নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – পরিবেশ ও তার সম্পদ – প্রাকৃতিক সম্পদ এবং তাদের টেকসই/স্থিতিশীল ব্যবহার – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

Souvick

এই আর্টিকলে আমরা নবম শ্রেণীর জীবন বিজ্ঞানের পঞ্চম অধ্যায় ‘পরিবেশ ও তার সম্পদ’ -এর অন্তর্গত ‘প্রাকৃতিক সম্পদ এবং তাদের টেকসই/স্থিতিশীল ব্যবহার’ অংশের গুরুত্বপূর্ণ রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করব। পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) -এর সিলেবাস অনুযায়ী আসন্ন ইউনিট টেস্ট বা স্কুল পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এই প্রশ্নগুলো অত্যন্ত জরুরি।

পরিবেশ ও তার সম্পদ-প্রাকৃতিক সম্পদ এবং তাদের টেকসই-স্থিতিশীল ব্যবহার
Contents Show

প্রাকৃতিক সম্পদ কাকে বলে? ছকের সাহায্যে প্রাকৃতিক সম্পদের শ্রেণিবিভাগ করো।

প্রাকৃতিক সম্পদ (Natural Resources) – জীবেরা জীবনধারণের জন্য পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল, বারিমণ্ডল ও শিলামণ্ডলে উপস্থিত যে-সমস্ত সজীব ও জড় উপাদান প্রকৃতি থেকে গ্রহণ করে, তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ বলা হয়। মানুষ প্রাকৃতিক সম্পদগুলিকে জীবনধারণ, সংস্কৃতি, স্বাচ্ছন্দ্য এবং উন্নতির জন্য প্রকৃতি থেকে সরাসরি গ্রহণ করে।

প্রাকৃতিক সম্পদের প্রকারভেদ –

রাসায়নিক উপাদানের ওপর ভিত্তি করে –

প্রাকৃতিক সম্পদ

প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাপ্তির ওপর নির্ভর করে –

প্রাকৃতিক সম্পদের প্রকারভেদ

প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা আলোচনা করো।

প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা – প্রকৃতির বিভিন্ন বিরল প্রাণী এবং উদ্ভিদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা যায়। প্রাকৃতিক সম্পদ যথাযোগ্য ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে ব্যবহার করা যায়। প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয় ও ক্ষয় রোধ করা যায়। প্রাকৃতিক সম্পদকে সুষ্ঠু ও যথাযথ ভাবে ব্যবহার করে মানবকল্যাণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন করা যায়। বাস্তুতান্ত্রিক পরিবেশকে স্বাভাবিক রাখা যায় এবং খাদ্যশৃঙ্খলকে সঠিকভাবে বজায় রাখা যায়। মানবসমাজে প্রাকৃতিক সম্পদের মাধ্যমে আনন্দ ও বিনোদনের ব্যবস্থা করা যায়।

বন কাকে বলে? বনের কার্যগুলি উল্লেখ করো।

বন (Forest) – যে ব্যাপক স্ব-উজ্জীবনক্ষম বায়োটিক কমিউনিটি স্থলভাগে বিস্তৃতি লাভ করে এবং প্রধানত বৃক্ষ, গুল্ম, বীরুৎ উদ্ভিদ দ্বারা আচ্ছাদিত ও জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ হয়, তাকে বন বলে।

বনের কার্যসমূহ –

জলসম্পদ সংরক্ষণ –

  • উদ্ভিদ তার শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়াকলাপের জন্য প্রয়োজনীয় জল মাটি থেকে শোষণ করে এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত জল বাষ্পমোচনের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলে জলীয়বাষ্পরূপে ত্যাগ করে। এর ফলে পৃথিবীপৃষ্ঠের তাপমাত্রা খানিকটা কমে যায়। আবার, বাতাসে জলীয়বাষ্প ঘনীভূত হয়ে বৃষ্টিপাত ঘটায় এবং পরিবেশে জলের সাম্যতা বজায় থাকে।
  • উদ্ভিদের মূল মাটিকে ছিদ্রযুক্ত করে। ফলে, বৃষ্টির জল মাটির বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে ভৌম জলস্তরে মেশে। এ ছাড়া বনের মেঝেতে থাকা পচা পাতা জলকে পরিস্তুত করতে সাহায্য করে। জলের মধ্যে থাকা পরিপোষক \(NO_3^-\)-কে ভিজে মাটিতে থাকা ব্যাকটেরিয়া ডিনাইট্রিফিকেশন পদ্ধতিতে N₂ -এ পরিণত করে। ফলে, অ্যালগাল ব্লুম তৈরি হতে পারে না।

বায়ুমণ্ডলের কার্য নিয়ন্ত্রণ – কোনো অঞ্চলের উষ্ণতা, বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত প্রভৃতি বনাঞ্চল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। তাছাড়া পরিবেশে O₂ ও CO₂ -র ভারসাম্য বজায় রাখতে বন সাহায্য করে।

সালোকসংশ্লেষের জন্য উদ্ভিদ বাতাস থেকে CO₂ শোষণ করে ও সালোকসংশ্লেষের ফলে উৎপন্ন O₂ পরিবেশে মুক্ত করে।

সালোকসংশ্লেষের জন্য উদ্ভিদ বাতাস থেকে CO₂ শোষণ

মাটি ক্ষয় নিয়ন্ত্রণ – বনের উদ্ভিদ ও বৃক্ষের জালকাকার মূল, শাখামূলের বিস্তার ভূত্বকের উপরিভাগের উর্বর মাটিকণাগুলিকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে থাকে। এর ফলে তীব্র বায়ুপ্রবাহ বা জলস্রোত মাটির কণাগুলিকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যেতে পারে না। এইভাবে বনভূমি মাটির ক্ষয় রোধ করে।

