এই আর্টিকেলে আমরা সপ্তম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের অন্তর্গত রামকিঙ্কর বেইজের লেখা ‘আত্মকথা’ গদ্যাংশের কিছু গুরুত্বপূর্ণ রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নোত্তরগুলো সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত সহায়ক, কারণ স্কুলের বাংলা পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে।

শৈশবেই রামকিঙ্করের মনে ও কাজে কীভাবে শিল্পপ্রভাব গড়ে উঠেছিল?
প্রায়শই দেখা গেছে, ভবিষ্যতে যাঁরা কোনো বিষয়ে মহৎ ব্যক্তিত্ব হিসেবে গড়ে ওঠেন, তাঁদের শৈশবেই সেই বিষয়ে একটা নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ দেখা দেয়। রামকিঙ্কর এক অপরিমেয় শিল্পপ্রতিভার অধিকারী হয়েছিলেন। তাঁর সূচনার একটা মুকুলও তাঁর শৈশবে বিকশিত হতে দেখা যায়। তাঁর বাড়িঘরের চারদিকের দেয়ালে নানা দেবদেবীর ছবি দেখে শৈশবে তাঁর ভালো লাগত। তিনি সেগুলি কপি করে সেই বয়সেই ‘ভিজ্যুয়াল আর্ট’-এ নিজের বর্ণপরিচয় ঘটিয়ে ফেলেন। মূর্তিগড়ার ক্ষেত্রেও সূচনাপর্বটি ছিল মজার। বাড়ির সামনের লাল-মোরামে ঢাকা রাস্তা একদিন হঠাৎ-বৃষ্টিতে ধুয়ে গেলে তিনি দেখেন নীল রঙের মাটি বেরিয়ে পড়েছে। সেখান থেকে এক খাবলা মাটি তুলে, তা দিয়ে তিনি নানারকম পুতুল তৈরি করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন – ‘আমার প্রথম শিল্পের ইস্কুল বাড়ির পাশের কুমোরপাড়া।’ সেখানেই ছেলেবেলায় অনেকক্ষণ ধরে কুমোরদের মূর্তিগড়া ও অন্যান্য কাজ দেখতেন আর তিনি ‘সুযোগ পেলেই মাটিতে হাত লাগিয়ে ছানাছানি’ করতেন। এভাবেই তাঁর মনে শৈশবেই একটা শিল্পপ্রভাব গড়ে উঠেছিল।
ছেলেবেলায় শিল্পচর্চা করার ক্ষেত্রে রামকিঙ্করের উদ্ভাবনী ক্ষমতার পরিচয় দাও।
একজন চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর হিসেবে বিস্ময়কর প্রতিভা ছিলেন রামকিঙ্কর বেইজ। জীবনের একটা বিশেষ বয়সে এসে শান্তিনিকেতনের পরিবেশ ও শিল্প তাঁর উপর যে অসাধারণ প্রভাব ফেলেছিল, তা তাঁর ছেলেবেলায় ছিল না। কিন্তু ‘আত্মকথা’ রচনায় ছেলেবেলা সম্পর্কে কিছু বলতে গিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, পারিপার্শ্বের নানা উপকরণ থেকে তিনি সংগ্রহ করে নিতেন তাঁর শিল্পবোধের উপকরণ। এর মধ্যে একটি বিশেষ দিক হলো রং। দেয়ালে টাঙানো দেবদেবীর ছবি এঁকে দিত ছবির বিষয়, নরম মাটি দিত তাঁকে মূর্তি গড়ার প্রেরণা। একইভাবে তিনি রঙের উৎসও খুঁজে নিয়েছিলেন নিজস্ব ভাবনায়। গাছের পাতার রস, বাটনা-বাটা শিলের হলুদ, মেয়েদের পায়ের আলতা, মুড়ি-ভাজা খোলার চাঁছা ভুষোকালি – এগুলি তাঁর রঙের প্রয়োজন মেটাত। একইভাবে তুলি গড়ার ক্ষেত্রে তাঁর উদ্ভাবনা ছিল অভিনব। পাড়ার প্রতিমা-প্রস্তুতকারক মিস্ত্রিদের দেখে ছাগলের ঘাড়ের লোম কেটে নিয়ে, তা বাঁশের কাঠির ডগায় বেঁধে নিয়ে তা দিয়ে তিনি তুলির কাজ চালাতেন।
আত্মকথা প্রবন্ধ অবলম্বনে লেখক রামকিঙ্কর বেইজ-এর শৈশব জীবনের পরিচয় দাও।
লেখক রামকিঙ্কর বেইজ বাঁকুড়া জেলার অন্তর্গত এক গ্রামের মানুষ ছিলেন। শৈশব থেকেই তিনি সুন্দর সুন্দর ছবি আঁকতে পারতেন। কুমোরপাড়ায় বাড়ির সুবাদে মাটি দিয়ে নানান মূর্তিও তৈরি করতে শিখেছিলেন। ঘরের দেয়ালে টাঙানো দেবদেবীর ছবি দেখে তিনি ছবি আঁকা অভ্যাস করতেন। লেখকের পারিবারিক অবস্থা ভালো ছিল না। কিন্তু আঁকার দক্ষতার জন্য বিদ্যালয়ে অবৈতনিক বা বিনা বেতনের ছাত্র হিসেবে তিনি পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছিলেন। পড়াশোনার থেকে আঁকার দিকে তাঁর আগ্রহ ছিল অনেক বেশি। ভালো মাটি দেখতে পেলে তা নিয়ে তিনি পুতুল তৈরি করতেন। সুযোগ পেলে মাটিতে হাত লাগিয়ে ছানাছানি করতেন। মূর্তি তৈরি করে অতি অল্প বয়সেই তিনি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। শৈশবকাল থেকে তাঁর আঁকা এবং মূর্তি গড়াকে কেন্দ্র করে পরবর্তী জীবনে বহু জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তির সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন।
শান্তিনিকেতনের সঙ্গে যোগাযোগ তাঁরই কৃপায় ঘটে। – ‘তাঁরই’ বলতে কার কথা বলা হয়েছে? শান্তিনিকেতনের সঙ্গে যোগাযোগের পর কী ঘটেছিল?
তাঁরই বলতে ‘প্রবাসী’ পত্রিকার পরম শ্রদ্ধেয় সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের কথা বলা হয়েছে।
রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় মহাশয় বাঁকুড়ায় গিয়েছিলেন এবং রামকিঙ্করের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। তাঁরই সৌজন্যে শান্তিনিকেতনের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটে 1925 খ্রিস্টাব্দে। ম্যাট্রিক পরীক্ষা না দিয়েই রামকিঙ্কর চলে এসেছিলেন শান্তিনিকেতনের ব্রহ্মচর্য বিদ্যালয়ে। প্রথমেই জেনারেল লাইব্রেরির উপরতলার কলাভবনে পরিচয় হল স্বনামধন্য চিত্রশিল্পী আচার্য নন্দলাল বসুর সঙ্গে। তিনি তাঁর কয়েকটি আঁকা ছবি দেখে বলেছিলেন “তুমি সবই জানো, আবার এখানে কেন?” একটু ভেবে তিনি বলেছিলেন, “আচ্ছা, দু-তিন বছর থাকো তো।” এই কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি প্রাকৃতিক বাস্তবতাকে খুঁজে পেয়েছিলেন নন্দলাল বসুর সান্নিধ্যে থেকে। ওরিয়েন্টাল আর্টের প্রবর্তক নন্দলালবাবুর পরোক্ষ প্রভাবে তিনি ছবির মধ্যে অতি সাধারণ ব্যাপারটাকে আরও বেশি প্রাণবন্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সত্যিকারের একজন শিল্পীর কাছে শিক্ষা লাভ করায় তিনি নিজেকে সৌভাগ্যবান বলে মনে করতেন।
শিল্পী রামকিঙ্কর বেইজ-এর শিল্পপ্রতিভার পরিচয় দাও।
রামকিঙ্কর বেইজ প্রখ্যাত ভাস্কর এবং চিত্রশিল্পী ছিলেন। ছোটোবেলা থেকেই তিনি ছবি আঁকায় পারদর্শী ছিলেন। কুমোরপাড়ায় শিল্পীদের দেখে নানা দেবদেবীর ছবি আঁকতেন। ম্যাট্রিক পাস করার পর 1925 খ্রিস্টাব্দে শিল্পী রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের সৌজন্যে শান্তিনিকেতনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়। এখানকার প্রখ্যাত শিল্পগুরু নন্দলাল বসুর কাছে শিল্প শিক্ষার সৌভাগ্য ঘটে। তাঁর আঁকা ছবি দেখে নন্দলাল বসু বলেছিলেন, “তুমি সবই জানো, আবার এখানে কেন?” অতঃপর দু-তিন বছর থাকার কথা বলেন। সেই দু-তিন বছর আর শেষ হয়নি; আজীবন শিল্পচর্চা করেছিলেন তিনি। প্রথম প্রথম অয়েল পেন্টিং-এ ছবি আঁকলেও পরবর্তীকালে ওরিয়েন্টাল আর্টের শিক্ষা গ্রহণ করেন। নন্দলাল বসুর শিল্পের সাদামাটা সুরটা শিল্পী রামকিঙ্করকে ভীষণভাবে আকর্ষণ করে। তাই তাঁর ছবি বা মূর্তির অধিকাংশ ক্যারেকটারই যে খুব সাধারণ, তা অনেকটা নন্দলালবাবুর পরোক্ষ প্রভাবে। এতেই রামকিঙ্করের শিল্পচর্চার সার্থকতা।
এই আর্টিকেলে আমরা সপ্তম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের অন্তর্গত, রামকিঙ্কর বেইজ রচিত ‘আত্মকথা’ পাঠের কিছু রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নোত্তরগুলো সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাংলা পরীক্ষায় এই ধরনের প্রশ্ন নিয়মিত আসে।
আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে আসবে। যদি আপনার কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তবে টেলিগ্রামে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। আপনাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। ধন্যবাদ।





মন্তব্য করুন