এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের দ্বিতীয় পাঠের অন্তর্গত ‘চিঠি’-এর বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করব। এখানে লেখকের পরিচিতি, পাঠ্যাংশের উৎস, পাঠপ্রসঙ্গ, সারসংক্ষেপ, নামকরণ এবং এর প্রধান বিষয়বস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। এই আর্টিকেলটি আপনাদের ‘চিঠি’ পাঠ্যাংশটি সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা দেবে এবং এটি ভালোভাবে বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। এ ছাড়া, অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষায় এই অধ্যায় থেকে লেখক ও সারসংক্ষেপ সম্পর্কিত প্রশ্ন আসতে পারে, তাই এই তথ্যগুলো জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক পরিচিতি
উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট কবি ও নাট্যকার মধুসূদন দত্ত 1824 খ্রিস্টাব্দের 25 জানুয়ারি যশোরের সাগরদাঁড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা রাজনারায়ণ দত্ত প্রখ্যাত উকিল ছিলেন। মা জাহ্নবী দেবীর তত্ত্বাবধানে তাঁর শৈশবশিক্ষা শুরু হয়। পরে পিতার সঙ্গে সাত বছর বয়সে কলকাতায় আসেন এবং প্রথমে দু-বছর খিদিরপুর স্কুলে পড়ার পর হিন্দু কলেজের জুনিয়র ডিপার্টমেন্টের সর্বনিম্ন শ্রেণিতে ভর্তি হন। এখানে ভূদেব মুখোপাধ্যায়, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, রাজনারায়ণ বসু, গৌরদাস বসাক প্রমুখ সহপাঠীদের সঙ্গে পাঠগ্রহণ করেন।
1843 খ্রিস্টাব্দের 9 ফেব্রুয়ারি খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হলে পিতা তাঁকে ত্যাগ করেন। ইংরেজি সাহিত্যে খ্যাতির অভিপ্রায়ে তিনি বিলেত যান এবং গ্রিক, ল্যাটিন, সংস্কৃত, ইংরেজি ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। ‘শর্মিষ্ঠা’, ‘পদ্মাবতী’, ‘একেই কী বলে সভ্যতা’, ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ ইত্যাদি নাটক-প্রহসন এবং ‘তিলোত্তমা সম্ভব কাব্য’, ‘মেঘনাদবধ কাব্য’, ‘ব্রজাঙ্গনা কাব্য’, ‘বীরাঙ্গনা কাব্য’ ও ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলী’ রচনা করেন। বাংলায় রচিত তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা 12টি এবং ইংরেজি গ্রন্থের সংখ্যা 5টি। মহান এই কবি ‘পদ্মাবতী’ নাটকে অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহার করেন। মহাকবি মধুসূদন ভাগ্যবিড়ম্বিত জীবন অতিবাহিত করে 1873 খ্রিস্টাব্দের 29 জুন লোকান্তরিত হন।
উৎস
‘মধুসূদনের পত্রাবলি’ গ্রন্থ থেকে গৃহীত তিনটি পত্র পাঠ্যাংশের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
পাঠপ্রসঙ্গ
প্রথম পত্রটি মধুসূদন দত্ত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে লেখেন ফ্রান্সের ভার্সাই থেকে 1864 খ্রিস্টাব্দের 3 নভেম্বর। দ্বিতীয় পত্রটি লেখেন সহপাঠী গৌরদাস বসাককে এবং তৃতীয় পত্রটি লেখেন অপর এক সহপাঠী রাজনারায়ণ বসুকে। পাঠ্য তিনটি পত্রের তরজমা অর্থাৎ অনুবাদ করেন সুশীল রায়।
বিষয়সংক্ষেপ
- প্রথম পত্র: মধুসূদন দত্ত বিদ্যাসাগরকে পত্র লিখেছেন 1864 খ্রিস্টাব্দের 3 নভেম্বর, 12 রু-দ্য শ্যাঁতিয়ারস, ভার্সাই, ফ্রান্স থেকে। ঈশ্বরচন্দ্রের ওপর আস্থাশীল মধুসূদনের তাঁর প্রতি অনুরাগ থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়—মধুসূদনের প্রতিভার বিকাশ ও বিস্তৃতি ঈশ্বরচন্দ্র উপলব্ধি করেছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্র নিজে বিচিত্র প্রতিভার অধিকারী ও নানা গুণের সমন্বয় তাঁর চরিত্রকে মহৎ করেছে বলে মধুসূদনের মতো বিপুল প্রতিভাকে শ্রদ্ধা জানাতে দ্বিধা করেননি।ঈশ্বরচন্দ্র যে নানাভাবে উপকারের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন এবং সাহায্য করতে কখনো দ্বিধা করেননি—তা জানাতে ভোলেননি। শীতকালে ফ্রান্সে যে ভয়ংকর শীত এবং তা যে ভারতের ঠান্ডার থেকে ছয় গুণ বেশি, তা জানিয়েছেন। কোনো শিক্ষকের সাহায্য ছাড়াই তিনি সহজে ফ্রেঞ্চ, ইতালিয়ান অনুশীলন করে জার্মান ভাষাচর্চায় ব্যস্ত। জার্মান ভাষা এক অদ্ভুত ভাষা এবং বিদেশি ভাষার প্রতি তাঁর যে গভীর অনুরাগ ছিল—তা এই পত্রের মাধ্যমে বোঝা যায়।
- দ্বিতীয় পত্র: মধুসূদন প্রিয় সহপাঠী গৌরদাস বসাককে এই পত্র লেখেন। ‘সিলন’ নামের এক জাহাজে যাওয়ার সময় সুযোগ পেয়ে তিনি চিঠি লিখতে বসেছেন। জাহাজটি রূপকথার দেশের ভেসে যাওয়া একটা প্রাসাদের মতো। এমন আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন জাহাজে থাকতে পারে—তা ভাবনার অতীত। এহেন বিলাসপূর্ণ ব্যবস্থার প্রতি তিনি গভীর আস্থা জ্ঞাপন করেছেন।ইংল্যান্ডে গিয়ে তিনি ঠিকানা জানালে তবে যেন গৌরদাস চিঠি লেখেন, তা জানিয়েছেন। কিন্তু ইংল্যান্ডে পৌঁছে তিনি যে নানা কর্মে ভীষণভাবে ব্যস্ত হয়ে যাবেন—তা জানাতেও দ্বিধা করেননি। জীবিকার প্রয়োজনে যে পেশা গ্রহণে এসেছেন এবং তা দৃঢ়তার সঙ্গে মনোযোগ দিয়ে গ্রহণ করার মানসিক প্রস্তুতি থেকে বোঝা যায়—পত্রলেখক নিজের সম্পর্কে সতর্ক এবং আত্মপ্রত্যয়ী ছিলেন।চিঠির অংশবিশেষ যে পরে লেখা, তার উল্লেখ আছে। পত্রের মধ্যে রয়েছে—’স্পেনের উপকূল ছাড়িয়ে, রবিবার।’ এ থেকে বোঝা যায়, পত্রের শেষাংশ পরে লেখা। চিঠিটি দুই দিন পর তিনি আবার লেখেন। আগামীকাল জিব্রালটার প্রণালীতে জাহাজ পৌঁছাবে বলে মনে করেছেন। সেখানের সমুদ্র ভীষণ শান্ত, অনেকটা হুগলি নদীর মতো। এখানে আবহাওয়া ভারতের নভেম্বর মাসের মতো নাতিশীতোষ্ণ। ঠান্ডা হওয়ার ভয় ছিল, কিন্তু প্রকৃতির ভিন্ন রূপ। লন্ডনে পৌঁছে সংবাদ দেবেন বলে অঙ্গীকার করেছেন। শৈশব থেকে যে দেশের প্রতি তীব্র মোহ ছিল, সেই দেশটা ক্রমশ কাছাকাছি এসে যাচ্ছে ভেবে পত্রলেখক যে রোমাঞ্চিত—তা পত্রের শেষাংশে পূর্ণতা পেয়েছে।
- তৃতীয় পত্র: প্রিয় অন্তরঙ্গ সুহৃদ রাজনারায়ণ বসুকে লেখা পত্র এটি এবং উভয়ের মধ্যে যে অগাধ শ্রদ্ধা ছিল—তার পরিচয় এখানে নিহিত। ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ কেমন লেগেছে—তা জানার জন্য মধুসূদন ব্যস্ত ছিলেন। রাজনারায়ণের সঙ্গে দেখা হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরেই যে তিনি ভীষণ জ্বরে আক্রান্ত হন—তা জানাতে দ্বিধা করেননি এবং তিনি যে ছয়-সাতদিন শয্যাগত ছিলেন—তাও জানিয়েছেন।মেঘনাদ চরিত্রটি নির্মাণে তিনি যে কতটা সন্দিগ্ধ ছিলেন—তার প্রকাশ আছে পত্রে। এজন্য প্রিয় বন্ধুকে জানাতে পেরে চিত্তের সমস্ত গ্লানি দূর করেছেন। মেঘনাদের মৃত্যুদৃশ্য বর্ণনা যে তাঁর কাছে ভীষণ পীড়াদায়ক ও বেদনার—তা জানাতে তিনি দ্বিধা করেননি। কাব্যের ষষ্ঠ সর্গটির চরণসংখ্যা 750-এর কাছাকাছি। এ ব্যাপারে মধুসূদন প্রিয় বন্ধুর উপযুক্ত মতামত প্রার্থনা করেছেন।’মেঘনাদবধ কাব্য’ সম্পর্কে তিনিও যে উচ্ছ্বসিত—তা তাঁর পত্রে বোঝা যায় এবং এটি যে মিলটনের কাব্য অপেক্ষা উৎকৃষ্ট, তা আনন্দের সঙ্গে জানিয়েছেন। কারো কারো বিশ্লেষণে কাব্যটি কালিদাসের সমগোত্রের। ভার্জিল, কালিদাস ও ট্যাসোর সমান কাব্যরচনা নিয়ে মধুসূদনের সংশয় ছিল না, কিন্তু মিলটন তাঁর কাছে সর্বোৎকৃষ্ট কবি।কাব্য সমালোচনায় ভালো-মন্দের দায়িত্ব বন্ধুবর রাজনারায়ণের ওপর ন্যস্ত রেখেছেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল কাব্য সম্পর্কে রাজনারায়ণের মূল্যায়ন অনেক বেশি সার্থক ও যথাযথ। অনেক হিন্দু নারী তাঁর ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ পাঠের পর চোখের জল ফেলেছেন বলে তিনি জানিয়েছেন এবং বন্ধুর কাছে দাবি রেখেছেন যে তাঁর স্ত্রী যাতে তাঁর কাব্যটি পড়েন—সেই ব্যাপারে তাঁর তৎপরতার প্রতি আস্থা জ্ঞাপনে দ্বিধান্বিত ছিলেন না। বিদ্যানুরাগী রাজনারায়ণের প্রতি মধুসূদন যে কতটা শ্রদ্ধাবনত ও আদর্শ ভাবনাচিন্তাকে সমানভাবে গুরুত্ব প্রদানে তৎপর—তা নির্ভীকভাবে জানাতে দ্বিধান্বিত ছিলেন না।
নামকরণ
নামকরণ যেকোনো সাহিত্যেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নাম ছাড়া সাহিত্য পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারে না। নাম হলো সাহিত্যের ইঙ্গিতবাহক। সাহিত্য পাঠের পূর্বে নামকরণ সাহিত্যবিষয়ে পাঠককে পূর্বাভাস দেয়। সাহিত্যে নামকরণ নানা উপায়ে হতে পারে। যথা: চরিত্রকেন্দ্রিক, ঘটনাকেন্দ্রিক, ব্যঞ্জনাভিত্তিক ইত্যাদি।
মাইকেল মধুসূদন দত্তের লেখা ‘চিঠি’ গদ্যাংশটি তিনটি পত্রের সংকলন। প্রথম পত্রটি মধুসূদন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে লেখেন ফ্রান্সের ভার্সাই থেকে 1864 খ্রিস্টাব্দের 3 নভেম্বর। দ্বিতীয় পত্রটি লেখেন সহপাঠী গৌরদাস বসাককে এবং তৃতীয় পত্রটি লেখেন অপর এক সহপাঠী রাজনারায়ণ বসুকে। পাঠ্য তিনটি পত্রের তরজমা অর্থাৎ অনুবাদ করেন সুশীল রায়।
যেহেতু গদ্যাংশটি তিনটি পত্রের সংকলন, তাই এর নামকরণ ‘চিঠি’ যথার্থ এবং সার্থক হয়েছে।
এই আর্টিকেলে আমরা অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের দ্বিতীয় পাঠের অন্তর্গত ‘চিঠি’-এর বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করেছি। আশা করি, আর্টিকেলটি আপনাদের উপকারে আসবে। যদি কোনো প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থাকে, তবে আমাদের টেলিগ্রামে যোগাযোগ করুন; আমরা উত্তর দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করব। এ ছাড়া, লেখাটি প্রয়োজনীয় মনে হলে আপনার বন্ধু বা সহপাঠীদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ।





মন্তব্য করুন