আজকে আমরা এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের প্রথম অধ্যায়, “ইতিহাসের ধারণা”-এর কিছু “ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর” নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের স্কুলের পরীক্ষার জন্য ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির পর্যায়ক্রমিক মূল্যায়ন (Unit Test) থেকে শুরু করে বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই আসে।

ভারতবর্ষের ইতিহাস রচনা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করো। এ সম্পর্কে তোমার মত কী?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতবর্ষের ইতিহাস প্রসঙ্গে বলেছেন, ইতিহাস পড়া ও মুখস্থ করা ভারতবর্ষের নিশীথ-কালের একটা দুঃস্বপ্ন কাহিনিমাত্র। আমাদের দেশে কত বিদেশি এসেছে, সিংহাসন নিয়ে লড়াই হয়েছে। একদল চলে যাওয়ার পর আরও একদল এসেছে কিন্তু এদের ইতিহাস আমরা জানি বিদেশি ইতিহাসবিদদের রচনা থেকে। বঙ্কিমচন্দ্র ঠিক একই মত পোষণ করেছেন। তাঁর মতে, বাঙালির ইতিহাস চাই। এই ইতিহাস বাঙালিরাই রচনা করবে। বিদেশিদের লেখা বাঙালির ইতিহাস ভুলে ভরা।
উভয়ের বক্তব্যের মধ্যে একটা ইতিবাচক মিল রয়েছে। প্রত্যেক দেশের আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। সুতরাং, ইংল্যান্ডের ঐতিহাসিকরা যদি ভারতবর্ষের ইতিহাস লিখতে যান তা কখনোই সঠিক ইতিহাস হবে না। তাই ইতিহাস নিয়ে তর্কবিতর্ক হয় বেশি। এই বিতর্কের মধ্য থেকেই আসল ইতিহাস বেরিয়ে আসে। সুতরাং, এক্ষেত্রেও উভয় পণ্ডিতের মধ্যে মিল লক্ষ করা যায়।
আমার মতে, আমরা সবাই ইতিহাস লিখব এই কথাটা সবক্ষেত্রে প্রযুক্ত হবে না। যিনি বা যাঁরা ইতিহাস লিখছেন তিনি যেভাবে ঘটনাকে দেখেছেন সেভাবেই লিখবেন। ওই একই ঘটনার বর্ণনা অন্য কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে এক হবে না। সুতরাং, একই ঘটনা এবং তার ফলাফল নিয়ে বিতর্ক থাকবেই। তবে এটা ঠিক ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। আমার বিচার অনুযায়ী ইতিহাস হবে ‘আমাদের ইতিহাস।’
ভারতের আধুনিককালের ইতিহাসের উপাদান সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করো।
ভারতের আধুনিককালের ইতিহাসের উপাদান – যে সমস্ত তথ্য ও সূত্রকে অবলম্বন করে ভারতের আধুনিক – কালের ইতিহাস রচনা করা হয় তা আধুনিককালের ইতিহাসের উপাদান নামে অভিহিত। সারা বিশ্বজুড়ে আধুনিক সময়ের ইতিহাস লেখার উপাদানের বৈচিত্র্য অনেক বেশি। ভারতের ইতিহাসও তার ব্যতিক্রম নয়।
- ইতিহাসের উপাদান – আধুনিক ভারতের ইতিহাসের উপাদানের মধ্যে প্রশাসনিক কাগজপত্র, বই, ডায়রি, চিঠি, জমি বিক্রির দলিল, রোজকার বাজারের ফর্দ, ফোটোগ্রাফ বা ছবি, পোস্টার, সংবাদপত্র, বিজ্ঞাপন প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য তবে এইসব বিভিন্ন উপাদান বিভিন্নভাবে অতি সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করতে হয়। চিত্র – পুরোনো দিনের ক্যামেরা
- আত্মজীবনী – ইতিহাসের উপাদানরূপে আত্মজীবনী একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। যিনি আত্মজীবনী লিখেছেন, তিনি তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিচারধারা অনুযায়ী ঘটনার ব্যাখ্যা করেছেন। ঐতিহাসিকগণ রচয়িতার ব্যাখ্যা বিচার করে তবেই তা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ করেন।
- ফোটোগ্রাফ – ইতিহাসের আধুনিক যুগের কোনো বিষয় জানার অন্যতম প্রধান উপাদান ফোটোগ্রাফ বা ক্যামেরায় তোলা ছবি। এইরকম ছবির সংগ্রহ থেকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা কথা জানা যায়।
- প্রশাসনিক কাগজপত্র – আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল প্রশাসনিক কাগজপত্র। প্রশাসনিক দলিল দস্তাবেজ থেকে প্রশাসনের আইনকানুন, দৈনন্দিন কাজকর্ম ও কর্মসূচি তথা সরকারের ভূমিকা সম্পর্কে নানা কথা জানা যায়।।
- সংবাদপত্র – ইতিহাস রচনার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল সংবাদপত্র। বিভিন্ন সংবাদপত্রে পরিবেশিত দৈনন্দিন সংবাদ ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে সাহায্য করে। তবে এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, ইতিহাসের বিভিন্ন উপাদান রচনার ক্ষেত্রে ব্যবহার করার আগে তার সত্যতা যাচাই করে নেওয়া উচিত।
মন্তব্য – আধুনিক ভারতের সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রা কীরূপ ছিল তা ভবিষ্যৎকে দিশা দেবে আধুনিক যুগের নানা উপাদান। ইতিহাস এইসব উপাদানের ওপর নির্ভর করে আপন গতিতে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে।
সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে উপনিবেশবাদের সম্পর্ক কী? ভারতের ইতিহাসে এর কী প্রভাব পড়েছিল?
