অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ঔপনিবেশিক অর্থনীতির চরিত্র – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর

Rahul

আজকে আমরা এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের চতুর্থ অধ্যায়, “ঔপনিবেশিক অর্থনীতির চরিত্র”-এর কিছু “ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর” নিয়ে আলোচনা করব। এই প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের স্কুলের পরীক্ষার জন্য ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো অষ্টম শ্রেণির পর্যায়ক্রমিক মূল্যায়ন (Unit Test) থেকে শুরু করে বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই আসে।

ঔপনিবেশিক অর্থনীতির চরিত্র – অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর
Contents Show

1. ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রবর্তিত বিভিন্ন ভূমি-রাজস্ব নীতির পরিচয় দাও।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে ঔপনিবেশিক অর্থনীতি কায়েম করতে গিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভিত্তিতে ভূমিস্বত্ব নীতির নানা রূপ দেয়। এই নীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি।

কোম্পানির প্রবর্তিত ভূমিরাজস্ব নীতি –

  • ইজারাদারি ব্যবস্থা – লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস 1772 খ্রিস্টাব্দে ভূমিরাজস্ব আদায়ের অধিকার নিলামে বা ইজারায় দেওয়ার প্রথা প্রবর্তন করেন। একে পাঁচশালা বন্দোবস্ত বা ইজারাদারি ব্যবস্থা বলা হয়।
  • দশশালা ব্যবস্থা – 1790 খ্রিস্টাব্দে লর্ড কর্নওয়ালিস জমিদারদের সঙ্গে দশ বছরের জন্য ভূমিরাজস্ব বন্দোবস্ত করেন। একে দশশালা বন্দোবস্ত বলা হয়।
  • চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত – 1793 খ্রিস্টাব্দে লর্ড কর্নওয়ালিস বাংলা, বিহার ও ওড়িশায় দশশালা বন্দোবস্তকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে পরিণত করেন। এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল নির্দিষ্ট সময়ে ও নির্দিষ্ট হারে রাজস্ব আদায় করা এবং কোম্পানির আয় সুনিশ্চিত করা।
  • রায়তওয়ারি ব্যবস্থা – 1820 খ্রিস্টাব্দে মাদ্রাজ ও বোম্বাই প্রেসিডেন্সিতে টমাস মনরো ও আলেকজান্ডার রিড রায়তওয়ারি ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। এই ব্যবস্থায় সরকার সরাসরি কৃষকদের সঙ্গে ভূমিরাজস্ব বন্দোবস্ত করত এবং 25-30 বছরের জন্য জমির স্বত্ব দেওয়া হত।
  • মহলওয়ারি ব্যবস্থা – 1822 খ্রিস্টাব্দে গাঙ্গেয় উপত্যকা, উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ ও মধ্যভারতের কিছু অংশে মহলওয়ারি ব্যবস্থা চালু হয়। এই ব্যবস্থায় গ্রাম বা মহল ভিত্তিক রাজস্ব বন্দোবস্ত করা হত।
  • ভাইয়াচারি ব্যবস্থা – 1824 খ্রিস্টাব্দে এই ব্যবস্থা পাঞ্জাবে প্রবর্তন করেন এলফিনস্টোন ও ম্যাকেঞ্জি। এই ব্যবস্থায় গ্রামের প্রতিটি কৃষককে আলাদাভাবে রাজস্ব দিতে হত। রাজস্ব হার নিরূপণ ও আদায়ের দায়িত্ব ভাইয়াচারি সভার ওপর ন্যস্ত ছিল। রাজস্ব অনাদায়ে জমি বাজেয়াপ্ত করা হত না।
  • তালুকদারি ব্যবস্থা – অযোধ্যা অঞ্চলে তালুকদারি ব্যবস্থা নামে একটি রাজস্ব ব্যবস্থা চালু ছিল। এই ব্যবস্থায় তালুকদারের অধীনে কয়েকটি গ্রাম ছিল। সরকার তার সঙ্গে 30 বছরের জন্য চুক্তি করত। তবে জমিতে তাদের কোনো স্বত্ব ছিল না। নিয়মিত রাজস্বের একটি নির্দিষ্ট অংশ তাকে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হত।

2. ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’—কথাটির অর্থ কী? এর দ্বারা বাংলার কৃষকরা কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তা সংক্ষেপে আলোচনা করো।

লর্ড কর্নওয়ালিস 1793 খ্রিস্টাব্দে বাংলা, বিহার ও ওড়িশার জমিদারদের সঙ্গে চিরস্থায়ী ভিত্তিতে যে ভূমিরাজস্ব বন্দোবস্ত করেছিলেন, তা ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ নামে পরিচিত। এই ব্যবস্থায় জমিদাররা বংশানুক্রমে জমির মালিকানা লাভ করত এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব সরকারকে দিতে হত।

বাংলা, বিহার ও ওড়িশা এবং পরে বারাণসীতে এই ব্যবস্থা চালু হয়। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রসঙ্গে মার্সম্যান বলেছেন, ‘এটা ছিল একটি দৃঢ়, সাহসী ও বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপ।’ (‘It was a bold, brave and wise measure.’)

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের শর্ত –

  • জমিদার ও তালুকদারদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাজনা দিতে হবে। বিনিময়ে তাঁরা বংশপরম্পরায় জমির ভোগদখল করতে পারবেন।
  • সূর্যাস্ত আইন অনুযায়ী, সূর্যাস্তের আগে নির্ধারিত রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা না দিলে জমিদারি নিলামে বিক্রি করা হবে।
  • খরা, বন্যা বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে শস্যহানি ঘটলেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রাজস্ব মেটাতে হবে।
  • জমিদারদের ওপর নির্ধারিত রাজস্ব চিরদিন অপরিবর্তিত থাকবে।

বাংলার কৃষককুলের ক্ষতি –

হোমস তাঁর ‘History of Indian Mutiny’ গ্রন্থে বলেছেন—’চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ছিল একটি দুঃখজনক প্রতারণা।’ (The permanent settlement was a sad blunder’)

  • এই ব্যবস্থায় রাজস্ব আদায় নির্দিষ্ট পরিমাণে ও নির্দিষ্ট সময়ে হওয়ার ফলে কোম্পানির আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রস্তুত করা সহজ হয়েছিল।
  • এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কোম্পানির ভূমিরাজস্ব আদায়ের পরিমাণ অনেক বৃদ্ধি পায়।
  • এই ব্যবস্থায় কৃষকদের কাছ থেকে জমিদারের প্রাপ্য খাজনা নির্দিষ্ট না হওয়ায় কৃষকগণ নির্যাতিত হতে থাকেন। জমিদারদের চাহিদা মেটাতে কৃষকেরা মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করতে আরম্ভ করেন।
  • জমিদার সম্প্রদায় নায়েব, গোমস্তা ও পেয়াদাদের হাতে খাজনা আদায়ের ভার দিয়ে অলস, পরিশ্রমহীন জীবনযাপন শুরু করেন। এর ফলে সমাজে এক মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণির সৃষ্টি হয়। ফলস্বরূপ সার্বিকভাবে আর্থিক ও সামাজিক ব্যবস্থা বিধ্বস্ত হয়।
  • শহুরে নতুন জমিদাররা তাদের জমিদারির রক্ষণাবেক্ষণের কাজ নায়েব-গোমস্তাদের ওপর অর্পণ করে শহরেই বাস করতেন। তাঁদের ব্যয় নির্বাহের জন্য গ্রামের অর্থ শহরে চলে যেত। ফলে গ্রামগুলি শ্রীহীন হয়ে পড়ে।
  • সূর্যাস্ত আইনের যাঁতাকলে পড়ে তথাকথিত বহু পুরোনো জমিদার তাদের জমিদারি হারান।
  • এই সময়কার সমাজ ব্যবস্থায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কল্যাণে মহাজন ও সুদখোর ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য বাড়ে। ড. ব্যাডেন পাওয়েল-এর মতে, “কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত অনেক প্রত্যাশাকে ধ্বংস করে এমন কিছু প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল যা অকল্পনীয়।”

3. চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের উদ্দেশ্যগুলি কী ছিল?

