মাধ্যমিক – ভূগোল – বারিমন্ডল – সমুদ্রস্রোত – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর

মাধ্যমিক ভূগোল বিষয়ের দ্বিতীয় অধ্যায় হলো বারিমন্ডল, ছাত্র/ছাত্রীরা যারা মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছ তাদের জন্য নিচে এই অধ্যায় সংক্রান্ত কিছু প্রশ্ন ও উত্তর দেওয়া হলো। প্রতিটি প্রশ্নের মান 3.

সমুদ্রস্রোত কয় প্রকার ও কী কী? সংক্ষেপে লেখো

সমুদ্রস্রোত সাধারণত দুই প্রকারের —

  • উষ্ণস্রোত
  • শীতল স্রোত

উষ্ণস্রোত – উষ্ণমণ্ডলের মহাসাগরগুলির অন্তর্গত উষ্ণ ও হালকা জল পৃষ্ঠপ্রবাহরূপে সমুদ্রপৃষ্ঠের ওপরের অংশ দিয়ে শীতল মেরু অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়। একে বলা হয় উষ্ণস্রোত। সমুদ্রের ওপরের অংশ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার ফলে উষ্ণস্রোতের আর-এক নাম হল পৃষ্ঠস্রোত বা বহিঃস্রোত (surface current)। উদাহরণ – উপসাগরীয় স্রোত

শীতল স্রোত – উষ্ণমণ্ডলের জল যখন শীতল অঞ্চলের দিকে ধাবিত হয়, তখন সেই জলের শূন্যতা পূরণের জন্য মেরু অঞ্চলের শীতল ও ভারী জল সমুদ্রের নিম্নাংশ দিয়ে অন্তঃপ্রবাহরূপে উয়মণ্ডলের দিকে বয়ে যায়, একে বলা হয় শীতল স্রোত সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয় বলে শীতল স্রোতের আর এক নাম অন্তঃস্রোত উদাহরণ – ল্যাব্রাডর স্রোত

বারিমন্ডল

জাপানের উপকূলের কাছে মৎস্যক্ষেত্র দেখা যায় কেন?

উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম প্রান্তে জাপান অবস্থিত এবং এই দেশটির পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে উষ্ণ কুরোশিয়ো বা জাপান স্রোত এবং শীতল কিউরাইল স্রোত। সুমেরু মহাসাগর থেকে আগত শীতল কিউরাইল বা কামচাটকা স্রোতের সঙ্গে বড়ো বড়ো হিমশৈলও থাকে, যেগুলি জাপানের উপকূলের কাছাকাছি উষ্ণ কুরোশিয়ো স্রোতের সংস্পর্শে এসে গলে যায়। এর ফলে হিমশৈলবাহিত বিভিন্ন পদার্থ, যেমন — শৈবাল, নুড়ি-পাথর ইত্যাদি এখানকার মহীসোপানে সঞ্চিত হতে থাকে। এইভাবে দীর্ঘকাল জমা হতে হতে জাপানের উপকূলের অদুরে অনেক অগভীর মগ্নচড়া সৃষ্টি হয়েছে, যেগুলিকে কেন্দ্র করে এখানে মাছের খাদ্য প্ল্যাঙ্কটন প্রচুর পরিমাণে জন্মায়। এজন্য জাপানের উপকূলের কাছে বিভিন্ন ধরনের মাছের ব্যাপক সমাবেশ ঘটে এবং সমগ্র এলাকাটি মৎস্যক্ষেত্র হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জাপানের পূর্ব উপকূলে ঘন কুয়াশা সৃষ্টি হয় কেন?

সাগর-মহাসাগরের যেসব অংশে উষ্ণ ও শীতল স্রোতের মিলন হয়, সেখানে উষ্ণ স্রোতের ওপর দিয়ে প্রবাহিত উয় বায়ুতে থাকা জলীয়বাষ্প শীতল স্রোতের ওপর দিয়ে প্রবাহিত শীতল বায়ুর সংস্পর্শে এসে জমে যায়। ফলে ওই অঞ্চলে ঘন কুয়াশার সৃষ্টি হয়। জাপানের পূর্ব উপকূল দিয়ে দক্ষিণ থেকে উত্তরে উষ্ণকুরোশিয়ো বা জাপান স্রোত এবং উত্তর থেকে দক্ষিণে শীতল কিউরাইল স্রোত বয়ে যায়। এই দুই ভিন্নধর্মী স্রোতের মিলনের ফলে জাপানের পূর্ব উপকূলে ঘন কুয়াশা সৃষ্টি হয়।

উত্তর ভারত মহাসাগরে গ্রীষ্মকালীন স্রোতের বর্ণনা দাও।

উত্তর ভারত মহাসাগরে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে গ্রীষ্মকালে ও শীতকালে সম্পূর্ণ বিপরীত দিক থেকে সমুদ্রস্রোত প্রবাহিত হয়। দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোতের যে শাখাটি উত্তরদিকে বেঁকে ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করে সেটি মৌসুমি বায়ুর গতি ও দিক অনুসারে প্রবাহিত হয়। তাই এর নাম মৌসুমি স্রোত। গ্রীষ্মকালে এই স্রোতটি দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ডানদিকে বেঁকে আফ্রিকার পূর্ব উপকূল দিয়ে সোমালি স্রোত নামে উত্তর-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়। এরপর, এই স্রোতটি দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি স্রোত নামে আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগরের মধ্য দিয়ে সুমাত্রা দ্বীপ পর্যন্ত চলে যায়।

বারিমণ্ডল আসলে কী?

ভূপৃষ্ঠের মোট আয়তনের প্রায় 71 শতাংশ জলরাশি দ্বারা আবৃত। এই জলভাগের ভৌগোলিক নাম বারিমণ্ডল। ছোটো-বড়ো পুকুর, খাল, বিল, জলাশয়, সাগর, মহাসাগর – সবই বারিমণ্ডলের অন্তর্গত। সমুদ্রের জল সর্বদা এক স্থান থেকে অন্যস্থানে এগিয়ে যায়। সমুদ্র স্রোত সমুদ্রজলের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক। সমুদ্র স্রোতের জন্যই পৃথিবীর জলবায়ুর অনেকটা অংশ নিয়ন্ত্রিত হয়।

সমুদ্রস্রোতের নামকরণ কীভাবে হয়?

সমুদ্রস্রোতের নামকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বায়ুর ক্ষেত্রে যেদিক থেকে বায়ু প্রবাহিত হয় সেদিক অনুযায়ী নামকরণ করা হয়। কিন্তু সমুদ্রস্রোতের ক্ষেত্রে সেই ধারণাটি সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থাৎ, সমুদ্রস্রোত যে স্থলভাগের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয় বা যেদিকে প্রবাহিত হয় বা যে সাগর বা মহাসাগরের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয় সেই অনুযায়ী নামকরণ করা হয়। যেমন – ক্যারিবিয়ান উপসাগরের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত স্রোতকে ক্যারিবিয়ান স্রোত নামে ডাকা হয় আবার ব্রাজিলের পাশ দিয়ে। প্রবাহিত স্রোতকে ব্রাজিল স্রোত নামে আখ্যায়িত করা হয়।

লন্ডন অপেক্ষা নিউইয়র্ক নিম্ন অক্ষাংশে অবস্থিত, অথচ নিউইয়র্কে শীত বেশি — এর কারণ কী?

লন্ডনের অক্ষাংশ প্রায় 51°30’26” উত্তর এবং নিউইয়র্কের অক্ষাংশ প্রায় 40°30 উত্তর। স্বাভাবিকভাবেই লন্ডনের তুলনায় নিউইয়র্কের উষ্ণতা বেশি হওয়া উচিত। কিন্তু নিউইয়র্কে লন্ডনের থেকে শীতের তীব্রতা বেশি। এর কারণ সমুদ্রস্রোত। নিউইয়র্কের পাশ দিয়ে সুমেরু থেকে শীতল ল্যাব্রাডর স্রোত প্রবাহিত হয় বলে এই স্রোত নিউইয়র্কের পাশাপাশি অঞ্চলকে শীতার্ত করে তোলে। অন্যদিকে লন্ডনের পাশ দিয়ে উষ্ণ উত্তর আটলান্টিক স্রোত প্রবাহিত হয় বলে লন্ডনের তাপমাত্রা বেশি হয়।

সমুদ্রস্রোত কীভাবে উপকূলের জলবায়ুকে নিয়ন্ত্রণ করে?

উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণ –

  • উষ্ণ সমুদ্রস্রোত শীতল অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হলে সেখানকার তাপমাত্রা বেড়ে যায়। যেমন — উষ্ণউপসাগরীয় স্রোত উত্তর আমেরিকার পূর্ব উপকূলকে উয় রাখে।
  • শীতল সমুদ্রস্রোত উয় অঞ্চলের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হলে সেখানকার তাপমাত্রা কিছুটা কমে যায়। যেমন — শীতল পেরু স্রোত পেরুর তাপমাত্রাকে খুব বাড়তে দেয় না।

বৃষ্টি, বন্যা, খরা – উষ্ণ সমুদ্রস্রোতের ওপর দিয়ে প্রবাহিত বায়ু বেশি জলীয় বাষ্প শোষণ করে বলে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা বাড়ে। অন্যদিকে শীতল স্রোতযুক্ত অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কম হয়। এলনিনো এবং লা-নিনার প্রভাবে সন্নিহিত অংশে খরা ও বন্যা দেখা যায়।

কুয়াশা – শীতল এবং উষ্ণস্রোত যেখানে মিলিত হয় সেখানে কুয়াশার, ঝড়-ঝঞ্ঝার সৃষ্টি হয়। যেমন — নিউফাউন্ডল্যান্ড উপকূল।

তুষারপাত – শীতল স্রোত শীতকালে বহু জায়গায় তুষারপাত ঘটায়।

সমুদ্রস্রোত কীভাবে জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটায়?

সমুদ্রস্রোত পৃথিবীর জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটায় –

  • পৃথিবীর তাপের সাম্য – উষ্ণস্রোত মেরুর দিকে এবং মেরুর শীতল স্রোত নিরক্ষীয় অঞ্চলে প্রবাহিত হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের মধ্যে তাপের আদান প্রদান ঘটে।
  • বৃষ্টিপাত ও তুষারপাত – উষ্ণ স্রোত প্রবাহিত অঞ্চলের পার্শ্ববর্তী অংশে বৃষ্টিপাত বাড়ে এবং শীতল স্রোত প্রবাহিত অঞ্চলের পার্শ্ববর্তী অংশে তুষারপাত এবং বৃষ্টিহীনতা দেখা যায়।
  • এলনিনো ও লা নিনা – এল নিনোর বছরগুলিতে দক্ষিণ আমেরিকার পেরু, ইকুয়েডর উপকূলে উত্তর দিক থেকে উষ্ণাস্রোত প্রবাহিত হয়। এর প্রভাবে ওই অঞ্চলে প্রবল বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া এমনকী ভারতে খরা প্রবণতা বাড়ে। লা নিনার বছরে অস্ট্রেলিয়ায় প্রবল বৃষ্টি, ভারতে স্বাভাবিক বর্ষা এবং পেরু ইকুয়েডরে অনাবৃষ্টি বা খরা দেখা যায়।

আরও পড়ুন – মাধ্যমিক ভূগোল – বারিমন্ডল – জোয়ারভাটা – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর

Rate this post


Join WhatsApp Channel For Free Study Meterial Join Now
Join Telegram Channel Free Study Meterial Join Now

মন্তব্য করুন