সাম্রাজ্যবাদ – লাতিন ‘ইম্পেরিয়াম’ শব্দটি থেকে ‘ইম্পেরিয়ালিজম’ বা ‘সাম্রাজ্যবাদ’-শব্দটির সৃষ্টি। পরবর্তীকালে এর ব্যাখ্যা করা হয় এভাবে, বড়ো রাষ্ট্রের দ্বারা অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র বা দুর্বল রাষ্ট্রের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। ব্রিটিশ ঐতিহাসিকরা ‘সাম্রাজ্যবাদ’ শব্দটিকে স্বীকৃতি দেয়। বিশ্বে প্রথম ব্রিটিশরাই অন্য দেশের ওপর তাদের ক্ষমতা বিস্তারের নীতি গ্রহণ করে। এর থেকেই জন্ম হয় উপনিবেশবাদের।
- উপনিবেশবাদ – লাতিন ‘কলোনিয়া’ শব্দটি থেকে ‘কলোনি’ বা ‘উপনিবেশ’ শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে। মানবসমাজের স্থানান্তরিত অংশকেও ‘উপনিবেশ’ বলা হয়। উপনিবেশের ‘রাজনৈতিক’ অর্থটিকে দুটি বিষয়ে উল্লেখ করা যায়। দেশের বাইরের অন্য কোনো দেশে বসতি বিস্তার।
কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্র কর্তৃক অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্রের ওপর প্রবর্তিত শাসনব্যবস্থা। - উভয়ের মধ্যে সম্পর্ক – প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে যখন কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়ে ওঠে ঠিক তখনই সেই রাষ্ট্র অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্রের ওপর তাদের শাসন প্রতিষ্ঠা করে। এই সময় থেকে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ এবং ‘উপনিবেশবাদ’ শব্দ দুটি যুক্ত হয়ে ‘ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদ’ ধারণার উৎপত্তি হয়। সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রটি তাদের নীতি, আদর্শ, পুঁজি, ধর্মীয় ধারণা এবং উৎপাদিত দ্রব্য ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দেয়।
ভারতের ওপর এর প্রভাব – 1498 খ্রিস্টাব্দে ভাস্কো-দ্য-গামা কালিকট বন্দরে অবতরণের পর থেকে ইউরোপীয় বণিকরা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে ভারতে আসতে শুরু করে। পোর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ইংরেজ, ফরাসি প্রভৃতি বণিক জাতি ভারতে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে উপনিবেশ স্থাপন করে। 1757 খ্রিস্টাব্দে পলাশির যুদ্ধে বাংলার নবাব সিরাজ উদ দৌলা, এবং 1764 খ্রিস্টাব্দে মিরকাশিমকে হারিয়ে ইংরেজরা বাংলা, অযোধ্যা, দিল্লিতে আধিপত্য বিস্তারে অগ্রসর হয়। দাক্ষিণাত্যে ফরাসি, ওলন্দাজদের পরাজিত করে ইংরেজরা প্রায় একচ্ছত্র ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পরে একে একে হায়দার আলি, টিপু সুলতান, মারাঠা ও শিখদের পরাজিত করে। 1857 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে প্রায় সমগ্র ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপিত হয়।
ইতিহাসের শিক্ষক মহাশয় তোমাদের শ্রেণিতে ভারতের ইতিহাসের যুগবিভাজন সম্পর্কে জেমস মিল-এর মতবাদ পড়িয়েছেন। পরের দিনে শ্রেণিতে মিলের মতবাদ সম্পর্কে তোমাদের লিখতে বললেন। তুমি কী লিখবে?
ভারতের ইতিহাসে যুগ বিভাজন সম্পর্কে জেমস মিলের মতবাদের যৌক্তিকতা – জেমস মিল ছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী ঐতিহাসিক। ভারত ছিল ইংল্যান্ডের উপনিবেশ। সুতরাং, ভারতে ব্রিটিশদের স্বার্থ বজায় রাখতে গেলে ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গিতে যুগ বিভাজন করা উচিত বলে মিল মনে করেছেন। 1917 খ্রিস্টাব্দে ‘হিস্ট্রি অব ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে মিল ভারতের ইতিহাসকে তিনটি যুগে ভাগ করেন –
হিন্দু যুগ, মুসলিম যুগ, ব্রিটিশ যুগ। তিনি হিন্দু ও মুসলিম যুগ সম্পর্কে অশ্রদ্ধা ব্যক্ত করেছেন। তাঁর মতে ভারতীয়রা ‘অসভ্য’। সুতরাং, ‘অসভ্য’ ভারতীয়দের ‘সভ্য’ করতে গেলে ব্রিটিশ শাসনের প্রয়োজন।
আমার মতে, জেমস মিলের করা এই ধরনের যুগ বিভাজন যুক্তিসংগত বা বাঞ্ছনীয় নয়। কারণ ইতিহাস কখনোই এক জায়গায় স্থির থাকে না, তার ধারা চিরপ্রবহমান। ইতিহাস অবিভাজ্য।
- হিন্দুযুগ – এই যুগ প্রসঙ্গে বলা যায়, ভারতে কেবলমাত্র বৈদিক হিন্দুরাজারাই রাজত্ব করেননি, চন্দ্র গুপ্তের মতো জৈন, অশোক ও কনিষ্কের মতো বৌদ্ধ শাসকরাও রাজত্ব করেছেন। সুতরাং, এই যুগকে ‘হিন্দুযুগ’ না বলে ‘প্রাচীন যুগ’ বলাই যুক্তি-সংগত।
- মুসলিম যুগ – এই প্রসঙ্গে বলা যায়, ভারতে মুসলিম শাসকদের পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক হিন্দু রাজারাও রাজত্ব করেছেন। ওড়িশা, রাজপুতানা, মধ্যপ্রদেশ, আসাম প্রভৃতি অঞ্চলে হিন্দুরাজ্যের অস্তিত্ব ছিল। সুতরাং, এই যুগকে মুসলিম যুগ বলা সংগত নয়।
- ব্রিটিশ যুগ – এ যুগের ক্ষেত্রে বলা যায়, কোনো জাতির পরিচয় দিয়ে যুগ বিভাজন কখনোই বিজ্ঞানভিত্তিক হতে পারে না। সুতরাং, ইউরোপের যুগ বিভাজন প্রক্রিয়াকে সামনে রেখে ভারতের ইতিহাসের যুগ বিভাজন হওয়া উচিত এভাবে – প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ, আধুনিক যুগ।
একনজরে সময়কাল ও বিষয়সমূহের সারণি –
| কাল | বিষয় |
| 1707 খ্রিস্টাব্দ | মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু |
| 1757 খ্রিস্টব্দ | ইংরেজ ও সিরাজ-উদ দৌলার মধ্যে পলাশির যুদ্ধ। |
| 1805 খ্রিস্টাব্দ | উইলিয়ম দানিয়েলের আঁকা চিনের ক্যান্টন প্রদেশে ইউরোপীয় ফ্যাক্টরির ছবি |
| 1808 খ্রিস্টাব্দ | মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের লেখা ‘রাজাবলি’ নামক গ্রন্থ। |
| 1817 খ্রিস্টাব্দ | জেমস মিল History of British India নামক গ্রন্থটি রচনা করেন। |
| 1947 খ্রিস্টাব্দ | ভারত বিভাজন। |
আজকে আমাদের এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের প্রথম অধ্যায়, “ইতিহাসের ধারণা”-এর কিছু “ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর” নিয়ে আলোচনা করেছি। এই ধরনের প্রশ্নগুলো স্কুলের পরীক্ষা বা বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই আসে।
আশা করি এই আর্টিকেলটি তোমাদের/আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে। যদি কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তাহলে নির্দ্বিধায় টেলিগ্রামে আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। আপনাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। এছাড়া, এই পোস্টটি সেইসব বন্ধু বা প্রিয়জনদের সাথে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।
FILE INFO: ইতিহাসের ধারণা (প্রথম অধ্যায়) অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস প্রশ্ন ও উত্তর | Class 8 History Itihaser Dharona Question and Answer with FREE PDF Download Link
- PDF File Name: ইতিহাসের ধারণা (প্রথম অধ্যায়) অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস প্রশ্ন ও উত্তর | Class 8 History Itihaser Dharona Question and Answer PDF
- Prepared by: Experienced Teachers
- Price: FREE
- Download Link 1: Click Here To Download





Leave a Comment