এই আর্টিকেলে আমরা সপ্তম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের লেখা কল্পবিজ্ঞান গল্প, ‘পাগলা গণেশ’-এর বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করব।
এখানে লেখকের পরিচিতি, গল্পের উৎস, গল্পের পাঠপ্রসঙ্গ, গল্পের বিষয়সংক্ষেপ, গল্পের নামকরণ এবং এর প্রধান বিষয়বস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। এই আর্টিকেলটি আপনাদের ‘পাগলা গণেশ’ গল্পটি সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা দেবে এবং গল্পটি ভালোভাবে বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।
এছাড়া, সপ্তম শ্রেণির পরীক্ষায় এই অধ্যায় থেকে লেখক ও গল্পের বিষয়সংক্ষেপ সম্পর্কিত প্রশ্ন আসতে পারে, তাই এই তথ্যগুলো জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পাগলা গণেশ – সপ্তম শ্রেণির বাংলা (বিষয়বস্তু ও সম্পূর্ণ আলোচনা)

পাগলা গণেশ – লেখক পরিচিতি
অসামান্য খ্যাতিমান ও জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক ছোটোগল্প রচয়িতা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বর্তমান বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায় 1935 খ্রিস্টাব্দের 2 নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। বাবা রেলে চাকরি করতেন। সেই সূত্রে তাঁর বাল্য ও কৈশোর উত্তরবঙ্গ, আসাম, বিহারের বিভিন্ন জায়গায় অতিবাহিত হয়। নিজের এই সমৃদ্ধ অতীত তাঁর রচনায় প্রভাব ফেলেছে। চলমান জীবনের নিখুঁত উপস্থাপনার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মানসিক জিজ্ঞাসার প্রকাশ তাঁর রচনাগুলিকে জীবনমুখী করে তোলে। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করার পর বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা দিয়ে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা এবং পরে সাংবাদিকতাকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করে ‘আনন্দবাজার’ পত্রিকাগোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন। অজস্র ছোটোগল্প ও উপন্যাস রচনা করেছেন তিনি। ‘ঘুণপোকা’ তাঁর প্রথম উপন্যাস। এ ছাড়া ‘উজান’, ‘পারাপার’, ‘মানবজমিন’, ‘দূরবীণ’, ‘পার্থিব’ প্রভৃতি তাঁর উল্লেখনীয় উপন্যাস। তাঁর গল্পগ্রন্থ – ‘পাগলা গণেশ’, ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’, ‘গল্পসমগ্র’ (তিন খণ্ড)। শিশু বা কিশোর সাহিত্যেও শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের অবদান অপরিসীম। অনেক পুরস্কার তিনি লাভ করেছেন। সাহিত্যস্বীকৃতির সেই পুরস্কারগুলি হল – ‘বিদ্যাসাগর পুরস্কার’, ‘আনন্দ পুরস্কার’ ও 1981-তে পাওয়া ‘সাহিত্য অকাদেমি’ পুরস্কার। ক্রীড়াপ্রেমিক এই লেখকের লেখা গল্প ‘ক্রিকেট’, ‘ক্রীড়াভূমি’, ‘খেলা’, ‘খেলার ছল’ ইত্যাদি।
পাগলা গণেশ – উৎস
কল্পবিজ্ঞানের কাহিনি নিয়ে লেখা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গল্পগ্রন্থ ‘পাগলা গণেশ’। ‘পাগলা গণেশ’ গল্পটি ওই গ্রন্থের নাম গল্প। গল্পটিতে লেখকের খেয়ালি কল্পনায় সমাজবাস্তবতার প্রকৃত স্বরূপ ধরা পড়েছে।
পাগলা গণেশ – পাঠপ্রসঙ্গ
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যা এবং যন্ত্রসভ্যতার প্রতি মানুষের নির্ভরতা সমগ্র পৃথিবীতে ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে মানুষের বেগ বাড়ছে, কিন্তু আবেগে পড়ছে ভাটা। এর থেকে যে সমস্যাটি প্রবল হয়ে উঠছে, সেটি হল – বিজ্ঞানের প্রতি অস্বাভাবিক নির্ভরতা ব্যাবহারিক জীবনকে ঋদ্ধ করলেও, মানব-মানসিকতায় শিল্পপ্রভাব ক্রমে বর্জিত হচ্ছে। অতএব ‘পাগলা গণেশ’ গল্পের মধ্যে প্রকাশিত বার্তাটি হল – মানসিক দিক থেকে মৃত্যুমুখী পৃথিবীকে বাঁচাতে হবে। কেননা মানুষ শুধু মেধায় বাঁচে না, মনেও বাঁচে। বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-যন্ত্র যে আধুনিক ঝকঝকে জীবন উপহার দেয়, তাতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পাওয়া আছে, কিন্তু জীবনের ছোঁয়া নেই। জীবনে মেধার প্রয়োজন তো আছে, কিন্তু তাতে মনস্বিতার স্পর্শ, কল্পনা ও মননের স্পর্শও জরুরি। তাই গল্পের পটভূমিতে গণেশ বিজ্ঞানের ছাত্র-অধ্যাপক ও বিজ্ঞানকর্মে লিপ্ত মানুষ হওয়া সত্ত্বেও, লক্ষ করেন সংস্কৃতির চর্চা থেমে গেছে, খেলাধুলার পাট চুকে গেছে, মহাকাশে পাড়ি জমাচ্ছে পৃথিবীর মানুষ, মানুষ মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে উঠছে। তাই তিনি হিমালয়ের গিরিগুহায় আশ্রয় নিয়ে অবিরাম ছবি আঁকা, গান-গাওয়া, ভাস্কর্য করা, কবিতার চর্চা করতে শুরু করেন। সঙ্গে সঙ্গে এই বার্তা দিয়ে যান-সৃষ্টিশীলতার মধ্যেই প্রকৃত বেঁচে থাকা সম্ভব।
পাগলা গণেশ – বিষয়সংক্ষেপ
পৃথিবীতে এক ধরনের মলম আবিষ্কৃত হয়েছে, যা মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে ছাড়িয়ে উড়ান পথে মানুষকে নিয়ে যাচ্ছে। নানান ধরনের উড়ান যন্ত্রে উড়ে গিয়ে মানুষ 3589 সালে সূর্যের শেষ দুটো গ্রহও আবিষ্কার করে ফেলেছে। অনেকে মহাকাশের দূর দিগন্তে পাড়ি দিয়ে একশো-দেড়শো বছর পরে ফিরছে। পৃথিবীতে মানুষ মৃত্যুহীন হয়ে গেছে। এই মানুষেরা গত দেড়শো বছরে পৃথিবীতে কোনো শিশুর জন্ম দেখেনি। পৃথিবী থেকে নান্দনিক সকল বিষয় উধাও হয়ে গেছে। মানুষ বুঁদ হয়ে আছে কেবল বিজ্ঞান নিয়ে।
পাগলা গণেশ একে বাড়াবাড়ি মনে করেন। তিনি মৃত্যুঞ্জয় টনিক সেবন করে জীবনের শেষ প্রান্তকে বাঁধ দিয়ে ফেলেছেন। সুকুমার শিল্পবিরোধী আন্দোলন দেখেছেন তিনি। তিনি বেঁচে থাকার দীর্ঘ ক্লান্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য হিমালয়ে নিপাট নির্জনতার সন্ধান করছেন। হিমালয়ও তাঁকে তা দিতে পারছে না।
গণেশ কবিতা লিখছেন, গান গাইছেন, ছবি আঁকছেন। আর বিজ্ঞানের অবিরাম সাধনায় যাঁরা মগ্ন তাঁরা গণেশের এমন কাজকে অকেজো বলে অবহেলা করছে। তাই গণেশ পৃথিবীর ভারসাম্যের কথা ভাবেন। নিজের পারিবারিক জীবনও তিনি ভুলে গেছেন। বউ-ছেলেমেয়ে কারও মুখ তিনি মনে করতে পারেন না। বহু বছর ধরে তাঁরাও মহাজ্যোতিষ্কমণ্ডলে এক-একজন কৃতী বিজ্ঞানী। তাঁরা আর আসে না।
গণেশ কবিতা লিখছিলেন। লেখা পাতাগুলো তিনি বাতাসে উড়িয়ে দিচ্ছিলেন। একজন পুলিশ আকাশপথে ধামা থেকে নেমে এসে চিনতে পেরেছিল-গণেশবাবু তাঁর স্যার, সায়েন্স কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক। পুলিশটি একখানা পাতা কুড়িয়ে নিয়ে পড়ে কিছু বুঝতে না পারলেও নিজের প্রিয় শৈশবকে ছুঁতে পেরেছিল। নতুন করে শৈশবকে অনুভব করার আনন্দ খুঁজে পেয়েছিল সে। সে তার মাকে আর বউকেও এনেছিল। সেদিন একটা নান্দনিক চর্চার ছোটোখাটো আসর হয়েছিল গণেশের ডেরায়। সে তার পুলিশ বন্ধুদের আনতে শুরু করে। তারপর গণেশের ডেরায় লোক আসা বাড়তে থাকে।
সপ্তাহখানেক পরে রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব এসে গণেশের কাণ্ডটাকে বিজ্ঞানবিরুদ্ধ ঘোষণা করে জানান পৃথিবীর লোক গান গাইছে, কবিতা লিখছে, ছবি আঁকছে। গণেশ তখন তৃপ্তির হাসি হেসে তাঁর প্রসন্নতাকে উজাড় করে দিয়ে বলেন, ‘তাহলে আর ভয় নেই। দুনিয়াটা বেঁচে যাবে।’
পাগলা গণেশ – নামকরণ
সাহিত্যিক মাত্রেই তাঁর সৃজিত সাহিত্যনির্মিতির নামকরণ করেন এবং তা করা হয় যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে, কেননা নামকরণ বা শিরোনামই সংশ্লিষ্ট সাহিত্যশৈলীটিকে প্রথম পরিচিত করে তোলে পাঠকচক্ষে। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে নামকরণ হল সাহিত্য ও পাঠকের মধ্যে সংযোগসেতু। গল্পের ক্ষেত্রে নামকরণ করা হয়ে থাকে কোনো বিশিষ্ট চরিত্র, সংশ্লিষ্ট কোনো ভাববাহী ঘটনা, কিংবা কোনো ব্যঞ্জনা অথবা বক্তব্যবিষয়ের প্রতীকতা প্রকাশ করে।
পাগলা গণেশ গল্পের নামকরণটি নির্মিত হয়েছে ‘পাগলা’ ও ‘গণেশ’ শব্দ দুটির অসাধারণ ব্যঞ্জনা নিয়ে এবং গল্পের কাহিনিরসের সঙ্গে শব্দ দুটির অনন্য সংযুক্তিসাধন করে। বলা বাহুল্য গল্পের চমকপ্রদ বিষয়বস্তুটি এখানে নামকরণের প্রসঙ্গটিকে নিঃসন্দেহে সহায়তা দান করেছে। দেখা যায় ‘গণেশ’ শব্দটি পৌরাণিক। এর বিশেষণরূপে ‘পাগলা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে নামকরণে। ফলত নামকরণে একটি দ্বিমাত্রিক বৈচিত্র্য এসেছে নিঃসন্দেহে। মহাভারতের লিপিকার গণেশের মতোই উক্ত গল্পের প্রধান তথা কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘গণেশ’-ও রচনাকার, তিনি কবিতা লেখেন, ভাস্কর্য করেন, গান গেয়ে ওঠেন।
গল্পে দেখা যায় 3589 সালের প্রেক্ষাপটে যখন কবিতা-গান-কবি-কথাসাহিত্য-নাটক ইত্যাদি বিষয়চর্চা ‘নিতান্ত পাগলামি’, দয়া-মায়া-করুণা-ভালোবাসা কেবলই ‘অনাবশ্যক ভাবাবেগ’, তখন এককভাবে বিজ্ঞানচর্চার ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক কাজ করতে চেয়েছিলেন গণেশ। বিজ্ঞানের অসম্ভব রকমের এককভাবে বাড়াবাড়িরও যে একটা সীমা থাকা উচিত এই বিশ্বাস নিয়ে পাগলের মতো মানবমনের সুকুমার শিল্পবোধগুলিকে চর্চিত রাখায় তৎপর হন গণেশ, অথচ তখন প্রতিটি মানুষই বুঁদ হয়ে আছে বিজ্ঞানে, সব মানুষই কম-বেশি বিজ্ঞানকর্মে লিপ্ত। বিজ্ঞান বাদে অন্য কোনো চর্চাই তখন থেমে গেছে। মানবমনের সুকুমার বৃত্তিগুলি মরতে বসেছে। এমনকি মানুষ আর প্রকৃতির অঙ্গনে গিয়েও একটি মুহূর্ত অতিবাহিত করতে চায় না। গণেশ নিশ্চিত জানেন, কালের চাকার গতিকে একা তিনি উলটো দিকে ঘোরাতে পারবেন যৌবন না। তবুও তিনি হিমালয়ের নির্জন গিরিগুহায় আশ্রয় নিয়ে সময়ের স্রোতকে নিজ ভাবনার অনুকূলে আনায় সচেষ্ট হন।
অতএব রোমাঞ্চকর এই কল্পবিজ্ঞান গল্পে গণেশের একক এবং সাধু প্রচেষ্টাটিকেই পাগলামির নামান্তর হয়ে প্রকাশিত হতে দেখা যায়। গণেশ নামক ব্যক্তিটির সঙ্গে তাঁর এই পাগলপনা নিবিড়ভাবে সংযুক্ত হয়ে গল্পের নামকরণটিকে অসাধারণ চমৎকারিত্ব দান করেছে বলে এই নামকরণটি সার্থক হয়েছে।
এই আর্টিকেলে আমরা সপ্তম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের অন্তর্গত শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের লেখা “পাগলা গণেশ” গল্পটির বিষয়বস্তু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করলাম। আশা করি, এই আর্টিকেলটি আপনাদের ‘পাগলা গণেশ’ সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা দিয়েছে এবং কল্পবিজ্ঞানের এই সুন্দর গল্পটি ভালোভাবে বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছে।
সপ্তম শ্রেণির পরীক্ষায় এই অধ্যায় থেকে লেখক পরিচিতি ও গল্পের বিষয়সংক্ষেপ সম্পর্কিত প্রশ্ন আসতে পারে, তাই পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য এই তথ্যগুলো ভালোভাবে আয়ত্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যোগাযোগ: যদি আপনার কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকে, তবে টেলিগ্রামে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। আপনাদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা সর্বদা প্রস্তুত। ধন্যবাদ।





মন্তব্য করুন