অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – আঞ্চলিক শক্তির উত্থান – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর

Rahul

আজকে আমরা এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের দ্বিতীয় অধ্যায়, “আঞ্চলিক শক্তির উত্থান”-এর কিছু “ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর” নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের স্কুলের পরীক্ষার জন্য ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির পর্যায়ক্রমিক মূল্যায়ন (Unit Test) থেকে শুরু করে বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই আসে।

আঞ্চলিক শক্তির উত্থান – অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর
Contents Show

মোঘল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ উল্লেখ করো।

বাবর প্রতিষ্ঠিত মোঘল সাম্রাজ্য আকবরের আমলে একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু ঔরঙ্গজেবের পর থেকে নানা কারণে মোঘল সাম্রাজ্যের পতন ত্বরান্বিত হয়।

মোঘল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ

1. সাম্রাজ্যের বিশালতা – সাম্রাজ্যের বিশালতা ছিল মোঘল সাম্রাজ্যের পতনের একটি অন্যতম কারণ। ঔরঙ্গজেবের সময় মোঘল সাম্রাজ্যের চরম বিস্তৃতি ঘটে। তাঁর আমলে মোট 21টি মোঘল সুবা ছিল। ঔরঙ্গজেবের মত দক্ষ সম্রাটের পক্ষেও বিশালকায় এই সাম্রাজ্যকে দীর্ঘ দিন ধরে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। তাঁর মৃত্যুর পর সাম্রাজ্যের বিশালতার সুযোগ নিয়ে আঞ্চলিক শাসককর্তারা স্ব-স্ব ক্ষেত্রে স্বাধীন হয়ে ওঠে।

2. সামরিক দুর্বলতা – সামরিক শক্তির দুর্বলতা ছিল মোঘল সাম্রাজ্য পতনের আর একটি কারণ। ঐতিহাসিক আরভিন দেখিয়েছেন যে, মোঘল বাহিনীর কার্যকরী ক্ষমতা, শৌর্য, শৃঙ্খলা এবং নতুন যুদ্ধ সরঞ্জামের অভাবে মোঘল বাহিনী দুর্বল হয়ে পড়ে। নানা কারণে মোঘল বাহিনীর দুর্বলতা প্রকট হয়, যেমন—

  • বিভিন্ন জাতি ও সম্প্রদায় নিয়ে গড়ে ওঠায় মোঘল বাহিনী কখনও ‘জাতীয় বাহিনী’ হিসেবে গড়ে ওঠেনি।
  • সুখসাচ্ছন্দ্য ও বিলাস-ব্যসনের ফলে সৈন্যরা দুর্বল হয়ে পড়ে।
  • তা ছাড়া আকবর ছাড়া কেউই নৌবাহিনীর প্রতি বিশেষ নজর দেননি।

3. অর্থ সংকট – শাহজাহানের জাঁকজমক ও আড়ম্বরপ্রিয়তা, ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতি, উচ্চপদস্থ আমলা, কর্মচারীদের অধিক বেতনের ফলে মোঘল অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। 1717 খ্রিস্টাব্দে ফারুকশিয়রের ফরমান ইংরেজদের বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার অনুমতি দান এবং 1765 খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় শাহ আলম ইংরেজ কোম্পানিকে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার ‘দেওয়ানি’ প্রদান করে মোঘল সাম্রাজ্যকে আর্থিক দিক থেকে দুর্বল করে। এ প্রসঙ্গে স্যার যদুনাথ সরকার ‘দেউলিয়া’ অর্থনীতির কথা উল্লেখ করেছেন।

4. জায়গির প্রথা – ইরফান হাবিবের মতে, ত্রুটিপূর্ণ জায়গিরদারি প্রথা মোঘল সাম্রাজ্যের পতনের একটি অন্যতম কারণ। এই ব্যবস্থায় কৃষকদের ওপর অত্যাচার ও শোষণ বেড়ে যায়, বহু কৃষক জমি ছেড়ে চলে যায়। এতে কৃষির ফলন হ্রাস পায়, যা ছিল সাম্রাজ্যের পক্ষে একটি অশুভ লক্ষণ। ঔরঙ্গজেবের আমলে জায়গির প্রথা অত্যন্ত দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

5. ঔরঙ্গজেবের দায়িত্ব – ঔরঙ্গজেবের ‘ধর্মান্ধ গোঁড়া নীতি’র ফলে অমুসলমানগণ, যেমন—জাঠ, বুন্দেলা, সৎনামী, শিখ, রাজপুত ও মারাঠাগণ মোঘলদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। অধ্যাপক গৌতম ভদ্র দেখিয়েছেন যে, ঔরঙ্গজেবের আমলে সংগঠিত অধিকাংশ কৃষক বিদ্রোহের কারণ ছিল ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক। তিনি তাঁর জীবনের শেষ 25 বছর কেবল শিবাজি ও মারাঠাদের শায়েস্তা করতেই ব্যস্ত ছিলেন।

6. মোঘল শাসকদের দুর্বলতা – ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর 50 বছরের মধ্যে পরবর্তী মোঘল শাসকদের দুর্বলতা ও অপদার্থতার দরুন মোঘল সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে যায়। তাঁর মৃত্যুর 12 বছরের মধ্যে সিংহাসনের দখল নিয়ে যুদ্ধবিগ্রহ, ষড়যন্ত্র ও হত্যার মধ্য দিয়ে 3 বার গৃহযুদ্ধ ও 5 বার সম্রাট বদল হয়। বাহাদুর শাহের চার পুত্রের মধ্যেও বিরোধ বাধে।

7. দরবারের রাজনীতি – ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মোঘল দরবারে 3টি গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়, যথা— হিন্দুস্থানি, ইরানি ও তুরানি। বাহাদুর শাহের দরবারে জুলফিকার খাঁ ছিলেন প্রভাবশালী ইরানি নেতা। হিন্দুস্থানি গোষ্ঠীর নেতা হোসেন আলি ও আবদুল্লা খাঁ নামক ‘সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয়’ 1719 খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ছিলেন দিল্লির দরবারে রাজনীতির ভাগ্যনিয়ন্তা।

8. বৈদেশিক আক্রমণ – মোঘল সাম্রাজ্যের দুর্বলতা আরও প্রকট হয় দুটি বৈদেশিক আক্রমণের মধ্য দিয়ে। 1738 খ্রিস্টাব্দে পারস্যের নাদির শাহ এবং 1761 খ্রিস্টাব্দে আফগান অধিপতি আহম্মদ শাহ আবদালীর ভারত আক্রমণ মোঘল রাজশক্তির মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে দেয়।

মূল্যায়ন – সুতরাং সামগ্রিক আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, কোনো একটি বিশেষ কারণকে মোঘল সাম্রাজ্যের পতনের জন্য দায়ী করা যায় না। বিভিন্ন কারণের সম্মিলিত ফসল ছিল মোঘল সাম্রাজ্যের পতন।

2. মোঘলযুগে জায়গিরদারি সংকটের কারণ কী ছিল? এর ফল কী হয়েছিল?

একসময় যে জায়গিরদারি ও মনসবদারি ব্যবস্থা ছিল মোঘল শাসন ব্যবস্থা ও সংহতির মূল ভিত্তি, তা ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মোঘল সাম্রাজ্যের ভিত দুর্বল করে তোলে।

মোঘল যুগে জায়গিরদারি সংকটের কারণ –

আয়ের ঘাটতি – মোঘল যুগে অধিকাংশ মনসবদার নগদ বেতন ভোগ করতেন। তবে জায়গির ভোগের উদাহরণ ব্যতিক্রম ছিল না। এই প্রথার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল জমা ও হাসিল। কৃষি ফসল থেকে ও জমি থেকে কী পরিমাণে রাজস্ব সংগৃহীত হবে তার হিসাবকে বলা হত ‘জমা’ এবং এই রাজস্ব বাবদ আদায়কৃত অর্থকে বলা হত ‘হাসিল’। জাহাঙ্গীর ও ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকালে জায়গিরদারের সংখ্যা বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়, কিন্তু কৃষি জমির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়নি। জাহাঙ্গীরের আমলে হাসিলের পরিমাণ দারুণভাবে হ্রাস পায়। সাম্রাজ্যের আয়ের উৎস কমে যেতে থাকে, ফলে সাম্রাজ্যের অর্থনীতিতে প্রবল চাপ সৃষ্টি হয়। ফলে মনসবদারদের বেতন ও সেনাবাহিনীর বেতন দিতে এবং প্রশাসনিক খাতে টাকার জোগান দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।

যথেচ্ছ জায়গির দান – জায়গির লাভের আশায় শুরু হয় গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও দলাদলি। শাহজাহানের সময় প্রায় সাত হাজার জন মনসবদার ছিলেন। ঔরঙ্গজেবের আমলে এর পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় 14,449 জনে। দক্ষিণ ভারতের অভিজাতদের সমর্থন লাভের আশায় তিনি সেখানে বহু মনসব দান করেছিলেন।

জায়গিরদারদের দুর্নীতি – জায়গিরদারগণ অধিক আয়ের লোভে বেশি করে রাজস্ব আদায় করত। যদিও এই অতিরিক্ত ‘হাসিল’ সরকারের তহবিলে জমা পড়ত না। প্রজাগণও চরম দুর্দশার মধ্যে পড়তে থাকে। তাদের জীবনযাত্রা হয়ে পড়ে অসহনীয়। এ ছাড়া জায়গিরদারগণ অনেক সময় জায়গির ইজারা দেওয়ার বন্দোবস্ত করে।

ফলাফল – মোঘল সাম্রাজ্যের এই প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক দুর্বলতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রাদেশিক শাসনকর্তাগণ (সুবাদার) কেন্দ্র বিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত হয় এবং তাঁরা নিজ নিজ প্রদেশে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

3. আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে বাংলার উত্থান আলোচনা করো। অথবা, মোঘল যুগে বাংলায় কীভাবে স্বাধীন নবাবির সূচনা হয় তা আলোচনা করো।

মোঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের সময় পর্যন্ত বাংলা ছিল মোঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্গত একটি সুবা। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর বাংলায় স্বাধীন নবাবির সূচনা হয়।

আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে বাংলার উত্থান –

ঔরঙ্গজেবের সময় – 1700 খ্রিস্টাব্দে সুবা-বাংলার (বাংলা, বিহার ও ওড়িশা) রাজস্ব আদায়ের জন্য সম্রাট ঔরঙ্গজেব মুর্শিদকুলি খানকে বাংলার দেওয়ান করে পাঠান। এই সময় বাংলার সুবাদার ছিলেন আজিম-উস-শান।

ফারুখশিয়রের সময় – মোঘল সম্রাট ফারুখশিয়র 1717 খ্রিস্টাব্দে মুর্শিদকুলি খানকে বাংলার সুবাদার, দেওয়ান ও নাজিম পদে উন্নীত করেন। ফলে বাংলার প্রায় সব ক্ষমতাই তাঁর হাতে চলে যায়। অন্যদিকে বাংলার ক্ষমতাবান জমিদাররাও তাঁকে সহযোগিতা করেন।

এই সময় থেকেই তিনি দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে বাংলায় স্বাধীন নবাবির সূচনা করেন। 1727 খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি স্বমহিমায় বাংলার নবাব ছিলেন।

