অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া: সহযোগিতা ও বিদ্রোহ – বিষয়সংক্ষেপ

Rahul

আজকের আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস বইয়ের পঞ্চম অধ্যায়, ‘ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া: সহযোগিতা ও বিদ্রোহ’-এর ‘বিষয়সংক্ষেপ’ নিয়ে আলোচনা করব। এই অংশটি পড়ার ফলে অধ্যায়টির মূল কাঠামো ও প্রধান বিষয়াবলি বুঝতে সুবিধা হবে, যা তোমাদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আশা করি, এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা তোমাদের প্রস্তুতিকে আরও মজবুত করতে সাহায্য করবে।

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া: সহযোগিতা ও বিদ্রোহ – বিষয়সংক্ষেপ

পরাধীন ভারতের সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায় ছিল উনিশ শতক। এই শতকের প্রথম দিকে ইংরেজ কোম্পানি ভারতীয়দের মধ্যে শিক্ষার প্রসার ঘটাতে এক ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে। 1835 খ্রিস্টাব্দে ঘোষিত হয় ‘মেকলে মিনিট’ বা ‘মেকলে প্রস্তাব’। এই প্রস্তাবের মধ্য দিয়েই এদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষার দরজা খুলে যায়। ফলে পাশ্চাত্য শিক্ষার হাত ধরে ভারতীয়দের মধ্যে জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য ও দর্শন, সর্বোপরি মানবতাবাদ, যুক্তিবাদ, জাতীয়তাবোধ ইত্যাদির অনুপ্রবেশ ঘটে।

ফলস্বরূপ একদল মানবতাবাদী মানুষ ভারতীয় সমাজে প্রচলিত ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সামাজিক কুসংস্কারগুলি দূর করতে এগিয়ে আসেন। তাঁদের একক উদ্যোগেই গোটা উনিশ শতক ধরে শুরু হয় ধর্ম ও সমাজ সংস্কার আন্দোলন। এই প্রসঙ্গে প্রাতঃস্মরণীয় কয়েকজন হলেন—রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ডিরোজিয়ো, স্যার সৈয়দ আহমেদ, স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী, রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, স্বামী বিবেকানন্দ প্রমুখ।

রাজা রামমোহন রায়ের উদ্যোগে ও ব্রিটিশ সরকারের প্রচেষ্টায় 1829 খ্রিস্টাব্দে পাস হয় ‘সতীদাহ প্রথা বিরোধী আইন’। 1856 খ্রিস্টাব্দে বিদ্যাসাগরের প্রচেষ্টায় ব্রিটিশ সরকার ‘বিধবা বিবাহ আইন’ পাস করে, যার দ্বারা এদেশে বিধবা পুনর্বিবাহ স্বীকৃতি পায়। ডিরোজিয়ো হিন্দু ধর্মের কুসংস্কারগুলি দূর করার জন্য সরব হন। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ‘নব্যবঙ্গ আন্দোলন’। ভারতের অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে নিরলস প্রয়াস করেন ভারতের একাধিক মানবতাবাদী মনীষী। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন—হাজি মহম্মদ মহসিন, মহাদেব গোবিন্দ রানাডে, জ্যোতিবা ফুলে প্রমুখ।

ভারতে হিন্দু ধর্মের পুনরুজ্জীবনের জন্য এগিয়ে আসেন স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী। তিনি বেদচর্চার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বেদের সত্যতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য ‘শুদ্ধি’ আন্দোলনের প্রবর্তন করেন এবং ‘আর্য সমাজ’ প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলায় এই সংস্কার কার্যে ব্রতী হন রাজনারায়ণ বসু ও নবগোপাল মিত্র। তাঁরা হিন্দু ধর্মের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিষ্ঠা করেন ‘হিন্দু মেলা’।

অন্যদিকে রামকৃষ্ণদেব ছিলেন সমন্বয়বাদী ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের পথিকৃৎ। তিনি ছিলেন এক মহান মানবতাবাদী ধর্মসংস্কারক। তিনি প্রচার করেন, ‘যত মত তত পথ’। এই আদর্শ মাথায় নিয়ে পথ চলা শুরু করেছিলেন তাঁরই শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ।

শুধু হিন্দুই নয়, সংস্কার আন্দোলনে পিছিয়ে ছিল না মুসলমানরাও। এ প্রসঙ্গে স্মরণীয় স্যার সৈয়দ আহমেদের নাম। মুসলমান সমাজের মধ্যে আধুনিক শিক্ষার প্রসার ও সামাজিক কুসংস্কারগুলি দূর করে সর্বোপরি সার্বিক উন্নতির জন্য তিনি এগিয়ে আসেন। তাঁর নেতৃত্বেই গড়ে ওঠে ‘আলিগড় আন্দোলন’।

ভারতে ব্রিটিশ শাসনের প্রথম শতক ছিল কৃষক থেকে শুরু করে নানা স্তরের মানুষের ক্ষোভ-বিক্ষোভ, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ তথা বিদ্রোহের যুগ। ইংরেজ কোম্পানির শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে এই সময় ভারতের নানা স্থানে ছোটবড়ো অনেক আদিবাসী ও কৃষক বিদ্রোহ দেখা দেয়; যেমন—কোল বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ, পাহাড়ি বিদ্রোহ, ওয়াহাবি আন্দোলন, ফরাজি আন্দোলন এবং সর্বশেষে সিপাহি বিদ্রোহ।

1857 খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত সিপাহি বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ ভারতে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহের প্রত্যক্ষ কারণ ছিল এনফিল্ড রাইফেল ও তার কার্তুজের ঘটনা। এই কার্তুজ দাঁতে কেটে রাইফেলে ভরতে হতো। গুজব রটে যে, এই কার্তুজের খোলসে গোরু ও শুয়োরের চর্বি মেশানো আছে। ফলে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের সিপাহিরা ধর্মনাশের ভয়ে এই কার্তুজ ব্যবহারে অসম্মতি জানায় এবং বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ব্যারাকপুর সেনা ছাউনিতে সিপাহি মঙ্গল পান্ডে প্রথম বিদ্রোহের সূচনা করেন। এই ঘটনার পর খুব দ্রুত ভারতের অন্যান্য সেনা ছাউনিতে সিপাহি বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। যদিও ব্রিটিশ সরকার কঠোর হাতে এই বিদ্রোহ দমন করে, তবু ভারতীয় রাজনীতিতে এর গুরুত্ব কম ছিল না।

1857 খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের ফলস্বরূপ ভারতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট 1858 খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে ভারতের শাসন ক্ষমতা নিজেদের হাতে নেওয়ার জন্য আইন পাস করে। ব্রিটেনের মহারানি ভারতের সাম্রাজ্ঞী বলে ঘোষিত হন।

1858 খ্রিস্টাব্দের 1 নভেম্বর মহারানি ভিক্টোরিয়া ‘ভারতশাসন আইন’ জারি করে ভারতের শাসন ক্ষমতা নিজের হাতে নেন। গভর্নর জেনারেলের জায়গায় ‘ভাইসরয়’ পদ তৈরি হয় এবং ব্রিটিশ মন্ত্রীসভার এক সদস্য ‘ভারত-সচিব’ নিযুক্ত হন।


আজকের আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস বইয়ের পঞ্চম অধ্যায়, “ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া: সহযোগিতা ও বিদ্রোহ”-এর “বিষয়সংক্ষেপ” নিয়ে আলোচনা করেছি। এই আলোচনাটি অধ্যায়টির মূল কাঠামো ও প্রধান বিষয়গুলো সহজে বুঝতে সাহায্য করবে, যা তোমাদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আশা করি, এই আর্টিকেলটি তোমাদের পরীক্ষার প্রস্তুতিতে কিছুটা হলেও সহায়ক হয়েছে। যদি কোনো প্রশ্ন থাকে, মতামত জানাতে চাও বা আরও সহায়তার প্রয়োজন হয়, তাহলে নিচে কমেন্ট করে জানাতে পারো কিংবা আমাদের টেলিগ্রামে যোগাযোগ করতে পারো—তোমাদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে আমরা সর্বদা প্রস্তুত।

Please Share This Article

Related Posts

ভারতীয় সংবিধান-গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার-অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস-বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর

ভারতীয় সংবিধান-গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার-অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস-ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর

ভারতীয় সংবিধান-গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার-অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস-সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর

অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস – ভারতীয় সংবিধান: গণতন্ত্রের কাঠামো ও জনগণের অধিকার – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর

About The Author

Rahul

Tags

Leave a Comment

SolutionWbbse

"SolutionWbbse" শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনলাইন অধ্যয়ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গাইডলাইন, এবং বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সাহায্য প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সকল বিষয়ের শিক্ষণীয় উপকরণ সহজেই সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

Editor Picks

বিভিন্ন রকমের বায়ুদূষকগুলি সম্পর্কে লেখো | মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান (Class 10 Life Science)

নাইট্রিফিকেশন এবং ডিনাইট্রিফিকেশন কাকে বলে? এদের পার্থক্য লেখো

নাইট্রিফিকেশন ও অ্যামোনিফিকেশন কাকে বলে? এদের পার্থক্য লেখো | মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান

জৈব ভূ-রাসায়নিক চক্র কাকে বলে? জৈব ভূ-রাসায়নিক চক্রের কটি দশা ও কী কী?

ডিনাইট্রিফিকেশন বলতে কী বোঝো ও এর তাৎপর্য – মাধ্যমিক জীবনবিজ্ঞান