এই আর্টিকেলে আমরা সপ্তম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের অন্তর্গত স্বনামধন্য সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলি রচিত ‘কুতুব মিনারের কথা’ প্রবন্ধটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। এখানে লেখক পরিচিতি, রচনার উৎস, পাঠপ্রসঙ্গ, বিষয়সংক্ষেপ, এবং নামকরণ সহজ ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে।
এই আলোচনাটি আপনাদের ‘কুতুব মিনারের কথা’ প্রবন্ধটি সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা দেবে এবং এর মূলভাব বুঝতে বিশেষভাবে সহায়ক হবে। এছাড়া, সপ্তম শ্রেণির পরীক্ষায় এই অধ্যায় থেকে লেখক পরিচিতি ও প্রবন্ধের সারসংক্ষেপ সম্পর্কিত নানা প্রশ্ন এসে থাকে; তাই পরীক্ষার সেরা প্রস্তুতির জন্য এই তথ্যগুলো জেনে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক পরিচিতি
সৈয়দ মুজতবা আলি 1904 খ্রিস্টাব্দের 13 সেপ্টেম্বর বর্তমান বাংলাদেশের করিমগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম খান বাহাদুর সৈয়দ সিকান্দর আলি এবং মাতার নাম আয়তুন খাতুন। পূর্ববঙ্গের সুনামগঞ্জের পাঠশালায় তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা হয়। এরপর সিলেট গভর্নমেন্ট হাইস্কুল থেকে তিনি যোগ্যতার সঙ্গে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। 1921 খ্রিস্টাব্দে মুজতবা শান্তিনিকেতনে আসেন এবং তিনি বিশ্বভারতীর প্রথম গ্র্যাজুয়েট। শান্তিনিকেতনে পড়া শেষ করে তিনি কিছুকাল আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। 1927 খ্রিস্টাব্দে আফগান রাজা আমানুল্লা খানের আমন্ত্রণে কাবুলের কৃষিবিজ্ঞান কলেজে অধ্যাপনা করেন এবং দু-বছর পরে 1929 খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি দেশে ফিরে আসেন। কিছুদিন পর তিনি বার্লিন এবং পরে বন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করেন। জার্মানি থেকে তিনি দেশে ফেরেন 1932 খ্রিস্টাব্দে। পরে তিনি ইউরোপ এবং সেখান থেকে কায়রোতে পৌঁছোন এবং 1934 খ্রিস্টাব্দে দেশে ফিরে বরোদা কলেজের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন।
শান্তিনিকেতনে পড়ার সময় সেখানের ‘বিশ্বভারতী’ নামের হস্তলিখিত ম্যাগাজিনে তিনি লিখতেন। পরবর্তীতে তিনি ‘সত্যপীর’, ‘ওমর খৈয়াম’, ‘টেকচাঁদ’, ‘প্রিয়দর্শী’ প্রভৃতি ছদ্মনামে বিভিন্ন পত্রিকায়, যেমন – দেশ, আনন্দবাজার, বসুমতী, সত্যযুগ, মোহাম্মদি প্রভৃতিতে কলাম লেখেন। তাঁর বহু দেশভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছেন অসংখ্য ভ্রমণকাহিনি। এ ছাড়াও লিখেছেন ছোটোগল্প, উপন্যাস, রম্যরচনা। বিবিধ ভাষায় তাঁর দখল ছিল এবং সেইসব ভাষা থেকে শ্লোক ও রূপকের যথার্থ ব্যবহার, হাস্যরস সৃষ্টিতে পারদর্শিতা এবং এর মধ্য দিয়ে গভীর জীবনবোধ ফুটিয়ে তোলার ক্ষমতা তাঁকে বাংলা সাহিত্যে এক বিশেষ মর্যাদার আসনে বসিয়েছে। তাঁর রচিত বই-এর সংখ্যা 30। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে ‘দেশে বিদেশে’, ‘পঞ্চতন্ত্র’, ‘চাচাকাহিনী’, ‘অবিশ্বাস্য’, ‘চতুরঙ্গ’, ‘দ্বন্দ্বমধুর’, ‘ময়ূরকণ্ঠী’, ‘শবনম’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশ্বভারতীর জার্মান ও ইসলামি-সংস্কৃতির অধ্যাপনা ইত্যাদি পদে দীর্ঘকাল কর্মরত থেকেছেন তিনি। তাঁর ‘দেশে বিদেশে’ গ্রন্থটির জন্য তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নরসিংহদাস পুরস্কার’ লাভ করেন 1949 খ্রিস্টাব্দে। 1974 খ্রিস্টাব্দের 11 ফেব্রুয়ারি এই মহান লেখকের জীবনাবসান হয়।
উৎস
‘কুতুব মিনারের কথা’ রচনাটি 1960 খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘চতুরঙ্গ’ (1960) গ্রন্থের উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ ‘দিল্লির স্থাপত্য’-এর নির্বাচিত অংশবিশেষ।
পাঠপ্রসঙ্গ
লেখক সৈয়দ মুজতবা আলির মতে দিল্লির ঐতিহাসিক নিদর্শন কুতুবমিনার বিশ্ব স্থাপত্যশিল্পের এক ও অদ্বিতীয় নমুনা। এটি ভারতের সুলতানি আমলের এক শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। কেন-না এর গঠনকৌশল, কারুকার্য, স্থাপত্য-ঐতিহ্য অতুলনীয়। অনুমিত 1232 খ্রিস্টাব্দে কুতুবউদ্দিন আইবকের জামাতা ইলতুৎমিস এই মিনারটির নির্মাণ সম্পূর্ণ করেন। এর উচ্চতা 235 ফুট, সুলতান কুতুবউদ্দিনের নামে নামাঙ্কিত এই মিনারটিকে বলা হয় ‘Minar or turret’। ইলতুৎমিস এর আগে কুতুবের নির্মিত তল বা Basement-এর উপরেই পুনর্নির্মাণ শুরু করে একে পূর্ণ আকার দেন। ইতিহাসসূত্রে জানা যায়, পাঁচটি তল ও গোলাকার অলিন্দ দিয়ে ঘেরা এই মিনারটির শেষ তিন মিটার উচ্চতা-নির্মাণের ক্ষেত্রে ফিরোজ শাহ তুঘলকেরও হাত ছিল। ইসলামীয় সংস্কৃতিতে মহাপণ্ডিত সৈয়দ মুজতবা আলি তাঁর গভীর দক্ষতায় পাঠ্য রচনাটিতে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, ভারতীয় স্থাপত্যশিল্পের শিল্পিত পটভূমি কেমন ছিল। নিতান্ত বৈঠকি মেজাজে তিনি ইতিহাস-কথা বলেছেন এখানে। তাই বোঝাতে পেরেছেন স্থাপত্যশিল্প কী? এই শিল্পকে বুঝতে গেলে বা এর রসাস্বাদন করতে গেলে শিল্পমানস থাকা প্রয়োজন কেন? অপূর্ব ভাষাশৈলীতে ইতিহাসের এক বিশেষ পর্বে কীভাবে শিল্পের সঙ্গে ধর্মের মিলন ঘটেছিল, তা জানাতেও লেখক ভোলেননি। ভারত শিল্পের ক্ষেত্রে একসময় হিন্দু-মুসলমান উভয় মানস যে এক সূত্রে গ্রথিত হয়ে গিয়ে কুতুবমিনারকে সর্বশ্রেষ্ঠ রূপ দিয়েছিল—তা বোঝাতেও তিনি সক্ষম হয়েছেন রচনাটিতে।
বিষয়সংক্ষেপ
পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মিনার ‘কুতুবমিনার’, যা এককথায় তুলনারহিত। কারণ স্থাপত্যশিল্পের পীঠস্থান ইরান-তুরানেও এমন স্থাপত্যের নিদর্শন নেই এবং ইংরেজরাও এ কথা স্বীকার করেছেন। সুতরাং মিনার স্থাপত্যের ব্যাপারে কুতুবমিনারই হল প্রথম বা শেষ পরীক্ষানিরীক্ষাস্থল। পাঁচটি তলবিশিষ্ট এই মিনারটির চতুর্থ ও পঞ্চম তলের তথ্য অপ্রতুল। বজ্রাঘাতে এই তলদ্বয় নষ্ট হয়ে গেলে, ফিরোজ তুঘলক তা মেরামত করেন মার্বেলে। মিনার এমনই এক স্থাপত্য, যা ঋজু-খাড়া এক স্তম্ভ। তাই এর মধ্যে শৈল্পিক সৌন্দর্যের প্রকাশ ঘটানো খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তবুও পাঁচতলা এই ইটে নির্মিত পৃথিবীর সর্বোচ্চ মিনারটি শিল্পগত দিক থেকে কত শ্রেষ্ঠ, তা বোঝা যায় এর গঠনকৌশলে। এর প্রথম তলাতে রয়েছে ‘বাঁশি’ ও ‘কোণ’-এর পরপর সাজানো নকশা। দ্বিতীয় তলাতে কেবল ‘বাঁশি’, তৃতীয় তলাতে শুধু ‘কোণ’, আর সমূহ মিনারটি আবর্তিত হয়ে রয়েছে সারি সারি লতাপাতা, পুষ্পসমাহার ও চক্রের নকশায়। এই স্থাপত্যকর্মটি নির্মাণের ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলমান উভয় শিল্প বা স্থাপত্যশিল্পের মিলন ঘটতে দেখা যায়। এই মিনার তৈরির ক্ষেত্রে যে ব্যাপারটি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, তা হল – প্রপর্শন (Proportion) বা সামঞ্জস্য। সুতরাং স্থাপত্যশিল্পের চরম নিদর্শন এই মিনারটি এতটাই মজবুত ও শিল্পসাফল্য পেয়েছিল, যা আটশত বছরেও অটুট। বহু সম্রাট মিনার গড়লেও কুতুবের মতো এমন মিনার গড়তে কেউ সাহস করেননি। এই স্থাপত্যের কাছে ইংরেজদের সেক্রেটারিয়েট, রাজভবন, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালও স্থান পায় না। আলাউদ্দিন খলজি কুতুবের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একটি দৃষ্টান্তমূলক মিনার তৈরির চেষ্টা করেছিলেন বটে, কিন্তু স্থাপত্যশিল্পের মতানুযায়ী তা ছিল ত্রুটিপূর্ণ; তা ছাড়া কাঠামো তৈরির পূর্বেই তাঁর মৃত্যু হলে কাজটি থমকে যায়। তবে ঐতিহাসিক নিদর্শনে মসজিদ, সমাধি বা অন্যান্য ইমারতসুলভ স্থাপত্যে মিনার বা মিনারিকা অনেক তৈরি হতে দেখা গিয়েছে বটে, কিন্তু তা অনেকাংশেই অসফল। কুতুবের মতো মিনার গড়ার সাহস আর কারও না দেখানোর কারণ, তুল্যমূল্য বিচার হত তাতে এবং কোনোটিই কুতুবের ধারেকাছে পৌঁছোতে পারত না। তাজমহল, হুমায়ুনের সমাধি ইত্যাদি নির্মাণের ক্ষেত্রেই যেন কুতুবের কাছে বশ্যতা স্বীকারের প্রবণতা আছে। গুজরাটের আহমদাবাদে কুতুবের অনুকরণে সৃজিত একটি মিনারিকা চোখে পড়ে, তবে তা উল্লেখযোগ্য নয়। কেন-না মিনারিকার অলংকরণে সেখানে মেয়েদের কঙ্কন-বলয়ের প্রভাব কাজ করেছিল। যেটি আহমদাবাদের রানি বেগম সিপ্রির মসজিদে দেখা যায়। এই মিনারিকাটি ভূপর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও, কোনোদিক থেকেই এর সঙ্গে কুতুবের তুলনা চলে না।
নামকরণ
সাহিত্যে নামকরণ বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব দাবি করে, কেন-না আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্রে সাহিত্য নির্মিতিগুলির অর্থবহ ও তাৎপর্যমণ্ডিত হয়ে প্রকাশিত হওয়াকে যথার্থভাবে ধরে রাখে নামকরণ। তাই সকল সাহিত্যকারই চান নামকরণ হোক বিষয়ানুগ। নামকরণের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়, ভাবব্যঞ্জনা-বিশেষ কোনো বার্তা, প্রধান চরিত্র বা প্রধান ঘটনার অভিব্যক্তিকে। নামকরণ আগ্রহী পাঠকের দৃষ্টিকে পাঠ্যবস্তুর দিকে আকর্ষণ করে তাকে পাঠে সন্নিবিষ্ট করতে আরো আগ্রহী করে। এই নিরিখে বিচার করলে দেখা যায়, পণ্ডিত-সাহিত্যিক তথা নিষ্ঠ প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলির ‘চতুরঙ্গ’ গ্রন্থের ‘দিল্লির স্থাপত্য’ প্রবন্ধের অংশবিশেষ পাঠ্য রচনাটির নামকরণ কতটা সঙ্গত ও সার্থক হয়েছে। বলাবাহুল্য এই রচনাংশের নামকরণ লেখককৃত নয়, ‘সাহিত্য মেলা’-র গ্রন্থ সংকলকগণই এই নামকরণ করেছেন।
লেখক প্রাজ্ঞজন, বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর আগ্রহ। তিনি গভীর তথ্যানুসন্ধানী বলেও এই রচনাংশে বৈঠকি মেজাজে দিল্লির এক অসমসাহসিক ও স্থাপত্যকলার শ্রেষ্ঠ নিদর্শনের ইতিবৃত্ত, কুতুবউদ্দিনের স্থাপত্যশিল্পের এক চরম নমুনা ‘কুতুবমিনার’ নিয়ে আলোচনা করেছেন। এর গঠন প্রক্রিয়া, নির্মাণকৌশল, প্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্ত, অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থাপত্যশিল্পের সঙ্গে তুলনামূলকতা নিয়ে লেখককে তথ্যনিষ্ঠ ও প্রাণবন্ত আলোচনা করতে দেখা যায় উক্ত রচনাংশে। লেখক অত্যন্ত গরিমার সঙ্গে দেখিয়েছেন সর্বব্যাপারে শ্রেষ্ঠত্বের ক্ষেত্রে কুতুবমিনার একক এবং এককভাবে নান্দনিক, যা কিনা সভ্যতার পূজারি ইংরেজদের স্থাপত্যকলাকেও দূরে ঠেলে দিতে পেরেছে। এই মিনারের বিকাশ-প্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্তে যে হিন্দু-মুসলমান শিল্পচেতনা ও স্থাপত্যকলার অভূতপূর্ব মিলন ঘটেছে এ তথ্যও রচনাটিতে সম্যক প্রকাশিত হতে দেখা যায়, যা প্রমাণ করে জাতি ও ধর্মগত পার্থক্য থাকলেও, শিল্পগত দিকে হিন্দু-মুসলমানের ভাষা-সুর ও চেতনা কত অভিন্ন ছিল। অতএব, সমগ্র রচনাটিতে লেখক যেহেতু মূল বর্ণিতব্য বিষয় করে তুলেছেন কুতুবমিনারের প্রসঙ্গকেই এবং তাঁর রচনায় ঘুরে-ফিরে কুতুবমিনারই সর্বাধিক প্রাধান্য পেয়ে কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে, তাই নামকরণ নিঃসন্দেহে সার্থকতম হয়ে উঠেছে।
এই আর্টিকেলে আমরা সপ্তম শ্রেণির বাংলা বইয়ের ‘কুতুব মিনারের কথা’ প্রবন্ধের বিষয়সংক্ষেপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। আশা করি, লেখাটি এই তথ্যবহুল প্রবন্ধটি সম্পর্কে আপনাদের একটি সুস্পষ্ট ধারণা দিয়েছে এবং এর অন্তর্নিহিত মূলভাবটি সহজে বুঝতে সাহায্য করেছে। সপ্তম শ্রেণির পরীক্ষায় এই অধ্যায় থেকে লেখক পরিচিতি এবং প্রবন্ধের সারসংক্ষেপ বা তাৎপর্য সম্পর্কিত প্রশ্ন আসতে পারে। তাই পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য এই তথ্যগুলো ভালোভাবে আয়ত্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যোগাযোগ: আপনাদের যদি কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তবে টেলিগ্রামে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। আপনাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে আমরা সর্বদা প্রস্তুত। ধন্যবাদ!





মন্তব্য করুন