মাধ্যমিক ভূগোল – ভারতের প্রকৃতিক পরিবেশ – ভারতের জলসম্পদ – সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক উত্তরধর্মী প্রশ্নাবলি

আজকের আর্টিকেলে আমরা ভারতের প্রাকৃতিক পরিবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, ভারতের জলসম্পদ নিয়ে রচনাধর্মী প্রশ্নগুলি আলোচনা করবো। এই প্রশ্নগুলি দশম শ্রেণীর পরীক্ষার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এগুলি মাধ্যমিক ভূগোলের পঞ্চম অধ্যায় “ভারতের জলসম্পদ” থেকে প্রশ্নগুলির উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে।

Table of Contents

মাধ্যমিক ভূগোল – ভারতের প্রকৃতিক পরিবেশ – ভারতের জলসম্পদ – সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক উত্তরধর্মী প্রশ্নাবলি

ব্রহ্মপুত্র নদ বন্যাপ্রবণ কেন?

অথবা, অসমে প্রতি বছর বন্যা হয় কেন?

অসমের প্রধান নদ ব্রহ্মপুত্র। প্রায় প্রতি বছরই বর্ষাকালে এই ব্রহ্মপুত্র নদে প্রবল জলোচ্ছ্বাস হয়, ফলে অসমের বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যার কবলে পড়ে। কারণ –

  • ভূমির ঢাল কম – ব্রহ্মপুত্র নদ অসমের যে অংশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে, সেখানে ভূমির ঢাল খুবই কম। এজন্য ব্রহ্মপুত্র নদের গতি অত্যন্ত ধীর এবং পলির বহনক্ষমতাও সামান্য। তাই ব্রহ্মপুত্র এবং তার উপনদীগুলি তাদের ঊর্ধ্বপ্রবাহ অঞ্চল থেকে যে পরিমাণ পলি বহন করে আনে তার বেশিরভাগই এখানকার নদীখাতে জমা হয়। এইভাবে বহুবছর ধরে পলি সঞ্চিত হওয়ার ফলে ব্রহ্মপুত্র নদের গভীরতা বর্তমানে যথেষ্ট হ্রাস পেয়েছে।
  • প্রচুর বৃষ্টিপাত – গ্রীষ্ম-বর্ষাকালে সাংপো নদ যখন তিব্বতের ঊর্ধ্বপ্রবাহ অঞ্চল থেকে প্রচুর পরিমাণে বরফগলা জল বহন করে আনে, সেই সময় অসমেও প্রবল বর্ষণ হয়। অগভীর ব্রহ্মপুত্রের খাতে যখন ওই বরফগলা জল ও বৃষ্টির জল এসে পড়ে, তখন তা বহন করার ক্ষমতা ব্রহ্মপুত্রের আর থাকে না। ফলে দু-কূল ছাপিয়ে বন্যা হয়।

আদর্শ নদী কাকে বলে? গঙ্গাকে আদর্শ নদী বলে কেন?

আদর্শ নদী – যে নদীর গতিপথে ক্ষয়কার্য-প্রধান পার্বত্যপ্রবাহ বা উচ্চগতি, বহনকার্য-প্রধান সমভূমিপ্রবাহ বা মধ্যগতি এবং সঞ্চয়কার্য-প্রধান বদ্বীপপ্রবাহ বা নিম্নগতি সুস্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়, তাকে আদর্শ নদী বলে।

গঙ্গাকে আদর্শ নদী বলার কারণ – গঙ্গোত্রী হিমবাহের গোমুখ তুষারগুহা থেকে গঙ্গানদীর উৎপত্তি। এই উৎসস্থল থেকে হরিদ্বার পর্যন্ত গঙ্গানদীর পার্বত্যপ্রবাহ বা উচ্চগতি, হরিদ্বার থেকে রাজমহল পর্যন্ত সমভূমিপ্রবাহ বা মধ্যগতি এবং রাজমহল থেকে বঙ্গোপসাগরের উপকূল অর্থাৎ মোহানা পর্যন্ত বদ্বীপপ্রবাহ বা নিম্নগতি লক্ষ করা যায়। যেহেতু গঙ্গানদীর গতিপথে তিনটি গতিই সুস্পষ্ট, তাই গঙ্গাকে আদর্শ নদী বলে।

দক্ষিণ ভারতে পশ্চিমবাহিনী নদী-মোহানায় বদ্বীপ নেই কেন?

অথবা, আরব সাগরে পতিত নদীগুলির মোহানায় বদ্বীপ নেই কেন?

অথবা, নর্মদা ও তাপ্তী নদীর মোহানায় বদ্বীপ গঠিত হয়নি কেন?

ভারতের পশ্চিমবাহিনী নদীগুলির মোহানায় বদ্বীপ গড়ে ওঠেনি কেন?

দক্ষিণ ভারতের অধিকাংশ পূর্ববাহিনী বা বঙ্গোপসাগরে পতিত নদীগুলির মোহানায় বদ্বীপ থাকলেও পশ্চিমবাহিনী বা আরব সাগরে পতিত নদীগুলির মোহানায় প্রায় কোনো বদ্বীপ নেই (ব্যতিক্রম হিসেবে নেত্রাবতী নদীর বদ্বীপ, ম্যাঙ্গালোরে দেখা যায়)। কারণ –

  • নদীগুলি স্বপ্ন দৈর্ঘ্যের – অধিকাংশ নদী স্বল্প দৈর্ঘ্যের বলে নদীর জলে পলি কম থাকে।
  • খরস্রোত – নর্মদা ও তাপ্তী অপেক্ষাকৃত বড়ো নদী। কিন্তু এই নদী দুটির মোহানাতেও বদ্বীপ নেই। কারণ, নর্মদা ও তাপ্তী নদী গ্রস্ত উপত্যকার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় মোহানার কাছেও নদী দুটি বেশ খরস্রোতা। ফলে নদীর মোহানায় পলি সঞ্চিত হয়ে বদ্বীপ গঠনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয় না।
  • ক্ষয়কার্য কম – এই নদী দুটি কঠিন আগ্নেয় ও রূপান্তরিত শিলা গঠিত অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় ক্ষয়কার্য কম হয়। ফলে নদীবাহিত বোঝার পরিমাণও যথেষ্ট কম।
  • পলির পরিমাণ কম – নর্মদা ও তাপ্তী নদীর উপনদীর সংখ্যা কম হওয়ার জন্যও নদীবাহিত পলির পরিমাণ কম।
  • মোহানায় সমুদ্রের ঢাল বেশি – কাম্বে উপসাগরের যে অংশে নদী দুটি এসে মিশেছে সেখানে সমুদ্রের তলার ঢাল খুব বেশি, ফলে পলি সঞ্চিত হয় না। এসব কারণে নর্মদা ও তাপ্তী নদীর মোহানায় বদ্বীপ গঠিত হয়নি।

ভারতের নদনদীগুলির জল দূষিত হওয়ার কারণ কী? গঙ্গার দূষণ রোধের জন্য কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?

নদীর জলদূষণের কারণ –

  • কলকারখানা, শহর-নগরের বিপুল আবর্জনারাশি প্রতিনিয়তই নদীতে এসে পড়ে।
  • কোথাও কোথাও নদীতে মৃত প্রাণীর দেহ ফেলা হয়।
  • কৃষিক্ষেত্রের বিষাক্ত কীটনাশক, রাসায়নিক সার প্রভৃতি ধুয়ে এসে নদীর জলে মেশে।
  • গৃহপালিত পশুদের নদীর জলে স্নান করানোর ফলে নদীর জল দূষিত হচ্ছে।
  • সর্বোপরি, পরিবেশদূষণ তথা জলদূষণ সম্পর্কে জনসচেতনতার অভাব নদনদীর জলকে নিরন্তর দূষিত করে চলেছে।

গঙ্গার দূষণ রোধে গৃহীত ব্যবস্থা – গঙ্গার জলদূষণ প্রতিকারের জন্য 1985 সালে সরকারি উদ্যোগে সেন্ট্রাল গঙ্গা অথরিটি নামে একটি সংস্থা গঠন করা হয়েছে। ওই সংস্থার তত্ত্বাবধানে গঙ্গার গতিপথের বিভিন্ন জায়গায় গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যান রূপায়িত হচ্ছে। পরিকল্পনাটির সম্পূর্ণ রূপায়ণ সম্ভব হলে গঙ্গার দূষণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত হবে বলে আশা করা যায়।

দক্ষিণ ভারতের অধিকাংশ নদী পূর্ববাহিনী হলেও নর্মদা ও তাপি বা তাপ্তী নদী পশ্চিমবাহিনী কেন?

ভূমির চাল অনুসারে নদী প্রবাহিত হয়। যেহেতু দাক্ষিণাত্য মালভূমি পশ্চিম থেকে পূর্বে চালু তাই সেখান থেকে উৎপন্ন মহানদী, গোদাবরী, কৃয়া, কাবেরী প্রভৃতি দক্ষিণ ভারতের নদীগুলি পূর্ববাহিনী। কিন্তু পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত সাতপুরা পর্বতের দুই পাশে (উত্তরে ও দক্ষিণে) চ্যুতির ফলে দুটি গ্রস্ত উপত্যকার সৃষ্টি হয়েছে। ওই গ্রন্ত উপত্যকার ঢাল পশ্চিমদিকে। তাই নর্মদা ও তাপ্তী নদী ওই দুই চ্যুতির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার জন্য দাক্ষিণাত্য মালভূমির সাধারণ ঢালের বিপরীতমুখী হয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত হয়েছে।

ভারতের একটি গ্রস্ত উপত্যকা মধ্যবর্তী প্রবাহিত নদীর নাম লেখো। এই নদীর গতিপথ বর্ণনা করো।

গ্রস্ত উপত্যকা দিয়ে প্রবাহিত নদী – ভারতের নর্মদা নদী উত্তরে বিন্ধ্য পর্বত ও দক্ষিণে সাতপুরা পর্বতের মধ্যবর্তী একটি গ্রন্ত উপত্যকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

এই নদীর গতিপথ – মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের 1057 মিটার উঁচু অমরকন্টক মালভূমি থেকে উৎপন্ন হয়ে নর্মদা নদী পশ্চিমে ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও গুজরাত রাজ্যের মধ্য দিয়ে 1300 কিমি পথ অতিক্রম করে খাম্বাত উপসাগরে পড়েছে। নর্মদা নদীর প্রথম 300 কিমি গতিপথে কপিলধারা ও ধুঁয়াধার নামে দুটি বিখ্যাত জলপ্রপাত দেখা যায়। গুজরাতের ভারুচ জেলায় এসে নর্মদা নদী সমতল অঞ্চলে প্রবেশ করেছে। এরপর খাম্বাত উপসাগরে মেশার আগে প্রায় 20 কিমি চওড়া একটি প্রশস্ত খাড়ি নর্মদা নদীতে গঠিত হয়েছে।

ব্রহ্মপুত্রের গতিপথে নদীটির বিভিন্ন নাম কী কী?

তিব্বতের রাক্ষসতাল-মানস সরোবরের কাছে চেমায়ুং দুং হিমবাহ থেকে উৎপত্তির পর পূর্বদিকে নামচাবারওয়া পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্রের নাম

  • সাংপো – ওখান থেকে অরুণাচলপ্রদেশের ওপর দিয়ে অসমের সদিয়া পর্যন্ত দক্ষিপমুখী প্রবাহপথের নাম
  • ডিহং – এখানেই ডিবং ও লোহিত নদী ডিহং-এর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এরপর সদিয়া থেকে (অসমের) ধুবড়ি পর্যন্ত এই তিনটি নদীর মিলিত পশ্চিমমুখী প্রবাহের নাম ও
  • ব্রহ্মপুত্র – এরপর বাংলাদেশের আরিচা পর্যন্ত (ওখানেই ব্রহ্মপুত্র নদ গঙ্গায় মিশেছে) এই নদীর দক্ষিণমুখী প্রবাহপথের নাম
  • যমুনা – ওখান থেকে গঙ্গা-যমুনার (ব্রহ্মপুত্র) মিলিত জলধারা পদ্মা নামে আরও কিছুটা দক্ষিণ-পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়ে শেষে মেঘনার সঙ্গে মিলিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে।

অববাহিকার আয়তন অনুসারে ভারতের নদনদীর শ্রেণিবিভাগ করো।

অববাহিকার আয়তন অনুসারে ভারতের নদনদীকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায় –

  • প্রধান নদনদী – গঙ্গা, সিন্ধু, ব্রহ্মপুত্র, নর্মদা, তাপি, মহানদী, গোদাবরী, সবরমতী, কৃয়া, মাহী, ব্রাহ্মণী, সুবর্ণরেখা, পেনার ও কাবেরী – এই 14 টি নদীর প্রত্যেকটির অববাহিকার আয়তন 20000 বর্গ-কিলোমিটারেরও বেশি। অববাহিকার আয়তন খুব বড়ো বলে এগুলিকে প্রধান নদনদী বলা হয়।
  • মাঝারি নদনদী – ভারতে প্রায় 45 টি নদী আছে যেগুলির প্রত্যেকটির অববাহিকার আয়তন 2000 থেকে 20000 বর্গকিলোমিটারের মধ্যে। অববাহিকার আয়তন মাঝারি বলে এগুলিকে মাঝারি নদনদী বলা যায়। দক্ষিণ ভারতের শরাবতী, ভাইগাই, পেরিয়ার, পালার, বৈতরণী প্রভৃতি এই ধরনের নদনদী।
  • ছোটো নদনদী – ভারতের প্রায় 55 টি নদীর প্রত্যেকটির অববাহিকার আয়তন 2000 বর্গকিলোমিটারেরও কম। অববাহিকার আয়তন কম বলে এদের ছোটো নদনদী বলা যায়। লুনি, বানস, রাচোল, দমন গঙ্গা প্রভৃতি এই ধরনের নদনদী।

ভারতকে ‘নদীমাতৃক দেশ’ বলা হয় কেন?

(i) ভারতের নদীগুলি বছরে গড়ে 186900 কোটি ঘনমিটার জল বহন করে (প্রধান নদীগুলি 85%, মাঝারি নদীগুলি 7% ও ছোটো নদীগুলি 4% এবং অন্যান্য জলধারা 4% জল বহন করে)। (ii) এই নদনদীগুলি সুদূর অতীত থেকে ভারতবাসীর জীবনধারার ওপর গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করে রয়েছে। হরপ্পা ও মহেন-জো-দারোর মতো প্রাচীন সভ্যতাসহ এলাহাবাদ, বারাণসীর মতো প্রাচীন ধর্মস্থান এবং আধুনিক ভারতের অধিকাংশ শহর, নগর, জনপদ গড়ে উঠেছে কোনো-না-কোনো নদীর তীরে। (iii) কৃষিকাজ দেশের বিস্তীর্ণ নদী উপত্যকাগুলিতে কেন্দ্রীভূত। (iv) গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগুলি, যেমন- কার্পাস বয়ন, চিনি, পাট প্রভৃতি পরোক্ষভাবে নদীর ওপর নির্ভরশীল। এ ছাড়া, দেশের জলসেচ-ব্যবস্থা, সামগ্রিক জলবিদ্যুৎ উৎপাদন, অভ্যন্তরীণ সুলভ জলপথে পরিবহণ ব্যবস্থা, পানীয় জলের জোগান প্রভৃতি ক্ষেত্রেও নদনদীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এজন্যই ভারতকে নদীমাতৃক দেশ বলে।

ভারতের বন্যাপ্রবণ অঞ্চলগুলির নাম করো।

ভারতের রাষ্ট্রীয় বাঢ় আয়োগ (Rashtriya Barh Ayog) – এর মতে, ভারতের সর্বাধিক বন্যাপ্রবণ রাজ্যগুলি হল –

  • উত্তরপ্রদেশ
  • বিহার
  • পাঞ্জাব
  • রাজস্থান
  • অসম
  • পশ্চিমবঙ্গ
  • হরিয়ানা
  • ওডিশা
  • গুজরাত
  • অন্ধ্রপ্রদেশ

ভারতের মোট বন্যাপ্রবণ অঞ্চলের 90 শতাংশের বেশি এই দশটি রাজ্যের অন্তর্গত। উত্তরপ্রদেশের গঙ্গা, যমুনা, ঘর্ঘরা, গণ্ডক অববাহিকা, বিহারের কোশি ও সোন অববাহিকা, পাঞ্জাবের পশ্চিমাংশ, হরিয়ানার দক্ষিণ-পূর্বাংশ, রাজস্থানের পূর্বাংশ, গুজরাতের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণদিক, অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওডিশার উপকূল অঞ্চল মূলত বন্যাপ্রবণ।

জলসম্পদের উৎস হিসেবে হ্রদ ও জলাশয়ের ভূমিকা লেখো।

ভারতে ভূপ্রাকৃতিক গঠনের বৈচিত্র্য এবং জলনির্গম ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী হ্রদ এবং জলাশয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে –

(i) হ্রদের জল পানীয় জলের প্রধান উৎস। (ii) হ্রদ এবং জলাশয় স্থানীয়ভাবে অতিরিক্ত জল ধরে রেখে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করে। (iii) ও এইসব জলাধারের জল শুষ্ক অঞ্চলে কৃষিতে সহায়তা করে। (iv) জলাশয়ে জল ধরে রাখলে ভৌমজলের ভান্ডার ভরে ওঠে। (v) জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের বৈচিত্র্য সৃষ্টিতে সাহায্য করে। (vi) হ্রদে প্রচুর পরিমাণে মাছ জন্মায়। হ্রদ ও জলাশয় থেকে মৎস্য আহরণ করে অনেকেই জীবিকানির্বাহ করে।

ভারতে জলসেচের গুরুত্বগুলি কী কী?

