এই আর্টিকলে আমরা নবম শ্রেণীর জীবন বিজ্ঞানের প্রথম অধ্যায় ‘জীবন ও তার বৈচিত্র্য’ -এর অন্তর্গত ‘জীববিদ্যা হল জীবনের রীতি ও প্রক্রিয়া এবং তারা বৈচিত্রের অধ্যয়ন’ অংশের গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করব। পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) -এর সিলেবাস অনুযায়ী আসন্ন ইউনিট টেস্ট বা স্কুল পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এই প্রশ্নগুলো অত্যন্ত জরুরি।

জীববিদ্যার (Biology) সংজ্ঞা দাও।
বিজ্ঞানের যে শাখায় জীবজগতের অন্তর্গত অণুজীব থেকে শুরু করে সমস্ত উন্নত উদ্ভিদ ও প্রাণীর আকৃতি, প্রকৃতি, শারীরবৃত্তীয় কার্যাবলি, জীবনপ্রক্রিয়া, পরিবেশের সঙ্গে মিথোষ্ক্রীয়া, স্থায়িত্ব, অভিযোজন, বংশগতি, অভিব্যক্তি অর্থাৎ জীবন সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য আলোচিত হয়, তাকে জীববিদ্যা বা বায়োলজি বলে।
জীববিদ্যা পাঠের প্রধান দুটি উদ্দেশ্য লেখো।
জীববিদ্যা পাঠের প্রধান দুটি উদ্দেশ্য –
- পরিবেশের বিভিন্ন জীব সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহ ও কৌতুহল সৃষ্টি করা।
- পরিবেশের মূল উপাদানগুলির সঙ্গে জীবজগতের সম্পর্ক ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতা সম্বন্দ্বে জ্ঞান লাভ করা।
ফলিত জীববিদ্যা (Applied Biology) বলতে কী বোঝো?
জীববিদ্যার যে শাখায় জীব সংক্রান্ত নানা তথ্য ও তত্ত্ব প্রয়োগ করে মানব কল্যাণমূলক পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয় এবং সরাসরি মানুষের উপকারে ব্যবহৃত হয়, তাকে ফলিত জীববিদ্যা বলা হয়।
শারীরস্থান (Anatomy) বলতে কী বোঝো?
জীববিদ্যার যে শাখায় কোনো জীবদেহের অঙ্গ, বিভিন্ন তন্ত্র ও তাদের অবস্থানের ব্যাপারে আলোচনা করা হয়, তাকে শারীরস্থান (Anatomy) বলে।
অনাক্রম্যবিদ্যা (Immunology) কাকে বলে?
জীববিদ্যার যে শাখায় কোনো জীবদেহে বিভিন্ন রোগজীবাণুর প্রভাব ও তাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থার বিষয়ে আলোচনা করা হয়, তাকে অনাক্রম্যবিদ্যা (Immunology) বলে।
বাস্তুবিদ্যা বা ইকোলজি (Ecology) কাকে বলে?
জীববিজ্ঞানের যে শাখায় পরিবেশ ও জীবের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক এবং জীবসম্প্রদায়ের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক সম্পর্কে আলোচনা করা হয়, তাকে বাস্তুবিদ্যা বা ইকোলজি বলা হয়।
কোশবিদ্যা (Cytology) কাকে বলে?
জীববিদ্যার যে শাখায় বিভিন্ন প্রকার কোশ, তাদের অঙ্গাণুসমূহ (যেমন – মাইটোকনড্রিয়া, রাইবোজোম, প্লাস্টিড, গলগি বস্তু, নিউক্লিয়াস প্রভৃতি), সাইটোপ্লাজম, বিভিন্ন কোশীয় অজীবীয় বস্তু প্রভৃতির গঠন এবং কাজ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়, তাকে কোশবিদ্যা (Cytology) বা কোশীয় জীববিদ্যা (Cell Biology) বলা হয়।
আণবিক জীববিদ্যা (Molecular Biology) কাকে বলে?
আণবিক জীববিদ্যা (Molecular Biology) – জীববিদ্যার যে শাখায় বৃহৎ, জটিল জৈব অণুগুলির (যেমন – প্রোটিন, উৎসেচক, কার্বোহাইড্রেট, লিপিড, নিউক্লিক অ্যাসিড, হরমোন প্রভৃতি) ভৌত ও রাসায়নিক গঠন, সংশ্লেষ পদ্ধতি এবং কাজ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়, তাকে আণবিক জীববিদ্যা বলা হয়।
জীবরসায়নবিদ্যা ও আণবিক জীববিদ্যার সাদৃশ্য লেখো।
জীবরসায়নবিদ্যা ও আণবিক জীববিদ্যার সাদৃশ্য –
- উভয় বিজ্ঞান শাখাতেই জৈব অণুর গঠন, সংশ্লেষণ ও কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়।
- উভয় বিজ্ঞান শাখার সাহায্যে RNA, প্রোটিন প্রভৃতি জৈব অণুর গঠন সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা লাভ করা সম্ভব হয়।
ফার্মাসি (Pharmacy) কী?
এটি একটি প্রায়োগিক জীববিদ্যা। এর সাহায্যে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ তৈরি, চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী ওষুধ প্রদান করা হয়।
মহাকাশ গবেষণায় জীববিদ্যা কীভাবে ভূমিকা পালন করে?
মহাকাশ গবেষণায় জীববিদ্যা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ক্লোরেল্লা (Chlorella) নামক এককোশী শৈবালকে মহাকাশযানে ব্যবহার করা হয়। মহাকাশচারীরা এই শৈবালকে খাদ্যরূপে গ্রহণ করে এবং ক্লোরেল্লা মহাকাশচারীর শ্বসনে নির্গত কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণ করে সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় খাদ্য তৈরি করে ও মহাকাশযানটিকে দূষিত গ্যাস মুক্ত করে। এ ছাড়া ক্লোরেল্লা দ্বারা নির্গত অক্সিজেন মহাকাশচারীর শ্বসনে ব্যবহৃত হয়।
এক্সোবায়োলজি (Exobiology) কী?
পৃথিবীর বাইরের কোনো গ্রহ বা উপগ্রহে জীবনের সন্ধান সংক্রান্ত জীববিদ্যাকে এক্সোবায়োলজি বলে। যেমন -চাঁদে, মঙ্গলগ্রহে জীবনের অনুসন্ধান।
বনপালনবিদ্যা (Forestry) কাকে বলে?
জীববিদ্যার যে শাখায় বনসংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ, বিজ্ঞানসম্মতভাবে গাছের লালনপালন, রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় এবং বনজ সম্পদের উন্নয়ন সম্পর্কে আলোচনা করা হয়, তাকে বনপালনবিদ্যা বা ফরেস্ট্রি বলে।
রেডিয়েশন বায়োলজি কাকে বলে?
যে জীববিদ্যার শাখায় জীবদেহের ওপর এবং তাদের শারীরবৃত্তীয় কার্যাবলির ওপর বিভিন্ন প্রকার তেজস্ক্রিয় রশ্মির প্রভাব সংক্রান্ত আলোচনা করা হয়, তাকে রেডিয়েশন বায়োলজি (Radia- tion Biology) বলে।
রেণুবিদ্যা কাকে বলে? এর গুরুত্ব কী?
রেণুবিদ্যা (Palynology) – উদ্ভিদবিদ্যার যে শাখাতে রেণুর গঠন ও প্রকৃতি সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়, তাকে রেণুবিদ্যা বা প্যালিনোলজি বলে।
গুরুত্ব – প্রত্নউদ্ভিদবিদ্যার অন্তর্গত রেণুবিদ্যার সাহায্যে সমুদ্রের বা মাটির নীচে কোন পাথরের স্তরে জীবাশ্ম জ্বালানি আছে তার সন্ধান পাওয়া যায়।
বংশগত রোগ নির্ণয় ও তার প্রতিকারে জীববিদ্যার ভূমিকা লেখো।
জীববিদ্যা ও জেনেটিক্সের সাহায্যে মানুষ বর্তমানে প্রায় চার হাজারের মতো বংশগত রোগকে শনাক্ত করতে পেরেছে। যেমন – হিমোফিলিয়া, থ্যালাসেমিয়া, কয়েক ধরনের ক্যানসার প্রভৃতি। বর্তমানে জিনথেরাপি, ব্লাড ট্রান্সপ্লান্ট, কেমোথেরাপি প্রভৃতি বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি দ্বারা এই সমস্ত রোগের প্রকোপ অনেকাংশে কমানো সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া জেনেটিক কাউন্সেলিং-এর মাধ্যমে বর্তমানে বংশগত রোগাক্রান্ত সন্তান উৎপাদনও অনেক কমিয়ে আনা হয়েছে।
মহামারি দূরীকরণে জীববিদ্যার ভূমিকা অপরিসীম – কারণসহ ব্যাখ্যা করো।
মহামারি যেমন – কলেরা, প্লেগ, ম্যালেরিয়া প্রভৃতি দুরীকরণে জীববিদ্যার ভূমিকা অপরিসীম। জীববিদ্যার রোগবিদ্যা (Pathology) শাখার সাহায্যে মহামারি সৃষ্টিকারী রোগগুলির জন্য দায়ী জীবাণুদের চেনা, তাদের সংক্রমণ পদ্ধতি প্রভৃতি জানা সম্ভব হয়েছে। এই সমস্ত জীবাণুকে ধ্বংস করে, তাদের বাহক প্রাণীর প্রজনন ক্ষেত্র নষ্ট করে এবং ভ্যাকসিন প্রয়োগ করে মহামারিগুলিকে বর্তমানে পৃথিবী থেকে দূর করা সম্ভব হয়েছে।
জীববিদ্যার জনক কাকে ও কেন বলা হয়। ‘জীববিদ্যা’ শব্দটি কে প্রথম ব্যবহার করেন?
জীববিদ্যার জনক (Father of Biology) বলা হয় গ্রিক দার্শনিক ও বিজ্ঞানী অ্যারিস্টট্লকে (Aristotle, 384-322 BC)।
রিস্টট্লকে ‘জীববিদ্যার জনক’ বলার কারণ হল তিনিই প্রথম জীববিজ্ঞানী যিনি সমস্ত জীবকে প্রকৃতি ও গঠন অনুযায়ী শ্রেণিবিন্যস্ত (hierarchy) করেছিলেন এবং সরল জীবদের স্থান দিয়েছিলেন হায়ারার্কির নীচে এবং জটিল জীবদের স্থাপন করেছিলেন হায়ারার্কির ওপরে। তিনিই প্রথম বলেছিলেন, পৃথিবীতে সরল জীব থেকে জটিল জীবের সৃষ্টি হয়। এই ধারণাকে ‘স্ক্যালা ন্যাচুরি’ (Scala Naturae) বা ‘সৃষ্টির মহান শৃঙ্খল’ রূপে অভিহিত করা হয়।
‘জীববিদ্যা’ বা ‘Biology’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন ল্যামার্ক ও ট্রাভিরেনাস (Lamarck and Traviranus, 1801)। (Biology; ল্যাটিন উৎস: Bios life, logos discourse)
আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রে জীববিদ্যার প্রয়োগ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা দাও।
আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রে জীববিদ্যা রোগ নির্ণয়ে, রোগ নিরাময়ে ও রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- রোগ নির্ণয়ে ভূমিকা – রোগীর রক্ত, কফ, মলমূত্র প্রভৃতি অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে পরীক্ষা করে রোগের জন্য দায়ী জীবাণুকে চিহ্নিত করা যায়। এ ছাড়া জ্বরের পরিমাণ নির্ণয়ে থার্মোমিটার; রক্তের চাপ নির্ণয়ে স্ফিগমোম্যানোমিটার; হূৎপিণ্ডের অবস্থা নির্ণয়ে ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাফ; মস্তিষ্ক, সুষুম্নাকাণ্ড, অস্থিসন্ধি প্রভৃতি অঙ্গের গঠনগত ত্রুটি ও রোগ নির্ণয়ে – MRI প্রভৃতি ব্যবহৃত হয়।
- রোগ নিরাময়ে ভূমিকা – আধুনিক জীববিদ্যার সাহায্যে রোগ নিরাময় খুবই সহজসাধ্য হয়ে উঠেছে। ম্যালেরিয়া, উচ্চরক্তচাপ, নিউমোনিয়া প্রভৃতি রোগের চিকিৎসার জন্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তৈরি অ্যান্টিবায়োটিক, ভ্যাকসিন প্রভৃতি প্রয়োগ করা হচ্ছে। এ ছাড়া ক্যানসার রোগ নিরাময়ে রেডিয়াম থেরাপি, কেমোথেরাপি, লেজার থেরাপি, দেহের বিভিন্ন অঙ্গ প্রতিস্থাপন প্রভৃতিও সহজেই করা সম্ভব হয়েছে।
- রোগ প্রতিকারে জীববিদ্যার প্রয়োগ – ড. জেনারের আবিষ্কৃত বসন্ত রোগের টিকা, লুই পাস্তুর আবিষ্কৃত জলাতঙ্কের টিকা বহু মানুষকে মারণরোগের হাত থেকে রক্ষা করেছে। বর্তমানে পৃথিবী থেকে পোলিয়ো নির্মূলকরণে পালস পোলিয়ো টিকাকরণ প্রভূত সাফল্য পেয়েছে।
- বংশগত রোগ নির্ণয়ে জীববিদ্যার ভূমিকা – অ্যালক্যাপটোনিউরিয়া, অ্যালবিনিজম, হিমোফিলিয়া, বর্ণান্ধতা প্রভৃতি রোগ নির্ণয়ে জেনেটিক্সের জ্ঞান প্রয়োগ করা হয়।

শিল্পক্ষেত্রে জীববিদ্যার ভূমিকা সংক্ষেপে আলোচনা করো।
জীববিদ্যা আধুনিক শিল্পকে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন দিক থেকে সাহায্য করছে। যেমন –
- বস্ত্র শিল্প (Textile Industry) – সংকরায়ণ পদ্ধতিতে তৈরি অধিক ফলনশীল তুলো, পাট প্রভৃতি এবং রেশমতন্তু ও পশম বস্ত্রশিল্পে প্রভূত উন্নতি ঘটিয়েছে।
- কাগজ শিল্প (Paper Industry) – বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ যেমন – বাঁশ, ঘাস, খড়, পাটকাঠি, আখের ছিবড়ে প্রভৃতি থেকে উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে কাগজ তৈরি করা হচ্ছে।
- কাঠ শিল্প (Wood Industry) – শাল, বাদাম, জারুল, গামার, হলক, সেগুন, পাইন প্রভৃতি গাছ থেকে স্লিপার, দরজা, জানালা, প্লাইউড প্রভৃতি তৈরির কাঠ পাওয়া যায়। বর্তমানে অণুবিস্তার পদ্ধতিতে এই সমস্ত উদ্ভিদের সংখ্যা অনেকাংশে বাড়ানো সম্ভব হয়েছে।
- চা-শিল্প (Tea Industry) – চা শিল্পে ব্যাসিলাস মেগাথেরিয়াম (Bacillus megatherium) নামক ব্যাকটেরিয়া প্রয়োগ করে স্বাদ ও গন্ধের উৎকর্ষতা বৃদ্ধি করা হয়েছে।
- চর্মশিল্প (Leather Industry) – বিভিন্ন জীবাণু ও ছত্রাক ব্যবহার করে চর্মশিল্পের প্রভূত উন্নতি ঘটানো হয়েছে। এক্ষেত্রে জীবাণু নিঃসৃত প্রোটিয়েজ উৎসেচক চামড়াকে ট্যান করতে সাহায্য করে।
- রবার শিল্প (Rubber Industry) – হিভিয়া ব্রাসিলিয়েনসিস নামক রবারগাছ থেকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে রবার উৎপাদন ঘটিয়ে রবার শিল্পের প্রভূত উন্নতি করা হয়েছে।

পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণে জীববিদ্যার ভূমিকা আলোচনা। করো।
বর্তমানে পরিবেশদূষণ হল মানুষের কাছে সবচেয়ে বড়ো সংকট। এই পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণে জীববিদ্যার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- বায়ুদূষণ রোধে – প্রচুর গাছপালা লাগানো, বনমহোৎসব, অরণ্য সপ্তাহ প্রভৃতি কর্মসূচি পালন করা হয়। গাছ দূষিত কার্বন ডাইঅক্সাইডকে বাতাস থেকে টেনে নিয়ে এবং বিশুদ্ধ অক্সিজেন বাতাসে ত্যাগ করে বায়ুকে অনেকাংশে দূষণমুক্ত রাখে।
- জলদূষণ রোধে – বিভিন্ন প্রকার শৈবাল মূখ্য ভূমিকা পালন করে। যেমন –
- শৈবাল খর জল থেকে কার্বনেট, বাইকার্বনেট শোষণ করে তা ব্যবহারের উপযুক্ত করে তোলে।
- কচুরিপানা নোংরা দূষিত জল থেকে ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, সালফেট, কোবাল্ট, নিকেল, লেড ও মার্কারির মতো ভারী ধাতু শোষণ করে জলকে ব্যবহারযোগ্য করে তোলে।
- কিছু কিছু ছত্রাকের (যেমন – পেনিসিলিয়াম) দেহনিঃসৃত অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতিতে জলাধারের চারপাশে ক্ষতিকারক ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে না।
- সিউডোমোনাস ব্যাকটেরিয়া সমুদ্রের জলে ভাসমান তৈলবিন্দুকে বিশ্লিষ্ট করে জলকে দূষণমুক্ত রাখে এবং এর দ্বারা সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়।
- মৃত্তিকা দূষণ রোধে – বর্তমানে বিভিন্ন প্রকার ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক ব্যবহৃত হয়। এরা মাটিতে বর্তমান বিভিন্ন জটিল জৈব যৌগকে বিয়োজিত করে সরল উপাদানে পরিণত করে। ফলে মাটির উপাদানের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রিত হয়।
জিন প্রযুক্তিতে আধুনিক জীববিদ্যার প্রয়োগ সম্পর্কে আলোচনা করো।
কোনো সজীব কোশের কোনো ত্রুটিপূর্ণ জিনকে অন্য কোনো সমজাতীয় জীবের DNA থেকে নেওয়া সুস্থ ও স্বাভাবিক জিন দ্বারা প্রতিস্থাপিত করে ত্রুটিপূর্ণ জিনকে ত্রুটিমুক্ত করা অথবা কোনো সজীব কোশের কোনো জিনে অপর কোনো কোশের DNA স্থিত কোনো জিন কৃত্রিম উপায়ে প্রবেশ করিয়ে সেই জীবের জিনবিন্যাসের পরিবর্তন করাকে জিন প্রযুক্তি (Genetic engineering) বলে।
জীববিদ্যার এই আধুনিক শাখাটির সাহায্যে বর্তমানে চিকিৎসাক্ষেত্রে, কৃষিক্ষেত্রে, খাদ্য ও পানীয় প্রস্তুতিতে ব্যাপক উপকার পাওয়া যাচ্ছে।
ট্রান্সজেনেসিস ও ট্রান্সজেনিক জীব কাকে বলে? উদাহরণ দাও।
জৈবপ্রযুক্তিবিদ্যা বা বায়োটেকনোলজির দ্বারা একটি নির্দিষ্ট জীবের জিন অন্য কোনো জীবের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে নতুন জিনোটাইপসম্পন্ন ও আরও উন্নতপ্রকার জীব সৃষ্টির পদ্ধতিকে ট্রান্সজেনেসিস বলে। ট্রান্সজেনেসিস পদ্ধতিতে সৃষ্টি করা জীবেদের বলা হয় ট্রান্সজেনিক জীব।
উদাহরণ – বিটি কটন, গোল্ডেন রাইস, রোসি (ট্রান্সজেনিক গোরু) ইত্যাদি।
ট্রান্সজেনেসিস পদ্ধতির গুরুত্বগুলি কী কী?
ট্রান্সজালসিস দশুতির গুরুত্বগুলি হল-
- শস্য উৎপাদনকারী উদ্ভিদে এবং মাছের দেহে মানুষের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের প্রবেশের মাধ্যমে ট্রান্সজেনেসিস ঘটিয়ে শস্য এবং মাছেদের উৎপাদন প্রচুর বাড়ানো হচ্ছে।
- বর্তমানে Bt জিন প্রবেশ করিয়ে পতঙ্গ প্রতিরোধী ও রোগ প্রতিরোধে সক্ষম বেগুন, টম্যাটো এবং bxn জিনযুক্ত আলু ফলানো হচ্ছে। ধানে ড্যাফোডিল জিন প্রবেশ করিয়ে অত্যধিক ভিটামিনসমৃদ্ধ সোনালি চাল (Golden rice) তৈরি করা হচ্ছে।
- বর্তমানে মানুষের দেহে নানা ভাইরাস প্রতিরোধী পদার্থ ইন্টারফেরন প্রবেশ করিয়ে রোগপ্রতিরোধী ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
জেনেটিক্স বা বংশগতিবিদ্যা কাকে বলে? এর গুরুত্ব কী?
জীববিদ্যার যে শাখায় জীবের বংশগত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, বংশপরম্পরায় বংশগত বৈশিষ্ট্যের সঞ্চারণনীতি, প্রকরণ সৃষ্টি প্রভৃতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়, তাকে বংশগতিবিদ্যা (Genetics) বলে।
গুরুত্ব –
- জেনেটিক্সের জ্ঞানের ওপর নির্ভর করে বর্তমানে বিভিন্ন রকমের শস্য উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। এই সমস্ত শসাগুলির উৎপাদন ক্ষমতা ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেশি হয়।
- গোরু, ভেড়া, মোষ, পোলট্রি বার্ড প্রভৃতি প্রাণীর সংকরায়ণ ঘটিয়ে অধিক উৎপাদনক্ষম করে তোলা হয়েছে।
প্রত্নজীববিদ্যা বলতে কী বোঝো? এর উপশাখাগুলির নাম লেখো।
জীববিদ্যার যে শাখায় জীবাশ্মের পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে বর্তমানে অবলুপ্ত প্রাগৈতিহাসিক জীব সম্পর্কে আলোচনা করা হয়, তাকে প্রত্নজীববিদ্যা (Paleontology or Paleobiology) বলে।

বর্তমানে প্রতুজীববিদ্যা দুটি উপশাখায় বিভক্ত। যথা –
- প্যালিওবোটানি – উদ্ভিদ জীবাশ্ম সম্পর্কে আলোচনা করা হয়।
- প্যালিওলজি – প্রাণী জীবাশ্ম সম্পর্কে আলোচনা করা হয়।
মাইক্রোবায়োলজি ও প্যারাসাইটোলজি কাকে বলে?
সাইক্রোবায়োলজি – জীববিদ্যার যে শাখায় আণুবীক্ষণিক জীব (যেমন – ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস প্রভৃতি) -এর বাসস্থান, প্রকৃতি, গঠন, বংশবিস্তার, গুরুত্ব ও অপকারিতা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়, তাকে মাইক্রোবায়োলজি বলে।
প্যারাসাইটোলজি – জীববিদ্যার যে শাখায় উদ্ভিদ ও প্রাণীদেহের অন্তঃ ও বহিঃপরজীবী জীবের জীবনচক্র, সংক্রমণ পদ্ধতি এবং রোগ সৃষ্টির প্রকৃতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়, তাকে প্যারাসাইটোলজি (Parasitology) বলা হয়।
ভূগোল এবং জীববিদ্যার সমন্বয়ে গঠিত বিজ্ঞান শাখার নাম লেখো। জীববিদ্যায় এই শাখার গুরুত্ব কী?
ভূগোল এবং জীববিদ্যার সমন্বয়ে গঠিত বিজ্ঞান শাখাকে বলা হয় বায়োজিওগ্রাফি (Biogeography)।
গুরুত্ব – জীবজগতে বিভিন্ন জীব বিভিন্ন ভৌগোলিক পরিবেশে বাস করে। ভৌগোলিক জীববিদ্যা বা বায়োজিওগ্রাফির সাহায্যে আমরা বিভিন্ন জীবের ভৌগোলিক অবস্থান ও সেই পরিবেশের সঙ্গে জীবের অন্তঃসম্পর্ক সম্বন্ধে ধারণা লাভ করতে পারি।
জুলজি (Zoology) এবং বটানি (Botany) কাকে বলে লেখো
- জুলজি (Zoology) – জীববিজ্ঞানের যে শাখায় প্রাণী সম্পর্কিত বিষয়ে আলোচনা করা হয়, তাকে জুলজি (Zoology) বলা হয়। ‘Zoology’ শব্দটি গ্রিক শব্দ ‘Zoon’ (প্রাণী/animal) এবং ‘logos’ (আন/Knowledge)-র সমন্বয়ে গঠিত।
- বটানি (Botany) – জীববিজ্ঞানের যে শাখায় উদ্ভিদ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়, তাকে বটানি (Botany) বলা হয়। Botany’ শব্দটি গ্রিক শব্দ ‘Botane’ (Plant) থেকে উদ্ভব হয়েছে, যার অর্থ গাছপালা বা উদ্ভিদ।
তৈল সন্ধানে কীভাবে আধুনিক জীববিদ্যা সাহায্য করে?
তৈলের অবস্থান নির্ণয়ে জীববিদ্যার ভূমিকা – পেট্রোল, ডিজেল ইত্যাদি তেল বর্তমান সভ্যতার ধারক। রেণুবিদ্যা (Palynology), প্রত্নজীববিদ্যা (Palaeontology) সম্পর্কিত জ্ঞান শিলাস্তরের গভীরে তেলের অবস্থান নির্দেশ করে। রেণুবিদ্যা হল উদ্ভিদবিদ্যার একটি শাখা যেখানে রেণুর প্রকৃতি ও গঠন প্রণালী সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা যায় আর প্রত্নজীববিদ্যা বলতে বোঝায় বিজ্ঞানের সেই শাখা যেখানে মাটির নীচে চাপা পড়া উদ্ভিদ অংশ ও রেণু সম্পর্কে জানতে সাহায্য করে। রেণুবিদ্যা ভূবিদ্যার অণুপুরক রূপে তৈল সন্ধানে সাহায্য করে।
এ ছাড়া এককোশী প্রাণী ফোরামিনিফেরার জীবাশ্ম তেলের সম্ভাব্য অবস্থান নির্দেশ করে।
ওষুধ তৈরিতে জীববিদ্যার গুরুত্ব উল্লেখ করো।
ওষুধ তৈরিতে জীববিদ্যার গুরুত্ব/ ভূমিকা –
- জীববিদ্যার এবং প্রযুক্তিবিদ্যার সাহায্যে বিভিন্ন অণুজীব থেকে বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিক (যেমন – পেনিসিলিন, স্ট্রেপটোমাইসিন, অ্যাম্পিসিলিন, এরিথ্রোমাইসিন প্রভৃতি) আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে।
- বিভিন্ন প্রাণীজাত পদার্থ থেকে বর্তমানে বহু গুরুত্বপূর্ণ ওষুষ আবিষ্কৃত হয়েছে। যেমন –
- সাপের বিষ থেকে ল্যাকোসিস,
- মৌমাছির বিষ থেকে এপিস,
- রোগাক্রান্ত কুকুরের লালারস থেকে জলাতঙ্ক রোগের ভ্যাকসিন হাইড্রোফোবিনাম প্রভৃতি।
- বিভিন্ন ভেষজ উদ্ভিদের নির্যাস থেকে গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ তৈরি হয়। যেমন – সর্পগন্ধা থেকে প্রাপ্ত রেসারপিন উচ্চরন্তচাপ প্রশমনকারী ওষুধ তৈরিতে, সিঙ্কোনা গাছ থেকে প্রাপ্ত কুইনাইন ম্যালেরিয়া রোগের ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
বাস্তুবিদ্যা বা বাস্তুসংস্থানবিদ্যা এবং বিন্যাসবিধি নামক জীববিদ্যার শাখা দুটিতে কোন্ কোন্ বিষয় অধ্যয়ন করা হয়? এদের দুটি করে উদাহরণ দাও।
| জীববিদ্যার শাখা | অধ্যয়নের বিষয় | উদাহরণ |
| বাস্তুসংস্থানবিদ্যা | পরিবেশের সঙ্গে উদ্ভিদ ও প্রাণীর আন্তঃক্রিয়া। | খাদ্যশৃঙ্খল, শক্তিপ্রবাহ, জীবভর, খাদ্যজাল প্রভৃতি। |
| বিন্যাসবিধি | জীবের শনাক্তকরণ, নামকরণ ও শ্রেণিবিন্যাসকরণ। | হায়ারার্কি, কী (Key) গঠন, দ্বিপদ নামকরণ প্রভৃতি। |
রসায়নবিদ্যার সাহায্যে প্রাণীদেহের কোন্ কোন্ গঠন ও শারীরবৃত্তীয় ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা যায়? উদাহরণ দাও।
| সম্পর্কিত বিজ্ঞান | গঠন/পদ্ধতি | উদাহরণ |
| কোশপর্দা | লিপিড ও প্রোটিনের গঠন ও সজ্জাবিন্যাস। | |
| রসায়নবিদ্যা | দেহে অক্সিজেন পরিবহণ | অক্সিহিমোগ্লোবিন যৌগ গঠন। |
| রেচন | ইউরিয়া উৎপাদন/খনিজ লবণ শোষণ ও পরিত্যাগ। |
পদার্থবিদ্যার সাহায্যে উদ্ভিদদেহের কোন্ কোন্ শারীরবৃত্তীয় ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা যায়? প্রতিটির উদাহরণ দাও।
| সম্পর্কিত বিজ্ঞান | গঠন/পদ্ধতি | উদাহরণ |
| অভিস্রবণ | মূলরোম দ্বারা জল শোষণ ও পাতায় পরিবহণ। | |
| পদার্থবিদ্যা | বাষ্পমোচন ও ব্যাপন | পত্ররন্ধ্রের মাধ্যমে জলীয় বাষ্পের নির্গমন। |
| আলোকপর্যায়বৃত্তি | ফুল ফোটাতে বিভিন্ন আলোক তরঙ্গদৈর্ঘ্যের প্রভাব। |
আজকের এই আর্টিকেলে আমরা নবম শ্রেণীর জীবন বিজ্ঞানের প্রথম অধ্যায় ‘জীবন ও তার বৈচিত্র্য’ -এর অন্তর্গত ‘জীববিদ্যা হল জীবনের রীতি ও প্রক্রিয়া এবং তারা বৈচিত্রের অধ্যয়ন’ অংশের সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলো নবম শ্রেণীর পরীক্ষা এবং যারা ভবিষ্যতে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেবেন, তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আশা করি, আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে আসবে। যদি কোনো প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থাকে, তবে আমাদের টেলিগ্রামে যোগাযোগ করতে পারেন; আমরা উত্তর দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। এছাড়া, লেখাটি প্রয়োজনীয় মনে হলে আপনার বন্ধু বা সহপাঠীদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ।





মন্তব্য করুন