ফারুখশিয়রের পর – 1727 খ্রিস্টাব্দে মোঘল সম্রাট ফারুখশিয়র ও বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যু হয়। এরপর বাংলায় ক্রমান্বয়ে নবাব হন সুজাউদ্দিন, সরফরাজ খান, আলিবর্দি খান ও সিরাজ উদ্-দৌলা। এঁরা সকলেই দিল্লির সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে বাংলায় স্বাধীনভাবে রাজত্ব করেন।

মন্তব্য – এইভাবে মোঘল সম্রাটদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মুর্শিদকুলি খান বাংলায় যে স্বাধীন নবাবির সূচনা করেছিলেন, তা অব্যাহত ছিল সিরাজ উদ্-দৌলার রাজত্বকাল পর্যন্ত।

4. ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে বাংলার নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলার বিরোধের কারণগুলি আলোচনা করো।

1756 খ্রিস্টাব্দে বাংলার মসনদে বসেন সিরাজ উদ্-দৌলা। এই ঘটনা আলিবর্দির কিছু আত্মীয়বর্গ মেনে নিতে পারেন না। তারা সিরাজ বিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। এই ষড়যন্ত্রে যোগ দেন ঘসেটি বেগম, জগৎ শেঠ, উমিচাঁদ, রায়দুর্লভ, শওকৎ জঙ্গ, মিরজাফর প্রমুখ। সবশেষে ইংরেজ কোম্পানি এই ষড়যন্ত্রে যোগ দিলে সিরাজ বিরোধী ষড়যন্ত্র পরিপূর্ণতা লাভ করে।

বিরোধের কারণ

  • ঘসেটি বেগমকে সাহায্য – ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সিরাজের প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ঘসেটি বেগম ও পূর্ণিয়ার শাসনকর্তা শওকৎ জঙ্গকে সিরাজ বিরোধী কাজে সাহায্য দানের প্রতিশ্রুতি দেয়। এই সংবাদ নবাবের কর্ণগোচর হলে তিনি ইংরেজদের প্রতি রুষ্ট হন।
  • দুর্গ নির্মাণ – দাক্ষিণাত্যে কর্ণাটকের যুদ্ধ শুরু হলে ইংরেজরা কলকাতায় দুর্গ নির্মাণ ও দুর্গ সংস্কারের কাজ শুরু করে। সিরাজ ইংরেজদের দুর্গ সংস্কার করতে বারণ করেন। কিন্তু সেই নিষেধ অমান্য করে কোম্পানি দুর্গ সংস্কারের কাজ চালিয়ে যায়।
  • কৃষ্ণদাসকে আশ্রয় দান – ঢাকার শাসক নওয়াজিস মহম্মদের মৃত্যু হলে তাঁর দেওয়ান রাজবল্লভের পুত্র কৃষ্ণদাস প্রচুর ধনসম্পদ লুণ্ঠন করে ইংরেজদের শরণাপন্ন হয়। সিরাজ কৃষ্ণদাসকে তাঁর হাতে তুলে দিতে আদেশ দিলে কলকাতার ইংরেজ গভর্নর ড্রেক তা অস্বীকার করেন।
  • দস্তকের অপব্যবহার – সিরাজের নির্দেশ অমান্য করে কোম্পানির বণিকরা ব্যক্তিগতভাবে দস্তকের অপব্যবহার শুরু করে। তাতে নবাবের শুল্ক বাবদ আয় দারুণ ভাবে হ্রাস পায়।
  • সিরাজকে অপমান – প্রথা অনুযায়ী ইংরেজ কোম্পানি বাংলার নতুন নবাব সিরাজ উদ্-দৌলাকে কোনো উপঢৌকন বা নজরানা পাঠিয়ে সম্মান প্রদর্শন করেনি। ইংরেজদের এই উদ্ধত আচরণে সিরাজ দারুণ অপমানিত বোধ করেন।

5. তুমি কি মনে করো সিরাজউদ্দৌলা ও ইংরেজদের মধ্যে সংঘর্ষ অনিবার্য ছিল?

নবাব আলিবর্দি খাঁ-র মৃত্যুর পর তাঁর দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলা বাংলার নতুন নবাব হন। নবাব হওয়ার কিছুদিন পরেই একের পর এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে সিরাজের সঙ্গে ব্রিটিশ কোম্পানির বিরোধ তৈরি হয়।

বিরোধের কারণ –

  1. নজরানা না দেওয়া – ব্রিটিশ কোম্পানি সিরাজের ক্ষমতা লাভকে সুনজরে দেখেনি। সেইজন্য প্রথা অনুযায়ী নবাবের কাছে কোম্পানি কোনো নজরানা বা উপঢৌকন পাঠায়নি। এর ফলে সিরাজ কোম্পানির প্রতি ক্ষুব্ধ হন।
  2. দস্তকের অপব্যবহার – কোম্পানি বিনাশুল্কে বাণিজ্য করার জন্য ‘দস্তক’ নামে যে পরোয়ানা পায়, তার অপব্যবহার করে। কোম্পানির কর্মচারীরা ব্যক্তিগত বাণিজ্যে দস্তক ব্যবহার করতে থাকলে বাদশাহি শুল্কের ক্ষতি হয়। নবাব ও কোম্পানির মধ্যে এই শুল্ক নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল।
  3. কলকাতা দুর্গ সংস্কার – ফরাসি ও ব্রিটিশ কোম্পানি বাণিজ্যিক স্বার্থে নিজের নিজের দুর্গ সংস্কারে লিপ্ত হলে সিরাজ উভয় কোম্পানিকে এই কাজে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। ফরাসিরা নবাবের নির্দেশ মেনে নিলেও ব্রিটিশ কোম্পানি দুর্গ সংস্কারের কাজ চালিয়ে যায়। এর ফলে সিরাজ ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।
  4. নবাবের অকৃতজ্ঞ কর্মচারীকে আশ্রয় – বাংলার কোশাগার তছরুপ করার অভিযোগে অভিযুক্ত কৃষ্ণদাস নামে এক কর্মচারীকে কোম্পানি কলকাতায় আশ্রয় দেয়। তাঁকে সিরাজ ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দিলে কোম্পানি অগ্রাহ্য করে। ফলে কোম্পানির প্রতি সিরাজউদ্দৌলা রুষ্ট হন।

আমার মনে হয়, এই সকল কারণে সিরাজউদ্দৌলা ও ব্রিটিশ কোম্পানির মধ্যে সংঘর্ষ অনিবার্য ছিল।

6. ইংরেজ কোম্পানির সঙ্গে নবাব মিরকাশিমের বিরোধের কারণ কী? অথবা, বক্সারের যুদ্ধের কারণ উল্লেখ করো।

নানা কারণে নবাব মিরকাশিমের সঙ্গে ইংরেজ কোম্পানির দ্বন্দ্ব শুরু হয়। আর সেই দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত রূপ ছিল বক্সারের যুদ্ধ।

বক্সারের যুদ্ধের কারণ –

  1. অর্থনৈতিক দিক – মিরকাশিম তাঁর অর্থবল মজবুত করার জন্য কতগুলি আর্থিক সংস্কার করেন, যেমন—জমিদারদের ওপর বাড়তি করের বোঝা চাপানো হয়। দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মচারীদের বরখাস্ত করা হয় এবং তাঁদের কাছ থেকে জোর করে অর্থ আদায় করা হয়। শেঠ পরিবারের কাছ থেকে ‘আওয়াব’ নামক অতিরিক্ত কর আদায় করা হয় এবং তাদের কাছ থেকে জোর করে ঋণ নেওয়া হয়।
  2. সামরিক বিষয় – নবাব তাঁর সামরিক বাহিনী মজবুত করতে মুঙ্গেরে কামান ও বারুদের কারখানা স্থাপন করেন। সেনাবাহিনীকে সুশিক্ষিত করে তোলার জন্য তিনি ইউরোপ থেকে মার্কার ও সমরু নামক দুজন দক্ষ সেনা প্রশিক্ষক নিয়ে আসেন।
  3. প্রত্যক্ষ কারণ – ইংরেজ কোম্পানি ও বণিকরা দস্তকের অপব্যবহার শুরু করে। এতে নবাব তাঁর প্রাপ্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হন। ভারতীয় বণিকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। এই অবস্থায় মিরকাশিম বছরে 26 লক্ষ টাকার বিনিময়ে মোঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের নিকট একটি বাদশাহি ফরমান আদায় করেন এবং দেশীয় বণিকদের ওপর থেকে বাণিজ্যশুল্ক তুলে নেন। এতে ইংরেজরা দারুণ ক্ষুব্ধ হয়। ফলে সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে পড়ে।

যুদ্ধের সূচনা – এই সংঘর্ষে মিরকাশিম 1763 খ্রিস্টাব্দে ইংরেজদের কাছে কয়েকটি যুদ্ধে (কাটোয়া, গিরিয়া) পরাজিত হন। শেষপর্যন্ত তিনি অযোধ্যার নবাব ও মোঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের সঙ্গে মিত্রতা জোট গড়ে তোলেন এবং ইংরেজদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেন। এইভাবে 1764 খ্রিস্টাব্দে শুরু হয় বক্সারের যুদ্ধ।

7. মুর্শিদকুলি খান থেকে আলিবর্দি খানের সময় পর্যন্ত বাংলার নবাবদের সঙ্গে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সম্পর্ক আলোচনা করো।

বাংলার উন্নত ব্যাবসা বাণিজ্যের প্রতি আকৃষ্ট হয় ইংরেজ কোম্পানি। কিন্তু বাংলায় বাণিজ্য করার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় বাংলার নবাবগণ। স্বভাবতই কোম্পানির সঙ্গে বাংলার নবাবদের সুসম্পর্ক স্থাপিত হয়নি।

বাংলার নবাব ও ইংরেজ কোম্পানি –

মুর্শিদকুলি খান – 1717 খ্রিস্টাব্দ থেকে মুর্শিদকুলি খান বাংলায় স্বাধীনভাবে নবাবী শাসন শুরু করেন। তিনি ছিলেন একজন বিচক্ষণ নবাব। তিনি চেয়েছিলেন ইংরেজরা এখানে বাণিজ্য করুক, তবে বিনা শুল্কে নয়। 1713 খ্রিস্টাব্দ থেকেই তিনি কোম্পানির কাছ থেকে শুল্ক আদায় শুরু করেন। কিন্তু তাতে কোম্পানির লাভ হত না। এ জন্য 1717 খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ কোম্পানি মোগল সম্রাট ফারুখশিয়রের কাছ থেকে বাংলায় বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার জন্য একটি ফরমান আদায় করে নেয়। সেই ফরমানের জোরেই কোম্পানি বাংলায় বিনাশুল্কে বাণিজ্য শুরু করে।