স্থানীয় খাদ্য ও আশ্রয় দান –

  • বিভিন্ন কীটপতঙ্গ, প্রাণী এবং পাখি বনে বাস করে। বনের বিভিন্ন স্তর ও স্তরে উৎপাদিত খাদ্য (যেমন – পাতা, ফুল, ফল, বীজ, বাদাম, গাছের ছাল প্রভৃতি) বনের প্রাণীদের খাদ্য ও আশ্রয় দান করে।
  • বহু উপজাতি বনে বাস করে। এই সমস্ত উপজাতি সম্প্রদায় খাদ্য, আশ্রয়, ওষুধ, জ্বালানি প্রভৃতির জন্য সম্পূর্ণরূপে বনের ওপর নির্ভর করে।

উৎপাদনমূলক ব্যবহার –

বন থেকে আমরা যে-সকল উপাদান পাই তাদেরকে বনজ সম্পদ বলা হয়। বিভিন্ন প্রকার বনজ সম্পদ নানা ভাবে ব্যবহৃত হয়। যেমন –

  • বিভিন্ন উদ্ভিদের ফল, মধু ইত্যাদি খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
  • নরম কাঠ, বাঁশ, সাবাই ঘাস থেকে কাগজ প্রস্তুত হয়।
  • শাল, সেগুন, মেহগনি, বাবলা প্রভৃতি উদ্ভিদের কাঠ থেকে আসবাবপত্র তৈরি হয়। কালমেঘ, সর্পগন্ধা, সিঙ্কোনা প্রভৃতি ভেষজ উদ্ভিদের থেকে নানা ওষুধ প্রস্তুত করা হয়।

বনধ্বংস বা ডিফরেস্টেশন কাকে বলে? বনধ্বংসের কারণগুলি সংক্ষেপে আলোচনা করো।

বনধ্বংস বা ডিফরেস্টেশন (Deforestation) – প্রাকৃতিক কারণে বা মানুষের ক্রিয়াকলাপের ফলে বৃহত্তর অর্থে বনের স্বাভাবিক বাসস্থান, উদ্ভিদ, বৃক্ষ প্রভৃতির দীর্ঘস্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে বনধ্বংস বা ডিফরেস্টেশন বলে।

বনভূমি ধ্বংসের কারণসমূহ –

  • জনসংখ্যা বিস্ফোরণ – জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষ বাসস্থান নির্মাণ, শিল্পাঞ্চল স্থাপন, বাঁধ তৈরি, রাস্তাঘাট নির্মাণ প্রভৃতির উদ্দেশ্যে নির্বিচারে বনভূমি ধ্বংস করেছে।
  • খনি ও খননকার্য – বিভিন্ন আকরিক সংগ্রহের উদ্দেশ্যে মানুষ বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল কেটে নষ্ট করে ফেলেছে।
  • নিত্য ব্যবহার্য জিনিস সংগ্রহ – বনভূমি থেকে রবার, ওষুধ, জ্বালানি কাঠ ও টিম্বার সংগ্রহের ফলে বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে। এ ছাড়া রেললাইন প্রসারে, নদীতে বাঁধ দেওয়ার জন্য বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে।
  • অত্যধিক গবাদিপশুর বিচরণ বা ওভার গ্রেজিং – বনভূমিতে ওভারগ্রেজিং -এর ফলে বন ধ্বংস হতে পারে। গবাদিপশু অনেকসময় মূলসমেত গাছ খেয়ে ফেলে। এর ফলে বনভূমির দীর্ঘস্থায়ী আয়তনের হ্রাস ঘটে।
  • ক্ষতিকারক পেস্টের উপদ্রব – ক্ষতিকারক পেস্ট ছোটো চারাগাছ, পাতা, ফুল প্রভৃতির প্রভূত ক্ষতি করে, ফলে অনেকক্ষেত্রে বনভূমি ধ্বংসের কারণ হয়ে ওঠে।
  • আবহাওয়া – বন্যা, হড়কাবান, ভূমিকম্প এবং ভূমিধসের ফলে বনভূমি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
  • শিল্পের প্রয়োজনে – খনিজ শিল্প থেকে যে দূষক পদার্থগুলি নির্গত হয়, তা আশপাশের বনাঞ্চলের ওপর প্রভাব ফেলে। এ ছাড়াও শিল্পের প্রয়োজনে, রাস্তা সম্প্রসারণের জন্যও বহু গাছ কেটে ফেলা হয়।
  • দাবানল বা ফরেস্ট ফায়ার – বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণে বনভূমিতে যে আগুন। লেগে যায়, তাকে দাবানল বলে। দাবানল বনভূমিকে মারাত্মক-ভাবে নষ্ট করে দেয়। ছোটো বড়ো সমস্ত উদ্ভিদ, বীজ, এমনকি হিউমাস পর্যন্ত পুড়ে। ধ্বংস হয়ে যায়।
দাবানল

বনভূমি ধ্বংস বা ডিফরেস্টেশনের ফলাফলগুলি আলোচনা করো।

বনভূমি ধ্বংসের ফলাফল –

মরুভূমি সৃষ্টি বা ডেজার্টিফিকেশন – বনভূমি ধ্বংসের ফলে ভূত্বকের উপরিভাগের। মাটির কণাগুলি আলগা হয়ে যায়। ফলে তীব্র বায়ুপ্রবাহ ও জলস্রোতের টানে আলগা মাটির কণাগুলি অপসারিত হয়। উর্বর মাটির কণা ও হিউমাসের অভাবে উদ্ভিদের বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং দীর্ঘসময় এই ঘটনা চলতে থাকলে এই স্থান ক্রমশ মরুভূমিতে পরিণত হয়।

মরুভূমি সৃষ্টি

জীববৈচিত্র্য ধ্বংস – বনভূমি হল অসংখ্য উদ্ভিদপ্রজাতি ও প্রাণীপ্রজাতির বাসস্থান। বনভূমি ধ্বংস হয়ে এইসমস্ত জীব প্রজাতি খাদ্য ও বাসস্থানের অভাবে ক্রমশ অবলুপ্ত হতে থাকে। যেমন-আসামে বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বনভূমি ধ্বংস হওয়ার ফলে লালপান্ডা, গোল্ডেন ল্যাঙ্গুর প্রভৃতি প্রাণীপ্রজাতি, কলশপত্রী, সর্পগন্ধা প্রভৃতি উদ্ভিদপ্রজাতির সংখ্যা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