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের মাধ্যমে কোম্পানি কিছু উদ্দেশ্য পূরণ করতে বেশ তৎপর হয়েছিল। যথা —

  • রাজস্ব আদায়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা – খুব সহজভাবে এবং বেশি পরিমাণে কীভাবে রাজস্ব আদায় করা যায়, এই সংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষারই ফলশ্রুতি হল চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত।
  • আয়ের নিশ্চয়তা – চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের মাধ্যমে সরকারের আয় সুনিশ্চিতকরণের উদ্দেশ্য সাধিত হয়। কারণ এই ব্যবস্থায় জমিদারগণ নির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব প্রতি বছর জমা দিতে বাধ্য থাকেন।
  • ইংরেজদের সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি – কর্নওয়ালিস মনে করেন, জমিদাররা জমির চিরস্থায়ী মালিকানা পেলে সরকারের অনুগত সমর্থকে পরিণত হবে। এই জমিদার শ্রেণি গ্রামাঞ্চলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের স্তম্ভে পরিণত হবে।
  • বাজেট তৈরি – সরকারের আয় সুনিশ্চিত হয়ে বাৎসরিক আয় ও ব্যয়ের হিসাব অর্থাৎ বাজেট তৈরি করা সহজ হবে।
  • কৃষির উন্নতি – কর্নওয়ালিস মনে করেন, জমিদাররা জমির মালিকানা পেলে জমির উন্নয়নে মনোনিবেশ করবেন। তার ফলে কৃষির উন্নতি ঘটবে।
  • অনুগত জমিদার সম্প্রদায় সৃষ্টি – কোম্পানি চেয়েছিল চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সুবাদে জমির নির্দিষ্ট মেয়াদ প্রদান করে একশ্রেণির জমিদার তৈরি করতে, যারা কোম্পানির প্রতি অনুগত থাকবে।
  • নিলাম ব্যবস্থা থেকে মুক্তি – রাজস্ব ব্যবস্থার বিভিন্ন পর্বে মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়োগ করে কোম্পানি অনেক সময় রাজস্ব সংগ্রহ করত। অনেক ক্ষেত্রে নিলাম ডাকের সময় যে অর্থমূল্য উঠত, তার সম্পূর্ণ অংশ কোম্পানির ঘরে রাজস্ব হিসেবে জমা হত না। নিলাম ব্যবস্থার এই ঝামেলা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য কর্নওয়ালিস চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করেন।

মূল্যায়ন – ইংরেজ সরকার চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে কোম্পানির লক্ষ্যগুলি যথাযথভাবে পূরণ করতে সমর্থ হয়েছিল। সূর্যাস্ত আইনে জমিদারি হারানোর ভয়ে জমিদারগণ সরকারকে নির্দিষ্ট সময়ে রাজস্ব জমা দেওয়ার ফলে সরকারের আয় সুনিশ্চিত হয়। তবে সরকার জমিদারদের রাজস্বের পরিমাণ নির্ধারণ করে দিলেও কৃষকদের রাজস্বের পরিমাণ নির্ধারণ করে দেয়নি। ফলে জমিদারগণ প্রজাদের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত রাজস্ব ছাড়াও নানা রকমের বাড়তি রাজস্ব আদায় করত। সমালোচকদের মতে, লর্ড কর্নওয়ালিস বাংলায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রয়োগ ঘটিয়ে এদেশের শিল্প-বাণিজ্যকে ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন।

4. জমিদারি প্রথা বা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সুফল উল্লেখ করো।

1793 খ্রিস্টাব্দে ভারতের বড়োলাট লর্ড কর্নওয়ালিস চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দ্বারা জমি চিরকালের জন্য জমিদারদের মধ্যে বণ্টন করেন। ভারতীয় আর্থসামাজিক জীবনে এই ব্যবস্থার ফল ছিল সুদূরপ্রসারী।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সুফল —

  • কোম্পানির আয় সুনিশ্চিত – রস্থায়ী বন্দোবস্ত দ্বারা কোম্পানি ভূমিরাজস্ব থেকে আয় সুনিশ্চিত করে। ফলে কোম্পানির পক্ষে বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখা সহজ হয়।
  • কৃষির উন্নতি – জমিতে চিরকালের স্বত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় জমিদাররা জমির উন্নতির প্রতি যত্নবান হন। ফলে কৃষির উন্নতি সাধিত হয়।
  • গ্রামীণ বিকাশ – জমিদারি পাকাপোক্ত হওয়ায় জমিদাররা নিজস্ব এলাকার উন্নতির প্রতি যত্নবান হন। রাস্তাঘাট নির্মাণ, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, পুকুর খনন, জমিতে সেচের ব্যবস্থা প্রভৃতি জনসেবামূলক কাজের প্রতি তারা জোর দেন।
  • ব্রিটিশ অনুগত শ্রেণির উদ্ভব – একথা বলা বাহুল্য যে, চিরস্থায়ী ব্যবস্থা প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে কোম্পানির এক বিশেষ উদ্দেশ্য সাধিত হয়। এই ব্যবস্থার দ্বারা কোম্পানির অনুগত এক বিশেষ শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। এই সমস্ত জমিদারগণ নিজেদের স্বার্থরক্ষার তাগিদে কোম্পানির প্রতি আনুগত্য দেখাতেন।
  • কৃষকের সুবিধা – ভূমিরাজস্বের পরিমাণ সুনির্দিষ্ট হওয়ায় কৃষকদের খাজনা দিতে সুবিধা হয়। তারা জমিদার ও ইজারাদারদের দ্বারা শোষণ ও জমি থেকে ঘন ঘন উৎখাত হওয়ার হাত থেকে রেহাই পায়।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনে কর্নওয়ালিসের মূল উদ্দেশ্যই ছিল জমিদার শ্রেণির উন্নয়ন ঘটানো। এছাড়া এই ব্যবস্থার মাধ্যমে তিনি ব্রিটিশের অনুগত এক জমিদার শ্রেণি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল কৃষির উন্নতি সাধন তথা জমিদারদের স্বার্থরক্ষা করা।

5. চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কুফল কী হয়েছিল?

1793 খ্রিস্টাব্দে ভারতের বড়োলাট লর্ড কর্নওয়ালিস চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দ্বারা জমি চিরস্থায়ীভাবে জমিদারদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। ভারতীয় আর্থসামাজিক জীবনে এই ব্যবস্থার ফল হয়েছিল মারাত্মক।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কুফল —

  • সূর্যাস্ত আইনের কুফল – চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের এক অন্যতম দিক সূর্যাস্ত আইনের কবলে পড়ে বহু জমিদার তাঁদের জমিদারি হারান। কারণ অনেক জমিদার নির্ধারিত দিন অর্থাৎ বাংলা বছরের শেষ দিনে সূর্য অস্ত যাওয়ার আগে সরকারের ঘরে খাজনা জমা দিতে পারতেন না, ফলে তাদের জমিদারি থেকে উচ্ছেদ করা হত।
  • প্রজাপীড়ন – জমিদার ও ইজারাদারগণ অনেক সময় প্রজাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত খাজনা আদায় করতেন। এর ফলে কৃষকদের জীবনে নেমে আসে চরম বিপর্যয়।
  • মধ্যস্বত্বভোগীদের উদ্ভব – বহু জমিদার তাঁদের জমিদারি দেখাশোনার জন্য ইজারাদার বা পত্তনিদার নিয়োগ করতেন। এই ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই বাংলার গ্রামীণ জীবনে মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণির উদ্ভব হয়, যাঁদের সঙ্গে জমি বা কৃষকদের কোনো সম্পর্ক ছিল না।
  • কৃষিতে চাপ – জমিতে জমিদারদের চিরস্থায়ীভাবে স্বত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় কৃষির উন্নতি হয়। তখন কৃষি থেকে অধিক লাভের আশায় বহু বিনিয়োগকারী কৃষিক্ষেত্রে অর্থ বিনিয়োগ করেন। এর ফলে কৃষিক্ষেত্রে চাপ বাড়ে এবং কৃষিকাজ ব্যাহত হয়।
  • কৃষক উৎখাত – প্রকৃতপক্ষে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে জমিতে কৃষকের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে কৃষকের স্বার্থ উপেক্ষিত হয়। জমিদার বা ইজারাদারগণ জোর করে জমি থেকে কৃষকদের উৎখাত করতেন।
  • মহাজনী শোষণ – ইজারাদারদের খাজনার চাপের হাত থেকে রক্ষা পেতে অনেক সময় কৃষকরা মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে অর্থ ধার করত। কিন্তু মহাজনরা কৃষকদের সারল্য ও অশিক্ষার সুযোগ নিয়ে এই সমস্ত ঋণগ্রস্ত কৃষককুলকে সর্বস্বান্ত করত।

মন্তব্য – সামগ্রিকভাবে বলা যায়, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে জমিদার শ্রেণি সমৃদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু কৃষকদের অবস্থার কোনো সুরাহা হয়নি। উপরন্তু এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষকদের জীবনযাত্রার অবনমন ঘটে।

6. রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত বলতে কী বোঝো? এর ফলাফলগুলি লেখো।

‘রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত’ বলতে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে কোনো জমিদার বা মধ্যস্বত্বভোগীর পরিবর্তে সরকার কর্তৃক কৃষক ও রায়তের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে রাজস্ব বন্দোবস্তকে বোঝায়। উনিশ শতকের প্রথম দিকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম ভারতে ব্রিটিশ কোম্পানির আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর প্রধানত মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে রায়ত বা প্রকৃত চাষিদের থেকে সরাসরি খাজনা আদায়ের সরকারি ব্যবস্থা রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত নামে পরিচিত।

রায়তওয়ারি বন্দোবস্তের শর্ত

  • সরকারের সঙ্গে কৃষকদের সরাসরি যোগাযোগ গড়ে ওঠে।
  • রায়তওয়ারি প্রথায় কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরিভাবে সরকার রাজস্ব নিত।
  • কুড়ি-ত্রিশ বছর অন্তর আলোচনার মাধ্যমে ভূমিরাজস্বের পরিমাণ বাড়ানো হত।
  • উৎপন্ন ফসলের 45-55 ভাগ রাজস্ব রূপে নির্ধারিত হত।
  • কৃষকেরা খাজনা দিতে ব্যর্থ হলে তাদের ঘরবাডিসহ যাবতীয় সম্পত্তি অধিগ্রহণ করা হত।
  • জমি জরিপের মাধ্যমে এবং উৎপাদনের ভিত্তিতে রাজস্ব নির্ধারণ করা হত।
  • এই ব্যবস্থাতে জমির ওপর কৃষকদের কোনো মালিকানা স্বত্ব থাকত না। থাকত কেবল জমি ভোগ করার স্বত্ব।

রায়তওয়ারি বন্দোবস্তের ফলাফল

রায়তওয়ারি বন্দোবস্তের সুফল –

  • রায়তওয়ারি ব্যবস্থার বেশ কিছু সুফল ছিল। যথা—এই ব্যবস্থা সরকারের সঙ্গে রায়তদের সরাসরি যোগাযোগ ঘটায় এই ব্যবস্থায় প্রশাসনিক জটিলতা ও ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটে।
  • নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সরকারি তরফে রাজস্ব বাড়ানোর সুযোগ বৃদ্ধি পায়।
  • রায়তওয়ারি ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণির অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়।
  • জমিদার নিজের খেয়ালখুশিমতো প্রজাদের জমি থেকে উচ্ছেদ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।

রায়তওয়ারি বন্দোবস্তের কুফল –

  • কৃষকরা এই ব্যবস্থায় কোম্পানির কর্মচারীদের হাতে অত্যাচারিত হত।
  • এই ব্যবস্থায় রাজস্বের হার ছিল অত্যন্ত বেশি।
  • রায়তওয়ারি ব্যবস্থায় জমির ওপর কৃষকের মালিকানা স্বত্ব ছিল না।

7. রায়তওয়ারি বন্দোবস্তের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলি আলোচনা করো।

1820 খ্রিস্টাব্দে টমাস মনরো মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির কয়েকটি এলাকায় রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত প্রবর্তন করেন।

রায়তওয়ারি বন্দোবস্তের বিবরণ –

  • এই ব্যবস্থায় ভূমিরাজস্বের পরিমাণ ছিল উৎপন্ন ফসলের 45 শতাংশ।
  • এই ব্যবস্থা অনুযায়ী ঠিক হয় প্রতি 30 বছর অন্তর ভূমিরাজস্বের পরিমাণ মূল্যায়ন করা হবে।
  • জমির উর্বরতা শক্তি অনুযায়ী জমিকে 9টি শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়।
  • জমিতে চাষিরা চাষ করার অধিকার পেলেও, জমির মালিকানা লাভ করেনি।

ইতিবাচক দিক –

  • এই ব্যবস্থায় জমিদার ও মধ্যস্বত্বভোগী না থাকায় তাদের অত্যাচারের হাত থেকে চাষিরা রক্ষা পায়।
  • সরকার জমি সরাসরি কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করায় জমি থেকে চাষিদের উৎখাত হওয়ার ভয় কম ছিল।
  • চাষিরা নিজের জমিতে দারুণ উৎসাহ নিয়ে চাষ-আবাদ করত। ফলে কৃষিব্যবস্থার উন্নতি হয়।

নেতিবাচক দিক –

ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি এই ব্যবস্থায় কিছু নেতিবাচক দিকও ছিল, যেমন—

  • কৃষকরা মহাজনি শোষণের হাত থেকে রক্ষা পায়নি, সরকারি রাজস্ব নগদে দিতে হত বলে মহাজনদের দ্বারস্থ হতে হত।
  • কোম্পানির কর্মচারীরা কৃষকদের কাছ থেকে অবৈধভাবে টাকা উপার্জন করত।
  • ভূমিরাজস্ব না দিতে পারলে সরকার চাষির জমি বেদখল করত।

মন্তব্য – প্রকৃতপক্ষে রায়তওয়ারি বন্দোবস্তে কৃষকদের অবস্থার বিশেষ উন্নতি হয়নি। মহাজনি শোষণ ও সরকারি কর্মচারীদের অত্যাচারে তারা সর্বস্বান্ত হত। তাই তারা দারিদ্র্যের অন্ধকারেই নিমজ্জিত হয়। ঘন-ঘন দুর্ভিক্ষ ও খাদ্যাভাব ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী।

8. মহলওয়ারি বন্দোবস্ত কাকে বলে? এর সুফল ও কুফলগুলি কী ছিল?

‘মহল’ কথাটির অর্থ কয়েকটি গ্রামের সমষ্টি। মহলওয়ারি বলতে মূলত গ্রামভিত্তিক কথাটিকে বোঝানো হত। উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ভূমির খাজনা আদায়ের জন্য ‘মহলওয়ারি’ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল।

মহলওয়ারি বন্দোবস্তের ফলাফল —

মহলওয়ারি বন্দোবস্তের সুফল –

  • চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে ভবিষ্যতে রাজস্ব বৃদ্ধির কোনো সুযোগ ছিল না, কিন্তু মহলওয়ারি বন্দোবস্তে এই সুযোগ বিদ্যমান ছিল।
  • এই ব্যবস্থার দ্বারা মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণির অবলুপ্তির চেষ্টা করা হয়েছিল।

মহলওয়ারি বন্দোবস্তের কুফল –

  • এই ব্যবস্থায় জমির ওপর কৃষকদের কোনো মালিকানা ছিল না।
  • এই ব্যবস্থার মাধ্যমে জমিদার ও তালুকদারদের স্থান দখল করে গ্রাম প্রধানরা।
  • এতে রাজস্বের হার ছিল অত্যন্ত চড়া।
  • গোটা গ্রামের ওপর রাজস্ব নির্ধারিত হওয়ায় অনেকেই রাজস্ব দেওয়ার ব্যাপারটিতে উদাসীন থাকত।

মহলওয়ারি বন্দোবস্তের ফলে কৃষক সমাজের আর্থিক দুর্দশার কোনো সমাধান হয়নি। এই ব্যবস্থায় একটা নির্দিষ্ট সময় অন্তর রাজস্বের হার সংশোধন করা হত। এর ফলে রাজস্ব আদায়ের হার ক্রমশ বৃদ্ধি পেত। সুতরাং, বর্ধিত রাজস্বের বোঝা মেটানোর জন্য মহাজনের কাছ থেকে কৃষকদের ধার করতে হত এবং ধার পরিশোধ করতে না-পারার ফলে তাদের অত্যাচার সহ্য করতে হত। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মহাজন ও ব্যবসায়ীদের হাতে জমিগুলি বন্ধক থাকত।

9. মহলওয়ারি বন্দোবস্তের শর্তাবলি ও ত্রুটি-বিচ্যুতি উল্লেখ করো।

1822 খ্রিস্টাব্দে কোম্পানির রাজস্ব সচিব ম্যাকেন্সির সুপারিশক্রমে গাঙ্গেয় উপত্যকা, দিল্লি, মধ্যপ্রদেশ, উত্তর-পশ্চিম প্রদেশে মহলওয়ারি বন্দোবস্ত প্রবর্তিত হয়।

মহলওয়ারি বন্দোবস্তের বিবরণ —

কারণ – 1793 খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সুবা-বাংলায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বা জমিদারি বন্দোবস্ত প্রবর্তন করে। কিন্তু এই ব্যবস্থায় নানা ত্রুটিবিচ্যুতি দেখা দেয়। এজন্য গঠিত হয় আমিনি কমিশন। এই কমিশনের সভাপতি হোল্ট ম্যাকেন্সির সুপারিশ অনুযায়ী কোম্পানি সপ্তম আইন জারি করে মহলওয়ারি বন্দোবস্ত প্রবর্তন করে।

মহলওয়ারি বন্দোবস্তের শর্ত বা বৈশিষ্ট্য —

মহলওয়ারি বন্দোবস্তের বৈশিষ্ট্যগুলি হল —

  • গাঙ্গেয় উপত্যকায় কয়েকটি গ্রাম নিয়ে এক একটি মহল গড়ে তোলা হয়।
  • প্রতিটি গ্রাম বা মহলের ওপর নির্দিষ্ট হারে রাজস্ব নির্ধারিত হত।
  • জমির উর্বরতা শক্তির বিচারে জমিকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করে ভূমিরাজস্ব নির্ধারণ করা হত। সাধারণত এই রাজস্বের হার ছিল উৎপন্ন ফসলের 2/3 অংশ।
  • সরকার মহলগুলির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলাকার জমি 20-30 বছরের জন্য বণ্টন করে।
  • এই ব্যবস্থায় কোনো জমিদার বা মধ্যস্বত্বভোগী ছিল না।

মহলওয়ারি বন্দোবস্তের ত্রুটিবিচ্যুতি —

মহলওয়ারি বন্দোবস্ত ত্রুটিমুক্ত ছিল না কারণ —

  • এই ব্যবস্থায় কৃষকদের জমি চাষ বা ভোগের অধিকার থাকলেও, জমির ওপর তাদের মালিকানা ছিল না।
  • গ্রামপ্রধানরা কৃষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করত। ফলে কৃষকদের ওপর দারুণ চাপ পড়ত।
  • এই ব্যবস্থায় ভূমিরাজস্বের হারও ছিল বেশি। তাই চড়া হারে রাজস্ব প্রদান করতে গিয়ে তারা সর্বস্বান্ত হত।
  • সরকারের খাজনা মেটাতে কৃষকরা মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করত। কিন্তু ঋণ পরিশোধ করার ক্ষমতা তাদের ছিল না। এর ফলে তাদের ঘরবাড়ি, জমি সবকিছু মহাজনের কাছে ঋণের দায়ে বাঁধা থাকত।