সম্পর্কের অবনতি – বাংলায় বাণিজ্য করার ফরমান লাভ প্রসঙ্গে মুর্শিদকুলি খান মোটেও সন্তুষ্ট ছিলেন না। স্বভাবতই তাঁর সঙ্গে কোম্পানির সম্পর্কের অবনতি হয়। ‘দস্তকের’ জোরে কোম্পানির বণিকেরা বাংলায় ব্যক্তিগত বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছিল। এতে যেমন ক্ষতি হচ্ছিল বাংলার বণিককুলের; তেমনি ক্ষতি হচ্ছিল নবাবের অর্থনৈতিক স্বার্থ। কারণ কোম্পানি ও তার বণিকেরা বিনা শুল্কে অর্থাৎ, কর ফাঁকি দিয়ে বাংলায় ব্যাবসাবাণিজ্য চালিয়ে যেতে থাকে। মুর্শিদকুলি খাঁ ইংরেজদের এই আধিপত্য মেনে নিতে পারেননি। সুতরাং, এর ফলে নবাব প্রতি বছর এক বিশাল অঙ্কের টাকা থেকে বঞ্চিত হয়। তবে মুর্শিদকুলি খাঁ বাংলার স্বার্থের কথা বিবেচনা করে ইংরেজদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংঘর্ষের রাস্তায় যাননি। বরং নিমরাজি হয়েই তা মেনে নেন।

সুজাউদ্দিন খাঁ – পরবর্তীকালে বাংলার নবাব সুজা উদ্দিন নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর অনুসৃত নীতিই অনুসরণ করেন। 1727 খ্রিস্টাব্দে মুর্শিদকুলি খাঁর জামাতা সুজাউদ্দিন বাংলার নবাব হন। তিনিও ইংরেজদের বিনা শুল্কে ব্যাবসাবাণিজ্য বিষয়ে ক্ষুব্ধ ছিলেন। তিনি প্রায়ই কোম্পানির বণিকদের আটক করে হয়রানি করতেন। লবণ আটক করে কোম্পানির বণিকদের কাছ থেকে শুল্ক আদায় করতেন।

আলিবর্দি খাঁ – 1740 খ্রিস্টাব্দে বাংলার মসনদে বসেন নবাব আলিবর্দি খাঁ। তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বাংলায় তাদের বাণিজ্যিক সুযোগসুবিধা থেকে বিশেষ বঞ্চিত করেননি। কারণ তিনি জানতেন বাংলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রশ্নে ব্যাবসা বাণিজ্যের প্রয়োজন আছে। তবে তিনি কোম্পানির রাজনৈতিক ও সামরিক বাড়বাড়ন্তের দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতেন। নবাবের কর্মচারীগণ মাঝে মধ্যেই কোম্পানির বণিকদের ব্যাবসা বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টি করত এবং অতিরিক্ত শুল্ক আদায় করত।

ইতিমধ্যে দক্ষিণ ভারতে কর্ণাটকের যুদ্ধ বা ইঙ্গ-ফরাসি সংঘর্ষ বাঁধলে ইংরেজ ও ফরাসিগণ কলকাতা ও চন্দননগরে দুর্গ নির্মাণ করতে তৎপর হয়। উভয়েই নবাবের কাছে দুর্গ নির্মাণের অনুমতি চাইলে, তিনি তা নাকচ করে দেন।

মন্তব্য – এইভাবে ইংরেজ কোম্পানির সঙ্গে বাংলার নবাবদের একটা অম্ল মধুর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তবে সিরাজ উদ-দৌলার সময় সেই সম্পর্ক তিক্ততার স্তরে পৌঁছোয়।

8. পলাশির যুদ্ধ কী ভারতে ব্রিটিশদের ক্ষমতালাভে সাহায্য করেছিল?

1757 খ্রিস্টাব্দের 23 জুন পলাশির যুদ্ধে ব্রিটিশ কোম্পানির বাহিনী নবাব সিরাজ উদ-দৌলার বাহিনীকে পরাজিত করে। এই যুদ্ধের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।

পলাশির যুদ্ধের গুরুত্ব –

  1. এই যুদ্ধের ফলে বাংলার নবাবের রাজনীতিজ্ঞানের অভাব ও সামরিক দক্ষতার দুর্বলতা প্রকাশ পায়।
  2. এই যুদ্ধে প্রথম ইউরোপীয় শক্তি তথা ব্রিটিশ কোম্পানি দেশীয় শক্তি অর্থাৎ বাংলার নবাবকে পরাজিত করে। ফলে ব্রিটিশদের সামরিক প্রাধান্য ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়।
  3. পলাশির যুদ্ধে জয়লাভের ফলে ব্রিটিশ কোম্পানির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি সুসংহত হয়েছিল।
  4. এই যুদ্ধে জয়লাভ করে ব্রিটিশ কোম্পানি প্রচুর অর্থলাভ করে এবং পরবর্তীকালে সেই অর্থে সেনাবাহিনী বৃদ্ধি করে ভারতবিজয়ের পথ প্রশস্ত করে।
  5. পলাশির যুদ্ধে জয়লাভ ইউরোপের অন্যান্য শক্তি; বিশেষত ফরাসিদের ভীত করে তোলে এবং পরবর্তী সময়ে তৃতীয় কর্ণাটকের যুদ্ধে তারা মনোবল হারিয়ে ব্রিটিশদের কাছে পরাজিত হয়।

9. পলাশির যুদ্ধের ফলাফল/গুরুত্ব আলোচনা করো।

ভূমিকা – 1757 খ্রিস্টাব্দে পলাশির যুদ্ধে মির্জাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় বাংলার নবাব সিরাজ উদ্-দৌলা পরাজিত হন। আধুনিক ভারতের ইতিহাসে এই যুদ্ধের গুরুত্ব অপরিসীম।

পলাশির যুদ্ধের ফলাফল/গুরুত্ব –

সামরিক দিক দিয়ে বিচার করলে দেখা যায় যে, এই যুদ্ধ ছিল নিছক একটা অসম খণ্ড যুদ্ধ। কিন্তু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিরিখে পলাশির যুদ্ধ ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।

রাজনৈতিক গুরুত্ব –

  1. এই যুদ্ধে বাংলার নবাব সিরাজ উদ্-দৌলা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে পরাজিত হন। ফলে বাংলায় স্বাধীন নবাবির অবসান ঘটে।
  2. গোপন চুক্তি অনুসারে বাংলার মসনদে বসেন মির্জাফর।
  3. তিনি কোম্পানির ক্রীড়নকে পরিণত হন। এই সময় থেকে বাংলার শাসনক্ষমতা পরোক্ষভাবে কোম্পানির হস্তগত হয়।
  4. ধীরে ধীরে বাংলাকে কেন্দ্র করেই ইংরেজরা সারা ভারতে তাদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করে।
  5. ইংরেজরা পলাশির যুদ্ধে জয়লাভ করার পর বাংলা থেকে ফরাসি বণিকরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব – পলাশির যুদ্ধে জয়লাভের পর ইংরেজ কোম্পানি বাংলাদেশে অবাধে বাণিজ্য শুরু করে। কোম্পানি ও তার বণিকরা দস্তকের অপব্যবহার শুরু করে। কোম্পানি বিনাশুল্কে বাণিজ্য করার ফলে দেশীয় বণিককুল ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। কোম্পানির একাধিপত্যের দরুন বাংলার শিল্প, কৃষি তথা বাণিজ্যে দেখা দেয় ভয়াবহ শূন্যতা। পলাশির যুদ্ধের পরবর্তী বাংলার ইতিহাস হল কোম্পানির অর্থনৈতিক শোষণের ইতিহাস। ইংরেজরা এদেশের অর্থ ও সম্পদ বিনা বাধায় ইংল্যান্ডে চালান শুরু করে। ব্রুকস্ অ্যাডামস্ এই অধ্যায়কে বলেছেন ‘পলাশির লুণ্ঠন’।

স্যার যদুনাথ সরকারের মতে, পলাশির যুদ্ধের ফলে ভারতে মধ্যযুগের অবসান হয় এবং আধুনিকযুগের সূচনা হয়।

10. ‘অন্ধকূপ হত্যা’ বলতে কী বোঝায়?

পটভূমি – কলকাতার ইংরেজ গভর্নর ড্রেক নানাভাবে নবাব সিরাজ উদ্-দৌলার কর্তৃত্বকে অস্বীকার করে। সিরাজের নির্দেশ সত্ত্বেও ঢাকার দেওয়ান রাজবল্লভের পুত্র কৃষ্ণদাসকে যেমন তিনি প্রত্যর্পণ করেননি, তেমনি ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের সংস্কার কাজও তিনি বন্ধ করেননি। ড্রেকের এই উদ্ধত ব্যবহারে ক্রুদ্ধ সিরাজ বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে কলকাতা অভিযান করেন। 4 জুন সিরাজ ইংরেজদের কাশিমবাজার কুঠি দখল করেন।

এরপর 16 জুন (1756 খ্রিস্টাব্দ) তিনি কলকাতা পৌঁছান। তিনদিন পর গভর্নর ড্রেক, সেনাবাহিনীর প্রধান ও অন্যান্য নেতৃস্থানীয় ইংরেজরা দুর্গ ছেড়ে ফলতায় পালিয়ে যান। পরের দিন (20 জুন) ফোর্ট উইলিয়মের সেনারা সামান্য প্রতিরোধের পর আত্মসমর্পণ করে।

হলওয়েল-এর বিবরণ – হলওয়েল নামে জনৈক ব্রিটিশ কর্মচারী এক বিবরণে জানান যে, এই সময় সিরাজ 146 জন ইংরেজকে বন্দি করে একটি 18’×14′ ঘরের মধ্যে আটকে রাখেন। পরের দিন শ্বাসরুদ্ধ হয়ে এর মধ্যে 123 জন মারা যান। ইংরেজ ঐতিহাসিক হলওয়েল -এর মতে পরিকল্পিতভাবে সিরাজ ইংরেজদের নির্মমভাবে হত্যা করেছিলেন। এই ঘটনা ‘অন্ধকূপ হত্যা’ (Black Tragedy) নামে পরিচিত।

সমালোচনা – অ্যানি বেসান্ত বলেছেন, হলওয়েল যে ঘরের পরিমাপের কথা বলেছেন তা ‘পাটিগণিত ও জ্যামিতির নিয়মে মিথ্যা’ বলে প্রমাণিত হয়। কারণ অত ছোটো ঘরে 146 জন লোককে রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ড. যদুলাল সরকার বলেন, তখন কলকাতায় 146 জন ইংরেজ ছিল না। 60/65 জন ইংরেজ থাকতে পারে। ঐতিহাসিক হলওয়েল কিন্তু সিরাজকেই এজন্য দায়ী করেছেন। যাইহোক, সিরাজের কলকাতা আক্রমণের কথা শুনে রবার্ট ক্লাইভ ও অ্যাডমিরাল ওয়াটসন মাদ্রাজ থেকে কলকাতা আসেন এবং 1757 খ্রিস্টাব্দের 2 জানুয়ারি কলকাতা পুনর্দখল করেন। সিরাজ শেষ পর্যন্ত 9 ফেব্রুয়ারি আলিনগরের অপমানজনক সন্ধির শর্ত মেনে নেন এবং এই সন্ধির ফলে দস্তকের ব্যবহার ও দুর্গনির্মাণের অনুমতি দিতে সিরাজ বাধ্য হন।

11. টীকা লেখো – ‘পলাশির লুণ্ঠন’।

পলাশির যুদ্ধে জয়লাভের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও তার কর্মচারীরা দু-হাত ভরে বাংলার অর্থ ও সম্পদ লুণ্ঠন করে এবং সেই অর্থ বিলেতে অবাধে পাচার করে দেয়। ইংরেজ কোম্পানির এই অর্থনৈতিক শোষণকে ব্রুকস্ অ্যাডামস্ ‘পলাশির লুণ্ঠন’ বলে অভিহিত করেন।

পলাশির লুণ্ঠনের বিবরণ –

পুরস্কারস্বরূপ – বাংলার নবাব হওয়ার পূর্ব শর্ত অনুযায়ী এই খাতে মির্জাফর প্রায় 1.5 কোটি টাকা ব্যয় করেছিলেন। মির্জাফর ক্লাইভ সহ কোম্পানির অন্যান্য কর্মচারীদের পুরস্কারস্বরূপ প্রচুর অর্থ প্রদান করেন। পলাশির যুদ্ধে জয়লাভের পর ক্লাইভ মির্জাফরের কাছ থেকে 3 লক্ষ টাকা লাভ করেন।

নবাব কেনাবেচা – 1760 খ্রিস্টাব্দে মির্জাফরকে সরিয়ে কোম্পানি মিরকাশিমকে নবাব করেন।

  1. এই সূত্রে কলকাতার ইংরেজ আধিকারিকরা লাভ করেন প্রায় 32,78,000 টাকা।
  2. এরপর নজম উদ্-দৌলাকে সিংহাসনে বসিয়ে কলকাতার উচ্চপদস্থ ইংরেজ কর্মচারীরা পান প্রায় 62,50,000 টাকা।

বাণিজ্য মারফত – পলাশির যুদ্ধে জয়লাভ করে কোম্পানির ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়। একদিকে কোম্পানি বাংলায় একচেটিয়া বাণিজ্য করে ফুলে ফেঁপে ওঠে। অন্যদিকে কোম্পানির বণিকরা ব্যক্তিগতভাবে বাণিজ্য শুরু করে।

অন্যান্য বাবদ – সিরাজের কলকাতা আক্রমণ ও পলাশির যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ বাবদ ইংরেজ কোম্পানি মির্জাফরের নিকট 1,77,00,000 টাকা আদায় করে।

মন্তব্য – এইভাবে ইংরেজ কোম্পানি, তার বণিক ও কর্মচারীরা বাংলার অর্থ ও সম্পদ লুণ্ঠন করে এবং তার প্রায় সবটাই বিলেতে পাচার করে দেয়। তাই ঐতিহাসিক পি. জে. মার্শাল পলাশির যুদ্ধ পরবর্তী অধ্যায়কে কোম্পানি কর্তৃক ‘সম্পদ নির্গমনের নির্লজ্জ অধ্যায়’ বলে চিহ্নিত করেছেন।

12. বক্সারের যুদ্ধের গুরুত্ব বা তাৎপর্য নির্ণয় করো।

1764 খ্রিস্টাব্দে বাংলার নবাব মীরকাশিমের সঙ্গে ইংরেজ কোম্পানির বক্সারের যুদ্ধ হয়। আধুনিক ভারতের ইতিহাসে এই যুদ্ধ এক তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়।

বক্সারের যুদ্ধের তাৎপর্য –

  • প্রত্যক্ষ ফল – বক্সারের যুদ্ধে ইংরেজ কোম্পানির কাছে বাংলার নবাব মীরকাশিম পরাজিত হন। ফলে বাংলার স্বাধীন নবাবির শেষ প্রদীপটুকু নিভে যায়।
  • রাজনৈতিক গুরুত্ব –
    • বক্সারের যুদ্ধে জয়লাভ করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় ‘প্রকৃত ক্ষমতায়’ প্রতিষ্ঠিত হয়।
    • বক্সারের যুদ্ধে একযোগে তিন শক্তিকে পরাজিত করলে ইংরেজ কোম্পানির রাজনৈতিক মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।
    • ইংরেজদের আধিপত্য বাংলার সীমানা অতিক্রম করে সুদূর এলাহাবাদ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
  • দেওয়ানি লাভ – বক্সারের যুদ্ধে হেরে গিয়ে মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম কোম্পানির সঙ্গে এলাহাবাদের দ্বিতীয় সন্ধি স্বাক্ষর করেন। এই সন্ধির সূত্র ধরেই কোম্পানি সুবা বাংলায় দেওয়ানি লাভ করে।
  • বাণিজ্যিক গুরুত্ব –
    • 1765 খ্রিস্টাব্দে দেওয়ানি লাভের পর কোম্পানি বাংলায় রাজস্ব আদায়ের অধিকার লাভ করে।
    • অন্যদিকে তাদের বাংলার মাটিতে বিনাশুল্কে বাণিজ্য করার অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

মন্তব্য – মনে রাখতে হবে, বক্সারের যুদ্ধে যদি ইংরেজ কোম্পানি পরাজিত হত তাহলে হয়ত ভারতের ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত। তাই ঐতিহাসিকগণ এই যুদ্ধটাকে একটি ‘নির্ণয়কারী যুদ্ধ’ বলে মনে করেন।

13. ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের পটভূমি লেখো।

1765 খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সুবা বাংলায় দেওয়ানি বা রাজস্ব আদায়ের অধিকার লাভ করে। বাংলা তথা ভারতের ইতিহাসে এই ঘটনা এক তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়।

দেওয়ানি লাভের পটভূমি –

  • বক্সারের যুদ্ধে জয় – 1764 খ্রিস্টাব্দে বক্সারের যুদ্ধে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার নবাব মীরকাশিম, অযোধ্যার নবাব সুজা-উদ-দৌলা এবং মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমকে পরাজিত করে। এই যুদ্ধে পরাজিত হয়ে অযোধ্যার নবাব ও মোগল সম্রাট ইংরেজদের সঙ্গে দুটি আত্মরক্ষামূলক চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়।
    • এলাহাবাদের প্রথম সন্ধি – 1765 খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে অযোধ্যার নবাব সুজা-উদ-দৌলা বাধ্য হয়ে কোম্পানির সঙ্গে আত্মরক্ষামূলক এলাহাবাদের চুক্তিতে আবদ্ধ হন। যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ বাবদ তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বাৎসরিক 50 লক্ষ টাকা কর এবং কারা ও এলাহাবাদ প্রদেশ দুটি দান করেন।
    • এলাহাবাদের দ্বিতীয় সন্ধি – অন্যদিকে ক্ষমতাহীন মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমও কোম্পানির সঙ্গে ওই একই বছর (12 আগস্ট) এলাহাবাদের দ্বিতীয় চুক্তিতে আবদ্ধ হন। এই সন্ধি অনুযায়ী কোম্পানি সম্রাটকে কারা ও এলাহাবাদ প্রদেশ এবং বাৎসরিক 26 লক্ষ টাকা করের বিনিময়ে বাংলা-বিহার-ওড়িশায় বিনাশুল্কে বাণিজ্য করায় ‘দেওয়ানি’ আদায় করে নেয়।
    • বাংলার নবাবের সঙ্গে চুক্তি – এরপর বাংলার নবাব নজম-উদ-দৌলাকে বাৎসরিক 53 লক্ষ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কোম্পানি সুবা বাংলায় রাজস্ব আদায়ের অধিকার লাভ করে।

এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেওয়ানি লাভ করলেও বাংলার শাসনভার সরাসরি নিজের হাতে তুলে নেয়নি। তার কারণ কোম্পানির বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যের স্বার্থ, দক্ষ কর্মচারীর অভাব ও দেশীয় ভাষা সম্পর্কে অজ্ঞতা, অন্যান্য ইউরোপীয় বণিকদের সঙ্গে সংঘাত।

14. সুবা-বাংলায় ইংরেজ কোম্পানির দেওয়ানি লাভের তাৎপর্য/গুরুত্ব আলোচনা করো।

1765 খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ কোম্পানি মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছ থেকে সুবা-বাংলায় দেওয়ানি আদায়ের অধিকার লাভ করে। বাংলা তথা ভারতের ইতিহাসে এর গুরুত্ব অপরিসীম।

দেওয়ানি লাভের তাৎপর্য –

  • রাজনৈতিক গুরুত্ব –
    • দেওয়ানি লাভের পর ইংরেজ কোম্পানি সুবা-বাংলায় ‘বৈধ ক্ষমতায়’ প্রতিষ্ঠিত হয়।
    • এই সময় বাংলার নবাব নজম-উদ-দৌলা নামেই নবাব ছিলেন। তাঁর কোনো ক্ষমতাই ছিল না।
    • দেওয়ানি লাভের পর কোম্পানি একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
  • প্রশাসনিক গুরুত্ব – দেওয়ানি লাভের পর লর্ড ক্লাইভ সুবা বাংলায় দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। রাজস্ব আদায় সংক্রান্ত আসল ক্ষমতা চলে যায় কোম্পানির হাতে। নবাবের হাতে থাকে কেবল প্রশাসনিক ক্ষমতা। এইভাবে নবাব পান ক্ষমতাহীন দায়িত্ব, অপরপক্ষে কোম্পানি পায় দায়িত্বহীন ক্ষমতা।
  • অর্থনৈতিক গুরুত্ব – দ্বৈতশাসনের দ্বারা
    • কোম্পানি চাষিদের ওপর দ্বিগুণ রাজস্বের বোঝা চাপিয়ে দেয়।
    • দেওয়ানির শর্তানুসারে কোম্পানি ও তার বণিকরা বাংলায় বিনাশুল্কে বাণিজ্য শুরু করে। অন্যদিকে শুল্ক দিয়ে বাণিজ্য করতে গিয়ে দেশীয় বণিকদের ভরাডুবি হয়।
    • কোম্পানির ঔপনিবেশিক বাণিজ্য নীতির ফলে বাংলার শিল্প ও বাণিজ্য ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। বহু কারিগর ও শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ে।
    • অন্যদিকে কোম্পানি ও তার বণিকরা এদেশের অর্থ ও সম্পদ বিনাবাধায় জলের মতো ইংল্যান্ডে পাচার করে।

15. দ্বৈতশাসন – টিকা লেখো

1765 খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের নিকট দেওয়ানি লাভের পর লর্ড ক্লাইভ সুবা-বাংলায় দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। বাংলার ইতিহাসে দ্বৈতশাসনের প্রবর্তন এক বিভীষিকাময় অধ্যায়।

ক্লাইভ প্রবর্তিত দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা

  • পটভূমি – দেওয়ানি লাভের পর ইংরেজ কোম্পানি সুবা বাংলায় ‘বৈধ ক্ষমতায়’ প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে বাংলায় তার রাজনৈতিক প্রতিপত্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। তবুও লর্ড ক্লাইভ বাংলার রাজদণ্ড সরাসরি নিজেদের হাতে তুলে নেননি। কারণ—
    • কোম্পানি বাংলায় তার রাজনৈতিক স্বার্থের চেয়ে ‘বাণিজ্যিক স্বার্থকেই’ বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল।
    • সেসময় কোম্পানির পক্ষে যথেষ্ট পরিমাণ দক্ষ কর্মচারী ছিল না।
    • দেশীয় ভাষা ও শাসন সম্পর্কে কোম্পানির কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না।
    • এ ছাড়া ক্লাইভ বাংলার শাসনভার সরাসরি নিজেদের হাতে নিলে অন্যান্য বিদেশি বণিকদের বিরোধিতার সম্ভাবনা ছিল।
  • দ্বৈতশাসন কী – দেওয়ানি লাভের পর 1765 খ্রিস্টাব্দের 20 ফেব্রুয়ারি লর্ড ক্লাইভ কোম্পানির তরফে সুবা বাংলায় এক বিশেষ ধরনের শাসন ব্যবস্থা চালু করেন। এই শাসনব্যবস্থাকেই বলা হয় ‘দ্বৈতশাসন’। পূর্বতন নায়েব মহারাজ নন্দকুমারকে সরিয়ে রেজা খাঁ ও সিতাব রায়কে যথাক্রমে বাংলা ও বিহারের নায়েব-সুবা নিযুক্ত করা হয়। বাংলার নবাব নজম-উদ-দৌলার হাতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা ছাড়া কিছুই থাকল না। অন্যদিকে কোম্পানির হাতে গেল দেওয়ানি বা রাজস্ব আদায়ের আসল ক্ষমতা।

মূল্যায়ন – এইভাবে বাংলার ক্ষমতা হস্তান্তর হয় কোম্পানির কাছে। অন্যদিকে সমস্ত রকমের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব অর্পিত হয় নবাবের কাঁধে। এককথায় বাংলার নবাব কোম্পানির ‘বেতনভোগী কর্মচারী’ বা ‘রাবার স্ট্যাম্পে’ পরিণত হয়।

16. দ্বৈতশাসনের ফল কী হয়েছিল?

1765 খ্রিস্টাব্দে সুবা বাংলায় দেওয়ানি লাভের পর কোম্পানির তরফে সুবা বাংলায় দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা চালু করেন লর্ড ক্লাইভ। বাংলা তথা ভারতের ইতিহাসে এই শাসনের ফল হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। কারণ—

দ্বৈতশাসনের ফল/গুরুত্ব –

  • নবাবের ক্ষমতা খর্ব – দ্বৈতশাসনের মধ্য দিয়ে বাংলার নবাবের যাবতীয় ক্ষমতা চলে যায় ইংরেজ কোম্পানির হাতে। ফলে বাংলার নবাব নামেই নবাব থাকেন। তাঁর কোনো প্রকৃত ক্ষমতাই আর থাকে না। এক কথায় তিনি ইংরেজ কোম্পানির ‘বেতনভোগী কর্মচারী’-তে পরিণত হন।
  • একচেটিয়া বাণিজ্য – কোম্পানি ও তার বণিকরা বাংলায় বিভিন্ন পণ্যের ওপর একচেটিয়া বাণিজ্য শুরু করে। এর ফলে বাংলার বণিকরা দারুণ ক্ষতির শিকার হয়।
  • ছিয়াত্তরের মন্বন্তর – দ্বৈতশাসনের পরোক্ষ ফল ছিল 1176 বঙ্গাব্দের (1770 খ্রিস্টাব্দের) মন্বন্তর। এই মন্বন্তরের কবলে পড়ে বাংলার প্রায় 1/3 অংশ মানুষ মারা যায়।
  • আর্থিক শোষণ – এই ব্যবস্থায় বাংলার আর্থসামাজিক জীবনে দেখা দেয় ঘন অন্ধকার। কোম্পানি ভূমিরাজস্বের পরিমাণ দ্বিগুণ বৃদ্ধি করে। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল রেজা খাঁ ও সিতাব রায়ের শোষণ ও উৎপীড়ন।
  • অর্থ লুণ্ঠন – কোম্পানি এবং তার কর্মচারীরা ও বণিকরা বাংলার অর্থ ও সম্পদ লুণ্ঠন করে বিনা বাধায় বিলেতে পাচার শুরু করে। ফলে বাংলার অর্থনীতি একপ্রকার ‘রক্তশূন্য’ হয়ে পড়ে।

মন্তব্য – এক কথায় দ্বৈতশাসন বাংলার জনজীবনে বয়ে আনে এক অমঙ্গলের বার্তা। শেষপর্যন্ত বাংলার গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংস 1772 খ্রিস্টাব্দে এই অমানবিক শাসনের অবসান ঘটান।

17. বণিকের মানদণ্ড কীভাবে রাজদণ্ডে পরিণত হয়?

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে এসেছিল ব্যবসা-বাণিজ্য করতে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, বাণিজ্যের সূত্র ধরে তারা ভারতে একচ্ছত্র রাজদণ্ড প্রতিষ্ঠিত করে।

ফারুখশিয়রের ফরমান – মনে রাখতে হবে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে আসার প্রায় 100 বছর পর প্রকৃত বাণিজ্যিক অধিকার লাভ করে। 1715 খ্রিস্টাব্দে ভারতে কোম্পানির প্রতিনিধি হয়ে আসেন স্যার সুরম্যান। 1717 খ্রিস্টাব্দে তিনি মোগল সম্রাট ফারুখশিয়রের নিকট সুবা বাংলায় বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার ফরমান লাভ করেন।

প্রকৃত ক্ষমতা – ‘ফারুখশিয়রের ফরমান’ লাভ করেও বাংলায় কোম্পানির ‘দস্তক’ ব্যবহারের অসুবিধা হচ্ছিল। মুর্শিদকুলি খাঁ-র আমলে তেমন অসুবিধা না হলেও প্রকৃত সমস্যার সৃষ্টি হয় বাংলার নবাব সিরাজ উদ-দৌলার সময়কালে। ক্রমশ কোম্পানি ও নবাবের সম্পর্কের অবনতি হয়। শেষ পর্যন্ত 1757 খ্রিস্টাব্দে পলাশির যুদ্ধে ইংরেজদের কাছে সিরাজ উদ-দৌলা পরাজিত হন। তার ফলে ইংরেজরা বাংলায় ‘প্রকৃত ক্ষমতায়’ প্রতিষ্ঠিত হয়।

বৈধ ক্ষমতা

  • বক্সারের যুদ্ধ – 1764 খ্রিস্টাব্দে বক্সারের যুদ্ধে কোম্পানি মিরকাশিমকে পরাজিত করে বাংলার নবাবির পতন ঘটায়।
  • এলাহাবাদের প্রথম সন্ধি – বক্সারের যুদ্ধে অযোধ্যার নবাব সুজা উদ-দৌলা পরাজিত হয়ে কোম্পানির সঙ্গে আত্মরক্ষামূলক সন্ধি স্বাক্ষর করেন।
  • এলাহাবাদের দ্বিতীয় সন্ধি – অন্যদিকে এই যুদ্ধে মোগল সম্রাট শাহ আলমও পরাজিত হন। তিনিও ইংরেজদের সঙ্গে অনুরূপ একটি সন্ধি করতে বাধ্য হন। শর্ত অনুযায়ী সম্রাটের কাছ থেকে কোম্পানি সুবা বাংলায় দেওয়ানি লাভ করে।

মূল্যায়ন – দেওয়ানি লাভের পর কোম্পানি সুবা বাংলায় ‘বৈধ ক্ষমতায়’ প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলার সমস্ত ক্ষমতা লাভ করে কোম্পানি। নবাব নামেই নবাব ছিলেন। তাঁর কোনো ক্ষমতাই ছিল না। এভাবেই বণিকের মানদণ্ড রাজদণ্ডে পরিণত হয়। এরপর বাংলাকে কেন্দ্র করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে।

18. পলাশি ও বক্সারের যুদ্ধের তুলনামূলক গুরুত্ব আলোচনা করো।

পটভূমি – ব্রিটিশ সাম্রাজ্য স্থাপনের ক্ষেত্রে পলাশির যুদ্ধ (1757 খ্রিস্টাব্দ) ও বক্সারের যুদ্ধ (1764 খ্রিস্টাব্দ) ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলার নবাব সিরাজ উদ-দৌলা পলাশির যুদ্ধে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে পরাজিত হন। বাংলার নবাব মিরকাশিম, অযোধ্যার নবাব সুজা উদ-দৌলা ও মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের সম্মিলিত সেনাবাহিনী ইংরেজ কোম্পানির কাছে বক্সারের যুদ্ধে চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়।

সাদৃশ্য – দুটি যুদ্ধের মূল কারণ ছিল কোম্পানির কর্মচারীদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে অংশগ্রহণ এবং দস্তকের অপব্যবহার। কোম্পানির কর্মচারীরা নবাবের আদেশ উপেক্ষা করত এবং নবাবের সার্বভৌম ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করত।

বৈসাদৃশ্য – তবে পলাশি ও বক্সারের যুদ্ধ দুটির প্রকৃতি ও গুরুত্বের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য ছিল —

  1. পলাশির যুদ্ধ ছিল একটি খণ্ডযুদ্ধ মাত্র, কিন্তু বক্সারের যুদ্ধ ছিল একটি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ। কারণ এই যুদ্ধে ইংরেজরা তিনটি ভারতীয় শক্তিকে পরাজিত করে। ঐতিহাসিক স্মিথের মতে পলাশি ছিল শুধু কামানের লড়াই, কিন্তু বক্সার ছিল এক চূড়ান্ত যুদ্ধ। এই যুদ্ধে জয়লাভ করে কোম্পানির সামরিক শক্তি বৃদ্ধি পায়।
  2. পলাশির যুদ্ধে জয়লাভ করে বাংলাদেশে ইংরেজ আধিপত্য সূচিত হয়। অন্যদিকে বক্সারের যুদ্ধের পর কোম্পানি প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের শাসকে পরিণত হয়। বক্সারের যুদ্ধের পর কোম্পানি মোগল সম্রাটের কাছ থেকে দেওয়ানি লাভ করায় বাংলাদেশে কোম্পানির প্রকৃত আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
  3. পলাশির যুদ্ধে জয়লাভ করে বাংলাদেশে কোম্পানি নিজের একচেটিয়া অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যায়। কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বক্সারের যুদ্ধের জয়লাভের পর অন্যান্য ইউরোপীয় কোম্পানিগুলি বাংলাদেশ থেকে পিছু হটতে থাকে। ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পূর্বভারতে তাদের একচেটিয়া বাণিজ্যিক অধিকার স্থাপন করে। বাংলার রাজস্ব ও বাণিজ্যিক আয় তাদের সমগ্র ভারতে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা লাভে সাহায্য করেছিল।
  4. পলাশির যুদ্ধে শুধুমাত্র বাংলার নবাব পরাজিত হয়েছিলেন এবং শুধুমাত্র বাংলাদেশেই ইংরেজদের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, কিন্তু বক্সারের যুদ্ধে অযোধ্যার নবাব পরাজিত হয়ে কোম্পানির অনুগত মিত্রে পরিণত হয়। একইভাবে মোগল সম্রাটও বাংলা, বিহার ও ওড়িশায় তাঁর রাজস্ব আদায়ের অধিকার হারান।

মূল্যায়ন – সমস্ত দিক দিয়ে বিচার করলে দেখা যায় যে, পলাশির যুদ্ধের তুলনায় বক্সারের যুদ্ধের ফল ছিল সুদূরপ্রসারী। পলাশির যুদ্ধের মাধ্যমে ইংরেজদের ভাগ্যোদয় শুরু হয় আর বক্সারের যুদ্ধের মাধ্যমে তা পরিণতি লাভ করে। বক্সারের যুদ্ধে জয়লাভের পর ভারতে ইংরেজ সাম্রাজ্য বিস্তারের পথ সুগম হয়।

19. অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি কে প্রবর্তন করেন? এই নীতির শর্তগুলি কী ছিল? কোন্ কোন্ রাজ্য এই নীতিতে আবদ্ধ হয়েছিল?

পটভূমি – স্যার জন শোরের পর 1798 খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে লর্ড ওয়েলেসলি ভারতের গভর্নর জেনারেলরূপে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তিনি মোট 7 বছর (1798-1805 খ্রিস্টাব্দ) গভর্নর জেনারেল ছিলেন। ঘোরতর সাম্রাজ্যবাদী শাসক ওয়েলেসলি অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি প্রবর্তন করেন।

অধীনতামূলক মিত্রতা নীতির শর্ত – লর্ড ওয়েলেসলির নগ্ন সাম্রাজ্যবাদের নির্লজ্জ নিদর্শন হল অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি। এই নীতির মূল কথা হল—কোনো দেশীয় রাজাকে নিরাপত্তা দানের বিনিময়ে রাজ্যটিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করা।

শর্তাবলি –

  • এই মিত্রতানীতিতে আবদ্ধ দেশীয় রাজ্যগুলি কোম্পানির অনুমতি ছাড়া অন্য কোনো শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে পারবে না।
  • এই মিত্রতা নীতিতে আবদ্ধ দেশীয় রাজ্যগুলিকে নিজেদের খরচে একদল ইংরেজ সৈন্য রাখতে হবে।
  • মিত্রতাবদ্ধ রাজ্যগুলি কোনো তৃতীয় শক্তির দ্বারা আক্রান্ত হলে তার রক্ষার দায়িত্ব নেবে কোম্পানি।
  • ছোটো রাজ্যগুলি সৈন্যদের ব্যয় বহন করার জন্য নগদ অর্থ অথবা রাজ্যের একাংশ কোম্পানিকে ছেড়ে দিতে বাধ্য থাকবে।
  • মিত্রতা নীতিতে আবদ্ধ রাজ্যে ব্রিটিশ রেসিডেন্ট থাকবে।
  • ব্রিটিশ বাদে অন্যান্য ইউরোপীয়দের রাজ্য থেকে বিতাড়িত করতে হবে।

অধীনতামূলক মিত্রতা নীতির প্রয়োগ – লর্ড ওয়েলেসলি এই নীতির দ্বারা বেশ কিছু দেশীয় রাজ্যকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। 1798 খ্রিস্টাব্দে হায়দ্রাবাদের নিজাম সর্বপ্রথম এই দাসত্বের চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন। 1801 খ্রিস্টাব্দে ওয়েলেসলি বলপূর্বক অযোধ্যার নবাবকে এই চুক্তি স্বাক্ষরে বাধ্য করেন। এরপর একে একে কর্ণাটক, তাঞ্জোর, সুরাট, মালব, উদয়পুর, বুন্দেলখন্ড, যোধপুর, জয়পুর প্রভৃতি রাজ্যগুলিতে এই নীতির প্রয়োগ ঘটানো হয়। লর্ড ওয়েলেসলির মতে—”দেওয়ানি লাভের পর অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি ছিল সবথেকে স্বাস্থ্যকর ও উপযোগী ব্যবস্থা” (“The Most salutary and useful measure after the diwani”)।

মূল্যায়ন – ঐতিহাসিক ড. ওয়েরের মতে, “ক্লাইভ ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য স্থাপন করেন। ওয়ারেন হেস্টিংস তাকে ঝড়-ঝাপটা থেকে রক্ষা করেন এবং ওয়েলেসলি তাকে বৃহৎ রাজশক্তিতে পরিণত করেন।” লর্ড ওয়েলেসলি তাঁর অধীনতামূলক মিত্রতা নীতির জালে বহু দেশীয় রাজ্যের নৃপতিকে আবদ্ধ করেছিলেন।

20. ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তারে লর্ড ডালহৌসি কী কী নীতি গ্রহণ করেছিলেন? এই নীতির প্রয়োগ ঘটিয়ে তিনি কীভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটিয়েছিলেন?

ভারতের ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য ডালহৌসি তিনটি নীতি গ্রহণ করেছিলেন। যথা —

  • স্বত্ববিলোপ নীতি,
  • কুশাসনের অজুহাতে দেশীয় রাজ্য গ্রাস এবং
  • যুদ্ধ নীতি।

প্রয়োগ –

  • স্বত্ববিলোপ নীতি – ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য স্থাপনের উদ্দেশ্যে যে-কৌশল প্রয়োগের জন্য ডালহৌসি ইতিহাসে বিতর্কিত, তা হল স্বত্ববিলোপ নীতির প্রয়োগ। এই নীতি অনুসারে কোনো আশ্রিত রাজ্যের রাজা অপুত্রক হলে কোনো পুত্রসন্তান দত্তক নিতে পারবেন না। কোনো পুত্র দত্তক নিলেও রাজার মৃত্যুর পর সেই রাজ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হবে। স্বত্ববিলোপ নীতি প্রয়োগ করে তিনি সাতারা, নাগপুর, ঝাঁসি, উদয়পুর প্রভৃতি রাজ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করেন।
  • কুশাসনের অজুহাতে দেশীয় রাজ্যগ্রাস – যেসমস্ত দেশীয় রাজ্যগুলিকে স্বত্ববিলোপ নীতি প্রয়োগ বা যুদ্ধনীতির দ্বারা গ্রাস করা সম্ভব ছিল না, সেইসব রাজ্য গ্রাস করার জন্য ডালহৌসি কুশাসনের অজুহাত দেখান। অযোধ্যার ক্ষেত্রে সেই অজুহাত দেখানো হয়েছিল। ব্রিটিশ সরকারের প্রতি অযোধ্যার আনুগত্যে কখনও প্রশ্ন দেখা যায়নি। তথাপি লন্ডনের পরিচালক সমিতির নির্দেশে ডালহৌসি কুশাসনের অজুহাতে অযোধ্যা গ্রাস করেন। অথচ কুশাসনের জন্য মূলত দায়ী ছিলেন সেখানকার ব্রিটিশ রেসিডেন্টরা। ব্রিটিশ রেসিডেন্ট ছিলেন প্রকৃত শাসক। তা ছাড়া বিপান চন্দ্র দেখিয়েছেন যে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হওয়ার পরও অযোধ্যা কুশাসন থেকে মুক্তি পায়নি।
  • যুদ্ধ নীতি – যেসব দেশীয় রাজ্যের ক্ষেত্রে প্রথম দুটি নীতির প্রয়োগ সম্ভব ছিল না, ডালহৌসি সেখানে যুদ্ধনীতি গ্রহণ করেছিলেন। এর প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত পাঞ্জাবের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্তি। দ্বিতীয় ইঙ্গ-শিখ যুদ্ধের পর ডালহৌসি শিখ সাম্রাজ্য গ্রাস করেন। ডালহৌসির এই কাজকে ট্রটার নীতিবর্জিত ও অযৌক্তিক বলেছেন। এমনকি লর্ড এলিনবরা ও হেনরি লরেন্স ডালহৌসির পাঞ্জাব গ্রাসের নীতি সমর্থন করেননি।

মূল্যায়ন – লর্ড ডালহৌসির এই নগ্ন সাম্রাজ্যবাদ নীতি দেশীয় রাজন্যবর্গের মধ্যে গভীর ক্ষোভ সৃষ্টি করে। অনেকের মতে, তিনি স্বত্ববিলোপ নীতি কেবল হিন্দু রাজন্যবর্গের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করেছিলেন। তিনি স্বত্ববিলোপ নীতি প্রয়োগে হিন্দুধর্মের চিরাচরিত প্রথাকে অগ্রাহ্য করেছিলেন। ফলে দেশীয় রাজন্যবর্গের মধ্যে ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব জাগ্রত হয়।

21. ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের কারণ ও ফলাফল লেখো।

পটভূমি – পলাশি ও বক্সারের যুদ্ধে জয়লাভ করে ইংরেজরা বাংলা-বিহার-ওড়িশার দেওয়ানি (1765 খ্রিস্টাব্দ) লাভ করে। এই সূত্রেই তারা বাংলায় দ্বৈতশাসন চালু করে, এর পর থেকেই বাংলায় এক ভয়াবহ মন্বন্তরের সৃষ্টি হয়।

ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের কারণ –

  • অনাবৃষ্টি – 1768-1770 খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অনাবৃষ্টির ফলে কোনো শস্য উৎপাদন হয়নি। তীব্র তাপদাহে ফসল নষ্ট হয়।
  • কোম্পানির অর্থশোষণ – কোম্পানির কর্মচারীদের অর্থলোলুপতা, পলাশির লুণ্ঠন প্রভৃতি কারণে নবাবের রাজকোষ প্রায় শূন্য হয়ে যায়। মাত্রাতিরিক্ত শোষণে সাধারণ মানুষের দৈন্যদশা প্রকট হয়।
  • দ্বৈতশাসনের কুফল – সুবেদার রেজা খাঁ ও সিতাব রায় রাজস্ব আদায়ের জন্য বীভৎস অত্যাচার শুরু করেন। নবাব ও কোম্পানি মাত্রাতিরিক্ত কর দিতে বাধ্য করায় গ্রামের কৃষক সম্প্রদায় নিঃস্ব হয়ে পড়ে। অনেকেই চাষ-আবাদ বন্ধ করে দেয়। বাড়তি রাজস্বের চাপ কৃষি অর্থনীতিকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়। সঞ্চিত শস্য অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রি করতে শুরু করে। এর ফলে কৃষকরা অনাহারে দিন কাটাতে থাকে।
  • সরকারি উদাসীনতা – দুর্ভিক্ষরোধে সরকারি সাহায্য ছিল অপ্রচুর। অনাহার ক্লিষ্ট মানুষ পথেঘাটে পড়ে থাকে, গ্রামগুলি জনশূন্য হয়ে পড়ে। হান্টারের ‘Annals of Rural Bengal’, বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ প্রভৃতি গ্রন্থে মন্বন্তরের এক ভয়াবহ চিত্র পাওয়া যায়।

ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের ফলাফল

  • জনসংখ্যা হ্রাস – দুর্ভিক্ষের করালগ্রাসে গ্রামগুলি প্রকারান্তরে জনমানবশূন্য হয়ে পড়ে, গ্রামবাংলা পরিণত হয় শ্মশানে।
  • কৃষির অবনতি – বিশাল জনসংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় কৃষিজমির একটি বড়ো অংশ অনাবাদী হয়ে পড়ে। জমিগুলি আগাছায় পরিপূর্ণ হয়, এর ফলে কৃষি-অর্থনীতি ভেঙে পড়ে।
  • কুটিরশিল্পের অবনতি – দুর্ভিক্ষের ফলে বাংলার তাঁতি, কামার-কুমোর, শ্রমজীবী মানুষ ব্যাপক হারে মারা যাওয়ায় কুটির শিল্পের প্রভুত ক্ষতি হয়।
  • নতুন জমিদার – অভাবের তাড়নায় অনেকে পুরোনো জমিদার জমিদারি হারায়। সুযোগ বুঝে কোম্পানি অধিক রাজস্ব প্রাপ্তির জন্য নতুন জমিদার নিয়োগ করে।
  • আইন শৃঙ্খলার অবনতি – দুর্ভিক্ষের ফলে চুরি-ডাকাতি ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। উত্তরবঙ্গে ফকির, সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে প্রচুর ডাকাতি হয়। কোম্পানির কর্মচারীরা প্রায়শই তাদের হাতে নিগৃহীত হতে থাকে।
  • রেগুলেটিং অ্যাক্ট – অবশেষে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট 1773 খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন পাস করে দ্বৈতশাসনের অবসান ঘটে। গভর্নর জেনারেল হেস্টিংস কোম্পানির প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে ভারত শাসন শুরু করেন।

মূল্যায়ন – ভারতীয় রাজন্যবর্গের দুর্বলতার সুযোগে সুচতুর ইংরেজ বণিকরা ভারতের হর্তাকর্তা হয়ে ওঠে। তবে দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধের জন্য কোম্পানি সচেষ্ট হলে নিশ্চয়ই এই অবস্থা সৃষ্টি হত না।

22. দক্ষিণ ভারতে ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্বের কারণ নির্ণয় করো। অথবা, কর্ণাটকের যুদ্ধের কারণগুলি আলোচনা করো।

দক্ষিণ ভারতে বাণিজ্য করার ক্ষেত্রে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় দক্ষিণ ভারতের আঞ্চলিক শক্তিসহ ফরাসি বাণিজ্যিক সংস্থা। স্বাভাবিকভাবেই বাণিজ্যের পথ মসৃণ করার জন্য ইংরেজ কোম্পানি ওই সব শক্তিগুলিকে নির্মূল করতে উদ্যত হয়। ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্ব সেই উদ্যোগেরই ফসল।

ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্ব –

  • প্রথম কর্ণাটকের যুদ্ধ – 1740 খ্রিস্টাব্দে কর্ণাটকের নবাব দোস্ত আলির মৃত্যু হলে সিংহাসন নিয়ে ওর জামাতা চাঁদা সাহেব ও নিজাম-উল-মূলকের মনোনীত প্রার্থী আনোয়ার উদ্দিনের মধ্যে দ্বন্দ্ব বেধে যায়। এই সুযোগে ইংরেজ ও ফরাসিগণ যথাক্রমে আনোয়ারউদ্দিন ও চাঁদা সাহেবের পক্ষ নেয়। এই সময় পণ্ডিচেরির ফরাসি শাসনকর্তা ডুপ্লের নির্দেশে লাবুর্দানে মাদ্রাজ দখল করলে আনোয়ারউদ্দিন ফরাসিদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেন। কিন্তু 1746 খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘সেন্টটোমের যুদ্ধে’ পরাজিত হন। অন্যদিকে 1748 খ্রিস্টাব্দে অস্ট্রিয়া ও প্রুশিয়ার মধ্যে ‘আয়লা স্যাপেলের সন্ধি’ স্বাক্ষরিত হলে, ভারতে ইংরেজ ও ফরাসিদের মধ্যে সাময়িক যুদ্ধ বিরতি ঘটে।
  • দ্বিতীয় কর্ণাটকের যুদ্ধ – ইতিমধ্যে হায়দ্রাবাদের নিজামের মৃত্যু হলে সিংহাসন দখলকে কেন্দ্র করে নিজামের পুত্র নাসির জঙ্গ ও দৌহিত্র মুজাফফর জঙ্গের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। সুযোগ বুঝে ইংরেজগণ নাসির জঙ্গ এবং ফরাসিগণ মুজাফফর জঙ্গের পক্ষ নেয়। 1749 খ্রিস্টাব্দে ‘অম্বুরের যুদ্ধে’ আনোয়ারউদ্দিন নিহত হন এবং নাসির জঙ্গ এক আততায়ীর হাতে নিহত হলে মুজাফফর জঙ্গ নিজেকে দাক্ষিণাত্যের সুবাদার ঘোষণা করেন। অন্যদিকে ফরাসিদের সাহায্য নিয়ে চাঁদা সাহেব কর্ণাটকের নবাব হন। কিন্তু শীঘ্রই তিনি ইংরেজদের হাতে নিহত হন। এরপর কর্ণাটকের নবাব হন মহম্মদ আলি। 1755 খ্রিস্টাব্দে ডুপ্লে স্বদেশে ফিরে যান এবং ইংরেজ ও ফরাসিদের মধ্যে শান্তি স্থাপিত হয়।
  • তৃতীয় কর্ণাটকের যুদ্ধ – ইতিমধ্যে ইউরোপে ‘সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধের’ সূত্র ধরে ভারতে নতুন করে ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্ব শুরু হয়। লর্ড ক্লাইভ ফরাসি বাণিজ্য কুঠি চন্দননগর দখল করে নেন। ফরাসি সেনাপতি কাউন্ট লালি সেন্ট ডেভিড দুর্গ দখল করলেও 1758 খ্রিস্টাব্দে মাদ্রাজ আক্রমণ করে ব্যর্থ হন। 1760 খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ সেনাপতি আয়ারকুট ‘বন্দিবাসের যুদ্ধে’ ফরাসি সেনাপতি লালিকে পরাজিত করে পণ্ডিচেরি দখল করে নেন। এরপর জিঞ্জি ও মাহে ফরাসিদের হাতছাড়া হয়। অন্যদিকে 1763 খ্রিস্টাব্দে ‘প্যারিস ও হিউবার্টসবার্গের’ সন্ধি দ্বারা সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধের নিষ্পত্তি হলে ভারতে কর্ণাটকের যুদ্ধের অবসান হয়।

মন্তব্য – 1757 খ্রিস্টাব্দে পলাশির যুদ্ধের মতোই কর্ণাটকের যুদ্ধ রাজনৈতিক দিক দিয়ে ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কর্ণাটকের যুদ্ধের মাধ্যমেই দক্ষিণ ভারত তথা সমগ্র ভারত থেকে ফরাসিদের হটিয়ে ইংরেজগণ ভারতীয় রাজনীতিতে তাদের আসন মজবুত ভিত্তির ওপর স্থাপন করতে সক্ষম হয়।

23. কর্ণাটকের যুদ্ধে (ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্ব) ফরাসিদের ব্যর্থতার কারণ কী ছিল?

দক্ষিণ ভারতে ইংরেজ-ফরাসিদের মধ্যে কর্ণাটকের যুদ্ধ শুরু হয়। কিন্তু সেই যুদ্ধে নানা কারণে ফরাসিরা পরাজিত হয়।

ফরাসিদের ব্যর্থতার কারণ –

  1. অর্থসংকট – ফরাসিদের পরাজয়ের প্রধান কারণ ছিল তাদের অর্থসংকট। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আগাগোড়া ইংল্যান্ডের কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য পেত। তা ছাড়া পলাশির যুদ্ধে জয়লাভের মধ্য দিয়ে কোম্পানি বাংলার বিপুল অর্থ-সম্পদকে কাজে লাগায়। অন্যদিকে ফরাসিরা স্বদেশ থেকে তেমন আর্থিক সাহায্য পায়নি।
  2. নৌশক্তির অভাব – ভারতে বাণিজ্য ও রাজনৈতিক প্রতিপত্তি স্থাপনের প্রধান শর্তই ছিল নৌবহর। সেখানে ফরাসিদের নৌবহরের অভাব ছিল। কিন্তু ইংরেজরা নৌশক্তিতে যথেষ্ট বলীয়ান ছিল।
  3. যোগাযোগের অভাব – মাদ্রাজের সঙ্গে বোম্বাই বা কলকাতার জলপথে যোগাযোগ থাকায় ইংরেজদের পক্ষে যুদ্ধের সরঞ্জাম, রসদ ও সৈন্য সহজেই সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু ফরাসিদের সে উপায় ছিল না। তাদের একমাত্র নিকটতম যোগাযোগ কেন্দ্র ছিল সুদূর মরিশাস। ফলে পন্ডিচেরির পতন হলে ফরাসিরা ভেঙে পড়ে।
  4. বাণিজ্যিক স্বার্থ উপেক্ষা – ভারতীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করলেও ইংরেজরা তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থকে উপেক্ষা করেনি। সেখানে ফরাসিরা ভারতে তাদের রাজনৈতিক প্রভুত্ব স্থাপনের বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব দেয়। তা ছাড়া ফরাসি কর্তৃপক্ষ ইউরোপের সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ ও আমেরিকায় উপনিবেশ নিয়েই বেশি ব্যস্ত ছিল।
  5. ডুপ্লের ভ্রান্ত নীতি – অনেকে পন্ডিচেরির গভর্নর ডুপ্লের ভ্রান্ত নীতিকে সমালোচনা করেছেন। যেমন, এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তিনি সেনাপতি বুসিকে সরিয়ে নেন। ইংরেজ আশ্রয়পুষ্ট মহম্মদ আলি ত্রিচিনপল্লিতে আশ্রয় নিয়েছে জেনেও তিনি তাঁকে আক্রমণ করেননি। ফরাসিদের মিত্র চাঁদাসাহেব যখন ত্রিচিনপল্লি অবরোধ করেন তখন তিনি আর্কট অরক্ষিত রাখেন। এই সুযোগে ক্লাইভ আর্কট দখল করে ফরাসিদের সব সম্ভাবনা নষ্ট করে দেন। সর্বোপরি ডুপ্লে বাণিজ্যিক নীতি ত্যাগ করে সামরিক আদর্শ গ্রহণ করে ভুল করেছিলেন। অন্যদিকে ইংরেজরা কোনো সময়েই তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থকে অবহেলা করেনি। ডুপ্লে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে হায়দ্রাবাদ থেকে সেনাপতি বুসিকে অপসারণ করে আর-একটা বড়ো ভুল করেছিলেন।
  6. সেনাদের অন্তর্দ্বন্দ্ব – ফরাসি সেনাপতিদের মধ্যে কলহ ও অন্তর্দ্বন্দ্ব ফরাসিদের ভরাডুবির আর-একটা কারণ। ডুপ্লে ও লাবুর্দানের পারস্পরিক বিরোধের ফলে ফরাসিরা মাদ্রাজ অধিকারে ব্যর্থ হয়। কাউন্ট লালি ছিলেন উদ্ধত ও গর্বিত, এই কারণে তিনি সহকর্মীদের কাছ থেকে কোনো সাহায্য পাননি।
  7. ইংরেজ সেনাপতিদের বিচক্ষণতা – ফরাসি সেনাপতিগণ যখন অন্তর্দ্বন্দ্বে লিপ্ত, তখন ইংরেজ সেনাপতি ক্লাইভ, ফোর্ড, ওয়াটসন, আয়ারকুট প্রমুখ পরস্পরের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।
  8. ফরাসি সরকারের ভ্রান্ত নীতি – দ্বিতীয় কর্ণাটকের যুদ্ধ চলাকালীন ফরাসিদের এক সংকটকালীন পরিস্থিতিতে ফরাসি সরকার ডুপ্লেকে পদচ্যুত করে মারাত্মক ভুল করেছিল।

24. ধর, তুমি সিরাজ উদ-দৌলার সেনাবাহিনীর প্রধান। নবাবের-দেশপ্রীতির পরিচয়কে কেমনভাবে ব্যাখ্যা করবে?

আমি নবাব সিরাজ উদ-দৌলার সেনাবাহিনীর প্রধান আসফ খাঁ। খুব কাছ থেকে নবাবকে আমি দেখেছি। নিজের আত্মীয়রা যাদের নবাব খুব ভালোবাসতেন, তারা বিভিন্ন সময়ে নবাবকে বিপদে ফেলার চেষ্টা করত। নবাব খুব ভালো মানুষ ছিলেন। তাঁর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করছে জেনেও তিনি ওই ব্যক্তির প্রতি বিশ্বাস হারাননি। মুর্শিদাবাদ রাজদরবারে বিভিন্ন ইউরোপীয় জাতির প্রতিনিধিরা বাংলায় ব্যাবসা করার অনুমতি নেওয়ার জন্য আসত। নবাব অনুমতি দিতেন কিন্তু তা কখনোই দেশীয় বণিকদের স্বার্থের বিরোধী ছিল না। প্রত্যেক প্রতিনিধিকেই আইন মেনে চলার পরামর্শ দিতেন। এদের মধ্যে ইংরেজ ছাড়া অন্যরা নবাবের পরামর্শ মতো কাজ করতেন।

  1. কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ সংস্কার করতে শুরু করলে নবাব ক্ষুব্ধ হয়ে তা বন্ধ করার নির্দেশ দেন। কিন্তু ইংরেজরা সে কথা শোনেনি।
  2. নবাব সিংহাসনে বসার পর নজরানা দেওয়া প্রত্যেক প্রজার কর্তব্য। কিন্তু ইংরেজরা তা করেনি।
  3. নবাবের ব্যক্তিগত শত্রুদের আশ্রয় দেওয়া আইনবিরোধী কাজ।

সব ক-টি ক্ষেত্রেই নবাব বাধা দিয়ে দেশ ও সিংহাসনের স্বার্থে কাজ করেছেন। সেই সময়ে মুর্শিদাবাদে ষড়যন্ত্রের জাল এমনভাবে বিস্তৃত হয়েছিল, যা ভেঙে দেওয়া নবাবের পক্ষে সম্ভব ছিল না। এসত্ত্বেও, শক্তিশালী ইংরেজদের সঙ্গে আপোষ না করে নবাব দেশপ্রেমের উল্লেখযোগ্য পরিচয় দিয়েছেন। পলাশির প্রান্তরে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেছেন কিন্তু দেশের স্বাধীনতা বিকিয়ে দেননি। আমার মতে, বাংলা তথা ভারতে যে ক-জন নবাব ছিলেন তাদের মধ্যে বাংলার নবাব সিরাজ উদ-দৌলা এবং মহীশূরের টিপু সুলতানের অবদানকে কোনোদিন ভোলার নয়।


আজকে আমাদের এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের দ্বিতীয় অধ্যায়, “আঞ্চলিক শক্তির উত্থান”-এর কিছু “ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর” নিয়ে আলোচনা করেছি। এই ধরনের প্রশ্নগুলো স্কুলের পরীক্ষা বা বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই আসে।

আশা করি এই আর্টিকেলটি তোমাদের/আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে। যদি কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তাহলে নির্দ্বিধায় টেলিগ্রামে আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। আপনাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। এছাড়া, এই পোস্টটি সেইসব বন্ধু বা প্রিয়জনদের সাথে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

Class 8 History Suggestion | West Bengal WBBSE Class Eight VIII (Class 8th) History Explanatory Question Answer Suggestion

“আঞ্চলিক শক্তির উত্থান (দ্বিতীয় অধ্যায়) অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর” একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ টপিক। অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষায় (Class 8 Exam / Class 8th / West Bengal Class Eight VIII / WB Class 8 / WBBSE / Class 8 Pariksha / WB Class 8 / West Bengal Board of Secondary Education – WB Class 8 Exam) এখান থেকে প্রশ্ন অবশ্যম্ভাবী। সে কথা মাথায় রেখে solutionwbbse.com-এর পক্ষ থেকে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস পরীক্ষা প্রস্তুতিমূলক সাজেশন এবং ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর (Class 8 History Suggestion FREE PDF Download / Explanatory Question Answer / অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস প্রশ্ন ও উত্তর। Class 8 History Suggestion / History Class 8 Exam Guide / Class 8 History Ancholik Soktir Utthan Explanatory Question Answer / Class 8 History Suggestion / Class 8 Pariksha History Suggestion / অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস সাজেশন) উপস্থাপনের প্রচেষ্টা করা হলো। ছাত্রছাত্রী ও পরীক্ষার্থীদের উপকারে লাগলে, আমাদের এই প্রয়াস অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস পরীক্ষা প্রস্তুতিমূলক সাজেশন এবং ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর (Class 8 History Suggestion / Class 8 History Ancholik Soktir Utthan Suggestion FREE PDF Download / Class 8 Pariksha Suggestion / West Bengal Eight VIII Explanatory Question Answer Suggestion / Class 8 History Ancholik Soktir Utthan Exam Guide / Class 8 History Ancholik Soktir Utthan Suggestion 2024, 2025, 2026, 2027, 2023, 2021, 2020, 2018, 2017, 2016, 2015, 2028, 2030 / Class 8 History Ancholik Soktir Utthan Suggestion / Class 8 History Ancholik Soktir Utthan Suggestion Explanatory Question Answer. / WBBSE Class 8th History Suggestion / Class 8 History Ancholik Soktir Utthan Explanatory Question Answer) সফল হবে।

আঞ্চলিক শক্তির উত্থান (দ্বিতীয় অধ্যায়) ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর

আঞ্চলিক শক্তির উত্থান (দ্বিতীয় অধ্যায়) ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর | আঞ্চলিক শক্তির উত্থান (দ্বিতীয় অধ্যায়) Class 8 History Ancholik Soktir Utthan Explanatory Question Answer Suggestion অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর – আঞ্চলিক শক্তির উত্থান (দ্বিতীয় অধ্যায়) ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর।

Class Eight VIII History Ancholik Soktir Utthan Suggestion | West Bengal Board of Secondary Education (WBBSE) Class 8 Exam

Class 8 History Ancholik Soktir Utthan Explanatory Question Answer, Suggestion Download PDF: West Bengal Board of Secondary Education (WBBSE) Class 8 Eight VIII History Suggestion is provided here. Class 8 History Ancholik Soktir Utthan Explanatory Question Answer Suggestion PDF Download Link in Free here.

অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর | অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর – আঞ্চলিক শক্তির উত্থান (দ্বিতীয় অধ্যায়) ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর | Class 8 History Ancholik Soktir Utthan Explanatory Question Answer, Suggestion

অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর – আঞ্চলিক শক্তির উত্থান (দ্বিতীয় অধ্যায়) | অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস প্রশ্ন ও উত্তর – আঞ্চলিক শক্তির উত্থান (দ্বিতীয় অধ্যায়) | আঞ্চলিক শক্তির উত্থান অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস প্রশ্ন ও উত্তর – আঞ্চলিক শক্তির উত্থান (দ্বিতীয় অধ্যায়) | অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস সহায়ক – আঞ্চলিক শক্তির উত্থান (দ্বিতীয় অধ্যায়) ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর। Class 8 History Ancholik Soktir Utthan Explanatory Question Answer, Suggestion | Class 8 History Ancholik Soktir Utthan Explanatory Question Answer Suggestion | Class 8 History Ancholik Soktir Utthan Explanatory Question Notes | West Bengal Class 8th History Explanatory Question Answer Suggestion.

WBBSE Class 8th History Ancholik Soktir Utthan Suggestion | অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর – আঞ্চলিক শক্তির উত্থান (দ্বিতীয় অধ্যায়)

WBBSE Class 8 History Ancholik Soktir Utthan Suggestion অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস প্রশ্ন ও উত্তর – আঞ্চলিক শক্তির উত্থান (দ্বিতীয় অধ্যায়) ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর। আঞ্চলিক শক্তির উত্থান (দ্বিতীয় অধ্যায়) | Class 8 History Ancholik Soktir Utthan Suggestion অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর – আঞ্চলিক শক্তির উত্থান (দ্বিতীয় অধ্যায়) ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর।

Class 8 History Ancholik Soktir Utthan Explanatory Question Answer Suggestions | অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর – আঞ্চলিক শক্তির উত্থান (দ্বিতীয় অধ্যায়) | অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস প্রশ্ন ও উত্তর

Class 8 History Ancholik Soktir Utthan Explanatory Question Answer অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস প্রশ্ন ও উত্তর – আঞ্চলিক শক্তির উত্থান (দ্বিতীয় অধ্যায়) অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর Class 8 History Ancholik Soktir Utthan Explanatory Question Answer অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস প্রশ্ন ও উত্তর প্রশ্ন ও উত্তর – আঞ্চলিক শক্তির উত্থান (দ্বিতীয় অধ্যায়) ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর।

West Bengal Class 8 History Suggestion Download WBBSE Class 8th History explanatory question suggestion. Class 8 History Ancholik Soktir Utthan Suggestion download Class 8th Question Paper History. WB Class 8 History suggestion and important explanatory question and answer. Class 8 Suggestion pdf. আঞ্চলিক শক্তির উত্থান অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস পরীক্ষার সম্ভাব্য সাজেশন ও শেষ মুহূর্তের ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর ডাউনলোড। অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস পরীক্ষার জন্য সমস্ত রকম গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর।

Get the Class 8 History Ancholik Soktir Utthan Explanatory Question Answer by solutionwbbse.com

Class 8 History Ancholik Soktir Utthan Explanatory Question Answer prepared by expert subject teachers. WB Class 8 History Suggestion with 100% Common in the Examination.

FILE INFO: আঞ্চলিক শক্তির উত্থান (দ্বিতীয় অধ্যায়) অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর | Class 8 History Ancholik Soktir Utthan Explanatory Question Answer with FREE PDF Download Link

  • PDF File Name: আঞ্চলিক শক্তির উত্থান (দ্বিতীয় অধ্যায়) অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর | Class 8 History Ancholik Soktir Utthan Explanatory Question Answer PDF
  • Prepared by: Experienced Teachers
  • Price: FREE
  • Download Link 1: Class 8 History Notes WBBSE

আঞ্চলিক শক্তির উত্থান (দ্বিতীয় অধ্যায়) অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর | Class 8 History Ancholik Soktir Utthan Explanatory Question Answer অসংখ্য ধন্যবাদ সময় করে আমাদের এই “আঞ্চলিক শক্তির উত্থান (দ্বিতীয় অধ্যায়) অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর | Class 8 History Ancholik Soktir Utthan Explanatory Question Answer” পোস্টটি পড়ার জন্য। এভাবেই solutionwbbse.com ওয়েবসাইটের পাশে থাকো, যেকোনো প্রশ্ন ও উত্তর জানতে এই ওয়েবসাইটটি ফলো করো এবং নিজেকে তথ্যসমৃদ্ধ করে তোলো, ধন্যবাদ।

Please Share This Article

Related Posts

ভারতীয় সংবিধান-গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার-অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস-বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর

ভারতীয় সংবিধান-গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার-অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস-ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর

ভারতীয় সংবিধান-গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার-অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস-সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর

About The Author

Rahul

Tags

Leave a Comment

SolutionWbbse

"SolutionWbbse" শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন অধ্যয়ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গাইডলাইন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সাহায্য প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষণীয় উপকরণ সহজেই সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

Editor Picks

বিভিন্ন রকমের বায়ুদূষকগুলি সম্পর্কে লেখো | মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান (Class 10 Life Science)

নাইট্রিফিকেশন এবং ডিনাইট্রিফিকেশন কাকে বলে? এদের পার্থক্য লেখো

নাইট্রিফিকেশন ও অ্যামোনিফিকেশন কাকে বলে? এদের পার্থক্য লেখো | মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান

জৈব ভূ-রাসায়নিক চক্র কাকে বলে? জৈব ভূ-রাসায়নিক চক্রের কটি দশা ও কী কী?

ডিনাইট্রিফিকেশন বলতে কী বোঝো ও এর তাৎপর্য – মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান