণত উদ্ভিদ।
উত্তেজিতা (Irritability) – জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল উত্তেজনায় সাড়া দেওয়া ও সংবেদনশীলতা। বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উদ্দীপকের প্রভাবে জীবের সাড়া দেওয়ার ক্ষমতাকে উত্তেজিতা বলে। যেমন – লজ্জাবতীর গাছের পাতাকে স্পর্শ করলে পত্রকগুলি মুড়ে যায়।

প্রজনন ও বংশবিস্তার (Reproduction) – জীবনের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল প্রজনন বা জনন। জননের মাধ্যমে প্রতিটি জীব তার নিজ সত্তাবিশিষ্ট অপত্য সৃষ্টি করে বংশবৃদ্ধি ঘটায়। জনন ও বংশবৃদ্ধির মাধ্যমে পৃথিবীতে জীবনের অস্তিত্ব বজায় থাকে। যেমন –

জীবের নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্য বা ধর্মগুলি সংক্ষেপে আলোচনা করো – [1] আকার ও আয়তন [2] বিপাক [3] শ্বসন [4] চলন ও গমন এবং [5] ছন্দবদ্ধতা।
জীবের বৈশিষ্ট্যাবলি বা ধর্মসমূহ –
সুনির্দিষ্ট আকার ও আয়তন (Definite shape and size) – প্রতিটি জীবের সুনির্দিষ্ট আকার ও আয়তন আছে, যার সাহায্যে প্রতিটি জীবকে সহজেই চিনে নেওয়া যায়। প্রত্যেক উদ্ভিদ ও প্রাণীরই আকার ও আয়তন পরস্পরের থেকে আলাদা (ব্যতিক্রম – অ্যামিবা)।
বিপাক (Metabolism) – জীবকোশের প্রোটোপ্লাজমে অনবরত যে-সমস্ত উৎসেচক নির্ভর রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে তাদের সমষ্টিগতভাবে বিপাক বলে। গঠনমূলক বিপাককে (সালোকসংশ্লেষ) উপচিতি বিপাক (Anabolism) এবং ভাঙনমূলক বিপাককে (শ্বসন) অপচিতি বিপাক (Catabolism) বলে। যেমন –

শ্বসন (Respiration) – বেঁচে থাকার জন্য এবং বিভিন্ন জৈবনিক ও শারীরবৃত্তীয় কাজের জন্য জীবের শক্তির প্রয়োজন হয়। জীব যে প্রক্রিয়ায় কোশের মধ্যে সঞ্চিত খাদ্যবস্তু জারিত করে শক্তি উৎপন্ন করে তাকে শ্বসন বলে। শ্বসনক্রিয়া বন্ধ হলে জীবের মৃত্যু ঘটে। যেমন –
চলন ও গমন (Movement and Locomotion) – একই স্থানে আবদ্ধ থেকে জীবদেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সঞ্চালনকে চলন ও সঞ্চালনের মাধ্যমে জীবদেহের সামগ্রিক স্থান পরিবর্তনকে বলা হয় গমন। চলন ও গমনের মাধ্যমে জীবদেহের খাদ্য সংগ্রহ, অনুকূল বাসস্থান সন্ধান, আত্মরক্ষা, জনন প্রভৃতি উদ্দেশ্যগুলি পূরণ হয়। যেমন –

ছন্দবদ্ধতা (Rhythmicity) – জীবদেহের বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কার্যাবলি একটি নির্দিষ্ট ছন্দে, পর্যায়ক্রমে সংঘটিত হয়। একে ছন্দবদ্ধতা বলে। যেমন – হৃৎস্পন্দন, ফুসফুসের ক্রিয়াশীলতা প্রভৃতি।
অজৈব বস্তু থেকে জীবনের উৎপত্তি সংক্রান্ত মতবাদগুলির সংক্ষিপ্ত ধারণা দাও।
অজৈব বস্তু থেকে জীবনের উৎপত্তি সংক্রান্ত মতবাদ –
- বিশেষ উৎপত্তি তত্ত্ব (Theory of Special Creation) – এই তত্ত্ব অনুযায়ী পৃথিবীতে কোনো অতিপ্রাকৃতিক উপায়ে ঈশ্বর জীবনের উৎপত্তি ঘটিয়েছিলেন।