মূল্যায়ন – এইভাবে গাঙ্গেয় উপত্যকায় কৃষিজীবনে নেমে এসেছিল চরম হতাশা ও দৈন্যদশা। 1833 খ্রিস্টাব্দে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক মহলওয়ারি বন্দোবস্তের কিছু সংস্কার বা উন্নতি করলেও, অবস্থার বিশেষ হেরফের হয়নি।

10. চিরস্থায়ী, রায়তওয়ারি, মহলওয়ারি ভূমি বন্দোবস্তের তুলনামূলক আলোচনা করো।

1772 খ্রিস্টাব্দ থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতের তিনটি প্রেসিডেন্সিতেই পরীক্ষানিরীক্ষামূলক কয়েকটি ভূমি-রাজস্ব বন্দোবস্ত চালু করে। যেমন—চিরস্থায়ী, রায়তওয়ারি বা মহলওয়ারি বন্দোবস্ত। নীচে এই তিন ভূমিবন্দোবস্তের তুলনামূলক আলোচনা করা হল —

বিষয়চিরস্থায়ী বন্দোবস্তরায়তওয়ারি বন্দোবস্তমহলওয়ারি বন্দোবস্ত
1. সময়চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তিত হয় 1793 খ্রিস্টাব্দে।1820 খ্রিস্টাব্দে রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত প্রবর্তিত হয়।মহলওয়ারি বন্দোবস্ত 1822 খ্রিস্টাব্দে প্রবর্তিত হয়।
2. কে বা কারা প্রবর্তন করেনভারতে বড়োলাট লর্ড কর্নওয়ালিস এই ভূমি বন্দোবস্ত প্রবর্তন করেন।স্যার টমাস মনরো ও আলেকজান্ডার রিড ছিলেন এই বন্দোবস্তের উদ্যোক্তা।এর উদ্যোক্তা ছিলেন ম্যাকানজি।
3. কোথায় প্রবর্তিত হয়সুবা বাংলা অর্থাৎ বাংলা, বিহার ও ওডিশায় এই ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়।ভারতের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত প্রবর্তিত হয়।গাঙ্গেয় উপত্যকায় প্রবর্তিত হয় মহলওয়ারি বন্দোবস্ত।
4. রাজস্বের হারএই ব্যবস্থায় কোম্পানি রাজস্ব-এর পরিমাণ ও হার বেঁধে দিয়েছিল।ভূমিরাজস্বের পরিমাণ ছিল 45-55 শতাংশ।উৎপন্ন ফসলের 9/10 অংশ রায়তকে দিতে হত।
5. রাজস্ব আদায়ইংরেজ কোম্পানি জমিদারদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করত।চাষিদের কাছ থেকে কোম্পানি সরাসরি রাজস্ব আদায় করত।কোম্পানি মহল পিছু রাজস্ব আদায় করত।
6. ফলাফলএই ব্যবস্থায় জমিতে চাষিদের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে জমিদাররা যখন-তখন তাদের জমি থেকে উৎখাত করত।মাত্রাতিরিক্ত রাজস্ব চাষিদের ক্ষতি করে।জমিতে কৃষকের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় চাষিদের বিড়ম্বনার শেষ ছিল না।

উপরোক্ত তিনটি ভূমি বন্দোবস্ত দ্বারা চাষিরা খুব লাভবান হয়েছিল তা নয়। তবে ভালো-মন্দের বিচারে আমার মনে হয় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ছিল কম ক্ষতিকারক।

কারণ —

  • জমিতে জমিদারদের চিরকালীন স্বত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ায়, তারা জমির উন্নতিতে যত্নবান হয়।
  • তার সঙ্গে এলাকার উন্নতির দিকেও নজর দেওয়া হয়। একই সঙ্গে রাস্তা-ঘাট, বিদ্যালয়, চিকিৎসাকেন্দ্র, জলাশয় ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করে জনগণের মঙ্গল সাধনে সচেষ্ট হয়।

11. অবশিল্পায়ন বলতে কী বোঝো? অবশিল্পায়নের কারণগুলি আলোচনা করো।

ইংরেজ কোম্পানি তথা ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে নানা কারণে ভারতীয় শিল্পের অবনমন ঘটে। শিল্পের এই অবনমনকেই সাধারণভাবে বলা হয় অবশিল্পায়ন।

অবশিল্পায়নের কারণ –

  • সরকারি অবহেলা – ইংরেজ কোম্পানি ভারতীয় শিল্পের উন্নতির ব্যাপারে বরাবর উদাসীন ছিল। এদেশের শিল্পের উন্নতির জন্য তারা যথেষ্ট অর্থ বিনিয়োগ করেনি। আসলে তারা চেয়েছিল ঔপনিবেশিক অর্থনীতি প্রয়োগ করে ইংল্যান্ডের শিল্প ও অর্থনীতির স্বার্থ বজায় রাখতে।
  • শিল্প বিপ্লব – শিল্প বিপ্লবের ফলে ইংল্যান্ডে বিভিন্ন শিল্পের প্রভূত উন্নতি হয়। ইংল্যান্ডের শিল্পে উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী ভারতীয় বাজারে বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। কারণ বিলেতি পণ্য ছিল দেখতে ভালো, দামে কম এবং টেকসই। তাই বিলেতি পণ্যের সঙ্গে দেশীয় পণ্যসামগ্রী প্রতিযোগিতায় দাঁড়াতে পারেনি। এর ফলে ধীরে ধীরে ভারতীয় কুটিরশিল্পগুলি ধ্বংসের সম্মুখীন হয়।
  • রক্ষণশীল শিল্পনীতি – ইউরোপ তথা ইংল্যান্ডের বাজারে ভারতীয় বস্ত্রের জোগান বন্ধ করার জন্য ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় পণ্যের আমদানির ওপর যেমন চড়া শুল্ক আরোপ করে, তেমনই দমনমূলক নীতি গ্রহণ করে। প্রয়োজনে জেল-জরিমানাও করা হত।
  • অসম শুল্কনীতি – অন্যদিকে বিভিন্ন বিলেতি পণ্য থেকে শুরু করে বস্ত্রসামগ্রী ভারতীয় বাজারে বিনা শুল্কে বিক্রি হতে থাকে। ফলে শুল্ক দিয়ে ভারতীয় বণিকগণ কোম্পানির বণিকদের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেনি। তারা রণে ভঙ্গ দেয়।
  • একচেটিয়া বাণিজ্য – 1717 খ্রিস্টাব্দের ফারুকশিয়ারের ফরমান ও 1765 খ্রিস্টাব্দের দেওয়ানি লাভের পর থেকে বাংলায় ইংরেজ কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যের পথ সুগম হয়। এই প্রতিযোগিতায় দেশীয় পণ্য তথা দেশীয় বণিকরা পাল্লা দিতে পারেনি। ফলে বাংলায় শিল্প ও বাণিজ্য পতনের সম্মুখীন হয়।

12. আঠারো শতকে ভারতের দেশীয় শিল্পের ধ্বংসের কারণ কী?

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের পর থেকে ভারতের কুটির শিল্পগুলি বিশেষ করে বস্ত্রশিল্পের উল্লেখযোগ্যভাবে অবনতি ঘটে। এর কারণ ছিল ব্রিটিশ রাজশক্তির ঔপনিবেশিক বাণিজ্যনীতি ও রক্ষণশীল শিল্পনীতি।

দেশীয় শিল্প ধ্বংসের কারণ –

রক্ষণশীল শিল্পনীতি – ইউরোপ তথা ইংল্যান্ডের বাজারে ভারতীয় বস্ত্রের জোগান বন্ধ করার জন্য ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় পণ্যের ওপর যেমন চড়া শুল্ক আরোপ করেছিল, তেমনই দমনমূলক নীতি গ্রহণ করেছিল। প্রয়োজনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও আরোপিত হত।

অসম শুল্কনীতি – অন্যদিকে বিভিন্ন বিলেতি পণ্য থেকে শুরু করে বস্ত্রসামগ্রী ভারতীয় বাজারে বিনা শুল্কে বিক্রি হতে থাকে। ফলে শুল্ক দিয়ে ভারতীয় বণিকগণ কোম্পানির বণিকদের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে রণে ভঙ্গ দেয়।

দাদন প্রথা – উইলিয়ম বোল্টস-এর রচনা থেকে জানা যায় যে, কোম্পানির দালাল ও গোমস্তারা তাঁতিদের জোর করে দাদন দিত এবং তাদের কাছ থেকে কাপড় কম দামে (20-40 শতাংশ কম দাম দিয়ে) ক্রয় করত। এই কারিগরেরা অন্য কাউকে তাদের কাপড় বিক্রি করতে পারত না। বরং লোকসান করেও কাপড় কোম্পানির বণিকদের হাতে তুলে দিতে হত।

দস্তুরি প্রথা – কোম্পানির দালাল, গোমস্তা থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মচারী সকলেই দস্তুরি নামক এক ধরনের উৎকোচ তাঁতিদের কাছ থেকে আদায় করত। ফলে তাঁতিদের আর্থিক অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে। তারা কখনোই লাভের মুখ দেখতে পেত না।

তুলোর মূল্যবৃদ্ধি – কোম্পানি কাঁচা তুলো নিয়ন্ত্রণ তথা ব্যবসা নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ফলে, তাঁতিদের অবস্থা আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। কারণ তাঁত শিল্পীদের মণ প্রতি 14-15 টাকা বেশি দিয়ে কোম্পানির কাছ থেকে এই তুলো কিনতে হত।

বাংলার দুর্ভিক্ষ – ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ (1176 বঙ্গাব্দ) বাংলার কুটির শিল্পে দারুণ আঘাত হানে। তাঁত শিল্পীদের প্রায় অর্ধেক সংখ্যক এই দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে মারা যায়।

13. সম্পদ নির্গমন – টীকা লেখো ।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে ভারতের অর্থ ও সম্পদ জলের মতো ইংল্যান্ডে পাচার হয়ে যেত। দেশের সম্পদ এভাবে বিদেশে চলে যাওয়াকে সম্পদ নির্গমন বলা হয়। সম্পদ নির্গমন তত্ত্বের জনক দাদাভাই নওরোজি ও ড. রমেশচন্দ্র দত্ত।

সম্পদ নির্গমন বা সম্পদ নিষ্কাশন –

নির্গমন পদ্ধতি – ভারতের অর্থ ও সম্পদ মূলত দু-ভাবে ইংল্যান্ডে প্রেরণ করা হত, যথা—ব্যক্তিগতভাবে ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে।

অর্থনৈতিক শোষণ –

  1. দেওয়ানি লাভের পর কোম্পানি সুবা-বাংলায় রাজস্বের পরিমাণ দ্বিগুণ বৃদ্ধি করে।
  2. কোম্পানি একচেটিয়া বাণিজ্য ও কোম্পানির কর্মচারীরা ব্যক্তিগত বাণিজ্য করে ফুলে ফেঁপে ওঠে।
  3. এইসময় কোম্পানির বণিকরা দস্তকের অপব্যবহার করে বিপুল অর্থের মালিক হয়ে ওঠে।
  4. জানা যায় যে, দেওয়ানি লাভের পর কেবল পূর্ণিয়া থেকেই সংগৃহীত হয় আনুমানিক 25 লক্ষ টাকা। যা ছিল পূর্বের চেয়ে 6 গুণ বেশি।

অর্থ নির্গমন – মাছের তেলে মাছ ভাজার মতো বাংলার টাকায় ব্যবসা করে যাবতীয় মুনাফা বিলেতে পাচার করাই ছিল কোম্পানির কাজ। কোম্পানির বণিক ও কর্মচারীরাও এ ব্যাপারে পিছিয়ে ছিল না। বাংলার অর্থ পাচার হত স্টক অব এক্সচেঞ্জ ও হুন্ডির মাধ্যমে। 1768 খ্রিস্টাব্দে বাংলা থেকে 5.7 মিলিয়ন পাউন্ড, 1783-93 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে প্রায় 17.8 মিলিয়ন পাউন্ড অর্থ ইংল্যান্ডে চালান দেওয়া হয়।

ফলাফল –

এই সম্পদ নিষ্কাশনের ফল হয়েছিল মারাত্মক। যেমন—

  • অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার অভাবে ভারতের চিরাচরিত কুটিরশিল্প ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।
  • ফলে বেকারত্ব ও দারিদ্র্য বৃদ্ধি পায়।
  • কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যের কাছে দেশীয় বণিকরা পরাজিত হয়।
  • ভারত একটি রপ্তানিকৃত উপনিবেশে পরিণত হয়।
  • শিল্প বাণিজ্যের অবক্ষয় শুরু হলে মানুষ কৃষিতে ভিড় জমায়। ফলস্বরূপ ভারতের কৃষি অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়।
  • অন্যদিকে ভারতের টাকায় ব্রিটেন একটি শিল্পোন্নত ও সম্পদশালী দেশে পরিণত হয়।

14. সম্পদের নির্গমন বা বহির্গমন বলতে কী বোঝো? ভারতের অর্থনীতিতে এর কী প্রভাব পড়েছিল?

পলাশির যুদ্ধের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতীয় উপনিবেশের সম্পদকে নানাভাবে ইংল্যান্ডে রপ্তানি করত, কিন্তু এর প্রতিদানে ভারতের কোনো অর্থনৈতিক লাভ হতো না। উপরন্তু অসম বাণিজ্য ও শিল্পের শুল্ক নীতির ফলে ভারতীয় শিল্প ও কারিগরি ব্যবস্থা ধ্বংসের সম্মুখীন হয়। ভারত থেকে সম্পদ বিদেশে রপ্তানি করা হলেও তার ফলে ভারতের কোনো অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটেনি। এইভাবে দেশীয় সম্পদ বিদেশে চলে যাওয়াকেই ‘সম্পদের বহির্গমন’ বলা হয়েছে। ভারতীয় কুটিরশিল্পের ধ্বংসসাধন করে ব্রিটেনের শিল্পের উন্নতি এবং ভারতীয় সম্পদকে ব্রিটেনের প্রয়োজনে ব্যবহার করাই ছিল তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। আর তার জন্য প্রয়োজন ছিল ভারতের সম্পদ ও অর্থকে ইংল্যান্ডে প্রেরণ করা। ভারতীয় সম্পদ নির্গমনের ফলে ভারতীয় শিল্প-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভারতে বেকার শ্রমিকের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং ভারতীয় কুটির শিল্পগুলি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

  • শিল্প বাণিজ্যের প্রসার হ্রাস – কোম্পানির রপ্তানি বাণিজ্য প্রচুর পরিমাণে বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারতীয় বণিকদের গুরুত্ব হ্রাস পায়। যারা প্রাথমিক উৎপাদক তারা কোম্পানির কর্মচারীদের দ্বারা শোষিত হয়। ফলস্বরূপ ভারতের চিরাচরিত শিল্পগুলির ধ্বংস সাধিত হয়।
  • আর্থিক শ্রীহীনতা – বিপুল অঙ্কের সম্পদ নিষ্ক্রমণের ফলে ভারতবর্ষ একটি শ্রীহীন, ইংল্যান্ডের কাঁচামাল সরবরাহকারী দেশে পরিণত হয়। R. C. Majumdar-এর ভাষায়— “It has reduced India to a land of famines.”

মূল্যায়ন – দাদাভাই নওরোজি, রমেশচন্দ্র দত্ত প্রমুখ জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকদের মতে, ভারতের দারিদ্র্যের মূল কারণ হলো ভারতীয় সম্পদের নির্গমন। অপরপক্ষে, ইংরেজ ঐতিহাসিক স্যার জন স্ট্রাচি, স্যার থিওডোর মরিসন, পি. জে. মার্শাল নির্গমন তত্ত্ব মানতে রাজি নন। বলা বাহুল্য, নির্গমন তত্ত্ব একটি বাস্তব ঘটনা। রমেশচন্দ্র দত্ত বলেন যে, পৃথিবীর কোনো দেশে সম্পদ নির্গমনের এত ন্যক্কারজনক উদাহরণ আর দেখা যায় না।

15. অবশিল্পায়ন কী? ভারতের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে অবশিল্পায়নের কী প্রভাব পড়েছিল?

শিল্পায়নের অধোগতিকে বলা হয় অবশিল্পায়ন। ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসনের সর্বাপেক্ষা কুফল হলো ভারতের ঐতিহ্যমণ্ডিত কুটিরশিল্পের ধ্বংসসাধন। এই ঘটনাকে অবশিল্পায়ন বা বি-শিল্পায়ন বলা হয়। দাদাভাই নওরোজি ও রমেশচন্দ্র দত্ত অবশিল্পায়ন বিষয়ে দেশবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। বস্ত্রশিল্পের ধ্বংস ভারতের, বিশেষত বাংলার আর্থ-সামাজিক জীবনে এক গভীর পরিবর্তন এনেছিল। রমেশচন্দ্র দত্ত সুতিশিল্পের ধ্বংসকে ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা বলে অভিহিত করেছেন। বস্ত্রশিল্পের ধ্বংস ভারতবাসীর জীবনে গভীর সংকট সৃষ্টি করেছিল।

  • কৃষিতে চাপ বৃদ্ধি – ইংল্যান্ড তার নিজের স্বার্থে ভারতীয় বস্ত্রশিল্পকে ধ্বংস করার নীতি নিলে কৃষির ওপর অত্যধিক পরিমাণে চাপ সৃষ্টি হয়। বিপিনচন্দ্রের মতে, কৃষির ওপর চাপ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে গ্রামীণ অর্থনীতির চেহারা রক্তশূন্য হয়ে পড়ে।
  • বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাব – ভারতে বস্ত্রশিল্পের ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে বিকল্প কোনো শিল্প গড়ে না ওঠার ফলে এই শিল্পের সঙ্গে সংযুক্ত বহু মানুষ বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবে জীবিকাচ্যুত হয়।
  • শহরের অবনতি – বস্ত্রশিল্পের পতনের ফলে ভারতীয় শিল্পকেন্দ্রিক শহরগুলি শ্রীহীন হয়ে পড়ে।
  • অভ্যন্তরীণ বাজারে সংকট – দেশি কাপড়ের ওপর অভ্যন্তরীণ শুল্ক বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে এর দাম বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে বিলিতি বস্ত্রের ওপর শুল্ক হ্রাস পাওয়ায় ইংল্যান্ডে তৈরি সস্তা মিলের বস্ত্র ভারতের বাজার ছেয়ে ফেলে।
  • কাঁচামালের রপ্তানিকারক দেশ – ভারতীয় শিল্প ধ্বংসের ফলে ভারত ক্রমশ ইংল্যান্ডের একটি কাঁচামাল রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়। কাঁচামালের উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধি পায়।

16. কৃষির বাণিজ্যিকীকরণের ফল কী হয়েছিল? এই প্রেক্ষিতে নীলবিদ্রোহ কতটা প্রাসঙ্গিক ছিল?

