এই আর্টিকেলে আমরা সপ্তম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের অন্তর্গত প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখা ‘কুতুব মিনারের কথা’ গদ্যাংশের কিছু গুরুত্বপূর্ণ রচনাধর্মী বা বড়ো প্রশ্ন ও উত্তর (Long Answer Questions) নিয়ে আলোচনা করব। এই বিস্তারিত প্রশ্নোত্তরগুলো সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত সহায়ক, কারণ স্কুলের বাংলা পরীক্ষায় এই অধ্যায় থেকে ব্যাখ্যামূলক বা বড়ো প্রশ্ন নিয়মিত আসে।

‘কুতুবের পর পাঠান মোগল বিস্তর মিনারেট গড়েছে; কিন্তু সেগুলোও কুতুবের কাছে আসতে পারে না।’ – উক্তিটির সত্যতা ব্যাখ্যা করো।
সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর ‘কুতুব মিনারের কথা’ রচনাংশে উদ্ধৃত কথাটি বলেছেন। কথাটির বিচারবিশ্লেষণ করতে গিয়ে প্রথমে মিনার ও মিনারেট বা মিনারিকার মধ্যে সাধারণ পার্থক্যটুকু বুঝতে হবে। খুব সোজা কথায় মিনার বলতে সুউচ্চ চূড়াযুক্ত ইমারতকে বোঝায় এবং স্বল্প উচ্চ চূড়াযুক্ত মিনারকে মিনারেট বা মিনারিকা বলা হয়। পাঠান-মোগলদের যে মিনারেট তার চেয়ে সময়ের নিরিখে কুতুবমিনার আগে। সমালোচনা ও শৈলীর বিচারে কুতুবমিনার পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মিনার। তাই পরবর্তীকালে নির্মিত তাজমহল ও হুমায়ুনের সৌধ-নির্মাতারা নতমস্তকে কুতুবের কাছে বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছেন। তাই তাঁরা মিনারেটগুলি নির্মাণের সময় এমন ন্যাড়াভাবে তৈরি করেছেন যে, দর্শকের মনে অজান্তেও যেন মিনারেটগুলি দেখতে দেখতে কুতুবমিনারের কথা স্মরণে না আসে। যে তাজের সর্বাঙ্গে গয়নার ছড়াছড়ি তার চারটি মিনারিকার হাতে নোয়া পর্যন্ত নেই। হুমায়ুনের সমাধি-নির্মাতা আরও এক ধাপ এগিয়ে, মিনারিকা সম্পূর্ণ বর্জন করেছেন।
‘বোধ হয় ঠিক সেই কারণেই তার নিজস্ব মূল্য আছে।’ – ‘তার’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে? কোন্ কারণে তার নিজস্ব মূল্য আছে?
‘তার’ বলতে এখানে গুজরাটের রাজা আহমেদের দ্বারা নির্মিত বেগম রানি সিপ্রির মসজিদের কথা বলা হয়েছে।
মিনারের ক্ষেত্রে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত কুতুবমিনার। কুতুবমিনারের পরবর্তী সময়ে যাঁরই যে মিনার তৈরি করতে গিয়েছেন তাতেই কুতুবের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে; এমনকি মিনারেট বা মিনারিকা তৈরির ক্ষেত্রেও। রবীন্দ্রনাথের ব্যাপকতা কাটিয়ে যেমন বাংলা সাহিত্যের কবি-সাহিত্যিকেরা বেরিয়ে আসতে পারছিলেন না, অনেকটা সেরকম। রানি সিপ্রির মসজিদ এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। দিল্লি-আগ্রার বহুদূরে গুজরাটে অবস্থিত মিনারিকাটির কুতুবের সঙ্গে কোনো মিল নেই। সেজন্যই এর একটা আলাদা মূল্য আছে এবং সেইজন্যই মসজিদটির মধুরদর্শন ভূপর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। রাজপুত রমণীদের মতো বিচিত্র আকার ও বিচিত্র দর্শনের অসংখ্য বলয়বন্ধন পরে মিনারিকাটি আপন মহিমায় ভাস্বর।
নীচে যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও – কানিংহাম, ফার্গুসন, সৈয়দ আহমেদ।
- কানিংহাম: আলেকজান্ডার কানিংহাম 1814 খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একাধারে প্রখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ভাষাতত্ত্ববিদ। 1833 খ্রিস্টাব্দে তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চাকরি নিয়ে এদেশে আসেন। বিশ্বের প্রায় হারিয়ে যাওয়া ভাষা নিয়ে তাঁর গবেষণা ও সুচিন্তিত মতামত আধুনিক ভাষাবিদদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছে। 1866 খ্রিস্টাব্দে অবসর নেওয়ার পর তিনি ভারত সরকার নিযুক্ত পুরাতত্ত্ববিভাগের সার্ভেয়ার পদে কাজ করেন।
- ফার্গুসন: বিখ্যাত ব্রিটিশ ঐতিহাসিক ও প্রত্নতত্ত্ববিদ জেমস ফার্গুসন ভারতের ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করেছেন। এমনকি অজন্তা-ইলোরা গুহাচিত্র নিয়েও তাঁর গবেষণা ভারতের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে। 1819 খ্রিস্টাব্দে কিছু অফিসার এই অজন্তা গুহা দেখেন। পরে 1824 খ্রিস্টাব্দে লেফট্যানেন্ট জেমস আলেকজান্ডার ব্যক্তিগতভাবে নিজামের দরবারে বেড়াতে আসেন এবং এই গুহা সম্বন্ধে রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটিকে জানান। ফার্গুসন এই ব্যাপারটি তৎকালীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ডিরেক্টরকে জানান এবং এই গুহাগুলিকে সংরক্ষণ করার অনুরোধ করেন।
- সৈয়দ আহমেদ: দিল্লির এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে এই ইতিহাসবিদের জন্ম হয়। ভারতীয় ইসলামিক সংস্কৃতি ও সামাজিক আন্দোলনের অন্যতম এক নেতা এই ব্যক্তি 1817 খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন আলিগড় আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা। পুরাতত্ত্ব ও স্থাপত্য বিষয়ে তাঁর গবেষণা ভারতের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে। মুসলিম সমাজের সংস্কারসাধন-সহ পাণ্ডিত্যপূর্ণ নানা কর্মের জন্য তিনি ‘স্যার’ উপাধি লাভ করেন। 1898 খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যু হয়।
‘কুতুব মিনার পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মিনার’ – এই উদ্ধৃতিটির আলোকে মিনারটির পাঁচটি বিশিষ্টতা উল্লেখ করো।
কুতুবমিনারই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মিনার। এই সর্বশ্রেষ্ঠ মিনারের শিরোপা পাওয়ার পিছনে কতকগুলি বৈশিষ্ট্য আছে। সেগুলি হল –
- কুতুব সোজা বা খাড়া স্তম্ভ। এমন স্তম্ভে সৌন্দর্য সৃষ্টি করা কঠিনই। কিন্তু এক্ষেত্রে শিল্পীরা চরমভাবে সফল হয়েছেন। স্তম্ভটিকে কয়েকটি তলায় বিভক্ত করে এবং যথাসাধ্য সামঞ্জস্য রেখে প্রতি তলায় তাকে একটু করে ছোটো করে, গুটিকতক ব্যালকনি লাগিয়ে মিনারটির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হয়েছে।
- পাঁচতলাবিশিষ্ট এই মিনারটির প্রথম তলায় আছে ‘বাঁশি’ ও ‘কোণ’-এর পরপর সাজানো নকশা।
- দ্বিতীয় তলাতে আছে শুধু বাঁশি, আর তৃতীয় তলাতে শুধু কোণ এবং চতুর্থ ও পঞ্চম তলা বজ্রাঘাতে বিনষ্ট হয়ে যাওয়ায় তার শিল্পকর্ম সম্পর্কে বিশেষ জানা যায় না।
- সমগ্র মিনারটি লাল বেলে-পাথর দিয়ে নির্মিত। এই মিনারকে ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করেছে।
- মিনারটি সৃজনের ক্ষেত্রে শিল্পীদের প্রপোরশন (Proportion) বা সামঞ্জস্য-ধারণা ছিল লক্ষ করার মতো। এতে হিন্দু-মুসলমান উভয় স্থাপত্যধারার মিশ্রণ লক্ষ করা যায়।
মিনারটির গঠনে হিন্দু-মুসলিম সাংস্কৃতিক মিলনের চেহারাটি কীভাবে ধরা পড়েছে, তা লেখো।
সুলতানি যুগের স্থাপত্যে হিন্দু ও মুসলিম স্থাপত্যরীতির সমন্বয় লক্ষ করা যায়, কারণ ভারতে ইসলামের আসার আগেই হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন স্থাপত্যের একটি বিশেষ ধারা ছিল। কুতুব মিনারের যে কারুকার্য তা হিন্দু-মুসলিম স্থাপত্যের এক অভূতপূর্ব মিলন। বাঁশি ও কোণের উপর দিয়ে সমস্ত মিনারটিকে কোমরবন্ধের মতো ঘিরে রয়েছে সারি সারি লতাপাতা, ফুলের মালা, চক্রের নকশা। এগুলি জাতে হিন্দু এবং এর সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে আরবি লেখার সারি, সেগুলি জাতে মুসলমান। গোটা মিনারটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা গিয়েছে মিনারটির পরিকল্পনা করেছেন মুসলমান এবং যাবতীয় কারুশিল্প ও খোদাইয়ের কাজ করেছেন হিন্দু। ভারতবর্ষে মুসলমানদের সর্বপ্রথম সৃষ্টিকার্যে হিন্দু-মুসলমান মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে, যা আজও অটুট আছে অন্তত কলাশিল্পের ক্ষেত্রে।
এই আর্টিকেলে আমরা সপ্তম শ্রেণির বাংলা পাঠ্যক্রমের অন্তর্গত, সৈয়দ মুজতবা আলী রচিত ‘কুতুব মিনারের কথা’ প্রবন্ধের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের আসন্ন পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এই প্রশ্নোত্তরগুলি অত্যন্ত সহায়ক হবে, কারণ পরীক্ষায় এই ধরনের বর্ণনামূলক প্রশ্ন প্রায়শই এসে থাকে।
আশা করি, এই আলোচনাটি আপনাদের উপকারে এসেছে। পাঠ্যবিষয়ক কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকলে নির্দ্বিধায় আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে জানাতে পারেন। আপনাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে এবং পড়াশোনায় সাহায্য করতে আমরা সর্বদা প্রস্তুত। ধন্যবাদ!





মন্তব্য করুন