- বহির্বিশ্ব আবির্ভাব তত্ত্ব (Extraterrestrial theory or cosmozoan theory) – এই মতবাদ অনুযায়ী জীবনের উৎপত্তি হয়েছিল পৃথিবীর বাইরের বিশ্বব্রহ্মাণ্ড থেকে। উল্কাপিণ্ড বা ধূমকেতুর মাধ্যমে প্রতিরোধক্ষমতাসম্পন্ন স্পোর (Cosmozoa) পৃথিবীতে পৌঁছে অনুকূল পরিবেশে পৃথিবীতে জীবন উৎপন্ন করেছে। বিজ্ঞানী রিখটার (Richter, 1865) এই মতবাদের কথা বলেন এবং প্রতিরোধক্ষমতাসম্পন্ন স্পোরকে ‘প্যানস্পার্মিয়া’ (Panspermia) নাম দেন। বিজ্ঞানী আরহেনিয়াস (1908) এই মতবাদ সমর্থন করেন।
- স্বতঃস্ফূর্ত উদ্ভব তত্ত্ব (Theory of Spontaneous origin) – Anaximander (611–547 B.C.) এবং Aristotle (384-322 B.C.) এই তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। তাঁদের মতে জড়বস্তু থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পৃথিবীতে জীবনের সূত্রপাত ঘটে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী পচনশীল মাংস থেকে মাছির লার্ভা (Maggot) উৎপন্ন হয়।
- বায়োজেনেসিস তত্ত্ব (Theory of Biogenesis) – Francesco Redi (1668) প্রথম এই তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। এই তত্ত্বে বলা হয়েছে যে, জীবন পূর্ববর্তী জীবন থেকেই উৎপত্তি লাভকরে। পরবর্তীকালে বিজ্ঞানী লুই পাস্তুরও একই বক্তব্য পেশ করেন।
- জৈবরাসায়নিক তত্ত্ব (Biochemical Theory) – এই তত্ত্ব অনুযায়ী বিভিন্ন রাসায়নিক বস্তু থেকে জৈববস্তু সৃষ্টি হয়, যা আদি পৃথিবীতে জীবন সৃষ্টির প্রাথমিক উপাদানরূপে কাজ করেছিল। বিজ্ঞানী ওপারিন এবং হ্যালডেন এই তত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতা এবং পরবর্তীকালে এই তত্ত্বটিই আধুনিক বিজ্ঞানীদের দ্বারা সমাদৃত ও সর্বজনগৃহীত হয়।
আদি পৃথিবীর পরিবেশগত অবস্থা কেমন ছিল তার একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা দাও।
আদি পৃথিবীর পরিবেশগত অবস্থা (Conditions of Primitive Earth) –
পৃথিবী সৃষ্টি ও বিভিন্ন মৌলের স্তরীভবন (Origin of Earth and arrangement of elements in layer) –
- প্রায় 460 কোটি বা 4.6 বিলিয়ান বছর আগে পৃথিবীর জন্মকালে এটি একটি উত্তপ্ত গ্যাসীয় পিন্ড ছিল।
- ধীরে ধীরে কোটি কোটি বছর ধরে এই গ্যাসীয় উপাদানগুলি ঠান্ডা ও ঘনীভূত হয় এবং আয়তনে সংকুচিত হয়।
- এই অবস্থায় পৃথিবীর বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন মৌল উপাদানগুলির (যেমন – Fe, Ni, Al, S, C, H, O, N প্রভৃতি) বিন্যাসকে ‘মৌলের স্তরীভবন’ বলা হয়।
আদি বায়ুমণ্ডল (Primitive Atmosphere) –
- আদি পৃথিবীর তাপমাত্রা ছিল প্রায় 5000-6000°C।
- এই উচ্চ তাপমাত্রায় হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, কার্বন প্রভৃতি মৌলের স্বাধীনভাবে থাকা সম্ভব ছিল না।
- মৌলগুলি নিজেদের মধ্যে বা বিভিন্ন ধাতব পদার্থের সঙ্গে বিক্রিয়া ঘটিয়ে অক্সাইড, নাইট্রাইড, কার্বাইড ইত্যাদি যৌগরূপে অবস্থান করেছিল।
- সুতরাং, সেই সময়কার পৃথিবীর পরিবেশে মিথেন, কার্বন ডাইঅক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, বিভিন্ন ধাতব অক্সাইড, বিভিন্ন ধাতব নাইট্রাইড, জল, অ্যামোনিয়া প্রভৃতি যৌগগুলি বর্তমান ছিল।
- এই সমস্ত যৌগগুলি সবই গ্যাসীয় অবস্থায় ছিল।
- বিজ্ঞানী অ্যাবেলসন (Abelson, 1966) -এর মতে, তখনকার পরিবেশে মুক্ত অক্সিজেন ছিল না, এই কারণে, এইরূপ পরিবেশকে ‘বিজারণধর্মী পরিবেশ’ (Reducing type of atmosphere) বলে।
শক্তির উৎস (Energy Source) –
- আদি পৃথিবীতে বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির উৎস ছিল –
- সৌরশক্তি।
- বিদ্যুৎস্ফুরণ।
- লাভা উদগিরণ।
- কসমিক রশ্মি।
- পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরের স্তরে কোনো ওজোন আবরণ (O₃ স্তর) ছিল না ফলে UV রশ্মি, কসমিক রশ্মি সহজেই পৃথিবীপৃষ্ঠে আপতিত হত।
জীবনের জৈবরাসায়নিক উৎপত্তি সংক্রান্ত মতবাদ বলতে কী বোঝো? এই মতবাদ অনুযায়ী জীবন সৃষ্টির পর্যায়গুলি লেখো।
জীবনের জৈব রাসায়নিক উৎপত্তি সংক্রান্ত মতবাদ –
রুশ বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ওপারিন (1924) এবং ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জে.বি.এস. হ্যালডেন (1928) -এর মতে আদি পৃথিবীতে সামুদ্রিক পরিবেশে বিদ্যুৎশক্তি, সৌরবিকিরণ ও অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে সরল সাধারণ অজৈব যৌগ থেকে ক্রমান্বয়ে জটিল থেকে জটিলতর জৈব যৌগের সৃষ্টি হয়। এই সমস্ত জৈব যৌগের পলিমারাইজেশন ও কনডেনসেশনের ফলে আদিম পৃথিবীতে প্রায় 370 কোটি বা 3.7 বিলিয়ন বছর আগে প্রথম জীবন বা প্রাণ সৃষ্টি হয়। জীবরসায়ন, জীববিজ্ঞান ও ভৌগোলিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই মতবাদকে জীবনের জৈব রাসায়নিক উৎপত্তি সংক্রান্ত মতবাদ বলা হয়।
জীবনের জৈব রাসায়নিক উৎপত্তি সংক্রান্ত মতবাদ অনুযায়ী জীবন সৃষ্টির পর্যায়গুলি হল –
প্রথম পর্যায় – পৃথিবীর উৎপত্তি ও তার আদিম পরিবেশ → দ্বিতীয় পর্যায় – জীবনের রাসায়নিক উৎপত্তি বা কেমোজেনি → তৃতীয় পর্যায় – জীবনের জৈবিক বিবর্তন বা বায়োজেনি → চতুর্থ পর্যায় – প্রোক্যারিওটিক কোশের আবির্ভাব ও বিবর্তন → পঞ্চম পর্যায় – ইউক্যারিওটিক কোশের আবির্ভাব ও বিবর্তন।
হ্যালডেন ও ওপারিন -এর মতবাদ অনুযায়ী জীবনের রাসায়নিক উৎপত্তি এবং প্রাণের জৈবিক বিবর্তন সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা দাও।
বিজ্ঞানী ওপারিন ও হ্যালডেন (1930) জীবরসায়ন, জীববিজ্ঞান ও ভৌগোলিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ‘জীবনের জৈব রাসায়নিক উৎপত্তি সংক্রান্ত মতবাদ’ প্রকাশ করেন। এই মতবাদের দুটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হল – জীবনের রাসায়নিক উৎপত্তি এবং প্রাণের জৈবিক বিবর্তন।
জীবনের রাসায়নিক উৎপত্তি বা কেমোজেনি –
- সরল জৈবযৌগ সংশ্লেষ –
- পৃথিবীর তাপমাত্রা কমে 1000°C হওয়ার পর বিভিন্ন প্রকার সম্পৃক্ত ও অসম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বন গঠিত হয়।
- হাইড্রোকার্বন উত্তপ্ত জলীয়বাষ্পের সঙ্গে বিক্রিয়া করে বিভিন্ন অক্সি ও হাইড্রক্সি যৌগ সৃষ্টি করে।
- পরবর্তী ক্ষেত্রে যৌগগুলি পলিমারাইজেশনের মাধ্যমে শর্করা, ফ্যাটি অ্যাসিড, গ্লিসারল, অ্যামিনো অ্যাসিড, পিউরিন, পিরিমিডিন প্রভৃতি সরল জৈবযৌগ সংশ্লেষ করে।
- জটিল জৈবযৌগ সংশ্লেষ – সরল জৈব অণুগুলি ঘনীভবন ও পলিমারাইজেশন পদ্ধতিতে পলিস্যাকারাইড, ফ্যাট, প্রোটিন, নিউক্লিক অ্যাসিড প্রভৃতি জটিল জৈবযৌগ সৃষ্টি করে।
- কোয়াসারভেট -এর উৎপত্তি – বৃহৎ জটিল জৈব অণুগুলি আন্তঃআণবিক বল দ্বারা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কোয়াসারভেট নামক অপেক্ষাকৃত বৃহৎ কোলয়েড কণা গঠন করে।
- মাইক্রোস্ফিয়ার -এর উৎপত্তি – কোয়াসারভেট কণাগুলির মধ্যে পরবর্তী পর্যায়ে আত্মপ্রতিলিপি গঠনে সক্ষম RNA অঙ্গীভূত হয়। বিজ্ঞানী এস ডব্লু ফক্স (S.W. Fox, 1964) -এর মতে দ্বিস্তরীয় লিপিড পর্দাবৃত, বিভাজন ক্ষমতাসম্পন্ন, নির্দিষ্ট আকার ও আয়তনযুক্ত এই বৃহৎ যৌগ থেকে প্রথম প্রাণের উৎপত্তি ঘটে। তিনি একে ‘মাইক্রোস্ফিয়ার’ নামে অভিহিত করেন।

প্রাণের জৈবিক বিবর্তন বা বায়োজেনি –
- প্রোটোসেল বা আদিকোশ -এর উৎপত্তি – লিপিড-প্রোটিন পর্দাবৃত, RNA সমন্বিত প্রোটোপ্লাজমসদৃশ কোলয়েডীয় অংশ থেকে প্রথম আদি কোশ বা প্রোটোসেল বা ইওবায়োন্ট বা প্রোটোবায়োন্ট -এর উৎপত্তি ঘটে।
- DNA -এর উৎপত্তি ও প্রোক্যারিওটিক জীব সৃষ্টি – পরবর্তী পর্যায় DNA মূল প্রজননিক বস্তুরূপে আত্মপ্রকাশ করে এবং RNA প্রোটিন সংশ্লেষে নিয়োজিত হয়।
- প্রোক্যারিওটিক -এর উৎপত্তি – DNA ও RNA সমন্বিত প্রোটোসেল থেকে প্রায় 370 কোটি বা 3.7 বিলিয়ন বছর আগে মাইকোপ্লাজমা সদৃশ প্রথম প্রোক্যারিওটিক জীব সৃষ্টি হয়। এরা ছিল অবায়ুজীবী এবং কেমোহেটারোট্রফিক বা রাসায়নিক পরভোজী। পরবর্তী পর্যায়ে জৈবিক বিবর্তনের মাধ্যমে প্রথমে অবাত সালোক স্বভোজী (ব্যাকটেরিয়া) ও পরে ক্লোরোফিলযুক্ত সবাত সালোক স্বভোজী (সায়ানোব্যাকটেরিয়া বা নীলাভ-সবুজ শৈবাল) জীবের উৎপত্তি।
- ইউক্যারিওটিক জীবের আবির্ভাব – আনুমানিক 150 কোটি বা 1.5 বিলিয়ন বছর আগে প্রথম সবাত শ্বসনকারী এককোশী ইউক্যারিওটিক জীবের আবির্ভাব ঘটে। প্রায় 600 মিলিয়ন বা 60 কোটি বছর আগে পৃথিবীতে জটিল বৈচিত্র্যযুক্ত বহুকোশী জীবের আবির্ভাব ঘটে।

পৃথিবীতে প্রাণের সৃষ্টি শব্দচিত্রের মাধ্যমে লেখো।
আজ থেকে প্রায় 260 কোটি বছর আগে সমুদ্রের জলে প্রথম প্রাণের সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের ঘনীভবন ও পলিমারাইজেশানের ফলে পৃথিবীতে প্রথম জীবের উৎপত্তি ঘটে। পৃথিবীতে প্রাণ সৃষ্টির ক্রমপর্যায়গুলি নিম্নরূপ –

পৃথিবীতে অজৈব গ্যাস থেকে জৈব অণুর সৃষ্টি ঘটনাটি একটি পরীক্ষার সাহায্যে বর্ণনা করো।
অনুরূপ প্রশ্ন, উরে ও মিলার কীভাবে পরীক্ষার দ্বারা হ্যালডেন ও ওপারিনের জীবনসৃষ্টি সংক্রান্ত তত্ত্ব প্রমাণ করেন?
পৃথিবীতে জৈব গ্যাস থেকে জৈব অণুর সৃষ্টি –
মিলার ও উরের পরীক্ষা – জীবন সৃষ্টির আধুনিক মতবাদ প্রবক্তাদের মধ্যে অন্যতম সদস্যরা হলেন আলেকজান্ডার আই ওপারিন ও জে বি এস হ্যালডেন। এই দুই বিজ্ঞানী জীবনপূর্ব রাসায়নিক অভিব্যক্তি সম্পর্কে যে মতবাদ দিয়েছিলেন তা বিজ্ঞানী স্ট্যানলি মিলার (Stanley Miller) ও হ্যারল্ড উরে (Harold Urey) 1953 খ্রিস্টাব্দে একটি সুপরিকল্পিত পরীক্ষার দ্বারা প্রমাণ করেন।
রাসায়নিক সংশ্লেষের সপক্ষে বিজ্ঞানী মিলার ও উরের দেওয়া প্রমাণ – ওপারিন ও হ্যালডেন রাসায়নিক সংশ্লেষ সম্পর্কে যে অনুমান করেছিলেন তার সত্যতা প্রমাণ করার জন্য 1953 খ্রিস্টাব্দে বিজ্ঞানী স্ট্যানলি মিলার ও হ্যারল্ড উরে এক সুপরিকল্পিত পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন।
মিলার ও উরে তাঁদের পরীক্ষার জন্য একটি আবদ্ধ পাত্র ব্যবহার করেন। এই আবদ্ধ পাত্রে মিথেন (CH4), অ্যামোনিয়া (NH3) ও হাইড্রোজেন (H2) 2 : 2 : 1 অনুপাতে জলীয় বাষ্পের মধ্যে রাখেন। এরপর তাপ প্রয়োগ করে পাত্রের মধ্যে জলীয় বাষ্পের পরিচলনের ব্যবস্থা করেন। এমন ব্যবস্থায় পাত্রের মধ্যে তড়িৎস্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করেন। এরপর কয়েকদিন এইভাবে রেখে দেওয়ার পর তাঁরা লক্ষ করেন, যন্ত্রের মধ্যে কার্বন ব্যবহৃত হয়ে বেশ কতগুলি জৈব যৌগ সৃষ্টি হয়েছে।
সংগৃহীত তরল পদার্থকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, তাতে বিভিন্ন প্রকার অ্যামিনো অ্যাসিড (গ্লুটামিক অ্যাসিড, অ্যাসপারটিক অ্যাসিড, গ্লাইসিন, অ্যালানিন প্রভৃতি), জৈব অ্যাসিড (সাকসিনিক অ্যাসিড, ফরমিক অ্যাসিড, অ্যাসেটিক অ্যাসিড, প্রোপিওনিক অ্যাসিড প্রভৃতি) ও বেশ কিছু জটিল জৈব যৌগ তৈরি হয়েছে। পরবর্তীকালে তড়িৎ স্ফুলিঙ্গের পরিবর্তে তাপ ও অতিবেগুনি রশ্মি প্রয়োগ করেও উপরের পদার্থগুলি তাঁরা তৈরি করেন। তাই এই পরীক্ষা থেকে তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন, আদি পৃথিবীর বিজারক পরিবেশে বজ্রপাত, অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে জলীয় বাষ্প, মিথেন, অ্যামোনিয়া, হাইড্রোজেন প্রভৃতি গ্যাসীয় পদার্থের সাহায্যে নানা প্রকার জৈব যৌগ প্রস্তুত হয়।

জীববৈচিত্র্য বা বায়োডাইভারসিটি বলতে কী বোঝো? জীববৈচিত্র্য সৃষ্টির কারণগুলি উল্লেখ করো।
অনুরূপ প্রশ্ন, জীববৈচিত্র্য কাকে বলে? জীববৈচিত্র্যের উৎস বলতে কী বোঝো?
জীববৈচিত্র্য বা বায়োডাইভারসিটি (Biodiversity) – নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলে বসবাসকারী জীবের আকৃতি, গঠন, প্রকৃতির বিভিন্নতার ব্যাপ্তিকে জীববৈচিত্র্য বা বায়োডাইভারসিটি বলে।
জীববৈচিত্র্য সৃষ্টির কারণ –
- যৌন জনন – জনিতৃ জীব যৌন জননের মাধ্যমে নতুন বৈশিষ্ট্যযুক্ত অপত্য জীব সৃষ্টি করে। এর ফলে প্রজাতির সদস্যদের মধ্যে বৈচিত্র্য সৃষ্টি হয়।
- মিউটেশন বা পরিব্যক্তি – বিজ্ঞানী হুগো দ্য ভ্রিস (1901) -এর মতে জিনের হঠাৎ পরিবর্তন যেটি স্থায়ী এবং বংশপরম্পরায় সঞ্চারণক্ষম সেটি জীববৈচিত্র্যের একটি প্রধান কারণ। একে মিউটেশন বা পরিব্যক্তি বলে।
- প্রকরণ বা ভেদ বা ভ্যারিয়েশন – পৃথিবীতে জীববৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল জিনগত প্রকরণ। এটি মিউটেশনের ফলে সৃষ্টি হয়।
- বিচ্ছিন্নতা – একই প্রজাতির অন্তর্গত সদস্যরা ভৌগোলিক বা জননগত কারণে পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন প্রজাতির জীব সৃষ্টি করে, ফলে জীববৈচিত্র্যের ব্যাপ্তি ঘটে।
- প্রাকৃতিক নির্বাচন – বিজ্ঞানী ডারউইন -এর মতে পরিবর্তিত পরিবেশে কেবলমাত্র অনুকূল প্রকরণযুক্ত জীবরাই বেঁচে থাকার সুযোগ পায় এবং সফলভাবে অভিযোজিত হয়। একে প্রাকৃতিক নির্বাচন বলে। এর ফলে নতুন জীবপ্রজাতি সৃষ্টি হয় এবং জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধি পায়।

আজকের এই আর্টিকেলে আমরা নবম শ্রেণীর জীবন বিজ্ঞানের প্রথম অধ্যায় ‘জীবন ও তার বৈচিত্র্য’ -এর অন্তর্গত ‘জীবনের প্রধান/মূল বৈশিষ্ট্য’ অংশের রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলো নবম শ্রেণীর পরীক্ষা এবং যারা ভবিষ্যতে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেবেন, তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আশা করি, আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে আসবে। যদি কোনো প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থাকে, তবে আমাদের টেলিগ্রামে যোগাযোগ করতে পারেন; আমরা উত্তর দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। এছাড়া, লেখাটি প্রয়োজনীয় মনে হলে আপনার বন্ধু বা সহপাঠীদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ।





মন্তব্য করুন