কৃষির বাণিজ্যিকীকরণের ফল – কৃষির বাণিজ্যিকীকরণের ফলে ভারতীয় কৃষকসমাজ নানা গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। এ সময় কৃষিব্যবস্থার আধুনিকীকরণ করা হয়েছিল। এজন্য মূলধন জোগাড় করা ও বাজারের চাহিদা অনুযায়ী কৃষিজ ফসল উৎপাদনের বিষয়গুলি জড়িত ছিল। কিন্তু এইসব ব্যাপারে কৃষকরা কোনো বিশেষ উদ্যোগ নিতে পারত না। ফলে লাভের অঙ্ক থেকেও কৃষকরা বঞ্চিত হতো। আর লাভের টাকা পেত যারা, তারাই মূলধন বিনিয়োগ করত।

নীলবিদ্রোহ – পূর্ব ভারতে নীলচাষকে কেন্দ্র করে ‘নীলবিদ্রোহ’ হয়েছিল। নীলচাষের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ কোম্পানি প্রত্যক্ষ উদ্যোগ নিয়েছিল। কোম্পানির নীলকর সাহেবেরা অগ্রিম টাকা দিয়ে চাষিদের নীলচাষ করতে বাধ্য করাত। 1829 খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত জমি কেনার ব্যাপারে নীলকরদের অবশ্য কোনো অধিকার ছিল না। ফলে নীলকররা প্রথমে স্থানীয় কৃষকদের নীলচাষের জন্য রাজি করাতেন। অবশ্য তাতে কাজ না হলে জোর করে অগ্রিম টাকা বা দাদন দিয়ে চাষিদের নীলচাষ করতে বাধ্য করানো হতো। এরই ফলে নীলচাষিদের সঙ্গে কৃষকদের সংঘর্ষের পথ তৈরি হয়।

আসলে ভারতে নীলচাষের বিষয়টি পুরোটাই ছিল ইংল্যান্ডের কাপড়কলে নীলের চাহিদা কতটা তার ওপর ভিত্তি করে। তা ছাড়া নীলচাষিদের নীলচাষে বাধ্য করার ব্যাপারে জুলুম শুরু হয়। এর ফলে 1859-60 খ্রিস্টাব্দে বাংলায় নীলবিদ্রোহ শুরু হয়। দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ নাটকে এই বিদ্রোহের কাহিনি লিপিবদ্ধ আছে। নীল বিদ্রোহ সংঘটিত হওয়ার পর ইংল্যান্ডে রাসায়নিক পদ্ধতিতে নীল তৈরি শুরু হয়। ফলে প্রাকৃতিক নীলের চাহিদা কমে যায়।

17. ব্রিটিশ শিল্প-বাণিজ্য শুল্কনীতির ফলে বস্ত্র-শিল্পের কী পরিবর্তন এসেছিল বলে তুমি মনে করো?

1757 খ্রিস্টাব্দে পলাশির যুদ্ধের সময় পর্যন্ত ব্রিটিশ ‘ইস্ট ইন্ডিয়া’ কোম্পানি ছিল মূলত একটি বাণিজ্যিক সংস্থা। এসময় কোম্পানি ভারতে দামি ধাতু ও নানারকম জিনিসপত্র আমদানি করত। আর রপ্তানি করত মশলাপাতি ও কাপড়।

  • ব্রিটেনের প্রতিক্রিয়া – ব্রিটেনের বস্ত্র উৎপাদকেরা ব্রিটেনে ভারতীয় বস্ত্র বিক্রি করা বন্ধ করার জন্য সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে থাকে। এর ফলে 1720 খ্রিস্টাব্দে আইন করে সেই বন্দোবস্ত করা হয়। পাশাপাশি অন্যান্য কাপড় আমদানির ওপরও চড়া হারে শুল্ক চাপানো হয়েছিল। তথাপি ভারতীয় বস্ত্রের চাহিদা কমানো যায়নি।
  • পলাশির যুদ্ধের পর কোম্পানির নীতি – পলাশির যুদ্ধের পর কোম্পানি বাংলার রাজস্বের অর্থে ভারতীয় দ্রব্য রপ্তানি করত। তা ছাড়া তারা নতুন শুল্কনীতিও প্রণয়ন করে। বাংলার তাঁতিরা ব্রিটিশ প্রশাসন নির্ধারিত কম দামে বস্ত্র বিক্রি করতে বাধ্য হয়। ফলস্বরূপ কম লাভের ফলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
  • তাঁতশিল্পের অবনতি – চড়া দামে কাঁচামাল কেনা ও সস্তা দামে তৈরি দ্রব্য বিক্রিতে বাধ্য হওয়ার ফলে বাংলার তাঁতিদের অবস্থা খারাপ হয় এবং তাঁতশিল্প বিনষ্ট হতে থাকে। 1813 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, ভারতীয় বস্ত্রশিল্প বিদেশের বাজারে তার গুরুত্ব হারায়। অন্যদিকে ভারতেও তাদের বিদেশি পণ্যের সঙ্গে পাল্লা দিতে হয়েছিল। এর ফলে ভারতীয় বস্ত্রশিল্প ও কুটিরশিল্প চূড়ান্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে ভারতের বাজারে কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

18. সংক্ষেপে দাক্ষিণাত্য হাঙ্গামার কারণগুলি উল্লেখ করো।

1857 খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত সিপাহি বিদ্রোহের পর ভারতে যতগুলি কৃষক বিদ্রোহ হয়েছে তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল 1875 খ্রিস্টাব্দের দাক্ষিণাত্য হাঙ্গামা।

দাক্ষিণাত্য হাঙ্গামার কারণ –

  • মহাজনী শোষণ – মহারাষ্ট্রের পুনা ও আহমেদনগর জেলায় ব্যাপকভাবে তুলোর চাষ হতো। এই তুলোচাষিরা ছিল কুনবী সম্প্রদায়ভুক্ত। এই সম্প্রদায়ের মানুষদের দারিদ্র্য ও অশিক্ষার সুযোগ নিয়ে বহিরাগত মহাজনরা তাদের শোষণ করত।
  • খাজনা বৃদ্ধি – ওই এলাকায় সরকার যেমন মাত্রাতিরিক্ত খাজনা বৃদ্ধি করেছিল, তেমনি গ্রামের মোড়ল ও সরকারি কর্মচারীরা অশিক্ষিত ও অসহায় চাষিদের কাছ থেকে বলপূর্বক অতিরিক্ত খাজনা আদায় করত।
  • প্রাকৃতিক দুর্যোগ – 1866-67 খ্রিস্টাব্দ নাগাদ দাক্ষিণাত্যে অনাবৃষ্টি হয়, ফলে অজন্মা দেখা দেয়। পরের বছরও অনুরূপ অবস্থা হয়। আবার 1871 খ্রিস্টাব্দের দুর্ভিক্ষের সময়ও সরকার চাষিদের ওপর প্রায় দেড়-গুণ কর বৃদ্ধি করে। মাত্রাতিরিক্ত করের বোঝা চাষিদের বিদ্রোহের পথে ঠেলে দেয়।
  • তুলোর মূল্য হ্রাস – 1865 খ্রিস্টাব্দের পর আমেরিকায় গৃহযুদ্ধ সমাপ্ত হলে সেখানে তুলোর উৎপাদন শুরু হয় এবং সেখানকার তুলো ইংল্যান্ডে রপ্তানি হতে শুরু হয়। ফলে ভারত থেকে ইউরোপে তুলো রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। ফলস্বরূপ তুলোর দাম অস্বাভাবিক হারে কমে যায়, যার প্রভাব পড়ে ভারতীয় অর্থনীতির ওপর।
  • প্রত্যক্ষ কারণ – এরূপ পরিস্থিতিতে 1874 খ্রিস্টাব্দে কার্দে গ্রামের এক মহাজন এক চাষির জমি কেড়ে নিয়ে নিলামে বিক্রি করে দেওয়ার ফলে চাষিদের ক্ষোভের আগুনে ঘৃতাহুতি পড়ে। তারা ওই মহাজনের বাড়ি আক্রমণ করে লুঠতরাজ করে। এই ঘটনারই সূত্র ধরে শুরু হয় ‘দাক্ষিণাত্য হাঙ্গামা’।

19. ভারতে ব্রিটিশ সরকারের রেলপথ স্থাপনের উদ্দেশ্য কী ছিল?

কোম্পানি শাসনাধীন ভারতের ইতিহাসে 1853 খ্রিস্টাব্দে রেলপথ স্থাপন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কারণ রেলপথ স্থাপনের মধ্য দিয়ে ভারতের আর্থসামাজিক জীবনে পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করে। ভারতে রেলপথ স্থাপনের মূল স্থপতি ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

ভারতবর্ষে রেলপথ স্থাপনের উদ্দেশ্য –

  • সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ – এদেশে রেলপথ স্থাপনের উদ্দেশ্যগুলি ছিল —
    • ভারতের দূরবর্তী স্থানে যে-কোনো ধরনের আন্দোলন বিক্ষোভ দমন করার জন্য দ্রুত সৈন্য পাঠানো।
    • ভারতে ব্রিটিশ পুঁজির পরিমাণ বৃদ্ধি করা।
    • বন্দর অঞ্চলগুলির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা ইত্যাদি।
  • প্রশাসনিক উদ্দেশ্য – প্রশাসনিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে সরকার রেলপথ স্থাপনে আগ্রহী ছিল। যেমন— i. দেশের কোথাও রাজনৈতিক গোলযোগ দেখা দিলে তার খবরাখবর দ্রুত আদানপ্রদান করা। ii. এ ছাড়া ওই সমস্ত রাজনৈতিক সমস্যা মোকাবিলা করার জন্য দ্রুত সেনাবাহিনী প্রেরণ করা ইত্যাদি।
  • অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য –
    • 1. ইংল্যান্ডের শিল্পজাত পণ্যসামগ্রী বিক্রির ভালো বাজার ছিল ভারত। তাই বিলেতি পণ্য এদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম-গঞ্জে পাঠানোর জন্য এবং এদেশের কাঁচামাল ইংল্যান্ডের শিল্পে পাঠানোর জন্য সরকার ভারতে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চেয়েছিল।
    • 2. এ ছাড়া ব্রিটেনের শিল্পপতিরা ভারতের শিল্পে অর্থ বিনিয়োগ করতে বিশেষ উৎসাহী ছিল যা রেলপথ স্থাপনে সহায়ক হয়ে উঠেছিল।
  • মহাবিদ্রোহ – 1857 খ্রিস্টাব্দে মহাবিদ্রোহ সংঘটিত হলে ব্রিটিশ সরকার নড়েচড়ে বসে। তারা এদেশে আরও রেলপথ স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে। ফলস্বরূপ মহাবিদ্রোহের পর ভারতে রেলপথ স্থাপনের হিড়িক পড়ে যায়।

20. ভারতীয় অর্থনীতিতে রেলপথের প্রভাবগুলি আলোচনা করো।

পটভূমি – ভারতে রেলপথ প্রবর্তন এক বৈপ্লবিক ঘটনা। রেলপথ ভারতবাসীর আর্থসামাজিক জীবনযাত্রাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। ড. বিপানচন্দ্রের ভাষায়— “রেলপথ স্থাপন ভারতের জনজীবন, সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক প্রভাব ফেলেছিল।”

ভারতীয় অর্থনীতিতে রেলপথ প্রবর্তনের সুফল –

  • যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি – রেলপথ স্থাপনের ফলে ভারতীয় জনজীবনে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার সূত্রপাত ঘটে। এর ফলে অতি দ্রুত নিরাপদে পণ্য পরিবহন ও যাত্রীদের যাতায়াত সম্ভব হয়।
  • দ্রুত শিল্পের বিকাশ – কার্ল মার্কস লিখেছেন যে “ভারতে রেলপথ প্রতিষ্ঠা আধুনিক শিল্পের অগ্রদূত। এদেশে নতুন নতুন শহর গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ও দ্রুত শিল্পায়নে রেলের ভূমিকা অকল্পনীয়।”
  • ব্যবস্যাবাণিজ্যের প্রসার – রেলপথ স্থাপনের ফলে সুলভ ও সহজে পণ্য পরিবহন সম্ভব হওয়ায় ব্যবসাবাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রচুর সুবিধা হয়। ফলে ব্যবসাবাণিজ্যের প্রসার ঘটে।
  • বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রসার – অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের সঙ্গে সঙ্গে বৈদেশিক বাণিজ্যেরও প্রসার ঘটে। রেলপথের মাধ্যমে বিভিন্ন দ্রব্য আমদানি রপ্তানি করা সহজসাধ্য হয়।
  • কৃষির উন্নতি – যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হয়। বাজারের চাহিদা অনুযায়ী ফসল উৎপাদন, জমির মূল্যবৃদ্ধি ইত্যাদির দ্বারা রেলপথ দেশের কৃষিব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে।
  • আন্তর্জাতিক বাজার – রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় পণ্যের চাহিদা সহজে মেটানো সম্ভব হয়েছিল। কৃষি উৎপাদক অঞ্চলের উন্নত ও প্রচুর কৃষিপণ্য রেলের মাধ্যমে সহজেই বন্দরগুলিতে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল, যা বাণিজ্য বিপ্লবের সহায়ক হয়ে ওঠে।
  • দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ – রেলব্যবস্থার মাধ্যমে দুর্ভিক্ষ কবলিত এবং প্রাকৃতিক বিপর্যস্ত স্থানে দ্রুত ত্রাণসামগ্রী প্রেরণ সম্ভব হয়।
  • জাতীয়তাবোধের বিকাশ – রেলপথ প্রসারের ফলে ভারতবাসীর মনে জাতীয় ঐক্যের পথ সুগম হয়েছিল। বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের মধ্যে জাতীয়তাবোধের স্পৃহা সঞ্চারিত হয়।

ক্ষতিকারক দিক/কুফল –

  • সম্পদের বহির্গমন – দাদাভাই নওরোজি, রমেশচন্দ্র দত্ত প্রমুখের মতে রেলব্যবস্থা ভারতীয় সম্পদের নিষ্ক্রমণের সুযোগ করে দেয়।
  • অন্যান্য পরিবহন ব্যবস্থার ক্ষতি – রেলপথ চালু হওয়ায় ভারতের চিরাচরিত জল পরিবহন ও সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
  • ভারতীয় কুটিরশিল্পের ক্ষতি – রেলব্যবস্থার প্রসারের ফলে ভারত ইংল্যান্ডের কারখানাগুলির কাঁচামাল সরবরাহকারী দেশে পরিণত হয়। বিদেশি পণ্যের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় ভারতীয় কুটিরশিল্প ধ্বংসের সম্মুখীন হয়।
  • ভারতীয়দের করের বোঝা – ইংল্যান্ডের বণিকরা গ্যারান্টি প্রথার মাধ্যমে ইংরেজ সরকারকে বিপুল পরিমাণ অর্থ রেললাইন পাতার খরচের জন্য প্রদান করে। সেই অর্থের সুদ কর হিসেবে ভারতীয়দেরই বহন করতে হত।
  • গ্রামগুলির শ্রীহীনতা – গ্রামাঞ্চলে নাগরিক সভ্যতার সূত্রপাত হওয়ায় গ্রামগুলি হতশ্রী হয়ে পড়ে।
  • বিদ্রোহ দমন – রেলপথ চালু হওয়ার ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংগঠিত বিদ্রোহগুলি দমন করা সহজসাধ্য হয়। দ্রুততার সঙ্গে ব্রিটিশরা সেখানে সৈন্যবাহিনী এবং যুদ্ধের উপকরণ প্রেরণ করতে সক্ষম হয়।

21. ভারতে কোম্পানি শাসন বিস্তারের প্রেক্ষিতে রেলপথ ও টেলিফোন ব্যবস্থার বিকাশের তুলনামূলক আলোচনা করো।

ভারতে কোম্পানি শাসন বিস্তারের প্রেক্ষিতে রেলপথ ও টেলিগ্রাফ ব্যবহার বিকাশের তুলনামূলক আলোচনা

বিষয়রেলপথটেলিগ্রাফ ব্যবস্থা
1. সময়1853 খ্রিস্টাব্দে ভারতে প্রথম রেলপথ প্রতিষ্ঠা করেন বড়লাট লর্ড ডালহৌসি।ভারতে প্রথম টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে 1851 খ্রিস্টাব্দে। সেসময় ভারতের বড়োলাট ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।
2. সরকারের উদ্দেশ্যভারতে রেলপথ বিস্তারের উদ্দেশ্য ছিল— যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করা (1) যাতে বিলেতি পণ্য সহজে ও কম খরচে বন্দর থেকে বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দেওয়া যায়।ভারতে টেলিগ্রাফ বিকাশের উদ্দেশ্য ছিল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি করা। যাতে খবরাখবর দ্রুত প্রদান করা যায়।
3. বিকাশের পর্যায়1858-1905 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারতে 36 হাজার মাইল রেলপথ গড়ে ওঠে।1856 খ্রিস্টাব্দের শেষ দিকে ভারতে মোট 46টি টেলিগ্রাফ কেন্দ্র ছিল, আওতায় ছিল 4250 মাইলের বেশি অঞ্চল।
4. কর্মসংস্থানরেলপথ বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন কাজে ভারতীয়দের প্রচুর কর্মসংস্থান হয়। স্বাধীনতার প্রাক্কালে 10,47,000 জন রেলকর্মীর নিয়োগের কথা জানা যায়।এদেশে টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা চালু হলে এই ক্ষেত্রে বহু মানুষের কর্মসংস্থান হয়। 1856 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে টেলিগ্রাফ যোগাযোগ বেড়ে দাঁড়ায় 17500 মাইল এবং উনিশ শতকের শেষে তা হয় 52900 মাইল।
5. ফলাফলরেলপথ সম্প্রসারণের ফলে ভারতে পরিবহণ ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটে। এদেশে বিদেশি পুঁজির বিনিয়োগ শুরু হয়। এর ফলে এদেশে ইংরেজ কোম্পানির প্রশাসনিক ভিত্তি মজবুত হয়।এর ফলে ভারতে যোগাযোগ ব্যবস্থায় উন্নতি হয়। এই যোগাযোগ ব্যবস্থাকে হাতিয়ার করে ইংরেজ কোম্পানি এদেশে তাদের প্রশাসনিক ভিত্তি আরও মজবুত করে।
6. প্রত্যক্ষ ফল1857 খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত সিপাহি বিদ্রোহ দমনে ইংরেজ কোম্পানি রেলপথ যোগাযোগ দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছিল।সিপাহি বিদ্রোহ মোকাবিলায় এই ব্যবস্থাকে ইংরেজ প্রশাসন দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছিল। জানা যায়, কলকাতায় বসে লর্ড ডালহৌসি টেলিগ্রাফের মাধ্যমে ইঙ্গ-বর্মা যুদ্ধে বর্মার রাজধানী রেঙ্গুনের পতনের খবর পেয়েছিলেন।

1. ভারতের গ্রামীণ সমাজের ওপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিভিন্ন ভূমিরাজস্ব নীতির প্রভাব বিষয়ে তুমি সংবাদপত্রের জন্য একটি প্রতিবেদন তৈরি করো।

উত্তর –

কলকাতা, 18 জানুয়ারি, 2015 – ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে তাদের ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ভূমিরাজস্ব বিষয়ে কতকগুলি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। গ্রামীণ সমাজের ওপর তার প্রভাব হয়েছিল মারাত্মক। এই প্রভাবকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে আমি প্রতিবেদন উপস্থিত করছি।

  • রাজস্বের হার বৃদ্ধি – কোম্পানি বিভিন্ন সময়ে রাজস্বের হার অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি করে। এর ফলে কৃষক শোষণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
  • ভূমিহীন কৃষক ও ক্ষেতমজুরের সংখ্যা বৃদ্ধি – কোম্পানি প্রবর্তিত ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থার ফলে জমিতে কৃষকের অধিকার স্বীকার করা হয়নি। অনেক সময় দেনার কবলে পড়ে কৃষক তার জমি মহাজনের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়। ফলে ভূমিহীন কৃষক এবং ক্ষেতমজুরের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
  • জমিদারদের সঙ্গে কৃষকের সম্পর্কের অবনতি – কোম্পানি সৃষ্ট ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থার আগে পর্যন্ত জমিদার ও কৃষকের মধ্যে সম্পর্ক ভালো ছিল। কিন্তু পুরোনো জমিদারের পরিবর্তে নতুন জমিদার জমির অধিকার পায়। এর ফলে কৃষকদের স্বার্থ ও গ্রামীণ জীবন অবহেলিত হতে থাকে।
  • কোম্পানি সৃষ্ট ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থার ফলে এক ধরনের নতুন মধ্যস্বত্বভোগীর সৃষ্টি হয়, যারা জমিদার ও কৃষকের মাঝখানে থেকে যাবতীয় সুযোগসুবিধা পেতে থাকে। এর ফলে কোম্পানি, জমিদার ও কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে।
  • নতুন ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থার ফলস্বরূপ মহাজনদের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। তারা কৃষকদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাদের ঋণ দিতে থাকে, যা পরিশোধ করা কৃষকদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। এই অবস্থায় কৃষকের সামাজিক ও আর্থিক অবস্থা বিপর্যস্ত হয়। এর ফলে ভারতীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে যায়।

2. মনে করো তুমি 1856 খ্রিস্টাব্দে একটি আদিবাসী সাঁওতালদের গ্রামের প্রধান। তোমাদের গ্রামের ওপর দিয়ে রেললাইন পাতা হবে। তোমরা ব্রিটিশ সরকারের এই সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে পারছ না। কোন্ কোন্ যুক্তিতে তুমি গ্রামের মানুষকে পক্ষে এবং বিপক্ষে বোঝানোর চেষ্টা করবে?

উত্তর –

একদিন আমি গ্রামের সকল মানুষকে সভায় আসার জন্য আমন্ত্রণ জানালাম। শুনেছি আমাদের গ্রামের ওপর দিয়ে রেললাইন যাবে অর্থাৎ রেললাইন পাতা হবে। বিভিন্ন স্থান থেকে যে সমস্ত খবরাখবর পেয়েছি সে সম্পর্কে একটি ধারণা আমি গ্রামবাসীদের শোনাই।

পক্ষে যুক্তি – গ্রামের সকল মানুষের কাছে আমি বললাম, ‘আপনারা জানেন, গ্রামে রেললাইন পাতা হবে। আমাদের গ্রামের ওপর দিয়ে ট্রেন যাবে। আপনারা এ ব্যাপারে বিরোধিতা করেছেন। আমি আপনাদের সঙ্গে একমত, কারণ রেলপথ প্রতিষ্ঠার পিছনে ব্রিটিশদের স্বার্থ বেশি কাজ করছে। তারা ঔপনিবেশিক স্বার্থের কারণে রেলপথ নির্মাণ করছে। যেমন— ভারত থেকে খাদ্যশস্য রপ্তানি করা, অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের বিকাশ, শিল্পের বিকাশ, কর্মসংস্থান এবং সাংস্কৃতিক সমন্বয়। প্রধানত দুটি কারণে আমরা এই প্রকল্পকে সমর্থন করতে পারি। কর্মসংস্থানের ফলে আমাদের গ্রামের লোকেরা রেললাইন বসানোর কাজে নিযুক্ত হবে। এতে আমাদের কিছু রোজগার হবে। পাশাপাশি অন্য অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে আমাদের সাংস্কৃতিক সমন্বয় ঘটবে।

বিপক্ষে যুক্তি – রেলপথ নির্মাণের ফলে আমাদের ক্ষতি হবে অনেক বেশি। এর কারণ —

  • আমাদের দেশের সম্পদ বাইরে চলে যাবে।
  • জিনিসপত্রের দাম বাড়বে,
  • রেলপথ নির্মাণের ফলে অর্থের যে অপচয় ঘটবে তার বোঝা আমাদের মাথায় চাপবে,
  • আমাদের মতো গ্রামগুলিতে চাষবাসের জন্য জলসেচ ব্যবস্থা করার প্রয়োজন। কিন্তু তা না করে রেলপথ নির্মাণ করলে আমাদের কোনো লাভ হবে না।
  • আমাদের জমিতে কৃষিজ ফসলের পরিবর্তে নীল চাষ করা হবে, যা জমির উর্বরতা শক্তি কমিয়ে দেবে। এই নীল বিদেশে বিক্রি করে প্রচুর লাভ করবে ইংরেজরা। আমরা না খেতে পেয়ে মরে যাব।
  • আমরা যারা তাঁত বুনে জীবিকা নির্বাহ করি, রেলপথ নির্মাণের ফলে বিদেশি পোশাকে বাজার ছেয়ে যাবে। আমাদের তৈরি পোশাক কেউ কিনবে না, ফলে আমরা বেকার হয়ে যাব।

সুতরাং, আমরা আজ থেকে সমবেতভাবে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছি।


আজকে আমাদের এই আর্টিকেলে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের চতুর্থ অধ্যায়, “ঔপনিবেশিক অর্থনীতির চরিত্র”-এর কিছু “ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর” নিয়ে আলোচনা করেছি। এই ধরনের প্রশ্নগুলো স্কুলের পরীক্ষা বা বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় প্রায়ই আসে।

আশা করি এই আর্টিকেলটি তোমাদের/আপনাদের জন্য উপকারী হয়েছে। যদি কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তাহলে নির্দ্বিধায় টেলিগ্রামে আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। আপনাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। এছাড়া, এই পোস্টটি সেইসব বন্ধু বা প্রিয়জনদের সাথে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

Please Share This Article

Related Posts

ভারতীয় সংবিধান-গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার-অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস-বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর

ভারতীয় সংবিধান-গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার-অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস-ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর

ভারতীয় সংবিধান-গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার-অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস-সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর

About The Author

Rahul

Tags

Leave a Comment

SolutionWbbse

"SolutionWbbse" শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন অধ্যয়ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গাইডলাইন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সাহায্য প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষণীয় উপকরণ সহজেই সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

Editor Picks

বিভিন্ন রকমের বায়ুদূষকগুলি সম্পর্কে লেখো | মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান (Class 10 Life Science)

নাইট্রিফিকেশন এবং ডিনাইট্রিফিকেশন কাকে বলে? এদের পার্থক্য লেখো

নাইট্রিফিকেশন ও অ্যামোনিফিকেশন কাকে বলে? এদের পার্থক্য লেখো | মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান

জৈব ভূ-রাসায়নিক চক্র কাকে বলে? জৈব ভূ-রাসায়নিক চক্রের কটি দশা ও কী কী?

ডিনাইট্রিফিকেশন বলতে কী বোঝো ও এর তাৎপর্য – মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান