এই আর্টিকেলে আমরা সপ্তম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের অন্তর্গত প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক বনফুলের (বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়) লেখা ‘খোকনের প্রথম ছবি’ গল্পের কিছু গুরুত্বপূর্ণ রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। এই বড়ো প্রশ্নোত্তরগুলো সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত সহায়ক, কারণ স্কুলের বাংলা পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে এবং ভালো নম্বর পেতে সাহায্য করে।

খোকনের প্রকৃতি থেকে ছবি ও তার কল্পনার সৃষ্টির মধ্যে তফাত কোথায় আলোচনা করো।
বাংলা সাহিত্যের অনন্য গল্পকার বনফুল তথা বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের একটি অসাধারণ কিশোরমনস্ক গল্প ‘খোকনের প্রথম ছবি’। অনেক কিশোরের মতোই খোকনও ছবি আঁকতে ভালোবাসে। ছোটো বয়স থেকেই কাগজের উপর রঙিন পেন্সিল দিয়ে হিজিবিজি কাটত সে। বিদ্যালয় জীবনে অঙ্কন শিক্ষকের সাহচর্যে সে আঁকা সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারে। মাস্টারমশাই তাকে প্রকৃতি থেকে ছবি আঁকার পরামর্শ দেন কিন্তু এ যেন নিছকই আঁকা, বাস্তব-বিষয়ের প্রতিলিপি বা অনুকরণ। এ ধরনের ছবিকে কপি করা বা নকল করা ছবি বলা যেতে পারে। ছবি গড়ে ওঠে বাস্তব-দৃষ্টিগ্রাহ্য বিষয়ের সঙ্গে কল্পনার সুসমন্বয়ে। খোকনের প্রাথমিক ছবিতে ছিল না কল্পনার মিশেল বা সৃষ্টিশীলতার স্পর্শ। তাই সেগুলি ছিল যেন কৃত্রিমতায় ভরা। ছোটোরা কল্পনাপ্রবণ, তাই খোকনের মনের মধ্যেও ছিল কল্পনাশক্তির অস্তিত্ব, তবে তা যেন ছিল ঘুমন্ত। তার বাবার এক বিখ্যাত চিত্রকর বন্ধু এসে এই কল্পনাশক্তিকে জাগিয়ে দেন। তিনি বলেন – “চোখ বুজে বসে কল্পনা করো। কল্পনায় যা দেখবে সেটাই এঁকে ফেলো।” খোকন একদিন নিজের ঘরে চোখ বুজে বসে থাকে। কেবল অন্ধকারই তার চোখে পড়ে। অবশেষে সেই অন্ধকারের ছবিই সে আঁকে। খাতার পুরো পাতা ভরে যায় কালো রঙে। আর সেটার দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে সে দেখে, শুধু কালোই নেই, তার ভিতর রয়েছে একটি মুখ, চোখ, যে চোখে মাখানো রয়েছে অদ্ভুত হাসি। এ হল সৃষ্টি। কারণ এ ছবিতে নকল করার কৃত্রিমতা নেই, আছে মনের মিশেল, কল্পনার রং।
আগে নানান ধরনের ছবি আঁকা সত্ত্বেও অন্ধকারের ছবিটিকেই খোকনের প্রথম ছবি বলা হয়েছে কেন?
শিশু ও কিশোরদের মন কোনো বন্ধন মানে না। তাদের কল্পনাশক্তিও অবারিত হয়। ছোটোবেলা থেকে যে খোকন কাগজে হিজিবিজি কেটে রঙের ফোয়ারা তুলত, বিদ্যালয়ের গণ্ডিতে তা অনেক প্রশংসা পায়। বিশেষত, তার আঁকার মাস্টারমশাই যখন প্রকৃতি থেকে ছবি আঁকতে শেখান, তখন সেই ছবি এঁকে সে প্রশংসা পায় অনেক। চেয়ার-টেবিল-কাপ-গোরু, ইউক্যালিপটাস গাছ কিংবা ছাদ থেকে দেখতে পাওয়া পুলের ছবিও সে সুন্দর করে আঁকতে পারে। ড্রইং বুক থেকে কপি করেও ছবি আঁকে খোকন। তবুও নিশ্চিতভাবে বলা যেতে পারে এ পর্বের কোনো ছবিতেই খোকনের নিজের মন কিংবা কল্পনাশক্তি তেমনভাবে কার্যকরী হয় না। এসব ছবিকে বলা যেতে পারে ‘নকল করা ছবি’।
হঠাৎ লখনউ থেকে আসা বাবার এক চিত্রকর বন্ধুর পরামর্শে খোকনের মানসিকতা বদলে যায়। নিজের কল্পনাশক্তির পরীক্ষা করতে একদিন সে ঘরে চোখ বুজে বসে সামনে কেবলই অন্ধকার দেখে। তারপর রং ও তুলি নিয়ে সেই অন্ধকারের ছবিই ড্রইং বুকের একটি সাদা পাতায় সে এঁকে ফেলে। সেই অন্ধকার ছবির মধ্যেই সে দেখতে পায় একটি মুখ ও অদ্ভুত হাস্যময় চোখ। এই ছবিতেই খোকনের নিজস্বতা ধরা পড়ে বলে একেই খোকনের আঁকার প্রথম ছবি বলা যায়।
খোকনের ‘ড্রইংয়ের মাস্টারমশাই’ কীভাবে খোকনকে প্রকৃতি দেখতে শিখিয়েছিলেন?
খোকন যে স্কুলে পড়ত, সেখানকার ড্রইং-এর মাস্টারমশাই তাকে প্রকৃতি থেকে বিষয় সংগ্রহ করে ছবি আঁকার কথা বলেছিলেন। ব্যাপারটি খোকন ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি। তখন তিনি তাকে বুঝিয়েছিলেন, প্রকৃতিতে ছড়িয়ে আছে অনেক ছবি। সেইগুলোই দেখে দেখে অনবরত ছবি আঁকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। খোকনদের বাড়ির সামনে যে ইউক্যালিপটাস গাছটি ছিল, সেটা তিনি একদিন এঁকে ফেলতে বলেছিলেন। খোকন সত্যি সত্যি একদিন সেটির ছবি এঁকে প্রথম ‘প্রকৃতি-চিত্র’ এঁকেছিল। মাস্টারমশাই সে ছবির প্রশংসা করে বলেছিলেন ‘আরো আঁকো’। এরপর তিনি খোকনকে তাদের বাড়ির ছাদ থেকে দেখতে পাওয়া পুলটার ছবি আঁকতে বলেছিলেন। তা আঁকা হলে, সে ছবিও মাস্টারমশাইয়ের দ্বারা খুব প্রশংসিত হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘চারপাশে যা দেখবে এঁকে ফেলবে।’ এভাবেই তিনি খোকনকে প্রকৃতি দেখতে শিখিয়েছিলেন।
খোকন অবাক হয়ে গেল, আর অবাক হয়ে চেয়ে রইল খোকন। – এই দুই ক্ষেত্রে খোকনের ‘অবাক’ হওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করো।
ড্রইংয়ের মাস্টারমশাই-এর কাছ থেকে খোকন প্রকৃতি দেখতে শিখেছিল। তাঁর অনুপ্রেরণায় খোকন প্রকৃতির যা কিছু দেখত তাই মহা উৎসাহে আঁকত। তার আঁকা ছবি দেখে তার বাবার একজন চিত্রকর বন্ধু প্রথমে তাকে বাহবা দিলেও পরে যখন জিজ্ঞাসা করেন খোকনের নিজের আঁকা ছবি কোথায়-তখন খোকন প্রথমবার অবাক হয়ে যায়।
তারপর, খোকনের বাবার চিত্রকর বন্ধু চলে যাওয়ার মুহূর্তে খোকনকে বলে যান – “চোখ বুজে বসে কল্পনা করো। কল্পনায় যা দেখবে সেটাই এঁকে ফেলো।” তাই খোকন নিজের ঘরে বসে অন্ধকারের ছবি আঁকবে স্থির করে। কালো রং আর তুলি নিয়ে শুরু করে দেয় আঁকতে। ড্রইং খাতার একটি পাতা কালো রঙে ভরে যায়। তারপর সেই ছবির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে সেই কালোর ভিতরে সে একটি মুখ-চোখ দেখতে পায়। নিজের প্রথম সৃষ্টির দিকে অবাক হয়ে চেয়ে থাকে।
তুমি যদি বড়ো হয়ে সাহিত্যিক হও, কোন্ ছদ্মনাম ব্যবহার করবে এবং কেন-তা লেখো।
আমি যদি বড়ো হয়ে সাহিত্যিক হই তাহলে আমি ‘কোকিল’ ছদ্মনাম নেব।
কারণ ‘কোকিল’ একটি পাখি। তার কুহু স্বর শুনে মানুষ ঘুম থেকে জেগে ওঠে। আবার সেই কোকিল মানুষের কর্মময় সময় নির্ঘণ্টকে মনে করিয়ে দেয়, অলস জীবনধারাকে জাগরিত করে। কোকিল প্রভাতের গায়ক পাখি। প্রভাতী সংগীতে মানুষের মনে যেমন নতুন ছন্দ ধ্বনিত হয়, তেমনি কর্মে গতি আসে। তার কণ্ঠস্বর শোনামাত্রই আর কেউ নিদ্রিত থাকতে চায় চৈতন্য।
আমি কোকিলের মতো সুমিষ্ট স্বরে সাহিত্যরচনা করতে চাই। আমার লেখা পড়ে মানুষ যেন কর্মবিমুখ না হয়। অলস জীবন ত্যাগ করে নতুন নতুন কর্মে মনোনিবেশ করতে পারে। সে যেন ছন্দহীন-গতিহীন না হয়। যে-কোনো কর্মে আনন্দ থাকবে এবং সেই আনন্দরস পরিবেশন করাই হবে আমার সাহিত্যরচনার একমাত্র লক্ষ্য। তাই ‘কোকিল’ ছদ্মনাম পছন্দ বলেই এই নাম নিতে চাই।
খোকনের ড্রইংয়ের মাস্টারমশাই আর তার বাবার এক বন্ধু যে যে ভাবে তাকে ছবি আঁকতে অনুপ্রাণিত করেছিল, তা লেখো। কোন্ রীতিটিকে তোমার পছন্দ হল এবং কেন তা যুক্তি-সহ লেখো।
বনফুলের লেখা ‘খোকনের প্রথম ছবি’ গল্পে ছবি আঁকার প্রতি অত্যন্ত আগ্রহী ছিল খোকন। তাকে ছবি আঁকতে যে দুই জন প্রেরণা দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে একজন হলেন ড্রইংয়ের মাস্টারমশাই, অন্যজন তার বাবার একজন বিখ্যাত চিত্রকর বন্ধু। খোকন যে ছবিই আঁকত তার মাস্টারমশাই তাতেই তাকে বাহবা দিতেন। তিনি বলতেন চারপাশে যা দেখবে এঁকে ফেলবে। অপরদিকে, খোকনের বাবার বন্ধু বলেছিলেন পরিবেশের থেকে কপি করে ছবি আঁকা ঠিক নয়। তিনি তাকে নিজের মন থেকে ছবি আঁকতে পরামর্শ দিয়েছিলেন।
এই দুই পদ্ধতির মধ্যে খোকনের বাবার চিত্রকর বন্ধুর নির্দেশিত দ্বিতীয় পদ্ধতিটিই আমার পছন্দ। কেননা আমার মনে হয়, খোকনের আঁকার মাস্টারমশাইয়ের পদ্ধতিতে রয়েছে নিছকই কপি করা, আলোকচিত্র তোলার মতো সহজতা ও সাধারণত্ব। এমন অনুকরণপ্রিয়তার পথে কোনো ছবিতে নিজস্বতা আসে না। অন্যদিকে দ্বিতীয় পদ্ধতিটিতে আছে নিজে করার দৃঢ় মানসিকতা, শিল্পীর কল্পনার সক্ষম প্রকাশ এবং মনের রং মিশিয়ে ছবি করার চেষ্টা।
এই আর্টিকেলে আমরা সপ্তম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের অন্তর্গত, বনফুল রচিত ‘খোকনের প্রথম ছবি’ গল্পের কিছু গুরুত্বপূর্ণ রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এই প্রশ্নোত্তরগুলো অত্যন্ত সহায়ক হবে, কারণ বিদ্যালয়ের বাংলা পরীক্ষায় এই ধরনের বড় প্রশ্ন নিয়মিত এসে থাকে।
আশা করি, এই আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে আসবে এবং ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সাহায্য করবে। আপনাদের যদি কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, অথবা অন্য কোনো বিষয়ের নোটস প্রয়োজন হয়, তবে নির্দ্বিধায় টেলিগ্রামে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। আপনাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। ধন্যবাদ!





মন্তব্য করুন