মূলত ভূপৃষ্ঠীয় জল এবং ভৌমজল থেকে ভারতের জলসেচ করা হয়।

জলসেচের গুরুত্ব –

  • জলসেচের জন্যই বছরের বেশিরভাগ সময়ে চাষ করা যায়।
  • জলসেচের কারণে উচ্চফলনশীল বীজের ব্যবহার বেড়েছে। তাই ফসল উৎপাদন বেড়েছে।
  • জলসেচের কারণেই বৃষ্টিহীন অঞ্চলেও এখন কৃষিকাজ সম্ভব হয়েছে।
  • জলসেচের জন্যই শীতকাল বা শুষ্ক ঋতুতেও বোরো ধানের মতো অতিরিক্ত জলের ফসল চাষ করা সম্ভব হয়।
  • ভারত মৌসুমি বৃষ্টির দেশ, তাই অনিশ্চিত জলবায়ুতে জলসেচ কৃষির সহায়ক।

তবে অধিক জলসেচ কয়েকটি সমস্যাও তৈরি করে –

  • বেশি জলসেচ মাটির লবণতা বাড়ায়।
  • বৃহত্তর অঞ্চলে জলসেচের মাধ্যমে কৃষিকাজ সম্ভব হয় না।

ভৌমজলের অতিরিক্ত ব্যবহার হলে পরিবেশে তার কী প্রভাব পড়ে?

ভারতের যেসব স্থানে এখনও খালের মাধ্যমে বা ভূপৃষ্ঠীয় জলের ব্যবহার সম্ভব হয়ে ওঠেনি, সেখানে কূপ, নলকূপের মাধ্যমে জলসেচ করা হয়। এতে পরিবেশে নানা প্রভাব পড়ে –

  • ভৌমজলতলের পতন – ভৌমজলের অতিরিক্ত ব্যবহারের জন্য ভৌমজলের ভান্ডার দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে কুয়োগুলি শুকিয়ে যাচ্ছে এবং নলকূল থেকে জল ওঠা কন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
  • আর্সেনিকের পরিমাণ বৃদ্ধি – আর্সেনিকপ্রবণ অঞ্চলে ভৌমজলের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে ভৌমজলে আর্সেনিকের সংক্রমণ বাড়তে থাকে। জলে অতিরিক্ত নাইট্রেট, ফ্লুরাইডজাতীয় যৌগের পরিমাণ বেড়ে যায়।
  • নোনাভাব বৃদ্ধি – ভৌমজল বেশি ব্যবহৃত হলে জলের লবণতা বেড়ে যায়। ওই জল জমির উর্বরতা শক্তি কমিয়ে দেয়।
  • ভূমির অবনমন – বেশি ভৌমজল ব্যবহার করলে ভূমির অবনমন ঘটতে পারে।

বহুমুখী নদী উপত্যকা পরিকল্পনা থেকে কী কী সুবিধা পাওয়া যায়?

বহুমুখী নদী উপত্যকা পরিকল্পনা থেকে নানা রকমের সুবিধা পাওয়া যায় –

  • বন্যার হাত থেকে কোনো অঞ্চলকে বাঁচানো বা বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা যায়
  • জলাধারের সঞ্চিত জলকে ব্যবহার করে সারাবছর খালের সাহায্যে জলসেচ করা যায়
  • জলাধারের জলকে ব্যবহার করে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়
  • জলাধারের জলকে পরিস্তুত করে পানীয় হিসেবে ব্যবহার করা যায়
  • নদীতে বাঁধ দিলে জলের গতিবেগ কমে যায় বলে ভূমিক্ষয় কম হয়
  • নদীর আড়াআড়ি বাঁধ নির্মাণ করা হয় বলে ওই বাঁধগুলি সেতুর কাজ করে
  • জলাশয়গুলিতে সারাবছর স্থায়ীভাবে জল থাকায় এখানে মাছচাষ করা যায়
  • ওইসব জলাধারের কাছাকাছি অঞ্চলে পর্যটনকেন্দ্রও গড়ে ওঠে।

কূপ ও নলকূপের মাধ্যমে জলসেচের সুবিধা এবং অসুবিধাগুলি লেখো।

সুবিধা –

  • কূপ ও নলকূপের মাধ্যমে খুব সহজেই জলসেচ করা যায়।
  • কূপ এবং নলকূপ কম ব্যয়বহুল ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হয় না। তাই সাধারণ কৃষকও এই পদ্ধতিতে জলসেচ করতে পারে।
  • ইচ্ছেমতো এবং প্রয়োজনমতো কৃষিজমির কাছেই কূপ বা নলকূপ খোঁড়া যায়।

অসুবিধা –

  • কূপ এবং নলকূপের সাহায্যে বেশি পরিমাণ জমিতে জলসেচ করা যায় না।
  • ভৌমজলের স্তর নেমে গেলে কূপ এবং নলকূপ অকেজো হয়ে যায়।
  • বেশি পরিমাণে ভৌমজল উত্তোলনের ফলে জলে আর্সেনিক, ফ্লুরাইড প্রভৃতি দূষণের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।

দক্ষিণ ভারতে জলাশয়ের মাধ্যমে জলসেচ বেশি হয় কেন?

দক্ষিণ ভারতের তামিলনাডু, কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ প্রভৃতি রাজ্যে প্রচুর পরিমাণে জলাশয় বা পুকুর রয়েছে। এর কারণ (i) এখানে শিলাস্তর খুব কঠিন বলে বৃষ্টির জল চুঁইয়ে মাটির খুব গভীরে পৌঁছাতে পারে না। তাই ভৌমজলের ভান্ডার খুব বেশি সমৃদ্ধ নয়। (ii) শিলা কঠিন এবং ভূপ্রকৃতি বন্ধুর বলে খাল খনন করা সম্ভব নয়। (iii) দক্ষিণ ভারতের এসব অঞ্চলগুলি বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলে বলে সারাবছর নদীগুলি জলপ্রবাহ বজায় রাখে না। কেবল বর্ষাকালে প্রচুর পুকুর খনন করে বৃষ্টির জল ধরে রেখে ওই জল কৃষিতে সেচকার্যে ব্যবহার করা হয়। এইসব কারণের জন্য দক্ষিণ ভারতে | জলাশয়ের মাধ্যমে জলসেচ বেশি হয়।

খালের মাধ্যমে জলসেচের সুবিধা এবং অসুবিধাগুলি কী কী?

সুবিধা –

  • খাল যদি নিত্যবহ হয় তবে সারাবছর ধরে জলসেচ করা যায়। অর্থাৎ সারাবছর কৃষিকাজ সম্ভব।
  • খাল তৈরিতে প্রাথমিক ব্যয় বেশি হলেও পরবর্তীকালে খালসেচের রক্ষণাবেক্ষণের খরচ অনেক কম।
  • নদীর পলি খালের মাধ্যমে আসে বলে কৃষিজমিতেও পলি সঞ্চয় ঘটে তাই কৃষিজমি উর্বর হয়ে ওঠে।

অসুবিধা –

  • কেবলমাত্র সমভূমি অঞ্চলেই জলসেচ করা সম্ভব।
  • এই পদ্ধতিতে অতিরিক্ত জলসেচ করা হয় বলে মাটি অনেকসময় লবণাক্ত হয়ে যায়।
  • খালের প্রবাহ বর্ষাকালে অনেকসময় বন্যা সৃষ্টি করে।

কয়েকটি বহুমুখী নদী উন্নয়ন পরিকল্পনার নাম করো।

ভারতের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বহুমুখী নদী উন্নয়ন পরিকল্পনা হল –

  • ভাকরা-নাঙ্গাল পরিকল্পনা – পাঞ্জাবে বিপাশা ও শতদ্রু নদীর ওপর নির্মিত হয়েছে ভাকরা-নাঙ্গাল পরিকল্পনা। এটি ভারতের বৃহত্তম নদী উপত্যকা পরিকল্পনা।
  • হিরাকুঁদ পরিকল্পনা – ওডিশা রাজ্যের মহানদীর ওপর জলসেচের উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছে হিরাকুঁদ বাঁধ।
  • ময়ূরাক্ষী প্রকল্প – ঝাড়খণ্ড এবং পশ্চিমবঙ্গের সীমাকে সামঞ্জস্য করে ময়ূরাক্ষী নদীর ওপর ম্যাসেঞ্জরে বাঁধ এবং সিউড়ির তিলপাড়ায় সেচবাঁধ তৈরি হয়েছে। এখানকার সেচবাঁধগুলির সাহায্যে বীরভূম, মুরশিদাবাদ, নদিয়া এবং বর্ধমান জেলায় জলসেচ করা হয়।
  • কোশী পরিকল্পনা – বিহারের কোশী নদীর ওপর কোশী নদী উপত্যকা পরিকল্পনা গঠিত হয়েছে।
  • গণ্ডক পরিকল্পনা – উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের যৌথ উদ্যোগে গণ্ডক নদীর ওপর গণ্ডক পরিকল্পনা গৃহীত হয়।
  • নাগার্জুন – তেলেঙ্গানায় কৃয়া নদীর ওপর নাগার্জুন সাগর পরিকল্পনা একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা।

জল সংরক্ষণ কী? জল সংরক্ষণের গুরুত্ব লেখো।

পৃথিবীতে স্বাদুজলের পরিমাণ সীমিত। এই জলকে সংরক্ষণ করে রাখার নামই জল সংরক্ষণ। এই জল সংরক্ষণ খুব গুরুত্বপূর্ণ।

গুরুত্ব –

  • পানীয় জল সংরক্ষণ – বর্তমানে পানযোগ্য স্বাদুজলের ব্যবহার আরও বেড়েছে। তাই জলের জোগান বজায় রাখা খুব জরুরি।
  • কৃষিকাজে জল সংরক্ষণ – কৃষিকাজে জলের চাহিদা পূরণের জন্য জল সংরক্ষণ অত্যন্ত দরকারি।
  • শিল্প ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক কাজে জল সংরক্ষণ – শিল্প ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক কাজে পর্যাপ্ত জলের জোগান বজায় রাখার জন্য জল সংরক্ষণ একান্ত প্রয়োজন।

এ ছাড়া, ভবিষ্যতে পর্যাপ্ত স্বাদু জলের জোগান নিশ্চিত করার জন্যও জল সংরক্ষণ করা দরকার।

বৃষ্টির জল সংরক্ষনের পদ্ধতিগুলি লেখো।

বৃষ্টিপাত হলে তার বেশিরভাগ অংশই মাটির ওপর দিয়ে গড়িয়ে নদী, খালের মাধ্যমে সমুদ্রে চলে যায়। এই জলকে কোনো কাজেই লাগানো যায় না। এই জলকে যদি আমরা কাজে লাগাতে পারি তবে মানুষের প্রয়োজনীয় জলের চাহিদা অনেকটাই মেটে। দুটি পদ্ধতিতে বৃষ্টির জল সংরক্ষণ করা যায় –

বৃষ্টির জল সংরক্ষণ

ভূপৃষ্ঠের জলপ্রবাহকে আটকে রেখে – প্রবহমান জলকে বাঁধ দিয়ে আটকে রেখে জলাধার নির্মাণ করে তাকে ব্যবহার করা যায়। ওই জলাধারের জল কৃষিতে, জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে, পানীয় জলের আধার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এতে জলের জোগান কিছুটা বাড়ে। একই সাথে ভৌমজলের স্তরও সমৃদ্ধ হয়।

বাড়ির ছাদে বৃষ্টির জল ধরে রেখে – বৃষ্টির জল বাড়ির ছাদে পড়লে তাকে সংগ্রহ করে মাটির নীচে জলাধারে জমা করা যায়। অনেকগুলো জলাধার নির্মাণ করলে ওই জলাধারের জল সারাবছরই ব্যবহার করা যেতে পারে। জলকে যেমন গৃহস্থের কাজে লাগানো যায় তেমনি পরিশোধন করে পানীয় হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে। এ ছাড়া অতিরিক্ত জলকে মাটির নীচে পাঠিয়ে দিয়ে ভৌমজলের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করা যায়।

বৃষ্টির জল সংরক্ষণের সুবিধা কী?

বৃষ্টির জল সংরক্ষণের অনেকগুলি সুবিধা রয়েছে – (i) বৃষ্টির জল পরিশ্রুত করে পানীয় জল হিসেবে গ্রহণ করা যায়। (ii) বৃষ্টির জল চুঁইয়ে চুঁইয়ে ভূ-অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। এতে ভৌমজলের সঞ্চয় বাড়ে। (iii) যেসব অঞ্চলে জল কম পাওয়া যায় সেখানে এই জল জলের সমস্যার সমাধান করে। তাই বৃষ্টির জল সংরক্ষণ করা একটি সামাজিক ভূমিকা পালন করে।

বৃষ্টির জল সংরক্ষণে তামিলনাডুর ভূমিকা কতখানি?

বৃষ্টির জল সংরক্ষণে তামিলনাড়ু রাজ্যের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তামিলনাডু এমন একটি রাজ্য যেখানে বৃষ্টির জল সংরক্ষণ একটি জরুরি এবং বাধ্যতামূলক বিষয়। 2001 সালে এই প্রকল্পটি গৃহীত হয় এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তামিলনাডুর প্রতিটি বাড়িতেই বৃষ্টির জল সংরক্ষণ করতে হবে। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার পর পরীক্ষা করে দেখা গেছে তামিলনাডুতে ভৌমজলের সঞ্চয় বেড়েছে। তামিলনাডু নগর আইন অনুযায়ী প্রতিটি নতুন বাড়িতে বৃষ্টির জল সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখতে হবে। সরকার বৃষ্টির জল সংরক্ষণে নানাবিধ ব্যবস্থা নিয়েছে। এর মধ্যে – (i) বিভিন্ন সরকারি এবং বেসরকারি সংগঠনের সাহায্যে জল সংরক্ষণের প্রচার চলছে। (ii) বৃষ্টির জল সংরক্ষণের জন্য নানা হোর্ডিং, ব্যানার, ফেস্টুনের সাহায্যে প্রচার চলছে। (iii) সরকারিভাবে বাড়ি বাড়ি ঘুরে প্রচার চালানো হচ্ছে। (iv) বৃষ্টির জল সংরক্ষণে সরকারি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। (v) এইরাজ্যে 1821টি জলাভূমি সংস্কার করে তাতে 6286.84 একর জলাভূমির সম্প্রসারণ ঘটানো হয়েছে।

বহুমুখী নদী উপত্যকা পরিকল্পনা বলতে কী বোঝ?

যে পরিকল্পনার মাধ্যমে উঁচু অঞ্চলে নদীর ওপর বাঁধ দিয়ে সমগ্র নদী উপত্যকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলসেচ, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন, জলপথে পরিবহণ, মাছ চাষ, পানীয় জল সরবরাহ প্রভৃতি বহুবিধ উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয় এবং নদী উপত্যকা অঞ্চলের সার্বিক কল্যাণ সাধিত হয়, তাকে বহুমুখী নদী উপত্যকা পরিকল্পনা বলে। যেমন – ভারতে দামোদর, শতদ্রু, মহানদী, কৃয়া, গোদাবরী প্রভৃতি নদীর ওপর বহুমুখী নদী উপত্যকা পরিকল্পনা রূপায়িত হয়েছে।

বহুমুখী নদী উপত্যকা পরিকল্পনার মাধ্যমে কী কী উদ্দেশ্য সাধিত হয়?

বহুমুখী নদী উপত্যকা পরিকল্পনার অধীনে নদীর ওপর বাঁধ দিয়ে জলাধার নির্মাণ করা হয় এবং এর ফলে বহুবিধ উদ্দেশ্য সাধিত হয়, যেমন – (i) জলাধার থেকে খাল কেটে সংলগ্ন অঞ্চলে সারাবছর জলসেচ করা হয়, (ii) বর্ষার অতিরিক্ত জল জলাধারে সঞ্চয় করে রাখা হয়, ফলে নদী উপত্যকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা যায়, (iii) জলাধার থেকে কৃত্রিম জলপ্রপাত সৃষ্টি করে তার সাহায্যে টারবাইন ঘুরিয়ে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়, (iv) নদীতে ও খালে সারাবছর জল থাকে বলে জলপথে পরিবহণ করা যায়, (v) জলাধারে মাছচাষ করা হয়, (vi) জলাধারের জল পরিস্তুত করে পানীয় জল সরবরাহ করা হয়, (vii) জলাধার-সংলগ্ন অঞ্চলে বৃক্ষরোপণ করা হয়, এর ফলে ভূমি সংরক্ষণ হয়, ও জলাশয়গুলি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হয় বলে পর্যটন কেন্দ্রও গড়ে ওঠে। এ ছাড়া, বাঁধগুলি নদীর ওপর সেতুর কাজ করে। ভারতের দামোদর, শতদ্রু, মহানদী, কৃয়া, গোদাবরী প্রভৃতি নদীতে বহুমুখী নদী উপত্যকা পরিকল্পনা রূপায়িত হয়েছে।

দামোদর উপত্যকা পরিকল্পনার উদ্দেশ্যগুলি লেখো।

দামোদর উপত্যকা পরিকল্পনার নানাবিধ উদ্দেশ্য রয়েছে – (i) খনিজ সম্পদে পরিপূর্ণ দামোদর উপত্যকায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে ধাতব শিল্পের উন্নতিসাধন করা, (ii) নিম্ন উপত্যকা অঞ্চলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা, (iii) জলাধারের জলসেচের কাজে ব্যবহার করে কৃষিব্যবস্থার উন্নতিসাধন করা ও পতিত জমির পুনরুদ্ধার, (iv) পরিবেশদূষণ রোধ ও মৃত্তিকা সংরক্ষণ করা, (v) জনস্বাস্থ্যের উন্নতি, (vi) পর্যটনকেন্দ্রের বিকাশ ঘটানো প্রভৃতি।

দামোদর উপত্যকা পরিকল্পনা থেকে কী কী সুবিধা পাওয়া যায় আলোচনা করো।

দামোদর উপত্যকা পরিকল্পনার মাধ্যমে বিভিন্ন সুবিধা পাওয়া যায় – (i) দামোদর পরিকল্পনায় বাঁধ এবং জলাধারগুলি নির্মাণের মাধ্যমে এই নদের উপত্যকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। (ii) শুষ্ক অঞ্চলে জলসেচের মাধ্যমে কৃষিকাজ করা সম্ভব হয়েছে। (iii) তিলাইয়া, পাঞ্চেত প্রভৃতি বাঁধ স্থাপন করে জলবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। (iv) এ ছাড়াও এই বহুমুখী নদী পরিকল্পনার সাহায্যে শিল্পাঞ্চলের বিকাশ ঘটেছে। যেমন-আসানসোল, চিত্তরঞ্জন প্রভৃতি শিল্পাঞ্চলের বিকাশ ত্বরান্বিত হয়েছে।

সেচবাঁধ ও বহুমুখী বাঁধের পার্থক্য লেখো।

সেচবাঁধ ও বহুমুখী বাঁধের মধ্যে পার্থক্যগুলি হল –

বিষয়সেচবাঁধবহুমুখী বাঁধ
উদ্দেশ্যসেচবাঁধ মূলত কৃষিজমিতে জলসেচের জন্যে নির্মাণ করা হয়।বহুমুখী বাঁধ কৃষিজমিতে জলসেচ ছাড়াও বিদ্যুৎ উৎপাদন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পণ্য পরিবহণ, মৎস্যচাষ প্রভৃতির জন্য নির্মাণ করা হয়।
জলধারণের স্থিতিকালসেচবাঁধে সাধারণত বর্ষাকালের উদ্বৃত্ত জল সেচের জন্যে ব্যবহার করা হয়। কৃষি মরশুমের পরে ওই জল না থাকলেও চলে।বহুমুখী বাঁধে সারাবছরই জল ধরে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। সারাবছরই ওই জল বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়।
নির্মাণের স্থানঢালু ভূমিতে সেচবাঁধ নির্মাণ করা হয়।পাহাড়ি অঞ্চলে বহুমুখী বাঁধ নির্মাণ করা হয়।
দৃঢ়তাবহুমুখী বাঁধের মতো সেচবাঁধ অত মজবুত ও দৃঢ় হয় না। অনেকক্ষেত্রে মাটির সেচবাঁধও আছে।বহুমুখী বাঁধ কংক্রীটের তৈরি অত্যন্ত মজবুত ও দৃঢ় হয়।
উচ্চতাবেশিরভাগ সেচবাঁধের উচ্চতা কম।বেশিরভাগ বহুমুখী বাঁধের উচ্চতা বেশি।
উদাহরণকংসাবতী, সুবর্ণরেখা প্রভৃতি নদীতে সেচবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।দামোদর, ময়ূরাক্ষী প্রভৃতি নদীতে বহুমুখী বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।

দক্ষিণ ভারতের তুলনায় উত্তর ভারতে নিত্যবহ খালের সংখ্যা অনেক বেশি কেন?

যেসব নদীতে সারাবছর জল থাকে, সেইসব নদী থেকে খনন-করা খালগুলিকে বলে নিত্যবহ খাল। দক্ষিণ ভারতের নদীগুলি বর্ষার জলে পুষ্ট বলে এগুলি গ্রীষ্মকালে প্রায় শুকিয়ে যায়। এজন্য এইসব নদী থেকে নিত্যবহ খাল খনন করা খুবই অসুবিধাজনক। এর ফলে দক্ষিণ ভারতে নিত্যবহ খালের সংখ্যাও খুব কম। কিন্তু উত্তর ভারতের নদীগুলি তুষারগলা জলে পুষ্ট বলে নদীগুলিতে সারাবছরই জল থাকে, অর্থাৎ এগুলি নিত্যবহ। তাই উত্তর ভারতেই নিত্যবহ খালের সংখ্যা অনেক বেশি। যেমন-উত্তর ভারতের পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ প্রভৃতি রাজ্যে অনেক নিত্যবহ খাল আছে।

কৃষিকাজের জন্য ভারতে জলসেচের প্রয়োজন হয় কেন?

জলসেচ হল এমন এক ব্যবস্থা যার মাধ্যমে, বৃষ্টিপাত অনিশ্চিত বা অনিয়মিত হলেও, কৃষিক্ষেত্রে সারাবছর নিয়মিতভাবে ও প্রয়োজনমতো জল সরবরাহ করে ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হয়। ভারতে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বৃষ্টিপাত হলেও জলাভাব ভারতীয় কৃষির একটি প্রধান সমস্যা। এর কারণ – (i) মৌসুমি বৃষ্টিপাত অত্যন্ত অনিয়মিত এবং অনিশ্চিত। তাই কখনও অনাবৃষ্টি, আবার কখনও অতিবৃষ্টি কৃষি উৎপাদনে সমস্যার সৃষ্টি করে। (ii) ভারতে মৌসুমি বৃষ্টিপাতের আঞ্চলিক বণ্টন সর্বত্র সমান নয়। যেমন-উত্তর-পূর্ব ভারতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেশি হলেও রাজস্থান, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, গুজরাত, দাক্ষিণাত্যের মধ্যভাগ প্রভৃতি এলাকায় অর্থাৎ দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ স্থানে স্বল্প-বৃষ্টিপাতজনিত কারণে কৃষিকাজ ভীষণভাবে ব্যাহত হয়। (iii) দেশের বেশির ভাগ জায়গায় শীতকালে বৃষ্টিপাত হয় না বলে গম, ডাল, তৈলবীজ প্রভৃতি রবিশস্য বা শীতকালীন ফসল চাষের জন্য জলসেচ অপরিহার্য। (iv) ভারতে অধিকাংশ বৃষ্টিপাত হয় বর্ষাকালের মাত্র চার মাসে (জুন-সেপ্টেম্বর)। সুতরাং, একই জমিতে বছরে দুই-তিন বার ফসল • উৎপাদনের জন্য অর্থাৎ বহুফসলি জমির পরিমাণ বাড়াতে জলসেচ ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। (v) লোহিত মৃত্তিকা এবং ল্যাটেরাইট মৃত্তিকার জলধারণক্ষমতা কম বলে জলসেচ ভিন্ন ওইসব মাটিতে ফসল উৎপাদনে উন্নতি সম্ভব নয়। উচ্চফলনশীল শস্য চাষের জন্য নিয়ন্ত্রিত ও পর্যাপ্ত জল সরবরাহের প্রয়োজন হয়, যা একমাত্র জলসেচের মাধ্যমেই করা যায়।

ভারতীয় জনজীবনে নদনদীর গুরুত্ব বা প্রভাব লেখো।

ভারতীয় জনজীবনে নদনদীর ভূমিকা অসীম –

  • কৃষিতে – একদিকে নদী অববাহিকায় উর্বর পলিমাটি চাষ-আবাদে উপযুক্ত, অন্যদিকে নদী, জলাশয় পুকুরের জল কৃষিতে জলসেচ করতে ব্যবহৃত হয়।
  • পরিবহণ – দেশের অভ্যন্তরীণ জলপথ পরিবহণে এইসব নদনদীর ভূমিকা অপরিসীম। সম্ভায় বাণিজ্য করার অন্যতম উপায় জলপথ পরিবহণ।
  • মাছ উৎপাদন – দেশের মানুষের প্রোটিনের চাহিদা মেটায় অভ্যন্তরীণ জলভাগের মাছ। সুতরাং স্বাদুজলের মাছ সংগ্রহে এইসব জলভাগের ভূমিকা প্রধান।
  • জলবিদ্যুৎ উৎপাদন – পার্বত্য নদীগুলিকে কাজে লাগিয়ে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। আবার বহুমুখী নদী উন্নয়ন পরিকল্পনার মাধ্যমেও জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে, যা পরিবেশবান্ধব শক্তিও বটে।
  • শিল্প বিকাশ – নদী, খালের জল শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং শিল্পজাতদ্রব্য পরিবহণ ও বাণিজ্যে নদী, খালপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে।
  • পানীয় হিসেবে – নদীর জলকে পরিশোধন করে পানীয় হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে নগরায়ণে সুবিধা বাড়ছে। এ ছাড়া জলভাগ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে, জল সংরক্ষণাগার হিসেবে ও অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।

উত্তর ভারতের সমভূমিতে খালসেচ প্রথা বেশি দেখা যায় কেন?

দক্ষিণ ভারত থেকে উত্তর ভারতে বেশি খালসেচ হয় কারণ –

  • নিত্যবহ নদী – উত্তর ভারতের নদীগুলি হিমালয়ের বরফগলা জলে সৃষ্ট ও পুষ্ট। তাই এগুলি চিরপ্রবাহী। এইসব নদী থেকে কাটা খালগুলিরও সারাবছর জলপ্রবাহ বজায় থাকে ও কৃষিতে জলসেচ করে।
  • সমতল ভূমিভাগ – উত্তর ভারতের ভূপ্রকৃতি সমতল তাই খালকাটা সুবিধাজনক।
  • নরম মাটি – উত্তর ভারতের সমভূমি নরম পাললিক মাটি দিয়ে গঠিত। এইরকম মাটিতে খাল খনন করা সুবিধাজনক।
  • বহুমুখী নদী উন্নয়ন পরিকল্পনা – উত্তর ভারতের বহু নদীতেই বহুমুখী নদী উন্নয়ন পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে। তাই এই পরিকল্পনার অধীনে অনেক খাল কাটা হয়েছে।

ভারতের কৃষিতে খালসেচের উপযোগিতা কতখানি?

ভারতের কৃষিতে খালসেচের উপযোগিতা অনেক বেশি –

  • অনেক অঞ্চল জুড়ে জলসেচ – খালসেচের মাধ্যমে একসাথে অনেকজমি জলসেচের আওতায় আনা সম্ভব।
  • বন্যা নিয়ন্ত্রণ – বর্ষাকালে অতিরিক্ত জল খালের মাধ্যমে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া সম্ভব, তাই এর সাহায্যে বন্যা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়।
  • জমির উর্বরতা বৃদ্ধি – খালের মাধ্যমে নদীর জল প্রচুর পলি বহন করে কৃষিজমি পর্যন্ত বয়ে নিয়ে যায়, এতে কৃষিজমিতে উর্বরতা বাড়ে।
  • ভৌমজলের সংকট থেকে মুক্তি – কূপ বা নলকূপের জল বেশি পরিমাণ ব্যবহার করলে ভৌমজলের সংকট বাড়ে, কিন্তু খালসেচ ভূপৃষ্ঠীয় জল বলে ভৌমজলের সংকট না বাড়িয়ে বরং ভৌম জলের রিচার্জ করে।

ভারতের জলসম্পদ দেশের অর্থনীতি, কৃষি, এবং জনজীবনের জন্য অপরিহার্য। এই সম্পদগুলির টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। রচনাধর্মী উত্তরভিত্তিক প্রশ্নগুলির মাধ্যমে, আমরা এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান এবং বোঝাপড়া আরও গভীর করতে পারি।

5/5 - (1 vote)


Join WhatsApp Channel For Free Study Meterial Join Now
Join Telegram Channel Free Study Meterial Join Now

মন্তব্য করুন