পরিবেশদূষণ – বনভূমি ধ্বংস পরিবেশদূষণের প্রধান কারণ। উদ্ভিদ গ্রিনহাউস গ্যাস, CO₂ বায়ুমণ্ডল থেকে গ্রহণ করে এবং বাতাসে O₂ ত্যাগ করে পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখে। বনধ্বংস হলে বায়ুমণ্ডলে CO₂ -র পরিমাণ বাড়বে এবং O₂ -র পরিমাণ কমবে। ফলে, পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হবে। ফলে, CO₂ -এর পরিমাণ এতই বৃদ্ধি পাবে যে বিশ্ব উন্নায়ন (Global warming)-এর পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাবে এবং মেরুপ্রদেশের বরফ গলে যাবে, বন্যার সৃষ্টি হবে।

জলসম্পদ হ্রাস – বনভূমি পৃথিবীতে জলচক্র নিয়ন্ত্রণ করে। বনভূমি ধ্বংসের ফলে মেঘ সৃষ্টি এবং বৃষ্টিপাত ব্যাহত হবে, ফলে সামগ্রিকভাবে পৃথিবীতে জলসম্পদ সংরক্ষণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বন্যা, খরা প্রভৃতি – বনভূমি ধ্বংসের ফলে পৃথিবীতে বন্যা, খরা প্রভৃতি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঘটনা বাড়তে থাকে।

বন্যা ও খরা

পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা – শক্তিপ্রবাহ, জৈবভূরাসায়নিক চক্রের মাধ্যমে পৃথিবীতে সমস্ত বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষিত হয়। বনভূমি ধ্বংস হলে এই প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।

বনভূমি কীভাবে সংরক্ষণ করা যেতে পারে?

বনভূমি সংরক্ষণের উপায়সমূহ –

  • অকারণে গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে অতি পরিণত বা মৃত গাছ কাটা যেতে পারে। একই সঙ্গে সেই অঞ্চলে একাধিক নতুন গাছ লাগাতে হবে।
  • পরিবেশের সকল স্তরের মানুষদের বৃক্ষরোপণে উৎসাহ দিতে হবে।
  • বনভূমি অঞ্চলে অগ্নিদগ্ধ কোনো স্থান থাকলে সেখানে গাছ লাগানো যেতে পারে এবং বনভূমির বিভিন্ন প্রকার আগাছা নির্মূল করে তার জায়গায় নতুন গাছ লাগাতে হবে।
  • বনভূমির সকল গাছের ওপর সর্বদা নজরদারি রাখতে হবে যাতে বনভূমির গাছগুলি কোনোভাবে জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত না হয়।
  • সর্বোপরি সরকারি আইনের মাধ্যমে বিভিন্ন বনাঞ্চলে (অভরায়ণ্য, জাতীয় উদ্যান ইত্যাদি) গাছ কাটা নিষিদ্ধ করতে হবে।

জলের প্রধান ব্যবহারগুলি কী কী?

জলের ব্যবহার –

পানীয় জল (Drinking water) – বেঁচে থাকার জন্য জল একান্ত প্রয়োজনীয়। সাধারণত বাড়িতে পানীয় জল আমরা দুইভাবে পেতে পারি। যথা –

  • মিউনিসিপ্যাল বা পুরসভার জলসরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে এবং
  • মোটরচালিত পাম্প বা টিউবওয়েলের মাধ্যমে সংগৃহীত গ্রাউন্ড ওয়াটার। এছাড়াও, গৃহে স্নান, কাপড় ধোয়া, বাসন প্রভৃতি পরিষ্কারের জন্যও জলের প্রয়োজন হয়।
পানীয় জল সংগ্রহ

কৃষিকাজে জলের ব্যবহার – ভারতে প্রায় 60% মানুষের জীবিকা কৃষিকার্য এবং তাঁরা প্রায় 90% জল সেচকাজে ব্যবহার করেন। সেচকাজের মাধ্যমে কৃষকরা যথাযথভাবে ফসল ফলাতে সক্ষম হন।

কৃষিকাজে জলের ব্যবহার

শিল্পকার্যে জলের ব্যবহার – শিল্পে পদার্থ উৎপাদনের বিভিন্ন স্তরে জলের প্রয়োজন ঘটে। শিল্পে জল দ্রাবকরূপে, কাঁচামাল, কুল্যান্ট (Coolant) প্রভৃতি পরিবহণের মাধ্যমরূপে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।

প্রাণী ও উদ্ভিদের শারীরবৃত্তীয় কাজে – মাছ, কাঁকড়া, ঝিনুক প্রভৃতি জলচর প্রাণীর চাষের জন্য এবং গৃহস্থালির কাজে জল একান্ত প্রয়োজন। উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ার জন্যেও জলের প্রয়োজন হয়।

জলবিদ্যুৎ তৈরি – পার্বত্য অঞ্চলের খরস্রোতা নদীর জলের স্রোতে টারবাইনের সাহায্যে জলবিদ্যুৎ তৈরি করা হয়।

অগ্নিনির্বাপণ – অগ্নিনির্বাপক উপাদান রূপে জল ব্যাপক ভাবে ব্যবহৃত হয়।

জলের অতিব্যবহার ও সংকট সম্পর্কে ধারণা দাও।

জলের অতিব্যবহার –

যদিও জল নবীকরণযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ, কিন্তু অতিব্যবহারের ফলে জলের অভাব তৈরি হচ্ছে। অতিব্যবহারের ক্ষেত্রগুলি হল –

  • জনসংখ্যা বৃদ্ধি – জনসংখ্যা বৃদ্ধি জলের চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মানুষের ব্যবহারযোগ্য জল, গৃহনির্মাণের জন্য জল, পানীয় জলের চাহিদা মেটাতে গিয়ে মাটির তলায় জলের সঞ্চয় কমছে। এর ফলে ভূগর্ভস্থ জলের স্তরে অবক্ষয় ঘটছে।
  • শিল্পকারখানা বৃদ্ধি – শিল্পকারখানায় বিভিন্ন পদার্থ উৎপাদনের বিভিন্ন স্তরে জলের প্রয়োজন হয়। এর ফলে মিষ্টি জলের বাস্তুতন্ত্রে বড়োসড়ো ভাঙন ঘটে।
  • কৃষিকাজে ব্যবহার – ভারতবর্ষে কৃষিজীবী মানুষের সংখ্যা বেশি। মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বৃষ্টিপাত যথেষ্ট না হওয়ায় সেচের জলের ওপর নির্ভর করে কৃষিকাজ চলে। এর ফলে মাটির তলায় জমে থাকা জলের (Ground water) স্তর নামতে থাকে।

জলের অতিব্যবহারের ফলে তৈরি সংকট –

পানীয় জলের সমস্যা – বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিজ্ঞানীদের অনুমান আগামী 20 – 25 বছরের মধ্যে পৃথিবীর মিষ্টি জলের ভাণ্ডার নিঃশেষ হয়ে যাবে। বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় 2 বিলিয়ন এবং ভারতে কয়েক মিলিয়ন মানুষ চরম জলসংকটে জীবনধারণ করে।

বিশ্ব জল সংকট

কৃষিকাজে জলের অভাব – জনসংখ্যার মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধির ফলে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় 69% – 75% ভূগর্ভস্থ জল তোলা হয় কৃষিকাজের জন্য। স্বাভাবিকভাবেই মাটির নীচে জলতল ক্রমশ নীচে নেমে যাচ্ছে যা ভবিষ্যতে কৃষিকাজে ব্যবহৃত জলের চরম অভাব তৈরি করবে।

জলসংকট ও রোগের সমস্যা বৃদ্ধি – পশ্চিমবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চল আর্সেনিক দূষণে আক্রান্ত। ভূগর্ভস্থ জলের স্তর নেমে যাওয়াতেই এই আর্সেনিক দূষণ ঘটে ও মানুষের দেহে ব্ল্যাকফুট ডিজিজ ও অন্যান্য চর্মরোগ এবং পেটের রোগের সমস্যা বাড়িয়ে দেয়।

রেন ওয়াটার হারভেসটিং বা বৃষ্টির জল ধরে রেখে সংরক্ষণ বলতে কী বোঝো? এই সংরক্ষণ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা দাও।

বৃষ্টির জল ধরে রোখ সংরক্ষণ (Rain Water Harvesting) – পারকোলেশন পিট ও রিচার্জ কুয়ো খননের দ্বারা যে উন্নত পদ্ধতির সাহায্যে বর্ষাকালে বৃষ্টির জলকে সংগ্রহ করে মাটির নীচে পাঠানো হয় এবং বছরের অন্যান্য সময় এই গ্রাউন্ড ওয়াটারকে প্রয়োজন অনুযায়ী তুলে সেচ বা দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করা হয়, তাকে রেন ওয়াটার হারভেসটিং বা বৃষ্টির জল ধরে রেখে সংরক্ষণ বলা হয়।

বৃষ্টির জল ধরে রেখে সংরক্ষণ ব্যবস্থা – এই সংরক্ষণ ব্যবস্থা শহরাঞ্চলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কারণ শহরে উন্মুক্ত বা অনাবৃত মাটি খুব কম থাকে। বেশিরভাগ স্থানই কংক্রিটের আচ্ছাদনে আবৃত থাকে। এক্ষেত্রে বৃষ্টির জলকে সংগ্রহ করে বিশেষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মাটির নীচে পাঠানো হয় এবং গ্রাউন্ড ওয়াটার -এর পরিমাণ বাড়ানো হয়। সংরক্ষণ ব্যবস্থাটি নিম্নলিখিতভাবে তৈরি করা হয় –

  • ছিদ্রযুক্ত কংক্রিট স্ল্যাব দিয়ে ঢাকা একটি পারকোলেশন পিট (কূপ) বানানো হয়।
  • পিটের পাশে একটু নীচে থাকে রিচার্জ কুয়ো (1 মিটার ব্যাস এবং 3 মিটার গভীরতাযুক্ত)। পিটের সঙ্গে একটি পাইপ দ্বারা কুয়ো যুক্ত থাকে।
  • বাড়ির ছাদ-এর সঙ্গে আর একটি পাইপ লাইন দ্বারা পিট যুক্ত থাকে।
  • বৃষ্টির সময় জল পাইপ লাইনের মধ্যে দিয়ে প্রথমে পিটে আসে তারপর আউটলেট পাইপের দ্বারা রিচার্জ কুয়োতে এসে জমা হয়।
  • কুয়ো থেকে জল চুঁইয়ে চুঁইয়ে মাটির তলায় প্রবেশ করে এবং গ্রাউন্ড ওয়াটারের পরিমাণ বৃদ্ধি করে।
রেন ওয়াটার হারভেসটিং-এর জন্য পারকোলেশন পিট ও রিচার্জ কুয়োর গঠন

বাড়ির ছাদে বৃষ্টির জল সংরক্ষণ কীভাবে করা যায় তা বর্ণনা করো।

বাড়ির ছাদে বৃষ্টির জল সংরক্ষণের উপায় – শহরাঞ্চলে বাড়ির ছাদে এই পদ্ধতিতে বৃষ্টির জল সংরক্ষণ করা হয়-

  • বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর প্রথম 5-6 মিনিট বৃষ্টির জল ছাদের সঙ্গে যুক্ত পাইপলাইনদিকে বের করে দেওয়া হয় (এই জলে ছাদের ময়লা ও নানা জীবাণু থাকে)।
  • এরপর ছাদের জল পাইপলাইনের মাধ্যমে ছাদের অপরিশোধিত নীচের নির্দিষ্ট ট্যাংকে সংগ্রহ করা হয়।
  • এই অপরিশোধিত জলকে সূক্ষ্ম জালের দ্বারা ফিলটার করে অপর একটি ট্যাংকে সংগৃহীত করা হয়।
  • এইভাবে সংগৃহীত জলকে বালি, কাঁকর ও কাঠকয়লার মধ্যে দিয়ে পাঠিয়ে পানীয় জল হিসেবেও গ্রহণ করা যায়।
  • অপরিশোধিত জল দিয়ে ঘরের অন্যান্য কাজ করা যায়।
বাড়ির সঙ্গে যুক্ত রেন ওয়াটার হারভেসটিং ব্যবস্থা

কৃষিবিদ্যা বলতে কী বোঝো? কৃষিকাজের মাধ্যমে মানুষ কী কী খাদ্য উৎপন্ন করে তার একটি তালিকা তৈরি করো।

কৃষিবিদ্যা (Agriculture) – উদ্ভিদবিদ্যার যে শাখায় ফসল উৎপাদন, জমি তৈরি, শস্যের উন্নত প্রজাতি সৃষ্টি, চাষবাস, বাজারজাতকরণ এবং বিভিন্ন ফসলের, গৃহপালিত পশুপাখির লালনপালন ও উৎপাদন সম্পর্কে আলোচনা করা হয়, তাকে কৃষিবিদ্যা বলা হয়।

কৃষিকাজের মাধ্যমে উৎপাদিত ফসল –

ফসলের প্রকৃতি (Nature of Crop)উদাহরণ (Examples)
দানাশস্য (Cereals)ধান, গম, যব, ভুট্টা, বার্লি, সরগাম প্রভৃতি (কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ খাদ্য)।
ডালশস্য (Pulses)ছোলা, মটর, মুগ, মশুর, রাজমা প্রভৃতি (প্রোটিন সমৃদ্ধ খাদ্য)।
তৈলবীজ (Oil seed)তুলোবীজ, তিল, সরষে, নারকেল, সূর্যমুখী, তিসি প্রভৃতি (ফ্যাট সমৃদ্ধ খাদ্য)।
বাদাম বা শুকনো ফল (Nuts or Dried fruits)আমন্ড, কাজুবাদাম, পেস্তা, অ্যাপ্রিকট, খেজুর প্রভৃতি (প্রোটিন ও ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাদ্য)।
ফল (Fruits)আম, আপেল, কলা, লেবু, পেয়ারা, পেঁপে, তরমুজ, আঙুর, বেদানা প্রভৃতি (ভিটামিন, খনিজ লবণ, রাফেজ, প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট ও ফ্যাট সমৃদ্ধ খাদ্য)।
সবজি (Vegetables)কুমড়ো, টম্যাটো, বাঁধাকপি, বেগুন, পালংশাক, নটেশাক, লেটুস প্রভৃতি (ভিটামিন, খনিজ লবণ, প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাট ও রাফেজ সমৃদ্ধ খাদ্য)।
মূল (Roots)মুলো, গাজর, বিট, রাঙাআলু প্রভৃতি।
কাণ্ড (Stems)আলু, কচু, ওল প্রভৃতি।
মশলা (Spices)লংকা, হলুদ, আদা, গোলমরিচ, পোস্ত, এলাচ, লবঙ্গ, দারুচিনি প্রভৃতি।
অন্যান্য ফসল (Other crops)তামাক, চা, কফি, কোকো প্রভৃতি।

খাদ্য কী? খাদ্যের বিভিন্ন উৎসগুলি উল্লেখ করো।

খাদ্য – যেসব আহার্য সামগ্রী গ্রহণের মাধ্যমে দেহের পুষ্টি, বৃদ্ধি হয়; দেহ সুস্থ থাকে, তাদের খাদ্য বলে। বেশিরভাগ খাদ্যেরই উৎস হল উদ্ভিদ। খাদ্যের উৎসগুলিকে নিম্নলিখিত কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায় –

  • কৃষিকাজ – খাদ্যের জন্য মানুষ প্রধানত কৃষিকাজের ওপর নির্ভর করে। ধান, গম, ভুট্টা প্রভৃতি দানাশস্য, মুগ, মুশুর, মটর প্রভৃতি ডালশস্য ও নানা প্রকার পশুখাদ্যের উৎস হল কৃষিকাজ।
  • উদ্যানবিদ্যা – কৃষিকার্যের একটি অন্যতম পথ হল উদ্যানবিদ্যা। ফল, শাকসবজি, মাশরুম, বিভিন্ন রকম ডাল, বিভিন্ন রকম তৈলবীজ (সরষে, তিল, বাদাম) প্রভৃতির চাষবাস যথেষ্ট প্রচলিত। এ ছাড়া মূল (মুলো, গাজর), কন্দ (আলু, পেঁয়াজ), ফুল (ফুলকপি), অগ্রজ মুকুল (বাঁধাকপি) প্রভৃতিও উদ্যান পালনের মাধ্যমে উৎপন্ন করা হয়।
  • পশুপালন – হাঁস, মুরগি প্রভৃতির ডিম; গোরু, ছাগল, মোষ প্রভৃতির দুধ; ছাগল, মুরগি প্রভৃতির মাংস ও অন্যান্য পশুখামারজাত খাদ্য মানুষের খাদ্যচাহিদা পূরণ করে।
  • মাছ চাষ – খাদ্যের উৎসের জন্য বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে বিভিন্ন মাছ চাষের পরিমাণ বর্তমানে যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন মিষ্টি জলের মাছ (রুই, কাতলা, মৃগেল) এবং খাঁড়ি ও ভেড়িতে অনেক রকম মাছ (ভেটকি, পমফ্রেট) প্রভৃতিও চাষ করা হচ্ছে।
  • খাদ্যের বিকল্প উৎস – প্রচলিত খাদ্য ছাড়াও নানা ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাককে বিকল্প খাদ্য উৎস হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যেমন – বিভিন্ন প্রকারের প্রাণী (চিংড়ি, কাঁকড়া), শৈবাল (স্পিরুলিনা, ক্লোরেল্লা), মাশরুম (ছত্রাক) প্রভৃতি।

বিশ্ব খাদ্য সংকটের কারণগুলি কী কী?

বিশ্বে খাদ্য সংকট তৈরির কারণ –

  • জন বিস্ফোরণ – বিশ্বে খাদ্য সংকটের প্রধান কারণ হল জনসংখ্যার মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি।
  • প্রাকৃতিক বিপর্যয় – খরা, বন্যা প্রভৃতি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে কোনো কোনো ভৌগোলিক স্থানে খাদ্য সংকট তীব্র আকারে দেখা দেয়।
  • শিল্পকারখানার বৃদ্ধি – অনেকসময় শিল্পকারখানা স্থাপনের জন্য কৃষিজমি ধ্বংস করা হয়। এ ছাড়া শিল্পকারখানা থেকে নির্গত দূষিত পদার্থও উদ্ভিদের উৎপাদন ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, ফলে খাদ্য সংকট দেখা দেয়।
  • কৃষিজমির অনুর্বরতা – জলের অভাবে কৃষিজমি অনুর্বর হয়ে পড়ছে, যার জন্য খাদ্যবস্তুর অভাব দেখা দিচ্ছে।
  • অনুন্নত সংরক্ষণ ব্যবস্থা – অনুন্নত সংরক্ষণ নীতির কারণে খাদ্যশস্যের প্রায় 33-40% মানুষের ব্যবহারের আগেই নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া, কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর আইন বিরুদ্ধভাবে খাদ্যসঞ্চয় করে রাখার ফলে বাজারের মূল্যবৃদ্ধি ঘটে এবং খাদ্যের সংকট তৈরি হয়।

খাদ্য সংকটের ফলগুলি লেখো। অথবা, বিশ্ব খাদ্য সংকটের ফলে কী হতে পারে?

খাদ্য সংকটের ফলাফল –

  • মানুষের সার্বিক বৃদ্ধি ব্যাহত – খাদ্যের চাহিদানুযায়ী যদি জোগান না থাকে, তবে বাজারে খাদ্য সংকট সৃষ্টি হয়। খাদ্য সংকটের কারণে মানুষের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।
  • অভাবজনিত রোগ – খাদ্য সংকটের ফলে বিরাট এলাকা জুড়ে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এর ফলে মহামারি, অপুষ্টিজনিত অন্যান্য রোগ দেখা দেয় (যেমন – ম্যারাসমাস, কোয়াশিওরকর ইত্যাদি)।
  • প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি – খাদ্য সংকটের কারণে বিভিন্ন দেশে দেশে মানুষের মধ্যে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পায়। এমনকি মানুষে মানুষে হানাহানি, দাঙ্গা ঘটতে পারে।
  • দেশের অগ্রগতি ব্যাহত – খাদ্য সংকটের ফলে সুস্থ, সবল, রোগ প্রতিরোধক্ষম জনসংখ্যা গঠিত হয় না, যা পরোক্ষভাবে দেশের অগ্রগতিকে ব্যাহত করে।
  • জনসংখ্যার হ্রাস – তীব্র খাদ্য সংকটের কারণে কোনো ভৌগোলিক অঞ্চলের জনসংখ্যা মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। অর্থাৎ, এই ভয়াবহতার চরম পরিণতি হল মানুষের মৃত্যু।
খাদ্য সংকটের ফলাফল

পশুপালন কাকে বলে? মানবকল্যাণে পশুপালনের ভূমিকাগুলি কী কী?

পশুপালন (Animal Husbandry) –

কৃষি বিজ্ঞানের যে শাখায় গৃহপালিত প্রাণীর ব্রিডিং এবং উন্নত লালনপালন পদ্ধতি অনুসরণ করে মাংস, দুধ প্রভৃতির উৎপাদন বৃদ্ধি-সংক্রান্ত আলোচনা করা হয়, তাকে পশুপালন বলে।

মানবকল্যাণে পশুপালনের ভূমিকা –

  • মাংস উৎপাদন – মুরগি, হাঁস, টার্কি, কোয়েল প্রভৃতি পোলট্রি পাখি এবং গোরু, ছাগল, উট, শুয়োর প্রভৃতি প্রাণীর মাংস মানুষ খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে।
  • দুধ উৎপাদন – গোরু, ছাগল, মোষ, উট প্রভৃতি প্রাণীকে দুধ উৎপাদনের জন্য লালনপালন করা হয়।
  • ডিম উৎপাদন – মুরগি, হাঁস প্রভৃতি প্রাণী থেকে ডিম পাওয়া যায়।
  • মাছ চাষ – উন্নত মাছচাষের মাধ্যমে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি করা হয়েছে।
  • দুগ্ধজাত সামগ্রী উৎপাদন – পনির, মাখন, ঘি, দুধ, ছানা প্রভৃতি দুগ্ধজাত সামগ্রী মানুষ খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে।
  • তন্তু উৎপাদন – রেশম মথ থেকে রেশম বা সিল্ক, ভেড়ার লোম থেকে পশম উৎপন্ন করা হয়।
  • জৈবসার – পোলট্রি পাখির মল, বর্জ্য অংশ এবং অন্যান্য গবাদিপশুর মল উন্নত জৈবসাররূপে কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।
  • মধু উৎপাদন – মৌমাছি পালনের দ্বারা মধু পাওয়া যায়।
পোলট্রি (হাঁস, মুরগি পালন)

শক্তি সম্পদের উৎস বা প্রকারভেদগুলি কী কী? শক্তির ব্যবহার সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা দাও।

পৃথিবীতে শক্তি সম্পদের উৎস বা প্রকারভেদগুলি হল –

শক্তি সম্পদের উৎস বা প্রকারভেদ

শক্তি সম্পদের ব্যবহার –

  • পশুশক্তি – এটি নবীকরণযোগ্য শক্তি। গোরু, ষাঁড়, মোষ, উট, ঘোড়া, হাতি প্রভৃতি প্রাণী শক্তি পরিবহণ, জল তোলা, কৃষিকাজ প্রভৃতি কাজে ব্যবহার করা হয়।
  • জ্বালানিকাঠ – নবীকরণযোগ্য শক্তি। প্রায় 2 বিলিয়নের বেশি মানুষ জ্বালানি কাঠকে শক্তি উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করে। প্রধানত রান্না, বাড়িঘর গরম রাখা (ঠান্ডার সময়) প্রভৃতি কাজে এই শক্তি কাজে লাগানো হয়।
  • জৈববর্জ্য পদার্থ – গোরু, মোষ প্রভৃতির মল (dung), ভেড়া ও ছাগলের মল (droppings), কসাইখানার বর্জ্যপদার্থ, গৃহের আবর্জনা প্রভৃতি জৈবশক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে।
  • জীবাশ্ম জ্বালানি – কয়লা, পেট্রোলিয়াম, প্রাকৃতিক গ্যাস প্রভৃতি শক্তির অনবীকরণযোগ্য উৎসরূপে ব্যবহৃত হয়। কয়লা তরল জ্বালানি বা মিথেন গ্যাসে রূপান্তরিত অবস্থাতেও ব্যবহৃত হয়। পেট্রোলিয়াম বা খনিজ তেল পরিশোধিতরূপে এবং পেট্রোল, ডিজেল বা কেরোসিন তেলরূপে ব্যবহৃত হয়। জীবাশ্ম জ্বালানি প্রধানত রান্না, গরম করা, কৃষিকাজ, শিল্পকারখানা, তাপবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, অটোমোবাইল, যানবাহন, এরোপ্লেন, জাহাজ এবং পরিবহণে ব্যবহৃত হয়।

শক্তির ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণগুলি লেখো।

সমগ্র পৃথিবীতে উন্নয়নশীল দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শক্তির চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে। এই শক্তির ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণগুলি হল –

  • কৃষিকাজের উন্নতিসাধনে কৃষিজমিতে ব্যবহৃত আধুনিক যন্ত্রপাতির এবং জলসেচ ব্যবস্থার উন্নতিকল্পে শক্তির চাহিদা বাড়ছে।
  • খাদ্য উৎপাদন, উৎপাদিত দ্রব্যসামগ্রীর উন্নত পরিকাঠামো গড়ে তোলার কাজে শক্তির ব্যবহার বাড়ছে।
  • তথ্যপ্রযুক্তি, শিল্পকার্যের আধুনিকীকরণে বিশেষ করে পেট্রো-কেমিক্যাল শিল্পে, বিদ্যুৎশিল্পে, রাসায়নিক শিল্পে, বয়ন শিল্পে, রং শিল্পে, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে শক্তির ব্যবহার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।
  • নগরায়ণ ও সেতু-সৌধ নির্মাণে বিভিন্ন সামগ্রীর উৎপাদনের জন্য শক্তির চাহিদা প্রচুর বৃদ্ধি পেয়েছে।
  • উন্নত জীবনধারণের উদ্দেশ্যে এবং জীবনযাপনের মান আরও প্রগতিশীল করতে শক্তির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার হয়।
  • বর্তমানে বহু অপ্রচলিত শক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে প্রচলিত শক্তির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার কমানোর চেষ্টা চলছে।

শক্তির বিকল্প উৎস বা অপ্রচলিত উৎস ও তাদের ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা দাও।

শক্তির বিকল্প উৎস বা অপ্রচলিত উৎস ও ব্যবহার –

সৌরশক্তি (Solar Energy) – সৌরশক্তি একপ্রকার অনিঃশেষীকরণ (Nonexhaustible) শক্তি। এই শক্তিকে সোলার যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিবিদ্যার সাহায্যে আবদ্ধ করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা হয়। যেমন – স্পেস হিটিং, জল গরম করা, এয়ার কন্ডিশনিং, আলো জ্বালানো, রান্না করা প্রভৃতি।

সৌরচুল্লি

জলবিদ্যুৎ শক্তি (Hydroelectric Power) – জলের গতিশক্তিকে ব্যবহার করে জলবিদ্যুৎশক্তি উৎপন্ন করা হয়।

বায়ুশক্তি (Wind Power) – বায়ুপ্রবাহের গতিকে কাজে লাগিয়ে বায়ুশক্তি উৎপন্ন করা হয়। এই শক্তি মূলত বায়ুচালিত কারখানা বা গ্রহণযোগ্য দানাশস্য তৈরির মিল বা কলে ব্যবহার করা হয়।

জিওথার্মাল শক্তি (Geothermal Energy) – পৃথিবীর কিছু কিছু স্থানে উন্নপ্রস্রবণ আছে। এই জল থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা হয়।

জোয়ারভাটা শক্তি (Tidal Energy) – সমুদ্রের জোয়ারভাটা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা হয়।

জোয়ারভাটা শক্তি

বায়োগ্যাস (Biogas) – বিভিন্ন বর্জিত জৈবপদার্থের ওপর অণুজীবের ক্রিয়া ঘটিয়ে মিথেন, CO₂ সমৃদ্ধ বায়োগ্যাস উৎপন্ন করা হয়। এই শক্তি রান্না ও আলো জ্বালানোর কাজে ব্যবহার করা হয়।

নিউক্লিয়ার শক্তি (Nuclear Energy) – এটি অপ্রচলিত অনবীকরণযোগ্য শক্তি। ইউরেনিয়াম-235, থোরিয়াম প্রভৃতি এই শক্তি উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। ইউরেনিয়াম-235 -এর 1 a.m.u. (Atomic mass unit) পরিমাণের ফিশন (fission) ঘটলে যে পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন করে তা প্রায় 15 মেট্রিক টন কয়লা দহনের ফলে উৎপন্ন শক্তির সমান।

নিউক্লিয়ার শক্তি

গারবেজ শক্তি (Garbage Energy) – আমেরিকা এবং অন্যান্য উন্নত দেশগুলিতে আবর্জনা থেকে উন্নত টেকনোলজির সাহায্যে বর্তমানে শক্তি উৎপন্ন করা হচ্ছে। এই শক্তি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।

প্রাত্যহিক জীবনে শক্তি সংরক্ষণের উপায়গুলি লেখো। অথবা, শক্তির সংরক্ষণ করতে বা শক্তির অপচয় বন্ধ করতে বর্তমানে কী কী উপায় অবলম্বন করতে পারি? 

প্রাত্যহিক জীবান শস্ত্রি সংরক্ষণের উপায়সমূহ –

  • প্রচলিত শক্তি উৎসের ব্যবহার কমিয়ে অপ্রচলিত শক্তির উৎসের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে।
  • অল্প দূরত্ব চলাচল করার জন্য যানবাহন যেমন – বাস, অটো, মোটরবাইকের ব্যবহার এড়িয়ে চলা।
  • চাহিদা অনুসারে শিল্প-কারখানায় কয়লা উৎপাদন করে, সঞ্চয় বাড়াতে হবে।
  • গৃহস্থালির কাজে অপ্রয়োজনে আলো, পাখা, হিটার, ফ্রিজের ব্যবহার কমাতে হবে।
  • বিভিন্ন প্রচলিত শক্তির উৎসের প্রকৃতি ও প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের ব্যবহার ও সঞ্চয়ের ব্যাপারে সরকারি নীতি ও আইন প্রণয়ন।
  • সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের মধ্যে শক্তি সংরক্ষণের ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

শক্তি সংরক্ষণের জন্য তুমি সম্পাদন করতে পারো এমন কয়েকটি কাজের উল্লেখ করো।

  • বাড়িতে বাল্ব বা টিউবের পরিবর্তে CFL বা LED ল্যাম্প ব্যবহার করা।
  • যে-সকল ইলেকট্রনিক যন্ত্র এই মুহূর্তে ব্যবহৃত হচ্ছে না, সেগুলি থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখা।
  • খাদ্যবস্তু বাড়িতে ফ্রিজে রাখার সময় তাতে ঢাকনা ব্যবহার করা।
  • রান্নার কাজে যতটা সম্ভব প্রেশার কুকার ব্যবহার করা।
  • বাড়িতে যখন প্রয়োজন হচ্ছে না, সেই সময় পাখা, লাইট, টি.ভি., রেডিয়ো বন্ধ করে বিদ্যুৎ সংযোগস্থল থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা।
  • মোটরবাইক বা স্কুটারের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব সাইকেল ব্যবহার করা।
  • ভিজে চুল শুকোনোর জন্য হেয়ার ড্রায়ার না ব্যবহার করে তোয়ালে ব্যবহার করা এবং জামাকাপড় কাচার পর শুকোনোর জন্য ওয়াশিং মেশিনের ড্রায়ারের পরিবর্তে সূর্যালোক ব্যবহার করা।

আজকের এই আর্টিকেলে আমরা নবম শ্রেণীর জীবন বিজ্ঞানের পঞ্চম অধ্যায় ‘পরিবেশ ও তার সম্পদ’ -এর অন্তর্গত ‘প্রাকৃতিক সম্পদ এবং তাদের টেকসই/স্থিতিশীল ব্যবহার’ অংশের রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নগুলো নবম শ্রেণীর পরীক্ষা এবং যারা ভবিষ্যতে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেবেন, তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আশা করি, আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে আসবে। যদি কোনো প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থাকে, তবে আমাদের টেলিগ্রামে যোগাযোগ করতে পারেন; আমরা উত্তর দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। এছাড়া, লেখাটি প্রয়োজনীয় মনে হলে আপনার বন্ধু বা সহপাঠীদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ।

Please Share This Article

Related Posts

পরিবেশ ও তার সম্পদ-প্রাকৃতিক সম্পদ এবং তাদের টেকসই-স্থিতিশীল ব্যবহার

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – পরিবেশ ও তার সম্পদ – প্রাকৃতিক সম্পদ এবং তাদের টেকসই/স্থিতিশীল ব্যবহার – টীকা

পরিবেশ ও তার সম্পদ-প্রাকৃতিক সম্পদ এবং তাদের টেকসই-স্থিতিশীল ব্যবহার

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – পরিবেশ ও তার সম্পদ – প্রাকৃতিক সম্পদ এবং তাদের টেকসই/স্থিতিশীল ব্যবহার – পার্থক্যধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

পরিবেশ ও তার সম্পদ-প্রাকৃতিক সম্পদ এবং তাদের টেকসই-স্থিতিশীল ব্যবহার

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – পরিবেশ ও তার সম্পদ – প্রাকৃতিক সম্পদ এবং তাদের টেকসই/স্থিতিশীল ব্যবহার – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

About The Author

Souvick

Tags

মন্তব্য করুন

SolutionWbbse

"SolutionWbbse" শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন অধ্যয়ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গাইডলাইন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সাহায্য প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষণীয় উপকরণ সহজেই সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

Editor Picks

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – পরিবেশ ও তার সম্পদ – প্রাকৃতিক সম্পদ এবং তাদের টেকসই/স্থিতিশীল ব্যবহার – রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – পরিবেশ ও তার সম্পদ – প্রাকৃতিক সম্পদ এবং তাদের টেকসই/স্থিতিশীল ব্যবহার – টীকা

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – পরিবেশ ও তার সম্পদ – প্রাকৃতিক সম্পদ এবং তাদের টেকসই/স্থিতিশীল ব্যবহার – পার্থক্যধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – পরিবেশ ও তার সম্পদ – প্রাকৃতিক সম্পদ এবং তাদের টেকসই/স্থিতিশীল ব্যবহার – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

নবম শ্রেণী জীবনবিজ্ঞান – পরিবেশ ও তার সম্পদ – প্রাকৃতিক সম্পদ এবং তাদের টেকসই/স্থিতিশীল ব্যবহার – অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর