নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – জীবন সংগঠনের স্তর – কোশ – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

Rahul

এই আর্টিকলে আমরা নবম শ্রেণীর জীবন বিজ্ঞানের দ্বিতীয় অধ্যায় ‘জীবন সংগঠনের স্তর’ -এর অন্তর্গত ‘কোশ’ অংশের গুরুত্বপূর্ণ রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করব। পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) -এর সিলেবাস অনুযায়ী আসন্ন ইউনিট টেস্ট বা স্কুল পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এই প্রশ্নগুলো অত্যন্ত জরুরি।

কোশ – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর
কোশ – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর
Contents Show

কোশ (Cell) কাকে বলে? কোশকে জীবের গঠনগত ও কার্যগত একক বলা হয় কেন? কোশের প্রকারভেদগুলি উল্লেখ করো।

কোশ (Cell) – সজীব পর্দাবৃত প্রোটোপ্লাজম সমন্বিত যে ক্ষুদ্রতম অংশ অনুকূল পরিবেশে স্বপ্রজননক্ষম ও আত্মনির্ভরশীল এবং জীবনের প্রাথমিক গঠনগত ও কার্যগত এককরূপে কাজ করে, তাকে কোশ বলে।

কোশকে জীবের গঠনগত ও কার্যগত একক বলা হয়, কারণ –

  1. প্রতিটি জীবদেহই এক বা একাধিক কোশ দ্বারা গঠিত। সুতরাং, কোশ হল জীবের গঠনগত একক (Structural unit)।
  2. প্রতিটি কোশ একটি নির্দিষ্ট গঠন ও আকৃতিযুক্ত হয় এবং নির্দিষ্ট কিছু কাজে নিযুক্ত থাকে। কোশের পর্দাসমন্বিত ও সাইটোপ্লাজমীয় অঙ্গাণুযুক্ত সংগঠন জীবনের মৌলিক কাজগুলি (যেমন – শ্বসন, পুষ্টি, প্রোটিন সংশ্লেষ, বৃদ্ধি প্রভৃতি) সম্পন্ন করে। এই কারণে কোশকে জীবনের কার্যগত একক (Functional unit) বলে।

কোশের প্রকারভেদ – গঠনের ভিত্তিতে কোশকে প্রধানত দুভাগে ভাগ করা হয়। যথা –

  1. প্রোক্যারিওটিক কোশ ও
  2. ইউক্যারিওটিক কোশ।

কোশবাদ বা কোশতন্তু কাকে বলে?

কোশবাদ (Cell Theory) – জার্মান উদ্ভিদবিদ ম্যাথিয়াস জে স্নেইডেন (Mathias J Schleiden, 1838) প্রস্তাব করেন সমস্ত উদ্ভিদদেহ কোশ দ্বারা গঠিত এবং জার্মান প্রাণীবিদ থিওডোর সোয়ান (Theodar Schwann, 1839) প্রকাশ করেন সমস্ত প্রাণীদেহও কোশ দ্বারা গঠিত। কোশ সংক্রান্ত তাৎপর্যপূর্ণ মতামতগুলিকে একত্রিত করে যে মতবাদ প্রকাশ করা হয়, তাকে কোশবাদ বা কোশতন্তু বা Cell Theory বলে। বিজ্ঞানী স্লেইডেন এবং সোয়ান কে বলা হয় ‘কোশবাদের জনক’ (Father of Cell Theory)।

কোশবাদের মূল বক্তব্য –

  1. প্রতিটি জীবের দেহ এক বা একাধিক কোশ দ্বারা গঠিত।
  2. কোশ হল জীবনের গঠনগত ও কার্যগত একক।
  3. প্রতিটি কোশ সজীব পর্দাবৃত এবং প্রোটোপ্লাজম সমন্বিত।
  4. প্রতিটি জীবের উৎপত্তি ঘটে একটি নির্দিষ্ট কোশ থেকে।

কোশবাদের অসম্পূর্ণতা –

  1. জীবজগতের সকল কোশ আদর্শ নিউক্লিয়াসযুক্ত হয় না।
  2. কোশবাদের মাধ্যমে কোশীয় বিভিন্ন অংশের বর্ণনা করা সম্ভব হয় না।

প্রোক্যারিওটিক কোশ কাকে বলে? এই প্রকার কোশের বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো।

প্রোক্যারিওটিক কোশ (Prokaryotic Cell; Pro = আদি, Karyon = নিউক্লিয়াস) – যেসব কোশে আদর্শ নিউক্লিয়াস থাকে না অর্থাৎ, নিউক্লিয়াসে নিউক্লিয়পর্দা, নিউক্লিওলাস ও নিউক্লিয় জালিকা থাকে না এবং কোশে কোনো পর্দাঘেরা কোশঅঙ্গাণু থাকে না, ক্রোমোজোম গঠিত হয় না, তাদের আদিকোশ বা প্রোক্যারিওটিক কোশ বলে। যেমন – ব্যাকটেরিয়া (রাইজোবিয়াম, ই.কোলাই), নীলাভ-সবুজ শৈবাল (নস্টক, অ্যানাবিনা), মাইকোপ্লাজমা ইত্যাদি।

প্রোক্যারিওটিক কোশের বৈশিষ্ট্য –

  1. কোশের আয়তন – প্রোক্যারিওটিক কোশগুলি আকারে অতি ক্ষুদ্র হয়, যেমন – মাইকোপ্লাজমা (0.1–0.25 µm ব্যাসযুক্ত)।
  2. কোশ আবরক – ব্যাকটেরিয়া ও সায়ানোব্যাকটেরিয়ার কোশের বাইরে কোশপ্রাচীর বর্তমান। মাইকোপ্লাজমা কোশপ্রাচীরবিহীন হয়। কোশপ্রাচীরের মুখ্য উপাদান হল মিউকোপেপটাইড বা পেপটাইডোগ্লাইকান। কোশপ্রাচীরের ভিতরে প্রোটোপ্লাজমের বাইরে কোশপর্দা উপস্থিত।
  3. নিউক্লিওয়েড – নিউক্লিয়াসে নিউক্লিয়পর্দা, নিউক্লিওলাস, নিউক্লিওপ্লাজম ও নিউক্লিয়জালিকা থাকে না। সাইটোপ্লাজমে হিস্টোন প্রোটিনবিহীন নগ্ন দ্বিতন্ত্রী চক্রাকার DNA অণুকে নিউক্লিওয়েড (Nucleoid) বা জেনোফোর (Xenophore) বলে। এদের নিউক্লিয় জালিকা না থাকায় ক্রোমোজোম গঠিত হয় না।
  4. পর্দাবৃত কোশীয় অঙ্গাণু – কোশে পর্দাবৃত কোশীয় অঙ্গাণু যেমন – মাইটোকনড্রিয়া, প্লাস্টিড, গলগি বডি প্রভৃতি থাকে না।
  5. রাইবোজোম – কোশে পর্দাবিহীন 70S প্রকৃতির রাইবোজোম বর্তমান। রাইবোজোমগুলি সাইটোপ্লাজমে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ানো থাকে।
  6. মেসোজোম – কিছু কিছু ব্যাকটেরিয়াতে কোশপর্দা কোশের ভিতরের দিকে ভাঁজ হয়ে গিয়ে মেসোজোম নামক কুণ্ডলিত থলির মতো গঠন তৈরি করে।
  7. সালোকসংশ্লেষকারী থাইলাকয়েড – ব্যাকটেরিওক্লোরোফিলযুক্ত, চ্যাপটা থলির মতো থাইলাকয়েড বর্তমান।
  8. ফ্ল্যাজেলা ও পিলি – কিছু কিছু ব্যাকটেরিয়াতে দেহকোশের বাইরে গমন অঙ্গ হিসেবে ফ্ল্যাজেলা ও যৌন জননে সাহায্যকারী অঙ্গ পিলি উপস্থিত থাকে।
প্রোক্যারিওটিক কোশ

ইউক্যারিওটিক কোশ কাকে বলে? এই প্রকারের কোশের বৈশিষ্ট্যগুলি উল্লেখ করো।

ইউক্যারিওটিক কোশ (Eukaryotic Cell; Eu = আদর্শ, karyon = নিউক্লিয়াস) – নিউক্লিয়পর্দা, নিউক্লিওলাস ও নিউক্লিয়জালিকা দ্বারা নির্মিত সুগঠিত নিউক্লিয়াসযুক্ত এবং অপেক্ষাকৃত জটিল গঠনের যে কোশগুলিতে পর্দাঘেরা কোশঅঙ্গাণু (যেমন – মাইটোকনড্রিয়া, প্লাস্টিড ইত্যাদি) উপস্থিত থাকে, সেই কোশগুলিকে ইউক্যারিওটিক কোশ বা আদর্শ কোশ বলে। যেমন – অ্যামিবা, ইউগ্নিনা প্রভৃতি এককোশী জীব এবং সমস্ত ছত্রাক, উদ্ভিদ ও প্রাণী দেহকোশ।

ইউক্যারিওটিক কোশের বৈশিষ্ট্য –

  1. কোশের আয়তন – প্রোক্যারিওটিকের তুলনায় বড়ো। কোশের আয়তন প্রায় 5–100 µm হয়।
  2. কোশ আবরক – সালোকসংশ্লেষকারী প্রোটিস্টা (ব্যতিক্রম – ইউগ্নিনা), ছত্রাক, উদ্ভিদকোশে কোশপ্রাচীর ও কোশপর্দা উভয়ই বর্তমান এবং প্রোটোজোয়ান প্রোটিস্টা ও প্রাণীকোশে কেবলমাত্র কোশপর্দা বর্তমান। কোশপ্রাচীরের মুখ্য উপাদানগুলি হল – সেলুলোজ, হেমিসেলুলোজ, লিগনিন ও সুবেরিন ইত্যাদি।
  3. নিউক্লিয়াস – নিউক্লিয়পর্দা, নিউক্লিয়জালিকা, নিউক্লিওপ্লাজম ও নিউক্লিওলাস সমন্বিত সুগঠিত নিউক্লিয়াস বর্তমান।
  4. পর্দাবৃত কোশীয় অঙ্গাণু – গলগি বডি, ER, মাইটোকনড্রিয়া, প্লাস্টিড (উদ্ভিদকোশ) প্রভৃতি পর্দাবৃত কোশীয় অঙ্গাণু উপস্থিত থাকে।
  5. পর্দাবিহীন কোশীয় অঙ্গাণু – 80S প্রকৃতির রাইবোজোম, সেন্ট্রোজোম (প্রাণীকোশ) প্রভৃতি পর্দাবিহীন কোশীয় অঙ্গাণু উপস্থিত থাকে। রাইবোজোমগুলি এন্ডোপ্লাজমীয় জালিকা ও নিউক্লিয়পর্দার গায়ে অথবা সাইটোপ্লাজমে অবস্থান করে।
  6. ফ্ল্যাজেলা ও সিলিয়া – কিছু কিছু প্রাণীকোশের বাইরে বেশি দৈর্ঘ্যযুক্ত ফ্ল্যাজেলা বা কম দৈর্ঘ্যযুক্ত সিলিয়া উপস্থিত থাকে।

একটি প্রাণীকোশের (Animal Cell) গঠন চিত্রসহ বর্ণনা করো।

প্রাণীকোশ প্রধানত দুটি অংশ নিয়ে গঠিত –

  • কোশপর্দা।
  • প্রোটোপ্লাজম।

কোশপর্দা –

প্রাণীকোশে প্রোটোপ্লাজমের বাইরের দিকে কোশপর্দা থাকে। এটি অর্ধভেদ্য, স্থিতিস্থাপক, সজীব প্রোটিন-লিপিড-প্রোটিন ত্রিস্তরীয় একক পর্দা দ্বারা গঠিত।

কাজ – কোশের আকৃতি প্রদান, প্রোটোপ্লাজমকে রক্ষা করা, পিনোসাইটোসিস ও ফ্যাগোসাইটোসিস পদ্ধতিতে তরল ও কঠিন বস্তু গ্রহণ করা।

প্রোটোপ্লাজম –

কোশমধ্যস্থ সম্পূর্ণ সজীব অংশ হল প্রোটোপ্লাজম। এটি দুটি অংশ নিয়ে গঠিত –

  • নিউক্লিয়াস।
  • সাইটোপ্লাজম।

নিউক্লিয়াস –

প্রোটোপ্লাজমের মধ্যে সবচেয়ে ঘন, প্রায় গোলাকার ও পর্দাবৃত অংশকে নিউক্লিয়াস বলে। প্রাণীদের ক্ষেত্রে বহু নিউক্লিয়াসযুক্ত কোশকে সিনসাইটিয়াম বলে। নিউক্লিয়াসের চারটি অংশ – নিউক্লিয় পর্দা, নিউক্লিয় রস বা নিউক্লিওপ্লাজম, নিউক্লিয় জালিকা এবং নিউক্লিওলাস নিয়ে গঠিত।

কাজ – নিউক্লিয়াস প্রোটোপ্লাজমের সবরকমের জীবজ ক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে, তাই একে ‘কোশের মস্তিষ্ক’ বলা হয়। নিউক্লিয়াসের মধ্যে থাকে ক্রোমোজোম, তার মধ্যে থাকে DNA (ডি-অক্সিরাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড)। এই DNA বংশগত বৈশিষ্ট্যগুলিকে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে বহন করে।

সাইটোপ্লাজম –

নিউক্লিয়াস বাদে প্রোটোপ্লাজমের বাকি বর্ণহীন, জেলির মতো অর্ধস্বচ্ছ, চটচটে তরলকে সাইটোপ্লাজম বলে। এর মধ্যেই কোশীয় অঙ্গাণু, ভ্যাকুওল ও অজীবীয় বস্তু থাকে।

কাজ – নিউক্লিয়াস, কোশ অঙ্গাণু ইত্যাদির ধাত্র হিসেবে কাজ করে। সাইটোপ্লাজমের মধ্যে যেসব কোশ অঙ্গাণু ও নির্জীব বস্তু থাকে সেগুলি হল –

  1. সেন্ট্রোজোম – সেন্ট্রোজোম শুধুমাত্র প্রাণীকোশে থাকে। এটি নিউক্লিয়াসের কাছে অবস্থিত। এটি দুটি সেন্ট্রিওল, সেন্ট্রোস্ফিয়ার নিয়ে গঠিত। দুটি সেন্ট্রিওলকে একসঙ্গে ডিপ্লোজোম বলে।
    • কাজ – প্রধান কাজ হল কোশ বিভাজনের সময় বেমতন্তু গঠনে সাহায্য করা। শুক্রাণুর পুচ্ছ গঠন করা। সিলিয়া ও ফ্ল্যাজেলা উৎপন্ন করা।
  2. মাইটোকনড্রিয়া – সাইটোপ্লাজমে বিক্ষিপ্তভাবে অবস্থিত দ্বি-একক পর্দাবেষ্টিত ছোটো ছোটো গোলাকার, দণ্ডাকার বা ডিম্বাকার কোশীয় অঙ্গাণু হল মাইটোকনড্রিয়া।
    • কাজ – এর প্রধান কাজ হল কোশের শ্বসনে সহায়তা করা এবং ATP অণু সংশ্লেষ করা।
  3. গলগি বডি – নিউক্লিয়াসের কাছে অবস্থিত একক পর্দাবেষ্টিত চ্যাপটা থলির মতো এবং ক্ষুদ্র গহ্বরের মতো অঙ্গাণু হল গলগি বডি।
    • কাজ – কোশের ক্ষরণকার্যে অংশগ্রহণ করে। শুক্রাণুর অ্যাক্রোজোম (টুপির ন্যায় আবরণ) গঠনে সাহায্য করে।
  4. রাইবোজোম – পর্দাবিহীন, গোলাকার দানার ন্যায় অঙ্গাণু যা নিউক্লিওপ্লাজম, সাইটোপ্লাজম বা এন্ডোপ্লাজমীয় জালিকার গায়ে বিন্যস্ত থাকে। এটি প্রোটিন ও RNA দ্বারা গঠিত।
    • কাজ – প্রধানত প্রোটিন সংশ্লেষে সাহায্য করে। তাই একে ‘প্রোটিন ফ্যাক্টরি’ বলে।
  5. এন্ডোপ্লাজমীয় জালিকা – সাইটোপ্লাজমে অবস্থিত নলাকার অঙ্গাণু যা সাইটোপ্লাজমকে অনিয়মিত কিছু প্রকোষ্ঠে বিভক্ত করে। এগুলি একক পর্দাবেষ্টিত। এটি দু-রকম হয় – দানাদার ও দানাবিহীন।
    • কাজ – কোশীয় অঙ্গাণু সৃষ্টি করে এবং সাইটোপ্লাজমের বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলিকে পৃথক রাখে।
  6. লাইসোজোম – সাইটোপ্লাজমে উপস্থিত পর্দাবেষ্টিত, গোলাকার থলির মতো অঙ্গাণু। এর মধ্যে একাধিক উৎসেচক এবং বিভিন্ন রকমের কণিকা থাকে।
    • কাজ – কোশের মধ্যেকার রোগগ্রস্ত অঙ্গাণুগুলি লাইসোজোম নিঃসৃত উৎসেচকের প্রভাবে পাচিত হয়, ফলে কোশের মৃত্যু ঘটে। কখনো-কখনো এই উৎসেচকের ক্রিয়ায় লাইসোজোম নিজেও পাচিত হয়। তাই একে ‘আত্মঘাতী থলি’ বলা হয়।
  7. কোশগহ্বর বা ভ্যাকুওল – প্রাণীকোশে ভ্যাকুওল ক্ষুদ্রাকার। ভ্যাকুওলের চারপাশে প্রোটোপ্লাজমের যে বিন্যাস থাকে, তাকে প্রাইমরডিয়াল ইউট্রিকল (Primordial Utricle) বলে।
    • কাজ – প্রাণীকোশের সংকোচী গহ্বর ও রেচন গহ্বর রেচন পদার্থ অপসারণে সাহায্য করে।
  8. নির্জীব বস্তু – প্রাণীকোশের সাইটোপ্লাজমে একাধিক নির্জীব বস্তু একত্রে অবস্থান করে। এদের মেটাপ্লাস্টিক বডিস (Metaplastic Bodies) বলে।
    • কাজ – গ্লাইকোজেন দানা, জাইমোজেন দানারূপে খাদ্য সঞ্চয় করে।
আদর্শ প্রাণীকোশের গঠন

চিত্রসহ একটি উদ্ভিদকোশের (Plant Cell) গঠন বর্ণনা করো।

উদ্ভিদকোশের প্রধানত দুটি অংশ –

  • কোশপ্রাচীর।
  • প্রোটোপ্লাজম।

এ ছাড়া কোশপ্রাচীর ও প্রোটোপ্লাজমের মধ্যে একটি সজীব কোশপর্দা থাকে।

কোশপ্রাচীর –

উদ্ভিদকোশের কোশপ্রাচীর জড়, স্থিতিস্থাপক, ভেদ্য ও পুরু। এটি মুখ্য প্রাচীর, গৌণ প্রাচীর ও মধ্যচ্ছদা নিয়ে গঠিত। কোশপ্রাচীরের মূল উপাদান হল সেলুলোজ।

কাজ – কোশের আকৃতি প্রদান, যান্ত্রিক শক্তি প্রদান ও কোশমধ্যস্থ সজীব অংশকে রক্ষা করা।

কাশপর্দা –

কোশের কোশপ্রাচীরের ভিতরে প্রোটোপ্লাজমকে ঘিরে কোশপর্দা থাকে। এটি অর্ধভেদ্য, সজীব, প্রোটিন-লিপিড-প্রোটিন (P-L-P) ত্রিস্তরীয় একক পর্দা।

কাজ – কোশকে আকৃতি প্রদান, প্রোটোপ্লাজমকে রক্ষা করা, পিনোসাইটোসিস ও ফ্যাগোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করা হল এর প্রধান কাজ।

প্রোটোপ্লাজম –

কোশমধ্যস্থ সম্পূর্ণ সজীব অংশ হল প্রোটোপ্লাজম। এই অংশ নিউক্লিয়াস ও সাইটোপ্লাজম নিয়ে গঠিত।

নিউক্লিয়াস –

কোশের প্রোটোপ্লাজমের সবচেয়ে ঘন, প্রায় গোলাকার ও দ্বি-একক পর্দাবেষ্টিত অংশ। এটি চারটি অংশ নিয়ে গঠিত – নিউক্লিয়পর্দা, নিউক্লিয়জালিকা, নিউক্লিওপ্লাজম ও নিউক্লিওলাস।

কাজ – কোশের যাবতীয় জীবজ ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। এই কারণে একে ‘কোশের মস্তিষ্ক’ (Brain of Cell) বলা হয়।

সাইটোপ্লাজম –

নিউক্লিয়াস ও কোশ অঙ্গাণু ছাড়া প্রোটোপ্লাজমের বাকি বর্ণহীন, জেলির মতো চটচটে, অর্ধস্বচ্ছ, সজীব অংশ হল সাইটোপ্লাজম। এর দুটি অংশ – এক্টোপ্লাজম ও এন্ডোপ্লাজম। সাইটোপ্লাজমের মধ্যেই কোশ অঙ্গাণু ও নির্জীব বস্তু থাকে।

কাজ – কোশীয় অঙ্গাণুকে ধরে রাখে এবং বিভিন্ন বিপাকীয় ক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে।

সাইটোপ্লাজমের মধ্যে যেসব কোশ অঙ্গাণু ও নির্জীব বস্তু থাকে সেগুলি হল –

  1. প্লাস্টিড – ছত্রাক ছাড়া প্রায় সবরকমের উদ্ভিদকোশের সাইটোপ্লাজমে এটি দেখা যায়। প্লাস্টিড দ্বি-একক পর্দাবেষ্টিত, গোলাকার, উপবৃত্তাকার, তারকাকার, অথবা ফিতের মতো। প্রধানত তিন ধরনের প্লাস্টিড দেখা যায়, ক্লোরোপ্লাস্টিড (সবুজ বর্ণযুক্ত), ক্রোমোপ্লাস্টিড হলুদ, কমলা, লাল, বাদামি বর্ণযুক্ত) ও লিউকোপ্লাস্টিড (বর্ণহীন)।
    • কাজ – সালোকসংশ্লেষে সাহায্য করা, পরাগসংযোগে সাহায্য করা এবং খাদ্য সঞ্চয়ে সাহায্য করা।
  2. মাইটোকনড্রিয়া – সাইটোপ্লাজমে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকা দ্বি-একক পর্দাবেষ্টিত, ছোটো ছোটো গোলাকার, ডিম্বাকার বা দন্ডাকার কাশ অঙ্গাণুগুলি হল মাইটোকনড্রিয়া।
    • কাজ – ATP (অ্যাডিনোসিন ট্রাইফসফেট) অণু সংশ্লেষের মাধ্যমে শক্তি উৎপন্ন করা। কোশের শ্বসনে সাহায্য করা।
  3. গলগি বডি – সাইটোপ্লাজমের নিউক্লিয়াসের কাছে একক পর্দাবেষ্টিত চ্যাপটা থলির মতো ও ছোটো গহ্বরের মতো অঙ্গাণু হল গলগি বডি। উদ্ভিদকোশের গলগি বডিকে ডিকটিওজোম বলা হয়।
    • কাজ – কোশের ক্ষরণ কাজে অংশগ্রহণ করা।
  4. রাইবোজোম – এন্ডোপ্লাজমীয় জালিকার গায়ে, কোশের নিউক্লিওপ্লাজমে, সাইটোপ্লাজমে অবস্থিত RNA (রাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড) প্রোটিন দ্বারা গঠিত দানার মতো অঙ্গাণু হল রাইবোজোম। রাইবোজোম পর্দাবিহীন।
    • কাজ – এর প্রধান কাজ হল প্রোটিন সংশ্লেষে সাহায্য করা।
  5. এন্ডোপ্লাজমীয় জালিকা – একক পর্দাবিশিষ্ট, নলাকার কোশীয় অঙ্গাণু যা সাইটোপ্লাজমকে অনেকগুলি অনিয়মিত প্রকোষ্ঠে ভাগ করে, তাকে এন্ডোপ্লাজমীয় জালিকা বলে। এরা সিস্টারনি, ভেসিক্স ও টিউবিউল নিয়ে গঠিত।
    • কাজ – সাইটোপ্লাজমের কাঠামো গঠন করা। মাইটোকনড্রিয়া, গলগি বডি প্রভৃতি কোশ অঙ্গাণু সৃষ্টি করা।
  6. কোশগহ্বর – কোশের সাইটোপ্লাজমে অবস্থিত ফাঁকা স্থান হল কোশগহ্বর বা ভ্যাকুওল। এটি সাইটোপ্লাজমবিহীন। পরিণত উদ্ভিদকোশে একটি বা দুটি বড়ো আকারের ভ্যাকুওল থাকে।
    • কাজ – কোশান্তর অভিস্রবণে সাহায্য করে।
  7. নির্জীব বস্তু – উদ্ভিদকোশের সাইটোপ্লাজমে যেসব জড় বস্তুগুলি বিক্ষিপ্তভাবে থাকে, তা হল নির্জীব বস্তু। এগুলি প্রধানত তিন প্রকারের হয় – সঞ্চিত পদার্থ, ক্ষরিত পদার্থ এবং বর্জ্যপদার্থ।
    • কাজ – শ্বেতসার, গ্লাইকোজেন, নেকটার (ফুলের মিষ্টি রস), বর্জ্যপদার্থ ইত্যাদি সঞ্চয় করা।
একটি উদ্ভিদকোশের চিহ্নিত চিত্র

কোশপ্রাচীর কাকে বলে? কোশপ্রাচীরের গঠন বর্ণনা করো।

কোশপ্রাচীর (Cell Wall) – ব্যাকটেরিয়া এবং আদর্শ উদ্ভিদ কোশের কোশপর্দার বাইরে সেলুলোজ নির্মিত যে পুরু, দৃঢ়, ভেদ্য, স্থিতিস্থাপক জড় আবরণ থাকে, তাকে কোশপ্রাচীর বলে।

কোশপ্রাচীরের গঠন –

উদ্ভিদের দেহে পরিণত কোশপ্রাচীর মুখ্যত তিনটি স্তর দ্বারা গঠিত হয়। যথা –

  1. মধ্যচ্ছদা (Middle lamella) – দুটি সংলগ্ন উদ্ভিদকোশের মাঝে কোশপ্রাচীরের যে সাধারণ স্তরটি থাকে, তাকে মধ্যচ্ছদা বলে। এটি স্থিতিস্থাপক, কোলয়েড জাতীয় এবং ক্যালশিয়াম পেকটেট, ম্যাগনেশিয়াম পেকটেট ও অল্প প্রোটিন দ্বারা গঠিত হয়।
  2. প্রাথমিক কোশপ্রাচীর বা মুখ্য কোশপ্রাচীর (Primary Cell Wall) – মধ্যচ্ছদার নীচে সেলুলোজ, হেমিসেলুলোজ, সুবেরিন, লিগনিন দ্বারা নির্মিত 1-3 µm পুরু, ভেদ্য ও স্থিতিস্থাপক যে কোশপ্রাচীরের স্তরটি অবস্থান করে, তাকে প্রাথমিক কোশপ্রাচীর বলে। এটি তুলনামূলকভাবে পাতলা ও নরম হয়।
  3. গৌণ কোশপ্রাচীর (Secondary Cell Wall) – বিশেষ কিছু উদ্ভিদের কোশে প্রাথমিক কোশপ্রাচীর ও কোশপর্দার মধ্যে অবস্থিত সেলুলোজ, হেমিসেলুলোজ, লিগনিন ও সুবেরিন নির্মিত যে 5-10 µm পুরু, স্থিতিস্থাপক, দৃঢ় ভেদ্য স্তরটি থাকে, তাকে গৌণ কোশপ্রাচীর বলে। কোশপ্রাচীরগুলিতে অনেক কূপ বা পিট (Pit) থাকে, যেগুলির দ্বারা পাশাপাশি অবস্থিত কোশগুলির মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে।
কোশপ্রাচীরের ভৌত গঠন

ব্যক্তবীজী উদ্ভিদের জাইলেম কলাস্থিত ট্র্যাকিডে কোন উপাদান দিয়ে গঠিত প্রগৌণ কোশপ্রাচীর (Tertiary Cell Wall) দেখা যায়?

ব্যক্তবীজী উদ্ভিদে জাইলেম কলাস্থিত ট্র্যাকিডে সেলুলোজ, মাইক্রোফাইব্রিলস ও জাইলান নির্মিত প্রগৌণ কোশপ্রাচীর (Tertiary Cell Wall) দেখা যায়।

কোশপ্রাচীরের কাজগুলি লেখো।

কোশপ্রাচীরের কাজগুলি হল –

  1. কোশের আকৃতি প্রদান – উদ্ভিদকোশকে নির্দিষ্ট আকৃতি প্রদান করে। যেমন – গোলাকার, ডিম্বাকার, বহুভুজাকার, ফিতাকৃতি প্রভৃতি।
  2. যান্ত্রিক দৃঢ়তা প্রদান – কোশপ্রাচীর পুরু ও দৃঢ় হওয়ায় কোশকে যান্ত্রিক দৃঢ়তা প্রদান করে। বাহ্যিক আঘাতের হাত থেকে প্রোটোপ্লাজমকে রক্ষা করে।
  3. কোশীয় সংযোগ স্থাপন – প্লাজমোডেসমাটার মাধ্যমে সন্নিহিত কোশগুলির মধ্যে সংযোগ স্থাপিত হয়।
  4. কোশীয় পদার্থের আদানপ্রদান – কোশপ্রাচীর ভেদ্য প্রকৃতির হওয়ায় সমস্ত পদার্থকে কোশের ভিতরে ও কোশের বাইরে যেতে সাহায্য করে।
  5. বাষ্পমোচন প্রতিরোধ – কিউটিন, সুবেরিন প্রভৃতি ফ্যাটজাতীয় পদার্থের উপস্থিতির জন্য কোশপ্রাচীর বাষ্পমোচন রোধ করে।

ছত্রাকের কোষপ্রাচীর কোন পদার্থ দ্বারা নির্মিত, এবং ব্যাকটেরিয়ার কোষপ্রাচীর কী দ্বারা গঠিত?

ছত্রাকের কোশপ্রাচীর কাইটিন নির্মিত এবং ব্যাকটেরিয়ার কোশপ্রাচীর পেপটাইডোগ্লাইকান নির্মিত হয়।

কোশপর্দা কাকে বলে? কোশপর্দার সাংগঠনিক উপাদানগুলির নাম লেখো।

কোশপর্দা বা প্লাজমাপর্দা (Cell Membrane or Plas-malemma or Plasma membrane) – প্রতিটি সজীব কোশের প্রোটোপ্লাজম বাইরের দিক থেকে পাতলা, সূক্ষ্ম, স্থিতিস্থাপক, প্রভেদক ভেদ্য ও ত্রিস্তরীয় লাইপোপ্রোটিন নির্মিত যে সজীব আবরণ দ্বারা আবৃত থাকে, তাকে কোশপর্দা বলে। বিজ্ঞানী নাগেলি ও ক্রামার কোশপর্দা আবিষ্কার ও নামকরণ করেন। পরবর্তীকালে প্লেয়ি এর নামকরণ করেন প্লাজমালেমা।

কোশপর্দার সাংগঠনিক উপাদানসমূহ –

  1. লিপিড – লিপিডের প্রায় 55-75% হল ফসফোলিপিড এবং 25-32% হল কোলেস্টেরল।
  2. প্রোটিন –
    • ফসফোলিপিড স্তরের বাইরের দিকে বহিস্থ প্রোটিন স্তর এবং কোশের ভিতরের দিকে অন্তঃস্থ প্রোটিন স্তর বর্তমান।
    • বহিস্থ প্রোটিনগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল স্পেকট্রিন (RBC), অ্যাসিটাইল কোলিন এস্টারেজ (নিউরোন), ATPase (মাইটোকনড্রিয়া) প্রভৃতি।
    • অন্তঃস্থ প্রোটিনগুলি হল সাইটোক্রোম অক্সিডেজ (মাইটোকনড্রিয়াল পর্দা), রোডোপসিন (রড কোশ) প্রভৃতি।
  3. কার্বোহাইড্রেট – কোশপর্দার প্রায় 5% হল কার্বোহাইড্রেট। যেমন – হেক্সোজ, ফিউকোজ, সিয়ালিক অ্যাসিড প্রভৃতি।
কোশপর্দার ভৌত গঠন

ডেনিয়েলি ও ড্যাভসন -এর 1935 সালের মডেল অনুযায়ী প্লাজমা পর্দার গঠন কীরূপ?

1935 খ্রিস্টাব্দে ডেনিয়েলি ও ড্যাভসন -এর প্রস্তাবিত মডেল অনুসারে প্লাজমা পর্দা প্রোটিন-লিপিড প্রোটিন দ্বারা গঠিত একটি ত্রিস্তরীয় গঠন, যেখানে দুটি প্রোটিনের অণুস্তরের মাঝে লিপিড অণুস্তরটি সজ্জিত থাকে। এই লিপিড অণুর জলবিদ্বেষী হাইড্রোফোবিক লেজ এবং জলাকর্ষী হাইড্রোফিলিক মস্তক থাকে।

কোশপর্দার গঠন সম্পর্কে বিভিন্ন বিজ্ঞানীদের মতবাদগুলো লেখো।

কোশপর্দার গঠন সম্পর্কে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিজ্ঞানী মতামত দিয়েছেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল –

রবার্টসনের একক পর্দা মাডল (Robertson’s Unit Membrane Model, 1959) –

  1. বিজ্ঞানী রবার্টসনের মতে জীবজগতে উপস্থিত সমস্ত সজীব পর্দাই তিনটি স্তরযুক্ত (প্রোটিন-লিপিড-প্রোটিন; P-L-P) হয়। এজন্য একে ‘এককপর্দা’ রূপে গণ্য করা হয়।
  2. এই মডেল অনুযায়ী লিপিড স্তরটি বহিস্থ দুটি পুরু প্রোটিনস্তরের মাঝখানে স্যান্ডউইচের (Sandwiched) মতো অবস্থান করে।
  3. একটি প্রোটিন স্তর মিউকোপ্রোটিন এবং অপর প্রোটিন স্তরটি ননমিউকোপ্রোটিন দ্বারা গঠিত হয়।
  4. একক পর্দা গড়ে 75Å চওড়া হয়, যার মধ্যে বহিস্থ প্রোটিন স্তরদুটি 20Å করে (20Å + 20Å) এবং অন্তর্বর্তী লিপিড স্তরটি 35Å পুরু হয়।
রবার্টসনের এককপর্দা মডেল

সিঙ্গার ও নিকলসন -এর তরল মোজেইক মডেল (Fluid Mosaic Model of Singer and Nicholson 1972) –

  1. কোশপর্দার তরল মোজেইক গঠনে প্রোটিন অণুগুলি লিপিড সমুদ্রের মধ্যে ভাসমান বরফের মতো উপস্থিত থাকে (Protein icebergs in a sea of lipids)।
  2. লিপিড অবিচ্ছিন্নভাবে একটি দ্বিস্তরীয় স্তর গঠন করে। এটি ফসফোলিপিড (অ্যাম্ফিফ্যাটিক অণু) দ্বারা গঠিত।
  3. প্রতিটি ফসফোলিপিড অণু দুটি প্রান্ত-বিশিষ্ট হয় – জলাকর্ষী মস্তক অংশ (হাইড্রোফিলিক হেড) এবং জলবিকর্ষী পুচ্ছ অংশ (হাইড্রোফোবিক টেল)।
  4. প্রোটিন অণুগুলি গ্লোবিউলার প্রকৃতির এবং দুধরনের হয় – বহিস্থ প্রোটিন ও অন্তঃস্থ প্রোটিন।
  5. বহিস্থ প্রোটিন অণুগুলি (যেমন – স্পেকট্রিন) লিপিড অণুর পোলার প্রান্তের সঙ্গে অথবা অন্তঃস্থ প্রোটিনের প্রান্তদেশের সঙ্গে দুর্বল ইলেকট্রোস্ট্যাটিক বা আয়নিক বন্ধনী দ্বারা যুক্ত থাকে। এই স্তরটি মোট প্রোটিনের প্রায় 30% অংশ গঠন করে।
  6. অন্তঃস্থ প্রোটিন অণুগুলি (যেমন – গ্লাইকোফোরিন) লিপিড দ্বিস্তরের মধ্যে আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে মোজেইক দানার মতো প্রোথিত থাকে। লিপিড ও প্রোটিন অণুগুলির মধ্যে তীব্র হাইড্রোফিলিক বা হাইড্রোফোবিক আকর্ষণ কাজ করে। মোট প্রোটিনের প্রায় 70% অংশ অন্তঃস্থ প্রোটিন গঠন করে।
কোশপর্দার ফ্লুইড-মোজেইক মডেল (সিঙ্গার ও নিকলসন)

কোশপর্দার কাজগুলি লেখো।

কোশপর্দার কাজগুলি হল –

  1. আকৃতি প্রদান – প্রাণীকোশকে নির্দিষ্ট আকৃতি প্রদান করে।
  2. প্রভেদক ভেদ্য পর্দা – কোশপর্দা প্রভেদক ভেদ্য হওয়ায় নির্দিষ্ট নির্বাচিত পুষ্টি পদার্থ ও অন্যান্য পদার্থের আদানপ্রদানে সাহায্য করে।
  3. কোশীয় অঙ্গাণু সৃষ্টি – বিভিন্ন কোশীয় অঙ্গাণুর বাইরে আবরণ সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের স্বতন্ত্রতা দান করে।
  4. সংযোগস্থাপন – আন্তঃকোশীয় স্থানের মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী কোশগুলির মধ্যে সংযোগ স্থাপিত হয়।
  5. শোষণ – কোশপর্দার উপবৃদ্ধি মাইক্রোভিলি (ক্ষুদ্রান্ত্রে থাকে) শোষণ তল বৃদ্ধি করে ও শোষণে সাহায্য করে।
  6. অভিস্রবণ চাপ নিয়ন্ত্রণ – কোশপর্দা সাইটোপ্লাজম ও বহিঃকোশীয় তরলের অভিস্রবণ চাপের মধ্যে ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে।
  7. প্রকোষ্ঠ গঠন – কোশপর্দা প্রোটোপ্লাজমের মধ্যে প্রকোষ্ঠ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা ইউক্যারিওটিক কোশকে উন্নত করে ও স্বতন্ত্রতা দানে সাহায্য করে।
  8. স্নায়ু উদ্দীপনা পরিবহণ – স্নায়ুকোশের পর্দা স্নায়ু উদ্দীপনা পরিবহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
  9. পিনোসাইটোসিস ও ফ্যাগোসাইটোসিস – কোশপর্দা বহিঃপরিবেশ থেকে তরল পদার্থ গ্রহণে (পিনোসাইটোসিস) ও কঠিন পদার্থ গ্রহণে (ফ্যাগোসাইটোসিস) মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
  10. গ্রাহক রূপে – কোশপর্দায় উপস্থিত গ্রাহক প্রোটিন কোশে তথ্য সরবরাহের মাধ্যম রূপে কাজ করে।

সাইটোপ্লাজম কী? সাইটোপ্লাজমের গঠন সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা দাও।

সাইটোপ্লাজম (Cytoplasm) – সজীব কোশে কোশপর্দা থেকে নিউক্লিয়পর্দা পর্যন্ত বিস্তৃত অংশে যে অর্ধস্বচ্ছ, দানাদার, কোলয়েড প্রকৃতির জেলির মতো তরল পদার্থ উপস্থিত থাকে, তাকে সাইটোপ্লাজম (Cytoplasm; Kytos = ফাঁপা, plasma = গঠন) বলে। সাইটোপ্লাজমে বিভিন্ন ম্যাক্রো উপাদান (কার্বন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, হাইড্রোজেন) এবং মাইক্রো উপাদান (কপার, কোবাল্ট, জিংক, সিলিকন) প্রভৃতি উপস্থিত থাকে।

সাইটোপ্লাজমের গঠন –

প্রধানত দুটি উপাদান দ্বারা সাইটোপ্লাজম গঠিত। যথা –

  • সাইটোপ্লাজমীয় ধাত্র বা সাইটোসল।
  • সাইটোপ্লাজমীয় বস্তু বা ট্রোফোপ্লাজম।
  1. সাইটোপ্লাজমীয় ধাত্র (Cytoplasmic matrix) – সাইটোপ্লাজমীয় অঙ্গাণু ছাড়া সমসত্ত্ব, অর্ধস্বচ্ছ, কোলয়েডীয় পদার্থকে সাইটোপ্লাজমীয় ধাত্র বা সাইটোসল বা হায়ালোপ্লাজম বলে। কোশের মধ্যে এটি দুভাবে বিন্যস্ত থাকে –
    • এক্টোপ্লাজম (কোশপর্দা সংলগ্ন অদানাদার ধাত্র)।
    • এন্ডোপ্লাজম (কোশের কেন্দ্র বরাবর বিন্যস্ত দানাদার ধাত্র)।
  2. সাইটোপ্লাজমীয় বস্তু (Cytoplasmic body) – সাইটোপ্লাজমীয় ধাত্রে উপস্থিত সমস্ত সজীব কোশীয় অঙ্গাণু ও অজীবীয় বস্তুসমূহকে সাইটোপ্লাজমীয় বস্তু বা ট্রোফোপ্লাজম বলে। অঙ্গাণুগুলি সাইটোপ্লাজমীয় ধাত্রে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকে।
সাইটোপ্লাজমের গঠন

সাইটোপ্লাজমের কাজগুলি লেখো।

সাইটোপ্লাজমের কাজ –

  1. আন্তঃকোশীয় বণ্টন – সাইটোপ্লাজম কোশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন বিপাকজাত পদার্থ, উৎসেচক, পুষ্টি পদার্থ প্রভৃতি বণ্টনে সাহায্য করে।
  2. পদার্থের আদানপ্রদান – সাইটোপ্লাজম বিভিন্ন কোশীয় অঙ্গাণুর মধ্যে প্রয়োজনীয় উপাদানের আদানপ্রদানে সাহায্য করে।
  3. বিক্রিয়ার সংগঠন স্থান – সাইটোপ্লাজমের মধ্যে গ্লাইকোলাইসিস, অবাত শ্বসন প্রভৃতি প্রক্রিয়াগুলি সংঘটিত হয়।
  4. জৈব সংশ্লেষ – সাইটোপ্লাজমে প্রোটিন, নিউক্লিওটাইড, ফ্যাটি অ্যাসিড প্রভৃতি জৈব অণুগলি সংশ্লেষিত হয়।
  5. কোশ বিভাজন – কোশ বিভাজনের জন্য নিউক্লিওসাইটোপ্লাজমিক আন্তঃক্রিয়া ও আয়তনের অনুপাত নিয়ন্ত্রিত হয়।
  6. সাইটোপ্লাজমীয় গতি – সাইটোপ্লাজমীয় গতি (যেমন – সাইক্লোসিস) দ্বারা কোশের অভ্যন্তরে কোশীয় অঙ্গাণুর সঞ্চালন ও অ্যামিবার ক্ষণপদ সৃষ্টি সম্ভব হয়।

নিউক্লিয়াস কাকে বলে? নিউক্লিয়াসের রাসায়নিক উপাদানগুলির নাম লেখো। নিউক্লিয়াসের কাজগুলি আলোচনা করো।

নিউক্লিয়াস (Nucleus) – ইউক্যারিওটিক কোশের প্রোটোপ্লাজমের সবথেকে ঘন, প্রায় গোলাকার, লিপিড ও প্রোটিন দিয়ে তৈরি দুটি একক পর্দা দিয়ে ঢাকা যে অংশ বংশগত পদার্থ বা DNA বহন করে এবং কোশের যাবতীয় প্রয়োজনীয় কাজগুলি নিয়ন্ত্রণ করে, তাকে নিউক্লিয়াস বলে। ল্যাটিন কথায় নিউক্লিয়াসের অর্থ হল শাঁস।

নিউক্লিয়াসের রাসায়নিক উপাদান – নিউক্লিয়াসে 9-12% DNA, 15% হিস্টোন (বেসিক) প্রোটিন, 5% RNA এবং প্রায় 65% আম্লিক ও প্রশমিত প্রোটিন এবং খনিজ আয়ন (যেমন – Ca2+, K+, Na+) থাকে।

নিউক্লিয়াসের কাজ –

  1. বিপাকীয় কাজ নিয়ন্ত্রণ – উৎসেচক সংশ্লেষের মাধ্যমে কোশের যাবতীয় বিপাকীয় কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। এজন্য নিউক্লিয়াসকে ‘কোশের মস্তিষ্ক’ (Brain of the Cell) বলে।
  2. বংশগত তথ্যের ভাণ্ডার – নিউক্লিয়াসের মধ্যে সমস্ত জীবদেহের বংশগত বৈশিষ্ট্য সংরক্ষিত থাকে।
  3. RNA সংশ্লেষ – নিউক্লিওলাসে RNA সংশ্লেষ ঘটে।
  4. কোশবিভাজন – কোশবিভাজনে নিউক্লিয়াস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
  5. বংশগত বৈশিষ্ট্যের সঞ্চারণ – নিউক্লিয়াস মধ্যস্থ DNA -এর মাধ্যমে জীবের বংশগত বৈশিষ্ট্য একটি জনু থেকে পরবর্তী জনুতে সঞ্চারিত হয়।
  6. প্রকরণ বা ভেদ সৃষ্টি – নিউক্লিয়াসস্থিত ক্রোমোজোমের গঠনের ও সংখ্যার পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রকরণ বা ভেদ সৃষ্টি হয়।

কে সর্বপ্রথম কোষের নিউক্লিয়াস আবিষ্কার ও নামকরণ করেন?

বিজ্ঞানী রবার্ট ব্রাউন (Robert Brown, 1831) সর্বপ্রথম নিউক্লিয়াস আবিষ্কার ও নামকরণ করেন।

ইউক্যারিওটিক নিউক্লিয়াসের গঠন সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো।

অনুরূপ প্রশ্ন, নিউক্লিয়াসের একটি পরিচ্ছন্ন চিত্র অঙ্কন করে নিম্নলিখিত অংশগুলি চিহ্নিত করো – 1. নিউক্লিওপ্লাজম, 2. নিউক্লিওলাস, 3. নিউক্লিয় জালিকা 4. নিউক্লিয় পর্দা।

আদর্শ নিউক্লিয়াস চারটি অংশ নিয়ে গঠিত। যথা –

  1. নিউক্লিয় পর্দা।
  2. নিউক্লিওপ্লাজম।
  3. নিউক্লিয় জালিকা।
  4. নিউক্লিওলাস।

নিউক্লিয় পর্দা (Nuclear Membrane) – নিউক্লিয়াসকে বেষ্টন করে যে দুটি একক পর্দা থাকে, যা নিউক্লিওপ্লাজমকে সাইটোপ্লাজম থেকে পৃথক রাখে তাকে নিউক্লিয় পর্দা বলে। একক পর্দা দুটির অন্তর্বর্তী স্থানকে পেরিনিউক্লিয়ার সিস্টারনি বলা হয়। নিউক্লিয় পর্দার স্থানে স্থানে সূক্ষ্ম ছিদ্র বা নিউক্লিয় রন্ধ্র থাকে। এই রন্ধ্রগুলির মাধ্যমে নিউক্লিয়াসের সঙ্গে সাইটোপ্লাজমের সংযোগ বজায় থাকে।

নিউক্লিয় পর্দা -এর কাজ –

  1. নিউক্লিয় পর্দা নিউক্লিয়াসের আকৃতি প্রদান করে।
  2. নিউক্লিয় রন্ধ্রের দ্বারা নিউক্লিয়াসের সঙ্গে সাইটোপ্লাজমের সংযোগ রক্ষিত হয়।
  3. নিউক্লিয় পর্দা সাইটোপ্লাজম ও নিউক্লিওপ্লাজমকে পৃথক করে রাখে।

নিউক্লিওপ্লাজম (Nucleoplasm) – নিউক্লিয় পর্দা বেষ্টিত নিউক্লিয়াসের মধ্যে যে স্বচ্ছ, ঈষৎ আম্লিক, অর্ধতরল, সূক্ষ্ম দানাযুক্ত ধাত্রবস্তু থাকে, তাকে নিউক্লিওপ্লাজম বা নিউক্লিয় রস বলে। এতে নিউক্লিওপ্রোটিন, বিভিন্ন উৎসেচক এবং নানান জৈব ও অজৈব পদার্থ (খনিজ লবণ – Na, Ca, P, Mg, K) উপস্থিত থাকে।

নিউক্লিওপ্লাজম -এর কাজ – এটি নিউক্লিয়াসের ধাত্ররূপে কাজ করে, যার মধ্যে নিউক্লিয়াসের অন্যান্য অংশ অবস্থিত থাকে।

নিউক্লিয় জালিকা (Nuclear reticulum) – নিউক্লিওপ্লাজমের মধ্যে ভাসমান নিউক্লিয় প্রোটিন দ্বারা নির্মিত সূত্রাকার জালকগুলিকে নিউক্লিয় জালিকা বা ক্রোমাটিন জালিকা বলা হয়। কোশ বিভাজনের সময় এই জালিকা থেকে ক্রোমোজোম সৃষ্টি হয়। ক্রোমোজোমে জিন (Gene) থাকে। এই জিনই বংশগত বৈশিষ্ট্যগুলি বংশানুক্রমে সঞ্চারিত করে। ক্রোমাটিন জালিকা বা সূত্রগুলি নিউক্লিক অ্যাসিড (DNA এবং RNA) ও প্রোটিন দ্বারা গঠিত হয়। এই ক্রোমাটিন দুই প্রকারের হয় – হেটারোক্রোমাটিন এবং ইউক্রোমাটিন।

নিউক্লিয় জালিকা -এর কাজ –

  1. কোশবিভাজনের সময় ক্রোমোজোম গঠন করে।
  2. বংশগত পদার্থ DNA বহন করে।

নিউক্লিওলাস (Nucleolus) – নিউক্লিয়াসের সর্বাপেক্ষা ঘন, উজ্জ্বলভাবে রঞ্জিত, গোলাকার বা উপবৃত্তাকার গঠনটিকে বলা হয় নিউক্লিওলাস। এটি RNA ও প্রোটিন দ্বারা গঠিত। সাধারণত একটি নিউক্লিয়াসে একটিই নিউক্লিওলাস থাকে। নিউক্লিওলাসে চারটি অঞ্চল দেখা যায়, যেমন –

  1. গ্রানিউলার বা দানাদার অঞ্চল
  2. ফাইব্রিলার বা সূত্রাকার অঞ্চল
  3. অ্যামরফাস বা অনিয়তাকার অঞ্চল
  4. অন্তঃ ও বহিঃ নিউক্লিয়ার ক্রোমাটিন।

নিউক্লিওলাস -এর কাজ –

  1. নিউক্লিওপ্রোটিনের সঞ্চয়স্থল হিসেবে কাজ করে।
  2. RNA উৎপাদনে ও প্রোটিন সংশ্লেষে অংশগ্রহণ করে।
একটি আদর্শ নিউক্লিয়াসের গঠন

নিউক্লিয়াসের উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে কোশকে কয় ভাগে ভাগ করা যাই লেখো।

নিউক্লিয়াসের উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে কোশকে চার ভাগে ভাগ করা হয়। যথা –

  1. ইনিউক্লিয়েট (Enucleate) – নিউক্লিয়াসবিহীন কোশ। যেমন – স্তন্যপায়ীর লোহিত রক্তকণিকা, সংবহন কলাযুক্ত উদ্ভিদের ফ্লোয়েম কলাস্থিত সিভনল কোশ।
  2. মনোনিউক্লিয়েট (Mononucleate) – একক নিউক্লিয়াসযুক্ত।
  3. বাইনিউক্লিয়েট (Binucleate) – দুটি নিউক্লিয়াসযুক্ত। যেমন – প্যারামেসিয়াম।
  4. মাল্টিনিউক্লিয়েট (Multinucleate) – বহু নিউক্লিয়াসযুক্ত উদ্ভিদকোশকে সিনোসাইট (Coenocyte) এবং বহু নিউক্লিয়াসযুক্ত প্রাণীকোশকে সিনসাইটিয়াল (Syncytial) বলে।

কে মাইটোকনড্রিয়া আবিষ্কার করেন এবং কে এর নামকরণ করেন?

বিজ্ঞানী কলিকার (Kolliker, 1857) মাইটোকনড্রিয়া আবিষ্কার করেন এবং বিজ্ঞানী বেন্ডা (Benda, 1898) ‘মাইটোকনড্রিয়া’ নামকরণ করেন।

মাইটোকনড্রিয়া কাকে বলে? মাইটোকনড্রিয়ার গঠন সম্পর্কে ধারণা দাও। মাইটোকনড্রিয়ার কাজগুলি লেখো।

অনুরূপ প্রশ্ন, মাইটোকনড্রিয়ার একটি পরিচ্ছন্ন চিত্র অঙ্কন করে প্রদত্ত অংশগুলি চিহ্নিত করো – 1. অন্তঃপর্দা, 2. বহিঃপর্দা, 3. ক্রিস্টি, 4. অক্সিজোম।

মাইটোকনড্রিয়া (Mitochondria; mitos = সুতো, chondrion = দানা) – সজীব কোশের (ইউক্যারিওটিক কোশ) সাইটোপ্লাজমে ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকা লিপিড ও প্রোটিন নির্মিত দ্বি-একক পর্দাবেষ্টিত যে-সমস্ত গোলাকার, ডিম্বাকার অথবা সূত্রাকার অঙ্গাণু সবাত শ্বসনে মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করে এবং কোশের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি উৎপন্ন করে, তাদের মাইটোকনড্রিয়া বলে।

মাইটোকনড্রিয়ার গঠন

মহিটোকনড্রিয়ার গঠন –

ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্রে মাইটোকনড্রিয়ায় নিম্নলিখিত অংশগুলি দেখা যায় –

  1. দ্বি-একক পর্দা – মাইটোকনড্রিয়া দ্বি-একক পর্দা দ্বারা আবৃত। যথা – বহিঃপর্দা ও অন্তঃপর্দা।
    • বহিঃপর্দা (Outer membrane) 60-70Å পুরু এবং মসৃণ হয়।
    • অন্তঃপর্দা (Inner membrane) 60-70Å পুরু এবং অমসৃণ হয়। দুটি পর্দার মাঝখানের দূরত্ব হয় 60-80Å।
  2. প্রকোষ্ঠ – দুটি প্রকোষ্ঠ বর্তমান। যথা –
    • বহিঃপ্রকোষ্ঠ।
    • অন্তঃপ্রকোষ্ঠ। বহিঃ ও অন্তঃপর্দার মাঝখানের প্রকোষ্ঠকে পেরিমাইটোকনড্রিয়াল স্থান (Perimitochondrial space বা বহিঃপ্রকোষ্ঠ বলে এবং অন্তঃপর্দা দ্বারা আবিষ্ট প্রকোষ্ঠকে অন্তঃপ্রকোষ্ঠ বলে।
  3. ধাত্র –
    • অন্তঃপ্রকোষ্ঠ ধাত্র দ্বারা পূর্ণ থাকে।
    • ধাত্রে 2-6টি নগ্ন, চক্রাকার DNA, RNA, rRNA, ও mRNA, 55S রাইবোজোম, প্রোটিন ও বিভিন্ন উৎসেচক উপস্থিত থাকে।
  4. ক্রিস্টি – অন্তঃপর্দা কোশের ভিতরের দিকে ভাঁজ হয়ে যে-সমস্ত আঙুলের মতো প্রবর্ধক সৃষ্টি করে, তাদের ক্রিস্টি বলে।
  5. গ্রানিউলস বা দানা (Granules) –
    • মাইটোকনড্রিয়ার বহিঃপর্দার বহির্ভাগে 60Å বিশিষ্ট বৃত্তহীন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দানা থাকে। এরা বহিস্থ দানা বা পারসনের উপএকক নামে পরিচিত।
    • প্রতিটি ক্রিস্টির গায়ে বৃত্তযুক্ত দানা আবদ্ধ থাকে। এদের F0-F1 বস্তু বা অক্সিজোম বা ফারনানডেজ মোরান অধঃএকক বলা হয়। প্রতিটি অক্সিজোম আবার মস্তক (F1) এবং ভূমি ও বৃত্ত (F0) দ্বারা গঠিত এবং দুটি অক্সিজোমের মধ্যে দূরত্ব থাকে 10 nm।

মহিটোকনড্রিয়ার কাজ –

  1. সবাত শ্বসন – ধাত্র ও পর্দাস্থিত উৎসেচকের সাহায্যে খাদ্যবস্তুর সম্পূর্ণ জারণ ঘটায় ও শক্তির মুক্তি ঘটে।
  2. কোশের শক্তিঘর (Powerhouse of the Cell) – সবাতশ্বসনে ক্রেবস চক্রের মাধ্যমে ATP -এর উৎপাদন ঘটে। ATP জীবের সমস্ত কাজে শক্তির জোগান দেয় বলে একে ‘এনার্জি কারেন্সি’ বলে এবং মাইটোকনড্রিয়াকে ‘কোশের শক্তিঘর’ (Powerhouse of the Cell) বলে।
  3. জৈব অণু সংশ্লেষ – মাইটোকনড্রিয়া সাইটোক্রোম, ক্লোরোফিল, পিরিমিডিন, স্টেরয়েড প্রভৃতি জৈব অণু সংশ্লেষের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান সরবরাহ করে।
  4. কুসুম উৎপাদন – ডিম্বাণুতে কুসুম (Yolk) উৎপাদনে সাহায্য করে।
  5. ফ্যাটি অ্যাসিড বিপাক – মাইটোকনড্রিয়াতে ফ্যাটি অ্যাসিডের β-জারণ ঘটে।
  6. অ্যামিনো অ্যাসিড সংশ্লেষ – মাইটোকনড্রিয়াতে α-কিটোগ্লুটারিক অ্যাসিড থেকে গ্লুটামিক অ্যাসিড, অক্সালোঅ্যাসিটিক অ্যাসিড থেকে অ্যাসপারটিক অ্যাসিড সংশ্লেষিত হয়।

প্লাস্টিড কাকে বলে? প্লাস্টিডের প্রকারভেদগুলি আলোচনা করো।

অনুরূপ প্রশ্ন, রঞ্জকের উপস্থিতি অনুযায়ী প্লাস্টিডের শ্রেণিবিভাগ করো।

প্লাস্টিড (Plastid) – প্রধানত উদ্ভিদকোশে ও সালোকসংশ্লেষকারী প্রোটিস্টান কোশে দ্বি-একক পর্দাবৃত গোলাকার, ডিম্বাকার বা সূত্রাকার যে বৃহত্তম কোশীয় অঙ্গাণু খাদ্য সংশ্লেষ ও খাদ্য সঞ্চয়ে মুখ্য ভূমিকা পালন করে, তাকে প্লাস্টিড বলে।

প্লাস্টিডের প্রকারভেদ – রঞ্জকের উপস্থিতি ও কাজ অনুযায়ী প্লাস্টিডকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। যথা –

  1. ক্লোরোপ্লাস্টিড।
  2. ক্রোমোপ্লাস্টিড।
  3. লিউকোপ্লাস্টিড।
প্লাস্টিডের প্রকারভেদ

প্রত্যেক প্রকার প্লাস্টিডের অবস্থান –

প্লাস্টিডঅবস্থান
ক্লোরোপ্লাস্টিড (সবুজ বর্ণযুক্ত)উদ্ভিদের সবুজ অংশে অর্থাৎ পাতা, ফুলের বৃতি, সবুজ কাণ্ড ইত্যাদি অঙ্গের কোশে দেখা যায়।
ক্রোমোপ্লাস্টিড (বিভিন্ন বর্ণযুক্ত)ফুলের পাপড়ি, পাকা ফলের ত্বকে দেখা যায়।
লিউকোপ্লাস্টিড (বর্ণহীন)প্রধানত মূলের কোশে, ভূনিম্নস্থ কান্ডে দেখা যায়।

চিত্রসহ ক্লোরোপ্লাস্টের গঠন ও কাজ লেখো।

ক্লোরোপ্লাস্ট (Chloroplast) – আদর্শ উদ্ভিদকোশের সাইটোপ্লাজমে অবস্থিত লিপিড ও প্রোটিন নির্মিত দুই একক পর্দা দ্বারা আবৃত গোলাকার, ডিম্বাকার, উপবৃত্তাকার, তারকাকার, পেয়ালাকার ও ফিতাকৃতি ক্লোরোফিলযুক্ত যে প্লাস্টিড উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষে মুখ্য ভূমিকা পালন করে, তাদের ক্লোরোপ্লাস্ট বলে।

ক্লোরোপ্লাস্টের গঠন

ক্লোরোপ্লাস্টের গঠন –

  1. আবরণ – প্রতিটি ক্লোরোপ্লাস্টিড লিপিড ও প্রোটিন দিয়ে তৈরি দুটি একক আবরণী দিয়ে আবৃত থাকে। বাইরের দিকের আবরণীকে বলে বহিঃআবরণী এবং ভিতরের দিকের আবরণীকে বলে অন্তঃআবরণী। আবরণী দুটির মাঝের স্থানকে পেরিপ্লাসটিডিয়াল স্থান বলে।
  2. ধাত্র বা স্ট্রোমা – অন্তঃআবরণীর মধ্যে যে ধাত্র থাকে, তাকে স্ট্রোমা বলে। এর মধ্যে প্রোটিন, শ্বেতসার, তৈলবিন্দু, খনিজ পদার্থ (Mg, Fe, Mn), রাইবোজোম দানা (70S) ও কিছু DNA, RNA, ভিটামিন প্রভৃতি উপস্থিত থাকে।
  3. গ্রাণা – ধাত্রের মধ্যে অসংখ্য চাকতির মতো একক পর্দাবৃত ছোটো ছোটো চ্যাপটা থলি পরপর সাজানো অবস্থায় দেখা যায়, এদের গ্রাণা (একবচনে গ্রাণাম) বলে। গ্রাণামের পর্দা ঘেরা প্রতিটি চাকতিকে বলে থাইলাকয়েড।
  4. থাইলাকয়েড – থাইলাকয়েডের আবরণীর অন্তঃপ্রাচীরে ক্লোরোফিল, ক্যারোটিন, সালোকসংশ্লেষের সহযোগী বিভিন্ন উৎসেচক ও প্রোটিন একসঙ্গে সালোকসংশ্লেষীয় একক গঠন করে। একে অ্যান্টেনা কমপ্লেক্স বলে।
  5. ক্লোরোফিল – থাইলাকয়েডের আবরণীর মধ্যে কোয়ান্টোজোম দানা থাকে। আর এগুলির ভিতরে থাকে সবুজ রঞ্জক কণিকা ক্লোরোফিল। প্রতিটি কোয়ান্টোজোমের মধ্যে প্রায় 250টি ক্লোরোফিল অণু থাকে। ক্লোরোপ্লাস্টিডের গ্রাণাগুলি পরস্পরের সঙ্গে সরু নালি দিয়ে জোড়া থাকে, এগুলিকে স্ট্রোমা ল্যামেলি বা স্ট্রোমা-পট্ট বলে।

ক্লোরোপ্লাস্টের কাজ –

ক্লোরোপ্লাস্টের কাজগুলি হল –

  1. সালোকসংশ্লেষ – ক্লোরোপ্লাস্টের প্রধান কাজ হল সালোকসংশ্লেষে সাহায্য করা। ক্লোরোপ্লাস্টের গ্রাণা অঞ্চলে সালোকসংশ্লেষের আলোক বিক্রিয়া এবং স্ট্রোমা অঞ্চলে সালোকসংশ্লেষের অন্ধকার বিক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
  2. সঞ্চয় – ক্লোরোপ্লাস্টের মধ্যে লিপিড বা ফ্যাট সঞ্চিত থাকে। এক্ষেত্রে ফ্যাট প্লাস্টোগ্লোবিউল (Plastoglobule) রূপে সঞ্চিত থাকে।
  3. প্রোটিন সংশ্লেষ – ক্লোরোপ্লাস্টে অবস্থিত রাইবোজোম প্রোটিন সংশ্লেষে সাহায্য করে।
  4. শক্তির রূপান্তর – ক্লোরোপ্লাস্ট মধ্যস্থ ক্লোরোফিল রঞ্জক কণিকা সৌরশক্তি শোষণ করে তাকে রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে।

অর্ধস্বতন্ত্র অঙ্গাণু কাদের বলে?

মাইটোকনড্রিয়া ও প্লাস্টিডের নিজস্ব DNA (অঙ্গাণু DNA বলে) ও রাইবোজোম (70S প্রকৃতির) থাকার জন্য এরা নিজস্ব প্রোটিন উৎপন্ন করতে সক্ষম। তাই এদের ‘অর্ধস্বতন্ত্র অঙ্গাণু’ (Semiautonomous organelle) বলে।

এন্ডোপ্লাজমিক জালিকার নামকরণ করেন কে?

বিজ্ঞানী পোর্টার (Porter, 1953) ও কলম্যান (Kallman) এই জালিকাকার কোশীয় অঙ্গাণুর নামকরণ করেন ‘এন্ডোপ্লাজমিক জালিকা’।

এন্ডোপ্লাজমিক জালিকা কাকে বলে? এর গঠন সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা দাও।

এন্ডোপ্লাজমিক জালিকা (Endoplasmic Reticulum or ER) – সজীব ইউক্যারিওটিক কোশের সাইটোপ্লাজমে একক পর্দাবৃত শাখাযুক্ত বা শাখাবিহীন নালিকা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত যে জালিকাকার কোশীয় অঙ্গাণু গঠন করে, তাকে এন্ডোপ্লাজমিক জালিকা বলে।

এন্ডোপ্লাজমিক জালিকার গঠন –

সাইটোপ্লাজমের প্রধানত এন্ডোপ্লাজম অংশে জালিকাকারে বিন্যস্ত এন্ডোপ্লাজমিক জালিকাতে তিন প্রকার ভিন্ন গঠনযুক্ত অংশ দেখা যায়।

  1. সিস্টারনি – সবুজ রঞ্জক ক্লোরোফিল সমন্বিত প্লাস্টিড; উদ্ভিদের পাতাসহ অন্যান্য সবুজ অংশে উপস্থিত।
    • একক পর্দাবৃত চ্যাপটা থলির মতো গঠন পরস্পর সংযুক্ত ও সমান্তরালে বিন্যস্ত থাকে।
    • সিস্টারনির ব্যাস 40-50 nm।
    • সিস্টারনির বহির্গাত্রে রাইবোজোম আবদ্ধ থাকায়, এদের অমসৃণ এন্ডোপ্লাজমিক জালিকা বা RER বলে।
  2. টিউবিউলস বা নালিকা –
    • 50-100 nm ব্যাসযুক্ত শাখাযুক্ত নলাকার গঠন।
    • এদের গায়ে রাইবোজোম আবদ্ধ থাকে না বলে, এদের মসৃণ এন্ডোপ্লাজমিক জালিকা বা SER বলে।
  3. ভেসিকল –
    • 25-500 nm ব্যাসযুক্ত গোলাকার বা উপবৃত্তাকার থলির মতো গঠন সাইটোপ্লাজমে পৃথকভাবে অবস্থান করে।
    • ভেসিকলের গায়ে রাইবোজোম আবদ্ধ থাকে না বলে, এদেরও SER বলে।
এন্ডোপ্লাজমিক জালিকার গঠন

এন্ডোপ্লাজমিক জালিকার কাজগুলি লেখো।

এন্ডোপ্লাজমিক জালিকার কাজগুলি হল –

  1. যান্ত্রিক দৃঢ়তা প্রদান – ER সাইটোপ্লাজমের কোলয়েডীয় ধাত্রকে যান্ত্রিক দৃঢ়তা প্রদান করে।
  2. আন্তঃকোশীয় পরিবহণ – কোশের মধ্যে ER -এর চ্যানেলগুলি সংবহনতন্ত্রের ভূমিকা পালন করে। কোশের বিভিন্ন স্থানে প্রয়োজনীয় পদার্থের আদান প্রদানে সাহায্য করে।
  3. প্রোটিন ও লাইপোপ্রোটিন সংশ্লেষ – RER -এর মাধ্যমে প্রোটিন এবং SER -এর মাধ্যমে লাইপোপ্রোটিন সংশ্লেষিত হয়।
  4. গ্লাইকোজেন বিপাক – SER গ্লাইকোজেনোলাইসিসের মাধ্যমে গ্লাইকোজেন ভেঙে গ্লুকোজ উৎপাদনে সাহায্য করে।
  5. বিপাকীয় পদার্থের পৃথকীকরণ – ER -এর পর্দা আন্তঃসিস্টারনাল পদার্থগুলিকে সাইটোসল থেকে পৃথক রেখে কোশের অভিস্রবণ চাপ নিয়ন্ত্রণ করে।
  6. অঙ্গাণু ও নিউক্লিয় পর্দা গঠন – কোশবিভাজনের সময় নিউক্লিয়াস, গলগি বডি, লাইসোজোম প্রভৃতির পর্দা গঠনে ER অংশগ্রহণ করে।

গলগি বডি কাকে বলে? গলগি বডির গঠন সম্পর্কে ধারণা দাও। গলগি বডির কাজগুলি আলোচনা করো।

গলগি বডি (Golgi Body) –

সজীব ইউক্যারিওটিক কোশে একক পর্দাবৃত যে-সমস্ত চ্যাপটা থলি ও গহ্বরের মতো গঠন একত্রিতভাবে কোশীয় ক্ষরণে অংশ নেয়, তাদের গলগি বডি বা গলগি বস্তু বলে।

গলগি বডির গঠন –

ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে দেখা যায় গলগি বডি তিন প্রকার উপাদান দ্বারা গঠিত –

  • সিস্টারনি।
  • ভ্যাকুওল।
  • মাইক্রোভেসিক্স।
  1. সিস্টারনি (Cisternae) – একক পর্দা দিয়ে ঘেরা, চ্যাপটা, একটি আর একটির ওপর স্তূপীকৃত অবস্থায় সমান্তরালভাবে বিন্যস্ত সরু, থলির মতো, কখনো-কখনো শাখাপ্রশাখাযুক্ত অংশ যেগুলির থাকে, তাদের সিস্টারনি বলে। সিস্টারনির একটি তল উত্তল ও অপর তলটি অবতল হয়। এগুলি সংখ্যায় 3-20টি হয়। সিস্টারনির পর্দাঘেরা নলাকার অংশগুলিকে বলা হয় টিউবিউল।
  2. ভ্যাকুওল (Vacuole) – সিস্টারনির প্রান্তীয় অংশ স্ফীত হয়ে যে বড়ো গহ্বর সদৃশ যে গঠন সৃষ্টি করে, তাকে ভ্যাকুওল বলে।
  3. মাইক্রোভেসিক (Microvesicle) – সিস্টারনিগুলির পরিধির দিকে তরল পদার্থ পূর্ণ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোলাকার যে অংশগুলি থাকে, তাকে মাইক্রোভেসিকল বলে।
গলগি বস্তুর গঠন

গলগি বডির কাজ –

  1. ক্ষরণ – কোশের ক্ষরণকাজে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। উদ্ভিদকোশে কোশপ্রাচীর, মূলত্র থেকে ক্ষরিত মিউসিলেজ প্রভৃতি এবং প্রাণীকোশে মিউকাস, ঘর্ম, অশ্রু প্রভৃতি বাহ্যিক ক্ষরণবস্তু ও HCI, রক্ত প্রোটিন, ইমিউনোগ্লোবিউলিন প্রভৃতি অন্তঃক্ষরণ বস্তুর একত্রিতকরণ, রূপান্তর ও ক্ষরণে গলগি বডি সাহায্য করে।
  2. লাইসোজোম ও ভ্যাকুওল সৃষ্টি – প্রাথমিক লাইসোজোম ও ভ্যাকুওল গঠনে গলগি বডি অংশগ্রহণ করে।
  3. জটিল কার্বোহাইড্রেট ও প্রোটিন সংশ্লেষ – উদ্ভিদকোশে সরল শর্করা থেকে পেকটিন, সেলুলোজ, হেমিসেলুলোজ প্রভৃতি এবং প্রাণীকোশে পলিস্যাকারাইড, হায়ালিউরোনিক অ্যাসিড প্রভৃতি সংশ্লেষে সাহায্য করে। এ ছাড়া গলগি বডি মিউসিন জাতীয় গ্লাইকোপ্রোটিন সংশ্লেষে সাহায্য করে।
  4. অ্যাক্রোজোম গঠন – শুক্রাণুর অ্যাক্রোজোম গঠনে গলগি বডি মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
  5. হরমোন ও রঞ্জক সংশ্লেষ – প্রোটিন ও লিপিডধর্মী হরমোন সংশ্লেষে এবং রঞ্জক গঠনে গলগি বডি অংশগ্রহণ করে।
  6. আত্মরক্ষা – উদ্ভিদদেহে জ্বালা ও চুলকানি সৃষ্টিকারী রোম এবং বিষাক্ত প্রাণীর বিষ ক্ষরণে গলগি বডি মুখ্য ভূমিকা পালন করে।

ডিকটিওজোম (Dictyosomes) কাকে বলে?

সাইটোপ্লাজমে বিক্ষিপ্তভাবে থাকা উদ্ভিদকোশ ও অমেরুদণ্ডী কোশের গলগি বডিকে ডিকটিওজোম (Dictyosomes) বলে।

চিত্রসহ লাইসোজোমের গঠন ও কাজ লেখো।

লাইসোজোম (Lysosome) – আদর্শ নিউক্লিয়াসযুক্ত সকল প্রাণীকোশ এবং কিছু উদ্ভিদকোশের সাইটোপ্লাজমে একক পর্দা দিয়ে আবৃত প্রায় গোলাকার থলির মতো একরকমের সূক্ষ্ম কোশীয় অঙ্গাণু দেখা যায়, যা আর্দ্রবিশ্লেষক উৎসেচক দিয়ে পূর্ণ থাকে, এদের লাইসোজোম বলে।

লাইসোজোমের গঠন –

প্রতিটি লাইসোজোম দুটি প্রধান অংশ নিয়ে গঠিত। যথা –

  1. আবরণী বা সীমাস্থ পর্দা,
  2. ধাত্র বা ম্যাট্রিক্স।

আবরণী (limiting membrane) –

  1. লাইসোজোম লিপিড ও প্রোটিন নির্মিত একক পর্দা দ্বারা আবৃত থাকে। একে লাইসোজোমের আবরণী বলে।
  2. আবরণী পর্দায় বিভিন্ন প্রকার আম্লিক এবং গ্লাইকোসাইলেটেড অন্তঃপ্রোটিন থাকে। ফলে সীমাস্থ পর্দাটি লাইসোজোমের মধ্যে অবস্থিত উৎসেচকের ক্রিয়া থেকে রক্ষা পায়।
  3. কোলেস্টেরল, কর্টিজোন ইত্যাদি পদার্থ লাইসোজোমের স্থিতিশীলতা বজায় রাখে, তাই এদের স্টেবিলাইজার বলে।

ধাত্র (Matrix) –

  1. লাইসোজোমের গহ্বরে যে সমসত্ত্ব দানাদার পদার্থ থাকে, তাকে ধাত্র বা ম্যাট্রিক্স বলে।
  2. লাইসোজোমের ধাত্রে প্রায় 50 রকমের আর্দ্রবিশ্লেষক উৎসেচক, অপাচ্য বস্তু ও আরও অন্যান্য দানাদার বস্তু জমা থাকে।
লাইসোজোমের গঠন

লাইসোজোমের কাজ –

  1. পরিপাক – লাইসোজোম অন্তঃকোশীয় ও বহিঃকোশীয় উপাদানের পরিপাকে সাহায্য করে।
  2. প্রতিরক্ষা – লিউকোসাইট ও ম্যাক্রোফাজস্থিত লাইসোজোম বিজাতীয় বস্তু বা রোগজীবাণু ধ্বংস করে দেহকে সুরক্ষিত রাখে।
  3. ক্ষতিগ্রস্ত ও মৃত কোশের অপসারণ – অটোফ্যাগির মাধ্যমে লাইসোজোম ক্ষতিগ্রস্ত ও মৃত কোশীয় অঙ্গাণু ও কোশকে পরিপাক করে ও অপসারিত করে।
  4. রূপান্তরভবন বা মেটামরফোসিস – মেটামরফোসিসের সময় লার্ভা দশার বহুগঠন যেমন – ব্যাঙাচির বহিঃফুলকা, লেজ এবং পতঙ্গের লার্ভার বহু গঠন অটোলাইসিসের মাধ্যমে অবলুপ্ত হয় এবং পূর্ণাঙ্গ প্রাণীতে পরিণত হয়।
  5. ক্যানসার সৃষ্টি – ক্রোমোজোমের ভাঙন ঘটিয়ে লাইসোজোম দেহে ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে।
  6. পুনঃপৃথকীকরণ – কোশ থেকে কলা উৎপত্তির সময় লাইসোজোমের কার্যকারিতার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত কোশ বা কলার অপসারণ ঘটে এবং কলার পুনর্বিন্যাস সম্ভব হয়।

লাইসোজোমের বহুরূপতার গঠনগুলি সম্পর্কে লেখো।

বিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান দ্য ডুভে (Christian Duve, 1955) লাইসোজোম আবিষ্কার ও নামকরণ করেন।

লাইসোজোমের বহুরূপতা – একই কোশের মধ্যে কার্যগতভাবে লাইসোজোম বিভিন্ন দশায় অবস্থান করে। এই ঘটনাকে লাইসোজোমের বহুরূপতা বলে। লাইসোজোমের বহুরুপতাতে চার রকমের গঠন দেখা যায়। যথা –

প্রাথমিক বা প্রাইমারি লাইসোজোম –

  1. 100 nm ব্যাসযুক্ত, নিষ্ক্রিয় উৎসেচক পূর্ণ, গলগি বডির পরিণত তল থেকে সৃষ্ট ছোটো ছোটো থলির মতো গঠনকে প্রাথমিক লাইসোজোম বলে।
  2. এই প্রকার লাইসোজোম পরিপাকে অংশগ্রহণ করে না বলে, এদের ভার্জিন লাইসোজোম বা নিষ্ক্রিয় লাইসোজোম বা সঞ্চয়কারী দানা বলা হয়।

গৌণ লাইসোজোম বা হেটারোফ্যাগোজোম –

  1. পিনোসাইটোসিস বা ফ্যাগোসাইটোসিস পদ্ধতিতে সৃষ্ট পিনোজোম বা ফ্যাগোজোম প্রাথমিক লাইসোজোমের সঙ্গে মিলিত হয়ে যে লাইসোজোম গঠন করে, তাকে গৌণ লাইসোজোম বা হেটারোফ্যাগোজোম বলে।
  2. এই প্রকার লাইসোজোমে সক্রিয় উৎসেচকের সাহায্যে বহিরাগত বস্তুর পরিপাক ঘটে বলে, একে হেটারোফ্যাগোজোম বলে।

অটোলাইসোজোম বা অটোফ্যাগোজোম –

  1. সজীব কোশমধ্যস্থ দুর্বল, রোগগ্রস্ত বা কর্মে অক্ষম কোশীয় অঙ্গাণু (যেমন – মাইটোকনড্রিয়া, ER প্রভৃতি) সমন্বিত ফ্যাগোজোম প্রাথমিক লাইসোজোমের সঙ্গে মিলিত হয়ে যে লাইসোজোম গঠন করে, তাকে অটোলাইসোজোম বা অটোফ্যাগোজোম বলে।
  2. অটোফ্যাগোজোমে কোশীয় অঙ্গাণুর পরিপাক ঘটে। একে অটোফ্যাগি বলে।

রেসিডুয়াল বডি –

  1. পরিপাকের পর যে-সমস্ত গৌণ লাইসোজোম (হেটারোফ্যাগোজোম বা অটোফ্যাগোজোম) -এর মধ্যে অপাচ্য খাদ্যবস্তু থেকে যায়, তাদের রেসিডুয়াল বডি বলে।
  2. রেসিডুয়াল বডি এক্সোসাইটোসিস বা ইফ্যাজি পদ্ধতিতে অপাচ্য বস্তুগুলিকে কোশের বাইরে নিঃক্ষেপ করে।

ভ্যাকুওল কাকে বলে? ভ্যাকুওলের গঠন লেখো। বিভিন্ন প্রকার ভ্যাকুওল ও তাদের কাজ সম্পর্কে ধারণা দাও।

ভ্যাকুওল (Vacuole) – সজীব ইউক্যারিওটিক কোশের (প্রধানত উদ্ভিদকোশে ও প্রোটোজোয়ান কোশে) সাইটোপ্লাজমে একক পর্দাবৃত যে সাইটোপ্লাজমবিহীন গহ্বর বিভিন্ন পদার্থ সঞ্চয়ে মুখ্য ভূমিকা পালন করে, তাকে ভ্যাকুওল বলে।

উদ্ভিদকোশের পরিণত ভ্যাকুওল

ভ্যাকুণ্ডলের গঠন –

  1. ভ্যাকুওলগুলি কোশরস পূর্ণ থলির মতো হয় এবং টোনোপ্লাস্ট নামক একক পর্দাবেষ্টিত হয়। এগুলি আকারে ক্ষুদ্র, গোলাকার বা ডিম্বাকার হয়।
  2. ভ্যাকুওলগুলিতে শক্তিশালী জারক উৎসেচক (ক্যাটালেজ) উপস্থিত থাকে যা হাইড্রোজেন পারক্সাইড (H2O2) নামক কোশের টক্সিক পদার্থকে জারিত করে।
  3. পাতার প্যারেনকাইমা কোশে উপস্থিত ভ্যাকুওলগুলি বড়ো আকৃতির হয় এবং প্রচুর পরিমাণে উপস্থিত থাকে। প্রাণীকোশে ভ্যাকুওল দেখা যায় না, থাকলেও তা আকৃতিতে ছোটো হয়।

বিভিন্ন প্রকার ভ্যাকুওল এ তাদের কাজ –

  1. খাদ্যগহ্বর – কোশগহ্বরে খাদ্য সঞ্চিত থাকে। অ্যামিবা কোশে দেখা যায়।
  2. রেচনগহ্বর – কোশগহ্বরে বিপাকজাত রেচনপদার্থ সঞ্চিত থাকে।
  3. জলগহ্বর – পিনোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় গৃহীত জলকে ঘিরে জলগহ্বর সৃষ্টি হয়।
  4. সংকোচনশীল গহ্বর – সংকোচন-প্রসারণক্ষম এই গহ্বরের মধ্যে বর্জ্যপদার্থ সঞ্চিত থাকে। গহ্বরগুলি কোশের পরিধির দিকে এসে ফেটে যায় ও বর্জ্য পদার্থকে কোশের বাইরে নিক্ষেপ করে।
  5. গ্যাসগহ্বর – জলজ উদ্ভিদের কোশে গহ্বরের ভিতরে গ্যাস জমা থাকে এবং উদ্ভিদকে প্লবতা দান করে।

কে উদ্ভিদকোশ ও প্রাণীকোশে রাইবোজোম আবিষ্কার করেন?

বিজ্ঞানী রবিনসন (Robinson) ও ব্রাউন (Brown, 1953) উদ্ভিদকোশে এবং প্যালাডে (Palade, 1955) প্রাণীকোশে রাইবোজোম আবিষ্কার করেন।

চিত্রসহ রাইবোজোমের গঠন ও কাজ উল্লেখ করো।

রাইবোজোম (Ribosome) – প্রোক্যারিওটিক এবং ইউক্যারিওটিক যে-কোনো সজীব কোশের সাইটোপ্লাজমে অথবা এন্ডোপ্লাজমীয় জালিকা এবং নিউক্লিয় পর্দার গায়ে লেগে থাকা অবস্থায় রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড ও প্রোটিন দিয়ে তৈরি পর্দাবিহীন যে ছোটো ছোটো দানা দেখা যায়, তাদের রাইবোজোম বলে।

রাইবোজোমের গঠন

রাইবোজোমের গঠন –

  1. রাইবোজোম গোলাকার বা উপবৃত্তাকার, একক পর্দাবিহীন কোশ অঙ্গাণু।
  2. রাইবোজোমে দুটি অধঃএকক থাকে যারা পরস্পর ম্যাগনেশিয়াম আয়ন (Mg++) দ্বারা যুক্ত থাকে।
  3. রাইবোজোমের দুটি অধঃএককের মধ্যে একটি বৃহৎ অধঃএকক থাকে আর একটি ক্ষুদ্র অধঃএকক থাকে। বৃহৎ অধঃএককটি গোলাকার এবং ক্ষুদ্র অধঃএককটি ডিম্বাকার হয়।
  4. রাইবোজোম প্রধানত রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড (RNA) ও হিস্টোনজাতীয় ক্ষারীয় প্রোটিন দ্বারা গঠিত হয়।
  5. যখন একাধিক রাইবোজোম পরস্পর যুক্ত হয়ে দলবদ্ধভাবে অবস্থান করে, তখন তাকে পলিরাইবোজোম বা পলিজোম বলে, এবং রাইবোজোমগুলি এককভাবে অবস্থান করলে, তাকে মোনোজোম বলে।
  6. 70S রাইবোজোমে 60% RNA এবং 40% হিস্টোন জাতীয় প্রোটিন থাকে। অপরদিকে 80S রাইবোজোমে 40% RNA এবং 60% হিস্টোন প্রোটিন থাকে।
  7. রাইবোজোমের গঠন সম্পর্কে অনেক মডেল প্রচলিত আছে, তাদের মধ্যে বিজ্ঞানী J. A. Luke প্রদত্ত মডেল সবর্জনগ্রাহ্য। তাঁর মডেল অনুসারে ছোটো উপএককটির তিনটি অংশ আছে, যথা –
    • মস্তক (head),
    • পাদদেশ (base) এবং
    • মঞ্চ (platform)। অনুরূপভাবে বড়ো উপ এককটির তিনটি অংশ আছে। যথা –
    • চূড়া বা রিজ (ridge),
    • বৃন্ত (Stalk) এবং
    • কেন্দ্রীয় স্ফীতি (Central protuberence)।

রাইবোজোমের কাজ –

  1. এটি প্রোটিন সংশ্লেষে মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করে। এজন্য রাইবোজোমকে কোশের ‘প্রোটিন তৈরির কারখানা’ (protein factory) বলা হয়।
  2. রাইবোজোম স্নেহপদার্থ বিপাকেও সাহায্য করে।
  3. রাইবোজোম কোশের ক্ষরণে সাহায্য করে।

কে সেন্ট্রোজোম আবিষ্কার করেন।

বিজ্ঞানী বোভারি (Boveri, 1888) সেন্ট্রোজোম আবিষ্কার করেন।

সেন্ট্রোজোম কাকে বলে? চিত্রসহ সেন্ট্রোজোমের গঠন ও কাজ উল্লেখ করো।

সেন্ট্রোজোম (Centrosome) – সজীব প্রাণীকোশে নিউক্লিয়াসের কাছে পর্দাবিহীন, তারার মতো আকৃতিযুক্ত যে কোশীয় অঙ্গাণু কোশবিভাজনের সময় বেমতন্তু গঠন করে, তাকে সেন্ট্রোজোম বলে।

সেন্ট্রোজোমের গঠন

সেন্ট্রোজোমের গঠন –

ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্রে সেন্ট্রোজোমের চারটি প্রধান অংশ দেখা যায়। যথা –

  1. সেন্ট্রোস্ফিয়ার – সেন্ট্রোজোমের বাইরের দিকের দানাবিহীন সাইটোপ্লাজমীয় সমসত্ত্ব ধাত্রকে সেন্ট্রোস্ফিয়ার বলে।
  2. কাইনোপ্লাজম – সেন্ট্রোজোমের কেন্দ্রে অবস্থিত সাইটোপ্লাজমীয় ধাত্রকে কাইনোপ্লাজম বলে।
  3. অ্যাস্ট্রাল রশ্মি – সেন্ট্রোস্ফিয়ার থেকে চতুর্দিকে বিচ্ছুরিত অণুনালিকাকে অ্যাস্ট্রাল রশ্মি বলে।
  4. সেন্ট্রিওল – সেন্ট্রোজোমের কেন্দ্রে পরস্পর সমকোণে অবস্থিত দুটি দুমুখ খোলা পিপেসদৃশ গঠনকে সেন্ট্রিওল বলে। দুটি সেন্ট্রিওলকে একত্রে ডিপ্লোজোম বলে।

সেন্ট্রোজোমের কাজ –

  1. কোশ বিভাজনের সময় সেন্ট্রোজোম বেমতন্তু গঠন করে ক্রোমোজোমের মেরু অভিমুখী চলনে সাহায্য করে।
  2. শুক্রাণুর পুচ্ছ গঠনে সাহায্য করে।
  3. সেন্ট্রোজোম সিলিয়া ও ফ্ল্যাজেলা উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
  4. অণুনালিকা গঠন করে।

সেন্ট্রিওল কী? সেন্ট্রিওলের গঠন ও কাজ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা দাও।

সেন্ট্রিওল (Centriole) – প্রধানত প্রাণীকোশে নিউক্লিয়াসের কাছে পর্দাবিহীন দুমুখখোলা পিপের মতো যে দুটি গঠন পরস্পর সমকোণে অবস্থান করে, তাদের প্রতিটিকে সেন্ট্রিওল বলে। দুটি সেন্ট্রিওলকে একত্রে ডিপ্লোজোম বলে।

সেন্ট্রিওলের গঠন –

0.15-0.25 µm (মাইক্রো মিটার) ব্যাস ও 0.3-0.5µm দৈর্ঘ্যযুক্ত প্রতিটি সেন্ট্রিওল দুমুখ খোলা পিপের মতো দেখতে। সেন্ট্রিওলের ‘cartwheel’ মডেলে নিম্নলিখিত অংশগুলি দেখা যায় –

  • অণুনালিকা বা মাইক্রোটিউবিউলস –
    • সেন্ট্রিওলের প্রাচীর 9টি (নয়টি) ত্রয়ী অণুনালিকা দ্বারা গঠিত (Threadgold, 1968)।
    • প্রতিটি ত্রয়ী উপনালিকা বা সাব-টিউবিউল ‘A’, ‘B’, ও ‘C’ অক্ষর দিয়ে চিহ্নিত করা হয়। প্রতিটি অণুনালিকা তিনটি উপনালিকা দ্বারা তৈরি একটি ট্রিপলেট ‘Triplet’ গঠন করে।
    • প্রতিটি উপনালিকা 250Å ব্যাসযুক্ত ও 13টি গ্লোবিউলার প্রোটিন অধঃএকক দ্বারা গঠিত।
  • লিঙ্কার – প্রতিটি অণুনালিকার ‘A’ উপনালিকা পার্শ্ববর্তী অণুনালিকার ‘C’ উপনালিকার সঙ্গে একটি ঘন যোজক পদার্থ দ্বারা যুক্ত থাকে, একে লিংকার বলে।
  • ইন্ট্রাসেন্ট্রিওলার গঠন – একটি সেন্ট্রিওলকে প্রস্থচ্ছেদ করলে গোরুর গাড়ির চাকার মতো গঠন লক্ষ করা যায়, একে কার্ট হুইল মডেল (Cart wheel Model) বলে। সেন্ট্রিওলের কেন্দ্রে থাকে কেন্দ্রীয় দণ্ড বা হাব। হাব থেকে নয়টি দণ্ডাকার অংশ নির্গত হয়ে ‘A’ উপনালিকাগুলির সঙ্গে যুক্ত হয়, এদের স্পোক বলে।
  • পেরিসেন্ট্রিওলার গঠন – প্রতিটি অণুনালিকাকে বেষ্টন করে ওপরে ও নীচে 9টি করে বাল্বের মতো স্ফীত অংশ যুক্ত থাকে, এদের স্যাটেলাইট বলে।

সেন্ট্রিওলের কাজ –

  1. প্রাণীকোশের বিভাজনের সময় বেমতন্তু গঠনে ও ক্রোমোজোমের প্রান্তীয় চলনে সাহায্য করে।
  2. শুক্রাণুর পুচ্ছ গঠনে সাহায্য করে।
  3. সিলিয়া ও ফ্ল্যাজেলা গঠনে সেন্ট্রিওল বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

মাইক্রোটিউবিউল কাকে বলে? এর গঠন সম্পর্কে ধারণা দাও। মাইক্রোটিউবিউলের কাজ লেখো।

মাইক্রোটিউবিউল (Microtubule) – সজীব ইউক্যারিওটিক কোশের সাইটোপ্লাজমে টিউবিউলিন প্রোটিন নির্মিত ফাঁপা, অশাখ, নলাকার যে-সমস্ত গঠন কোশের অন্তঃকাঠামো (সাইটোস্কেলিটন), সিলিয়া, ফ্ল্যাজেলা, বেম সৃষ্টিতে, কোশের ভারবহনে এবং কোশীয় চলনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে, তাদের অণুনালিকা বা মাইক্রোটিউবিউলস বলে।

মাইক্রোটিউবিউল বা অণুনালিকার গঠন –

  1. প্রতিটি মাইক্রোটিউবিউল ফাঁপা, শাখাবিহীন ও নলাকার।
  2. প্রতিটি মাইক্রোটিউবিলের ব্যাস 250Å।
  3. নলের প্রাচীর 60Å পুরু এবং 13টি অধঃএকক দ্বারা গঠিত, এদের প্রোটোফাইব্রিল বলা হয়।
  4. প্রতিটি প্রোটোফাইব্রিল বা প্রোটোফিলামেন্টের প্রাচীর দুপ্রকার প্রোটিন দ্বারা গঠিত। যথা – α-টিউবিউলিন ও β-টিউবিউলিন।
  5. α ও β টিউবিউলিন পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে টিউবিউলিন-ডাইমার গঠন করে, ডাইমারগুলি পরস্পর পেঁচিয়ে অবস্থান করে।
  6. বর্তমান গবেষণায় জানা গেছে যে মাইক্রোটিউবিউলের প্রাচীরে অণুনালিকা-সংযুক্ত প্রোটিন (MAPS) নামক বিশেষ ধরনের প্রোটিন উপস্থিত থাকে।
মাইক্রোটিউবিউল

মাইক্রোটিউবিউলের কাজ –

  1. সাইটোস্কেলিটন গঠন – সাইটোপ্লাজমীয় কঙ্কালের অন্যতম প্রধান উপাদান হল অণুনালিকা বা মাইক্রোটিউবিউলস।
  2. অন্তঃকোশীয় পরিবহণ – কোশের মধ্যে জল, খনিজ লবণ, খাদ্য প্রভৃতির স্থানান্তর নিয়ন্ত্রণ করে।
  3. গঠনগত উপাদান – বেমতন্তু, সেন্ট্রিওল, বেসাল বডি, সিলিয়া, ফ্ল্যাজেলা, শুক্রাণুর পুচ্ছ প্রভৃতি গঠনে অণুনালিকা অংশগ্রহণ করে।

আরগাস্টিক পদার্থ কী? এগুলি কয়প্রকার ও কী কী? সংক্ষেপে আলোচনা করো।

আরগাস্টিক পদার্থ – কোশের সাইটোপ্লাজমে সজীব অঙ্গাণুসমূহ ছাড়া বিপাকের ফলে উৎপন্ন যে অজীবীয় বা নির্জীব বস্তু উপস্থিত থাকে তাদের সামগ্রিকভাবে সাইটোপ্লাজমীয় অজীবীয় বস্তু বা সাইটোপ্লাজমীয় ইনক্লুশনস্ বলে। উদ্ভিদকোশে এগুলিকে আরগাস্টিক পদার্থ ও প্রাণীকোশে এগুলিকে মেটাপ্লাস্টিক বডি বলে।

কোশীয় আরগ্যাসটিক বস্তুকে তিনভাগে ভাগ করা যায় –

সঞ্চিত খাদ্যবস্তু –

কোশীয় সঞ্চিত খাদ্যবস্তু নিম্নলিখিত প্রকারের –

  1. শ্বেতসার দানা – চাল, আলু, ভুট্টাসহ বিভিন্ন দানাতে শ্বেতসার ক্ষুদ্র কঠিন দানারূপে অবস্থান করে। এগুলি বিভিন্ন আকারের গোলাকার (মটর), ডিম্বাকার (আলু), চ্যাপটা (গম)। এই দানাগুলি হাইলাম নামক একটি উজ্জ্বল বিন্দুকে ঘিরে কয়েকটি স্তরে অবস্থান করে। এই দানাগুলি সরল, যৌগিক বা অর্ধ যৌগিক হতে পারে।
  2. গ্লাইকোজেন – প্রাণীর যকৃৎ ও পেশিকোশে, ব্যাকটেরিয়া, নীলাভ-সবুজ শৈবাল ও ছত্রাকের দেহকোশে প্রাণীজ শ্বেতসার রূপে গ্লাইকোজেন জমা থাকে।
  3. ইনিউলিন – এগুলি ডালিয়ার কন্দমূলের কোশপ্রাচীরে সঞ্চিত কেলাসিত বিশেষ সঞ্চিত বস্তু। এর রাসায়নিক সংকেত (C6H10O5)।
  4. তৈলবিন্দু – উদ্ভিদের বীজের সস্যে ও বীজপত্রে, প্রাণীদেহের অ্যাডিপোজ কলাকোশে ফ্যাটি অ্যাসিড ও গ্লিসারলের সমন্বয়ে গঠিত তৈলবিন্দু সঞ্চিত থাকে।
  5. জাইমোজেন দানা – কিছু কিছু প্রাণী ও উদ্ভিদকোশের সাইটোপ্লাজমে বিশেষ কিছু উৎসেচক একত্রিতভাবে নিষ্ক্রিয় দানাদার গঠন সৃষ্টি করে, এগুলিকে জাইমোজেন দানা বলে।
  6. প্রোটিন – বীজের বীজপত্রে প্রোটিন জাতীয় উপাদান অ্যালিউরোন দানা হিসেবে সঞ্চিত থাকে।

ক্ষরিত পদার্থ –

উদ্ভিদকোশে বিভিন্ন প্রকার ক্ষরিত পদার্থের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। যেমন – মিষ্টিস্বাদযুক্ত মকরন্দ বা নেকটার, রঞ্জক পদার্থ (অ্যান্থোসায়ানিন, ক্যারোটিন, জ্যান্থোফিল), বিভিন্ন প্রকার ক্ষরিত জৈব উৎসেচক প্রভৃতি।

বর্জ্যপদার্থ –

উদ্ভিদকোশে বিপাকীয় ক্রিয়ার ফলে উৎপন্ন বিভিন্ন বর্জ্যপদার্থ কোশের সাইটোপ্লাজমে অবস্থান করে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – গঁদ, রজন, তরুক্ষীর, ট্যানিন, র‍্যাফাইড, সিস্টোলিথ, উপক্ষার প্রভৃতি। সিস্টোলিথ হল ক্যালশিয়াম কার্বনেটের গুচ্ছাকার কেলাস যা বট, রবার গাছের পাতায় থাকে, র‍্যাফাইড হল ক্যালশিয়াম অক্সালেটের কেলাস যা কচু, কচুরিপানার পত্রবৃত্তে থাকে। পাইন গাছের কাণ্ড ও পাতার রজননালিতে রজন থাকে। ট্যানিন তিক্ত স্বাদযুক্ত কার্বনঘটিত রেচনবস্তু যা আমলকী, হরীতকীতে থাকে। উপক্ষার নাইট্রোজেনঘটিত বর্জ্যপদার্থ যা বিভিন্ন উদ্ভিদে পাওয়া যায় যেমন – সিঙ্কোনার বাকলে (কুইনাইন), সর্পগন্ধার মূলে (রেসারপিন), তামাক পাতায় (নিকোটিন)। গঁদ হল কার্বনঘটিত বর্জ্যপদার্থ যা শালগাছের কান্ডে পাওয়া যায়।


আজকের এই আর্টিকেলে আমরা নবম শ্রেণীর জীবন বিজ্ঞানের দ্বিতীয় অধ্যায় ‘জীবন সংগঠনের স্তর’ -এর অন্তর্গত ‘কোশ’ অংশের রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলো নবম শ্রেণীর পরীক্ষা এবং যারা ভবিষ্যতে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেবেন, তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আশা করি, আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে আসবে। যদি কোনো প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থাকে, তবে আমাদের টেলিগ্রামে যোগাযোগ করতে পারেন; আমরা উত্তর দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। এছাড়া, লেখাটি প্রয়োজনীয় মনে হলে আপনার বন্ধু বা সহপাঠীদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ।

Please Share This Article

Related Posts

জৈবনিক প্রক্রিয়া-উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা-সালোকসংশ্লেষ-নবম শ্রেণী-জীবনবিজ্ঞান

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – জৈবনিক প্রক্রিয়া – উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা – সালোকসংশ্লেষ – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

জৈবনিক প্রক্রিয়া-উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা-সালোকসংশ্লেষ-জীবনবিজ্ঞান-নবম শ্রেণী

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – জৈবনিক প্রক্রিয়া – উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা – সালোকসংশ্লেষ – টীকা

জৈবনিক প্রক্রিয়া-উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা-সালোকসংশ্লেষ-জীবনবিজ্ঞান-নবম শ্রেণী

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – জৈবনিক প্রক্রিয়া – উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা – সালোকসংশ্লেষ – পার্থক্যধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

About The Author

Rahul

Tags

মন্তব্য করুন

SolutionWbbse

"SolutionWbbse" শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন অধ্যয়ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গাইডলাইন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সাহায্য প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষণীয় উপকরণ সহজেই সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

Editor Picks

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – জৈবনিক প্রক্রিয়া – উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা – সালোকসংশ্লেষ – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – জৈবনিক প্রক্রিয়া – উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা – সালোকসংশ্লেষ – টীকা

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – জৈবনিক প্রক্রিয়া – উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা – সালোকসংশ্লেষ – পার্থক্যধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – জৈবনিক প্রক্রিয়া – উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা – সালোকসংশ্লেষ – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – জৈবনিক প্রক্রিয়া – উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা – সালোকসংশ্লেষ – অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর